(Saradaranjan Roy)
বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ তাঁর ‘কর্নার অফ আ ফরেন ফিল্ড’ বইতে ভারতবর্ষের ক্রিকেট প্রসঙ্গে লিখেছিলেন— ‘An Indian Game accidentally invented by the English’। রাম গুহ তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে অনুভব করেছিলেন, ক্রিকেট খেলাটির যে মূল স্পিরিট, তা ভারতীয় উপমহাদেশের জলহাওয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সমস্ত রসদ থাকা সত্ত্বেও, ভারতের আগে ইংল্যান্ডে জন্ম নিয়েছিল।
তিনি লিখছেন, ক্রিকেট হল সেই খেলা, যা মালিকপক্ষ শ্রমিকপক্ষকে বিনোদনে ভুলিয়ে রেখে দিতে লাগাতার ব্যবহার করতে পারে, এবং এ কারণেই ভারতের ঔপনিবেশিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের বিচারে ক্রিকেটের জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ছিল সময়ের অপেক্ষা। তা হয়েছেও। ক্রিকেটকে ফুটবলের মতো সেই অর্থে গ্লোবাল গেমের তকমা দেওয়া না হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেট আসলে ধর্ম, যার জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত।
বিলেতের উইলোকাঠের এই বিনোদন মাধ্যমটি ১৪০ বছর ধরে ক্রমেই হয়ে উঠল উপমহাদেশের হৃদস্পন্দন। সেই জেন্টলম্যানস গেমের পুরোধা ডব্লু জি গ্রেসের মতোই বাংলার মাটিতে জন্মেছিলেন ক্রিকেটের এক প্রাণপুরুষ। একটু একটু করে ঔপনিবেশিক ভারতের পূর্বপ্রান্তে ক্রিকেটকে তিনি ছড়িয়ে দিলেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
১৮৮০ সাল, ক্রিকেটের সবচেয়ে বর্ণময় টেস্ট সিরিজ ‘দ্যা আসেজ’ শুরু হচ্ছে ব্রিটিশ মক্কায়। এদিকে কিশোরগঞ্জের এক যুবক ব্রিটিশ শাসনের অন্তরালে শানিয়ে নিচ্ছেন এক অস্ত্র, ক্রিকেট, একটা অদ্ভুত নেশার মতো তিনি বাংলার মাটিতে ক্রিকেটকে পরিচয় করাচ্ছেন হাত ধরে। তিনি সারদারঞ্জন রায়। বাংলা ক্রিকেটের ডব্লু জি গ্রেস। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বড় দাদা সারদারঞ্জন ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ সদর হয়ে ঢাকা অবধি। পরবর্তীকালে শত বছরের আভরণে সেজে সেই ক্রিকেটই হয়ে উঠল ভারতের বিনোদনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত জিয়নকাঠি।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়টা, মানে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পরে বাংলা তথা পূর্বভারতের মানুষের মনে এ বিশ্বাস দৃঢ় হল যে, বেঁচে থাকার রসদ হিসেবে নিয়মিত ব্যায়াম-কুস্তির পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক খেলা নিয়ে আসা জরুরি। তার আগে, বাংলায় খেলাধূলা বলতে মূলত শরীরচর্চার নানা কৌশল যেমন কুস্তি-লাঠিখেলা ইত্যাদি প্রচলিত ছিল। সংগঠিত স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা না হলেও, গোরাদের সঙ্গে শারীরিক কসরতে লড়ে নেওয়ার জন্য বাংলার পুরনো এই আর্টফর্মগুলি তখন ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
