(Hemendrakumar Roy)
প্রসাদদাস রায়। জন্ম ১৮৮৮ সালের ২রা সেপ্টেম্বর, পাথুরিয়াঘাটের এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে, আর কলকাতাতেই জীবনাবসান ১৯৬৩ সালের ১৮ই এপ্রিল। এই সময়ের মধ্যে অজস্র বই লিখেছেন, তার মধ্যে আশিটির উপর ছোটদের জন্য। বাংলায় কিশোর-কিশোরীরা তাঁর কাছেই প্রথম উপহার পেল গোয়েন্দা গল্প, অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি, ভূতের আর পিশাচের গল্প, কল্পবিজ্ঞানের মজা আর সহজ ভাষায় লেখা চমৎকার সব প্রবন্ধ। ‘জয়ন্ত-মানিক’ আর ‘বিমল-কুমার’ জুটিদের আজও ভোলা যায় না, ভোলা যায় না তাদের ‘সঙ্গতকার’ সুন্দরবাবু, বিনয়বাবু, মিনু, রামহরি আর বাঘাকে।
আরও পড়ুন: অনুবাদ: কর্নেই সাহেবের গুপ্তকথা
এতক্ষণে নিশ্চয় বোঝা গেছে, এই আশ্চর্য মানুষটিকে আমরা হেমেন্দ্রকুমার রায় নামেই জানি। কিন্তু সত্যিই কি ‘ছোটদের সাহিত্যিক’ ছাড়া তাঁর অন্য কোনও পরিচয় আমাদের জানা আছে? তাঁর সাহিত্যিকজীবন কিন্তু শুরু হয় পরিণত বয়সের পাঠক-পাঠিকাদের জন্য লেখার মধ্যে দিয়েই।
‘ভারতী’ পত্রিকা ও তার লেখকগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে এই পর্যায়ে অনেক উপন্যাস তিনি লিখেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী অস্থির সময়ে লেখা তাঁর বাস্তবধর্মী এই লেখাগুলি যথেষ্ট খ্যাতিও পেয়েছে, এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় তাদের কয়েকটি অনূদিত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, সাহিত্যের সব কয়টি এলাকায় তাঁর পদসঞ্চার ছিল নির্ভীক স্বকীয়তায় পরিপূর্ণ। তবু শুধুমাত্র কিশোরমনগুলিকে যুগোপযোগী করার তাগিদে অনেক স্বল্প আয় ও জনপ্রিয়তার পথটিকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন।

আঁকার ব্যাপারে তাঁর দক্ষতা সুবিদিত। তিনি নিজেই বলেছেন, আর্ট কলেজে তাঁর ভর্তি হওয়ার কথা, আর জানিয়েছেন তাঁর পদ্মফুল আঁকা দেখেই শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ তাঁকে ছাত্র হিসাবে নিতে চান। কিন্তু আবার আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, স্বয়ং শিল্পগুরুর সংস্পর্শে আসার এবং আর্ট কলেজ থেকে রীতিমতো পাশ করে বার হওয়ার পরেও, লেখার জগতে মগ্নতার কারণে তিনি ছবির জগৎ ছেড়ে গেলেন। তবে শিল্প নিয়ে তাঁর দৃষ্টি ছিল অনাবিল। পরাধীনতার মধ্যে ভারতীয় শিল্পের নতুন উন্মেষ যাঁর হাতে ঘটেছিল, সেই অবনীন্দ্রনাথের সঠিক মূল্যায়ন এবং রবি বর্মা প্রবর্তিত বোম্বে স্কুলের সঙ্গে অবনীন্দ্র অনুপ্রাণিত কলকাতা স্কুলের মূলগত প্রভেদ দুই-ই করেছেন তিনি, অতি অল্প কথায়, দ্ব্যর্থহীনভাবে।
এই ঋজুতাই হেমেন্দ্রকুমারের বৈশিষ্ট্য। বাংলা গানের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত অবদান কী, তাও তিনি এরকমই বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ করেছেন। ইউরোপের সংস্কৃতি একদিকে বাঙালি আলোকপ্রাপ্ত সমাজকে বাংলা লোকসঙ্গীত থেকে আপাতভাবে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। তার প্রকাশভঙ্গি আর এই সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। কিন্তু, তার কথার মাধুরী আর অন্তরের আবেগ বাঙালির মনের মধ্যে রয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে উত্তর ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তানকর্তব বাঙালির মনকে ছুঁতে পারেনি। এই দুই ধারার শ্রেষ্ঠ দিকগুলি নিয়ে যে অলোকসামান্য সংশ্লেষের ফলে রবীন্দ্রসঙ্গীত সৃষ্ট হল, তার মূলকথাও হেমেন্দ্রকুমারের অনায়াসলব্ধ।

