(Le Secret de Maitre Cornille)
মূল গল্প: ল্য সেক্রেৎ দ্য মায়ত্রহ্ কর্নেই – আলফঁস দোদে
ভাষান্তর: আলোকময় দত্ত
আলফঁস্ দোদের জন্ম ১৮৪০ সালের ১৩ই মে, ফ্রান্সের নিম শহরে। মৃত্যু ১৮৯৭ সালে ১৬ই ডিসেম্বর। ফরাসি সাহিত্যে তাঁর খ্যাতি তাঁর মরমী ভাষা আর সাধারণ মানুষের মনের কথা তুলে আনার জন্য। তাঁর জীবন ছিল বৈপরীত্যে ভরা, বারো বছর বয়স থেকে নারীসঙ্গ, অবশেষে সিফিলিসের আক্রমণে যাতনাক্লিষ্ট মৃত্যু, কট্টর রাজতন্ত্র সমর্থন ও গণতন্ত্র-বিরোধিতা, ইহুদীবিদ্বেষ, সবই ছিল তার মধ্যে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির দিকে তাকালে সে সব কথা মনেই আসে না। যেমন এই গল্পটি।
ফ্রঁসে মামাই এই গাঁয়ের একজন বাঁশিওয়ালা। বয়স্ক মানুষ, মাঝে মাঝে আমার এই হাওয়াকলে এসে গল্পস্বল্প করেন, মশলা দেওয়া ওয়াইন খান। সেদিন সন্ধ্যায় প্রায় বিশ বছর আগে এই গ্রামে ঘ’টে যাওয়া একটা বেশ নাটকীয় ঘটনার কথা বললেন। গল্পটা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, তাই আমি যেভাবে শুনেছি সেভাবেই আপনাদের বলার চেষ্টা করব। শুধু ভাবুন, আপনি একটি সুগন্ধি ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে একজন বয়স্ক বাঁশিওয়ালার সঙ্গে কথা বলছেন।
বুঝলেন স্যর, এই জায়গাটা আজকের মতো চিরকাল এরকম অখাদ্য মর্কুটেমার্কা ছিল না। একসময় এখানে একটা মস্ত গমকলের কারবার চলত, আশপাশের দশ লীগের মধ্যে সব খামার থেকে এখানে গম ভাঙাতে আসত। চারদিকের পাহাড়গুলো হাওয়াকলে হাওয়াকলে ছেয়ে ছিল। ডাইনে বাঁয়ে যেদিকে তাকান দেখবেন, পাইন গাছের উপরে মিস্ত্রাল হাওয়ায় ডানাগুলো ঘুরছে, আর পিঠে বস্তা নিয়ে সার সার ছোট ছোট সব গাধা যাচ্ছে আর আসছে।
আরও পড়ুন: অনুবাদ – তিনদিনের দৃষ্টি
হপ্তায় হপ্তায় চাবুকের শব্দ, ক্যানভাসের মচমচ আর কলের লোকজনের ‘হেঁইও!’ শুনে কানটা জুড়িয়ে যেত। রোববারে সবাই দল বেঁধে হাওয়াকলে আসতাম। কলমালিকরা মদের পয়সা জোগাত, তাদের বউয়েরা লেসের ওড়না, সোনার ক্রুশ পরে রানির মতো সুন্দর সেজে থাকত। আমি প্রতিবার আমার বাঁশিটা নিয়ে যেতাম, আর রাতভর সেই বাঁশির তানে সবাই নাচত। এই কলগুলোই আমাদের সব কিছু ছিল, স্যর।
সবই ঠিক ছিল হঠাৎ পারীর কিছু মহিলার মাথায় খেয়াল চাপল, তারা তারাস্কন যাওয়ার রাস্তার উপরে একটা ইস্টীমের গমকল চালু করে দিল। ব্যস, যা কিছু নতুন, তার পিছনেই তো সবাই ছোটে! দেখতে দেখতে সবাই ওখানেই গম ভাঙাতে লাগল, বেচারা হাওয়াকলগুলো বেকার হয়ে পড়ল। কয়েকদিন তারা যুঝেও ছিল, কিন্তু ইস্টীমের সঙ্গে কী পারে! অনেক লোকসান দিয়ে একে একে সব বন্ধ করতে বাধ্য হল। সেই ছোট ছোট গাধাগুলো আর আসত না। কলমালিকের সুন্দরী বউয়েরা তাদের সোনার ক্রুশ সব বেচে দিল। কোথায় গেল সেই মদের ফোয়ারা, কোথায় গেল রাতভর নাচের আসর! মিস্ত্রাল বাতাস আগের মতোই বয়, কিন্তু হাওয়াকলের ডানা আর নড়ে না। তারপরে একদিন গাঁয়ের লোকরা মিলে কলগুলো ভেঙে সেই জমিতে আঙুর আর জলপাই চাষ শুরু করে দিল।