কিংবদন্তি নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী ফুটবল খেলা শুরু করার সময় থেকেই ক্রিকেটেরও চল শুরু হয় বাংলায়। তবে এই সময়ে বাংলা বলতে কিন্তু অবিভক্ত বাংলার কথাই বলা যেতে পারে। ব্রিটিশ সেনার বিনোদনের জন্য আয়োজিত ক্রিকেটে অংশ নেওয়া শুরু করলেন মহারাজারা৷ মহারাজা ও মধ্যবিত্ত বাঙালির ক্রিকেট নিয়ে যে উৎসাহ শুরু হয়েছিল, তা আরও বাড়ল উত্তরবঙ্গে ব্রিটিশদের সঙ্গে আয়োজিত ক্রিকেট ম্যাচে মহারাজাদের দল অংশ নেওয়ার পর। তবে তা সমাজের এক নির্দিষ্ট স্তর অবধি সীমাবদ্ধ ছিল। পুরোনো গল্পগাছায় উত্তরবঙ্গের এই মহারাজাদের ক্রিকেট খেলার শখের কত মজার গল্প তো আমরা পড়েছি। ১৯১১ সালের পর যেমন মানুষ বুঝতে শিখেছিল, ফুটবল কেবল খেলা নয়; স্বাধীনতা সংগ্রামের হাতিয়ার। একইভাবে ক্রিকেটের যে আত্মা— যা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে জাতীয়তাবাদী হাতিয়ার হয়ে ওঠার সমস্ত সম্ভাবনা নিয়ে বেঁচে থাকে— এই ক্রিকেটের স্ফুলিঙ্গকেই দিকে দিকে ছড়িয়েছিলেন সারদারঞ্জন।
আধুনিক ক্রিকেট ব্যাটের যে গঠন অর্থাৎ গ্রিপ, ব্লেডসহ যে আধুনিক স্ট্রাকচার, তা তখনও সম্পূর্ণভাবে আবিষ্কৃত হয়নি। ঐ ছোট্ট সারদারঞ্জনই যে পরবর্তীকালে এই উইলো কাঠের ব্রহ্মাস্ত্রের আধুনিক গঠন দেবেন, তা কেই বা জানত তখন?
অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জের কাটিয়াদি গ্রাম। ডোবা আর জলাজমি ঘেরা নিচু অঞ্চল। খেলাধূলা বলতে খানিক শরীরচর্চা আর খুব সামান্য বিস্তারলাভ করেছে ফুটবল— এ গ্রামেই জন্ম সারদারঞ্জনের। বিখ্যাত রায় পরিবারে তখন একে একে আসছেন কামদারঞ্জন (যিনি পরে উপেন্দ্রকিশোর নামে খ্যাত হবেন), মুক্তিদারঞ্জন, কুলদারঞ্জন, প্রমদারঞ্জন। সে সময়ে কিশোরগঞ্জ ছিল ময়মনসিংহের অংশ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বিত্তবান ও বিস্তৃত অংশ ছিল এই ময়মনসিংহ। তাই বৃহত্তর ময়মনসিংহ প্রশাসনিক সুবিধার কারণে কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা ইত্যাদি অঞ্চলে ভাগ করা ছিল।
স্কুলজীবন শেষ করে ঢাকাতে এসে বিখ্যাত ঢাকা কলেজে ভর্তি হন রায় পরিবারের পাঁচ ভাই। সে সময়ে ঢাকা কলেজ ছিল বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় মহাবিদ্যালয়। সারদারঞ্জনের ক্রিকেটপ্রেম যদিও শুরু স্কুলজীবন থেকে। কাটিয়াদি গ্রামের রাস্তা দিয়ে পাঠশালা যাওয়ার সময় একহাতে বই আর একহাতে ব্যাট থাকত। তবে আধুনিক ক্রিকেট ব্যাটের যে গঠন অর্থাৎ গ্রিপ, ব্লেডসহ যে আধুনিক স্ট্রাকচার, তা তখনও সম্পূর্ণভাবে আবিষ্কৃত হয়নি। ঐ ছোট্ট সারদারঞ্জনই যে পরবর্তীকালে এই উইলো কাঠের ব্রহ্মাস্ত্রের আধুনিক গঠন দেবেন, তা কেই বা জানত তখন?