কোনও প্রগতিবাদী লেখক বা শিল্পী গোষ্ঠীতে তিনি ছিলেন না। চিন্তাধারা ছিল স্বতন্ত্র এবং স্বততই উদার, প্রগতিশীল। মঞ্চে পুরুষ ও মহিলাদের একত্রে অভিনয় তো বটেই, তাদের যুগল নৃত্য নিয়েও তাঁর মনে কোনও বাধা ছিল না, এ ব্যাপারেও তিনি ঠাকুরবাড়িকে পথ প্রদর্শনের জন্য উচ্ছ্বসিত অভিবাদন জানিয়েছেন, উদয়শঙ্করের নৃত্যশৈলীর অভিনবত্ব সম্পর্কে বাঙালিকে সচেতন করার ব্যাপারে অবনীন্দ্রনাথের অবদানের কথাও তিনিই জানিয়েছেন। কিন্তু, শুধু তাই নয়, তিনি নিজেও শিশির ভাদুড়ি পরিচালিত নাটকের মঞ্চ নির্দেশনা দিয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন বাংলায় চলচ্চিত্র ও নাট্যজগৎ নিয়ে সেই সময়কার সেরা ‘নাচঘর’ পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। তৎকালীন অনেক নাটক ও চলচ্চিত্রের নৃত্য পরিকল্পনাই শুধু নয়, ছৌ নাচের সঙ্গে বাংলার দর্শকদের পরিচয় তিনিই করান।
এই স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে শরৎচন্দ্রকে নতুন চোখে দেখিয়েছে, শরৎচন্দ্রের জীবন আর সাহিত্য যে কতটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তা তিনি তাঁর শরৎ-জীবনীতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির এই বলিষ্ঠ স্বাতন্ত্র্য ও প্রগতিশীলতার পিছনে ছিল তাঁর যৌবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা। সেসময় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মহানগরীর রাতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য তিনি একা অথবা সবান্ধবে এই শহরের পথে-বিপথে, অলিগলিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার মধ্যে বিপথটাই ছিল বেশি। কলকাতার কলঙ্ক বলতে যে জায়গাগুলোর কথা আমাদের মনে পড়ে, তার প্রতিটিতে তাঁর পা পড়েছে। অনেক সময় ভয়াবহ অবস্থায় পড়ে কোনওরকমে বেঁচে গেছেন, কিন্তু তাতে এই পরিক্রমা বন্ধ হয়নি। এইসব তথাকথিত জঘন্য এলাকাতে মানুষের চরিত্র কীভাবে গড়ে ওঠে, তা তিনি সরাসরি উপলব্ধি করেছেন, দেখেছেন একই মানুষ একদিকে পেশাদার গুন্ডা, আবার অন্যদিকে রীতিমত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সমঝদার হতে পারে। তাঁর রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চার কাহিনিগুলিতে তো বটেই, সমস্ত সাহিত্যই এই জীবনবোধ আর বাস্তবতায় জারিত।

অনেক সময় তাঁর কিছু লেখা, বিশেষ করে ভৌতিক বা পৈশাচিক কাহিনিতে অতি বাস্তব বর্ণনা, হয়তো কিশোর-কিশোরীদের জন্য অতিরিক্ত রূঢ় এমনকি বীভৎস বলে মনে হয়। তবে একথাও সত্য যে, বোধকরি, তাঁর মতে, এভাবেই বেড়ে ওঠা মনকে জগতের কুৎসিত দিকের জন্য তৈরির প্রয়োজন আছে। তবু মাঝেমাঝে এই সব বর্ণনার কদর্যতা দেখে মনে হয়, নিঃসন্দেহে সাহিত্যগুণের ক্ষতি হয়েছে, এতটা না হলেও হয়তো হত। একথা আরও মনে হয়, যখন দেখা যায়, ওই একই কলম থেকেই কী সরল, সুন্দর, মনোমুগ্ধকর লেখা বেরোয়, যেমন ‘দেড়শো খোকার কাণ্ড’ বা ‘হিমাচলের স্বপ্ন’।