সবই রসাতলে গেল, কিন্তু একটা হাওয়াকল শুধু রয়ে গেল। সবার নাকের ডগায় বুক ফুলিয়ে পাহাড়ের উপরে যেখানে এখন উপাসনাঘর হয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়ে বনবনিয়ে ঘুরতে লাগল। ওই কলটার মালিক ছিলেন কর্নেই সাহেব।
গমকলের ব্যবসায় বুড়ো কর্নেই সাহেব ষাট বচ্ছর কাটিয়েছেন, এই নতুন কলগুলো তাঁকে একেবারে খেপিয়ে তুলেছিল। আট দিন ধরে গাঁয়ের রাস্তায় রাস্তায় পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে, লোকজন জড়ো করে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলছিলেন ওইসব কলের আটা বিষ, ওই খাইয়ে ওরা গোটা প্রভঁসের সবাইকে মেরে ফেলার তালে আছে। কেবলই বলছিলেন, ‘ওদের আটা ময়দা খেও না, ডাকাতগুলো ইস্টীম দিয়ে কল চালায়, ওগুলো শয়তানের কল, আর আমার কল চলে মিস্ত্রাল আর ত্রামন্তঁ বাতাসে, খোদ ভগবানের নিঃশ্বাস।’ হাওয়াকল নিয়ে আরও কত ভাল ভাল কথা বলে গেলেন, কিন্তু কেউ তাতে কান দিল না।
দাদু নাতনিকে খুবই ভালোবাসতেন, প্রায়ই চড়া রোদ মাথায় নিয়ে চার লীগ হেঁটে খামারবাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, আর দেখা হওয়ার পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একনাগাড়ে কাঁদতেন।
তখন বুড়ো রেগে খেপে একেবারে একটা বুনো জন্তুর মতো নিজেকে ওই হাওয়াকলের মধ্যে আটকে ফেলে ওখানেই দিন কাটাতে লাগলেন। এমনকি তাঁর বাপ-মা মরা পনেরো বছরের নাতনি ভিভেৎকেও নিজের কাছে রাখলেন না। দাদু ছাড়া বেচারির দুনিয়ায় আর কেউ ছিল না। ওই বাচ্চা মেয়েটাকে তাই বেঁচেবর্তে থাকার জন্যে কোনও খামারে ফসল কাটা, কোথাও রেশমগুটি তোলা, আবার কোথাও বা জলপাই পাড়বার কাজে হাত লাগাতে হত। তবে দাদু নাতনিকে খুবই ভালোবাসতেন, প্রায়ই চড়া রোদ মাথায় নিয়ে চার লীগ হেঁটে খামারবাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, আর দেখা হওয়ার পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একনাগাড়ে কাঁদতেন।