ঢাকা কলেজে পড়াকালীন ক্রিকেটের প্রতি প্রবল টান থেকেই চার ভাই উপেন্দ্রকিশোর-মুক্তিদারঞ্জন-কুলদারঞ্জন-প্রমদারঞ্জনের সহায়তায় সারদারঞ্জন খুলে ফেলেন ঢাকা কলেজ ক্রিকেট ক্লাব। সারদা নিজের দুরন্ত একাডেমিক কেরিয়ারের পাশাপাশি ক্রিকেট নিয়ে পড়াশোনা চালাতেন পুরোদমে। এই ক্লাবে আগত পড়ুয়াদের শেখানো হত ক্রিকেটের ব্যকরণ, পাশ্চাত্য ক্রিকেটের গল্প। বিলিতি খেলার গল্পে মজে এবং ক্রিকেটের নিজস্ব সৌন্দর্যে প্রভাবিত হল একটা প্রজন্ম। সেই ঐতিহাসিক ঢাকা কলেজে ক্রমেই জনপ্রিয় হতে শুরু করল ক্রিকেট। পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ব্রিটিশদের অবসর বিনোদন হিসেবে ক্রিকেট দেখার সৌভাগ্যও হত নেটিভদের— ফলে আগ্রহ বাড়তে থাকে দ্রুত।
সারদারঞ্জন জানতেন, উনিশ শতকে মধ্য ও পশ্চিম ভারতীয়দের ধারণা ছিল দৈহিক সক্ষমতায় বাঙালিরা কখনই তাঁদের সমতুল্য নয়। ক্রিকেটের প্রয়োজনে সারদা এই মিথকে ভেঙে ক্রিকেটের পাশাপাশি শরীরচর্চার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা শুরু করেছিলেন ঢাকা ক্লাবে। এনেছিলেন প্রশিক্ষক। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়ে গেল ঢাকা ক্লাব ক্রিকেট টিম। বাংলার ক্রিকেট প্রজন্মের সম্ভবত প্রথম বাঙালি যুব ক্রিকেট দল। ১৮৭৮ সাল নাগাদ সারদা এই ক্লাবটি প্রতিষ্ঠা করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তখন কলকাতার মেট্রোপলিটান ইন্সটিটিউশানের সর্বাধিপতি। তিনি সারদাকে অনুরোধ করেন, সেখানে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের জন্য।
স্নাতক পাশ করার পর সারদারঞ্জন যুক্ত হলেন আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক হিসেবে। অঙ্কের পাশাপাশি আলিগড়েও তিনি গড়ে তুললেন ক্রিকেটের আবহ। কয়েক বছর অধ্যাপনার পর তিনি ফিরে এলেন ঢাকা কলেজে। ঢাকা কলেজ ক্রিকেট ক্লাবের জনপ্রিয়তা তখন উর্ধ্বমুখী। সেই অবস্থাতেই প্রথম প্রতিযোগিতামূলক খেলার জন্য প্রস্তুতি শুরু করল ঢাকা কলেজ টিম। ১৮৮৪ সালে ইডেন গার্ডেন্সের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের মুখোমুখি হল ঢাকা কলেজ। ম্যাচে জয়লাভও করল তারা। এর ফল হল বেশ মজার৷ প্রেসিডেন্সি এই হার সহজে মেনে নিল না। ঢাকা কলেজের ছাত্রদের দলে সারদা-প্রমদা-কুলুদা তিন অভিজ্ঞ অধ্যাপকের নাম থাকায়, তারা বিক্ষোভ জানায়৷