এই স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে শরৎচন্দ্রকে নতুন চোখে দেখিয়েছে, শরৎচন্দ্রের জীবন আর সাহিত্য যে কতটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, তা তিনি তাঁর শরৎ-জীবনীতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু শুধু তাই নয়, এই জীবনীর মধ্যে দিয়ে বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন নিয়েও যে কথাগুলি বলেছেন, তাদের যৌক্তিকতা আর গভীরতা থেকে বোঝা যায়, সমাজ বা জীবনকে তিনি কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়েই বিচার করতেন।

গীতিকার হিসাবে তাঁর ‘ষোড়শী’ নাটকের জন্য লেখা ‘অন্ধকারের অন্তরেতে অশ্রুবাদল ঝরে’ গানটির কথাই শুধু আমাদের চেনা। এই গানে সুর দিয়ে গেয়েছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী কৃষ্ণ চন্দ্র দে এবং পরে মান্না দে। অথচ ‘যৌবনের গান’ নামে তাঁর আরও অজস্র গান আছে। তার অনেকগুলিতে সুর দিয়েছেন শচীন দেববর্মণ, কৃষ্ণ চন্দ্র দে প্রমুখ জ্যোতিষ্করা। আজ এইসব গানের কয়েকটি রয়ে গেছে, অন্তর্জালে খুঁজলে তবেই তাদের দেখা মেলে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা থেকে জানা যায়, কবি যতীন বাগচীর বাড়িতে এক আড্ডার আসরে হেমেন্দ্রকুমার প্রথম শচীন দেববর্মণকে বিদ্বজ্জন সমাজের সঙ্গে পরিচিত করান।
কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও, তাঁর বিধিসম্মত অর্থাগম থেকে অতি অন্যায়ভাবে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। এরসঙ্গে আবার ছিল, তাঁর বেপরোয়া জীবনযাপন আর বন্ধুদের বিপন্নতায় অকাতরে দানের অভ্যাস।
বিশ শতকের বঙ্গসমাজের সব দিকপালরা তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে দ্বিজেন্দ্রলাল এবং অবশ্যই তাঁর পুত্র দিলীপকুমার, অবনীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, অহীন্দ্র চৌধুরী, শিশির ভাদুড়ি, ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর সব সাহিত্যিক, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবরাম, নজরুল, উদয়শঙ্কর, যামিনী রায়, যতীন্দ্রনাথ ওরফে গোবর গুহ, কার সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা ছিল না! তাঁর ‘যাঁদের দেখেছি’ আর ‘এখন যাঁদের দেখছি’ প্রকৃতপক্ষে বিগত শতকের প্রথমার্ধের বাঙালির চরিতাভিধান হিসাবে গণ্য হওয়া উচিত।
এই অনন্যসাধারণ মানুষটির শেষজীবন সুখের হয়নি। তাঁর সাহিত্যসম্ভারের বাণিজ্যিক দিকটি নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাবার কথা তাঁর মনেও আসেনি, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কপিরাইট সুরক্ষিত হয়নি। কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও, তাঁর বিধিসম্মত অর্থাগম থেকে অতি অন্যায়ভাবে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। এরসঙ্গে আবার ছিল, তাঁর বেপরোয়া জীবনযাপন আর বন্ধুদের বিপন্নতায় অকাতরে দানের অভ্যাস। এই সমস্ত কিছু থেকে উদ্ভূত আর্থিক সমস্যার জন্য অবশেষে তাঁকে সরকারের উপরে নির্ভর করতে হয়। বাঙালির আত্মবিস্মরণ ও আত্মহননের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি আরও একটি সংযোজন হয়ে থাকবে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
One Response
Alokmoy Datta ‘s unique style of writing comes alive once more – so also his interest on writing articles about personalities our society has largely forgotten – kudos to Dr Datta !