সবাই ভাবত, বুড়ো কলওয়ালা টাকার লোভে নাতনিটাকে খাটাচ্ছে। তাঁর মতো একজন বড় ঘরের মানুষের নাতনিকে আর পাঁচটা ছোঁড়াছুঁড়ির মতো এক খামার থেকে আরেক খামারে ঘুরে ঘুরে কাজ জোগাড় করতে হচ্ছে, আদালতের কর্মচারীদের বিশ্রী ব্যবহার সইতে হচ্ছে, এতে কি তাঁর মান বাড়ছে? তাছাড়া কর্নেই সাহেবের বেশ নামডাক ছিল, এখন তিনি আস্ত একটা বাউন্ডুলের মতো খালি পায়ে, ছেঁড়া টুপি আর ছেঁড়াখোঁড়া কোট পরে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন দেখে খুব খারাপ লাগত। রোববার রোববার ওঁকে গির্জায় দেখে আমরা বুড়োরা লজ্জা পেতাম। উনিও সেটা বুঝতেন তাই এসে বেঞ্চে বসার সাহস পেতেন না। একেবারে পিছন দিকে জর্ডানের জলের গামলাটার কাছে গরিবদের সঙ্গেই থাকতেন।

ওঁর হাবভাবের মধ্যে একটা লুকোনো কিছু ছিল, একটা রহস্য। অনেকদিন তো তাঁকে কেউ গম এনে দেয় না অথচ তাঁর কলের পাখাগুলো আগের মতোই ঘুরে চলে। প্রতি সন্ধ্যায় দেখা যায় তিনি গাধার পিঠে ময়দার বড় বড় বস্তা চাপিয়ে হাঁকিয়ে যাচ্ছেন।
চাষারা ডেকে বলত, ‘সেলাম, কর্নেই সাহেব! কারখানাটা দেখছি এখনও ভালই চলছে।’
তিনিও হাসিমুখেই জবাব দিতেন, ‘একদম ভাই একদম। ভগবানের দয়ায় কাজের কোনও অভাব নেই।’
কেউ যদি জিজ্ঞেস করত এত কাজ আসে কোত্থেকে অমনি ঠোঁটে আঙুল রেখে বলতেন, ‘সেটি বলার উপায় নেই, বড়সড় ব্যাপার, রপ্তানির কাজ, বুঝলে না…’ এর চাইতে বেশি কিছু কখনই বের করা যেত না। আর তাঁর কারখানায় নাক গলানোর তো প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি ভিভেৎ নিজেও ওখানে ঢুকতে পারত না।
গোটা ব্যাপারের মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ ছিল, এই নিয়ে কানাকানি লেগেই ছিল, প্রত্যেকের নিজের নিজের বক্তব্য, অনেকে ভাবত কলের মধ্যে ময়দার চেয়ে টাকার বস্তাই বেশি।
যখনই হাওয়াকলটার পাশ দিয়ে যেতাম, দেখতাম দরজাটা সবসময় বন্ধ, বিশাল ডানাগুলো নড়েই চলেছে, বুড়ো গাধাটা মাচার ঘাস খাচ্ছে, আর একটা মস্ত রোগা বিড়াল জানলার ধারে বসে রোদ পোহাতে পোহাতে বিটকেল মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে।
যা বলছিলাম, গোটা ব্যাপারের মধ্যে একটা রহস্যের গন্ধ ছিল, এই নিয়ে কানাকানি লেগেই ছিল, প্রত্যেকের নিজের নিজের বক্তব্য, অনেকে ভাবত কলের মধ্যে ময়দার চেয়ে টাকার বস্তাই বেশি।
শেষকালে কিন্তু সব বোঝা গেল। শুনুন কীভাবে। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা আমার বাঁশির সুরে তখনও নাচতে আসত, সেই নাচের আসরে একদিন বুঝতে পারলাম আমার বড় ছেলে আর ভিভেৎ প্রেমে প’ড়েছে। এতে আমার কোনও আপত্তি তো ছিলই না, বরং খুশি হলাম। কর্নেইরা বড় ঘর, আর ওই চড়ুইয়ের মতো ছোট্ট ভিভেৎটা আমাদের বাড়িতে ঘুরঘুর করবে ভাবতেই ভাল লাগল। তবে ছেলেমেয়ে দু’টো প্রায়ই একসঙ্গে ঘোরে, কোনসময় না কিছু অঘটন ঘটে, তাই বিয়েটা সেরে ফেলাই ভাল। মেয়ের দাদুর মত নিতে ওঁর হাওয়াকলে গেলাম।

বুড়োর আপ্যায়নের কী ছিরি! দরজাটা আদপে খুললেনই না, চাবির ফুটো দিয়ে যা বলার বললাম, আর সারাক্ষণ শয়তান বিড়ালটা মাথার উপর থেকে ফ্যাঁসফ্যাঁস করতে লাগল।
আমার কথা শেষ করার আগেই বুড়ো বলে কি না ছেলের বিয়ে দেওয়ার খুব তাড়া থাকলে কলে কারখানায় অনেক মেয়ে আছে, তাদের একটাকে খুঁজে নিন! ভাবুন একবার কী যাচ্ছেতাই কথা! আমার তো রক্ত গরম হয়ে উঠেছিল, তবু বুদ্ধি করে মাথাটা ঠান্ডা রেখে হাঁদা বুড়োটাকে ছেড়ে বাচ্চা দুটোর কাছে এসে ওর এঁড়েমির কথা বললাম।
বেচারারা ব্যাপারটা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। তারপরে আমাকে মিনতি করল একবার যেন তাদের একসঙ্গে দাদুর কাছে যেতে দিই। না বলব আর কী করে, তাই ঘাড় নাড়তে হল। সঙ্গে সঙ্গে দু’জনেই হাওয়া।
সারা যাঁতাঘর তো বেবাক ফাঁকা…একটাও থলে নেই, এক দানা গমও নেই, দেওয়ালে কী মাকড়সার জালে ময়দার কোনও চিহ্ন নেই। বাতাসে নতুন ভাঙা গমের সেই সুন্দর গন্ধটুকুও নেই।
ওরা পৌঁছে দেখে কর্নেই সাহেব সবেমাত্র বেরিয়ে গেছেন। দরজায় মস্ত বড় তালা ঝুলছে, তবে উনি যাওয়ার সময় তাঁর মইটা বাইরে ফেলে গিয়েছিলেন। তাই দেখে বাচ্চাদের বুদ্ধি খেলে গেল, এবার এই বিখ্যাত কারখানার ভিতরে কী আছে দেখার জন্য জানলা গলে ভিতরে ঢুকতে হবে।
এ কী কাণ্ড! সারা যাঁতাঘর তো বেবাক ফাঁকা…একটাও থলে নেই, এক দানা গমও নেই, দেওয়ালে কী মাকড়সার জালে ময়দার কোনও চিহ্ন নেই। বাতাসে নতুন ভাঙা গমের সেই সুন্দর গন্ধটুকুও নেই। ঘরের মাঝে গমকলের ডান্ডাটা ধুলোয় ঢাকা পড়ে আছে আর ধেড়ে রোগা বিড়ালটা তার পাশে শুয়ে ঘুমোচ্ছে।
নীচের ঘরেরও একই হাল, ছেঁড়াফাটা একটা বিছানা, কিছু কাপড়চোপড়, সিঁড়ির ধাপের একটা ভাঙা টুকরো, এক কোণে তিন-চারটে ফাটা বস্তা, সেখান থেকে নুড়িপাথর আর সাদা মাটি গড়িয়ে পড়ছে।

এই তাহলে কর্নেই সাহেবের গোপন কথা! প্রতিদিন সন্ধেবেলা বস্তায় ভরে এই ভাঙাচোরা টুকরো আর নুড়িগুলোই গাধার পিঠে চাপিয়ে রাস্তা বেয়ে নিয়ে যেতেন, লোকজনকে বোঝাতেন যেন সব ঠিক আছে, কল থেকে আটা বেরোচ্ছে, কলের মান বেঁচে আছে। আহা রে বেচারা কর্নেই! কতদিন আগেই তো ইস্টীম কলের মালিকরা ওঁর কলটাকে বেকার করে দিয়েছে, পালগুলো তখনও ঘুরছে, যাঁতাকলটাও ঘুরে চলেছে কিন্তু সব বৃথাই।
ছেলেমেয়ে দুটো কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এসে আমাকে সব বলল। শুনে আমার বুকটা ভেঙে গেল। একমুহূর্তও দেরি না করে পাড়াপড়শিদের কাছে ছুটে গিয়ে দু-একটা কথায় ব্যাপারটা বলতেই সবাই ঠিক করলাম যে যার বাড়িতে থাকা সব গম এক্ষুণি কর্নেই সাহেবের কলে নিয়ে যাব। যেমন কথা তেমন কাজ। গোটা গাঁয়ের সবাই মিলে গাধার পিঠে গমের বস্তা চাপিয়ে একেবারে মিছিল করে ওখানে হাজির। একেবারে খাঁটি আসল গম!
গিয়ে দেখলাম কলের দরজা পুরো খোলা। দরজার সামনে একটা প্লাস্টারের বস্তার উপরে বসে দু’হাতে মুখ ঢেকে কর্নেই সাহেব কাঁদছেন। বাড়ি ফিরেই বুঝেছেন, তাঁর না থাকা কালে কেউ ভিতরে ঢুকে তাঁর গোপন কথাটা জেনে ফেলেছে।
আমাদের গাধাগুলো কলের সামনের প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছাল। আমরাও আগে আগে কলের মালিকদের যেমন ডাকতাম তেমনই হাঁকডাক শুরু করে দিলাম।
ক্রমাগত বলছেন, ‘হায় কপাল! সবাই এবার সব জেনে গেল, আমার কলটার বদনাম রটে যাবে, আমার আর বেঁচে কী লাভ!’ তারপরেই বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে হাওয়াকলটাকে যা-তা বলে ডাকতে লাগলেন, ওটার সঙ্গে এমনভাবে বকবক করতে লাগলেন যেন ওটা কোনও মানুষ।
ঠিক তখনই আমাদের গাধাগুলো কলের সামনের প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছাল। আমরাও আগে আগে কলের মালিকদের যেমন ডাকতাম তেমনই হাঁকডাক শুরু করে দিলাম।

‘ও কত্তা! ও কর্নেই সাহেব!’
দরজার সামনে একে একে গমের বস্তাগুলো জমা পড়ে স্তূপ হয়ে চলেছে, সুন্দর লালচে দানাগুলো ছড়িয়ে পড়ছে মাটিতে।
কর্নেই সাহেবের চোখদু’টো একেবারে ছানাবড়া। হাতের তালুতে কয়েকটা গমের দানা নিয়ে ঘষেন আর একসঙ্গে হাসতে হাসতে আর কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘গম! হায় ভগবান! কী ভাল গম! দেখি, দু’চোখ ভরে একটু দেখি!’
তারপরে আমাদের দিকে ফিরে বললেন, ‘জানতাম, আমি ঠিক জানতাম, তোমরা আমার কাছে আবার ফিরে আসবে। ওই হতভাগাগুলো তো সব চোর।’
আমরা ওঁকে নিয়ে শোভাযাত্রা করে গাঁয়ে নিয়ে যেতে চাইলাম, কিন্তু উনি রাজি হলেন না।
‘না বাবা, সবার আগে আমার কলটাকে খাওয়াতে হবে। ভাবো তো, কতদিন হয়ে গেল ও বেচারা কিছুই খায়নি।’
অবশেষে, একদিন সকালে, কর্নেই সাহেব মারা গেলেন আর আমাদের শেষ হাওয়াকলের পালগুলো এবার চিরকালের জন্যই থেমে গেল। উনি মারা যাওয়ার পরে ওঁর জায়গাটা আর কেউ নেয়নি।
সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম বুড়োমানুষটা কেমন ব্যস্তভাবে ছোটাছুটি করছেন, বস্তা ছিঁড়ছেন, যাঁতাটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছেন, গম মাড়াই হচ্ছে, আর মিহি আটার গুঁড়ো ছাদের দিকে উড়ে যাচ্ছে। দেখতে দেখতে আমাদের চোখে জল আসছিল।

এটাই তো হওয়া উচিৎ তাই না? সেই দিন থেকে আর আমরা ওঁর কখনও কাজের অভাব হতে দিইনি।
অবশেষে, একদিন সকালে, কর্নেই সাহেব মারা গেলেন আর আমাদের শেষ হাওয়াকলের পালগুলো এবার চিরকালের জন্যই থেমে গেল। উনি মারা যাওয়ার পরে ওঁর জায়গাটা আর কেউ নেয়নি।
আরে স্যার, ওরকম চাইলেই কি সব থাকবে? জগতে সবকিছুরই তো একটা শেষ আছে, হাওয়াকলের দিনও শেষ হয়ে গেছে, আর ফিরে আসবে না। দেখছেন না, এরকম আরও কত জিনিসের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে, রোন নদীর উপর দিয়ে চলা গাড়ি, আমাদের সংসদ বা ওইসব বড় বড় ফুল আঁকা জ্যাকেট, কিচ্ছু আর ফিরে আসবে না।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
অলংকরণ- আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
3 Responses
মূল ভাষায় লেখা গল্পটি পড়বার সৌভাগ্য হয়েছিল এক ফরাসি বন্ধুর সৌজন্যে । ফরাসি ভাষায় অদক্ষ বলে সে অনুভব আসে নি যা এই স্বচ্ছ সুন্দর অনুবাদ পড়ে পেলাম , খুব ভাল লাগল । অসংখ্য ধন্যবাদ ।
Vibrant translation of a short story which will move all – the old and the young
অসাধারণ। শিল্পবিপ্লবের পটভূমিতে সমাজ বদলের গল্প। ঝরঝরে বাংলা ভাষা। মনেই হলো না অনুবাদ পড়লাম।