এই বিক্ষোভের পর প্রেসিডেন্সি কলেজের ব্রিটিশ অধ্যাপক ও ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবের যৌথ পিটিশনে ঢাকা কলেজের ক্রিকেট টিম থেকে নাম বাদ দিতে বাধ্য করা হল শিক্ষকদের। দল থেকে বাদ পড়লেন প্রতিষ্ঠাতা সারদারঞ্জন ও তাঁর দুই ভাই। এই রাগে সারদারঞ্জন ঢাকা কলেজ ত্যাগ করলেন সেই বছর। তবে এ কথা ঠিক, বাগবিতণ্ডা থাকলেও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই সারা বাংলায় জনপ্রিয় করেছিল ক্রিকেটকে। বিশেষত এই ঘটনাটির পর বাংলায় ক্রিকেট খেলা যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুন হয়ে উঠতে পারে, তার আভাস পাওয়া গেল পুরো দস্তুর।

তবে ক্রিকেট নিয়ে সারদারঞ্জনের ভালবাসা সেই সময়ের সমাজে কতখানি প্রভাব ফেলেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় আরেকটি মজার ঘটনায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তখন কলকাতার মেট্রোপলিটান ইন্সটিটিউশানের সর্বাধিপতি। তিনি সারদাকে অনুরোধ করেন, সেখানে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের জন্য। সে সময়ে মেট্রোপলিটানে চলছিল ব্যাপক অর্থসংকট। কলকাতায় ক্রমবর্ধমান ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে সারদারঞ্জন ‘S Ray and Company’ নামের একটি সংস্থা খুলে বই ও ক্রিকেট সরঞ্জাম বিক্রি করতে শুরু করলেন।
১৮৯৫ সালে এই কলকাতা শহরে সারদারঞ্জন প্রথম ক্রিকেট সরঞ্জাম বিপণিও খুলে ফেলেন। শিয়ালকোট থেকে কাঠ এনে কলকাতায় শুরু হল ব্যাট তৈরি, যশোর রোডের কাঠকারখানায় বরাত দিয়ে ব্যাট বানানোর চল শুরু করে দিলেন সারদা। এই ব্যাটগুলির দাম ছিল কম, এবং সারদা যা চেয়েছিলেন, সেই মতোই মধ্যবিত্ত বাড়িতে বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ঢুকতে শুরু করল ক্রিকেট ব্যাট। ১৯০৬ সালে সারদারঞ্জন তৈরি করলেন ব্যালেন্সড ব্যাট যা অনেকাংশেই আধুনিক ব্যাটের নকশা দিয়েছিল।
তিনিই প্রথম বাঙালি যাঁর নখদর্পণে ছিল ক্রিকেটের আইন ও ব্যাকরণ। একাধিক লেখায় ব্রিটিশরা স্বয়ং সারদারঞ্জনের ক্রিকেটীয় জ্ঞানের প্রশংসা করে গেছেন।
ক্রিকেটের পাশাপাশি সারদারঞ্জনের কোচিং প্রতিভা দেখে নাটোরের মহারাজ তাঁর ক্রিকেট দলের কোচ হিসেবে চেয়ে বসেন তাঁকে। সারদা নিরাশ করেননি রাজাকে। তিনিই প্রথম বাঙালি যাঁর নখদর্পণে ছিল ক্রিকেটের আইন ও ব্যাকরণ। একাধিক লেখায় ব্রিটিশরা স্বয়ং সারদারঞ্জনের ক্রিকেটীয় জ্ঞানের প্রশংসা করে গেছেন।
বিশাল সাদা লম্বা দাড়ির জন্য আজও অনেকে তাঁকে বলে থাকেন বাংলার ডব্লু জি গ্রেস। সেই উনিশ শতকের শেষভাগে, ঔপনিবেশিক ভারতে, অবিভক্ত বাংলার এক অধ্যাপক ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছেন বাঙালিকে, বিলিতি খেলার আদব কায়দায় শিক্ষিত হচ্ছে উপমহাদেশ— আসলে যে খেলার জন্ম হওয়া উচিত ছিল এই ভারতে, তাকেই ভারতের মাটিতে পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন সারদারঞ্জন রায়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত