Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

তপ্ত মরসুম

অমর মিত্র

জুন ৫, ২০২৬

Summer Story
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Summer Story)

গণেশ মণ্ডলের বাস চার নম্বর বস্তিতে। বস্তি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় দাঁড়ালেই ঘাড় উঁচু করে কপালে জোড় হাত রেখে প্রণাম। টালার মস্ত জলাধার মেঘের মতো ভেসে আছে যেন উত্তরে। উত্তরে উনাইল মেঘ, পশ্চিমে বরষিল গো। বরষা কবে আসবে, খবর নেই, ও মৌসুমী, মৌসুমী…, এ পাড়ায় বৃষ্টি আনে মৌসুমী বায়ু, মরসুমী বাতাস আর মেঘ। আজ গণেশের চোখে জল এসেছে। নকুলের জন্য কাঁদছে সে। নকুল তুই লিখলি এত, পাঁচশো টাকা পেলি না।

এখন গণেশের কথা বলি। সে মণ্ডল। মণ্ডল নাকি গ্রামের মাথার উপাধি। তারা মানে তার ঠাকুরদা, বড় ঠাকুরদা নাকি বেতনা নদীর পারে তাই ছিল। কিন্তু সর্বস্বান্ত হয়ে বর্ডার পেরিয়ে এসে বস্তিবাসী। তাদের কত জমি ছিল, এপার থেকে ওপার দেখা যেত না, এমনই ধান ফলত, কত বড় বড় দীঘি ছিল দুটি, তাতে রুই কাতলা মৃগেল কালবোস লাফাত।


আরও পড়ুন: জন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার নয়


তার ঠাকুরদার দেবতায় ভক্তি বাড়ল সোমত্ত ছেলে সাপের কামড়ে মারা যেতে, তখন নিরামিষ চালু করল সেই বেতনা ধারের বাড়িতে, পুকুরের মাছ বিলিয়ে দিত। এখন মাছের দাম কী, রবিবারে আর বুধবারে ছাড়া মাছ হয় না বাড়িতে। মাছ মানে আঁশ-গন্ধ, গণেশ বলে, বাজারে জ্যান্ত কাতলা, জ্যান্ত রুই লাফাতে দেখলে মনে হয় তাদের উত্তরের দীঘির মাছ তাকে দেখে লাফাচ্ছে। সেই সব মাছ, যা গাঁয়ের মানুষকে বিলি করে দেওয়া হয়েছিল দেশ ছাড়ার আগে। গণেশ তা শুনেছে, চোখে দ্যাখেনি। 

—কী করে বুঝলে গণেশদা? হাবু জিজ্ঞেস করল, মাছের আয়ু কতদিন, বটির সামনে শেষ।

গণেশ কানে খাটো বলে অন্যের কথার সঠিক জবাব দেওয়ার দায় নেই তার, কিন্তু নিজের কথা বলে ফেলার পূর্ণ অধিকার আছে, রুই কাতলার লাফানি নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে গণেশ মণ্ডল বলল, পুঁই শাক আর চিংড়ির তুলনা নেই, করলা ভাজা সে সব দিন খায়।

Summer Story
কী করে বুঝলে গণেশদা? হাবু জিজ্ঞেস করল, মাছের আয়ু কতদিন, বটির সামনে শেষ

এ পাড়ার বিলুপ্ত হওয়া স্কুল হরিনাথ একাডেমির রিটায়ার্ড পিয়ন কাম দপ্তরি গণেশ মণ্ডলের বস্তিবাড়ির ভাড়া একশো বাইশ টাকা, বেড়ে বেড়ে বিশ টাকা থেকে এই হয়েছে। এজমালি কলঘর, পায়খানা। বিশ টাকা গনেশের জন্মের বছরের বাড়ি ভাড়া। যে বছর যেই দিন জন্মায় গণেশ মণ্ডল, সেই বছর সেই দিন যশোর রোড দিয়ে বুলগানিন গেল, সঙ্গে বিধান রায় আর জওহরলাল নেহরু, পদ্মজা নাইডু রাজ্যপাল।

—তোমার মনে আছে?

গণেশ বলল, তারপর এল রানি এলিজাবেথ, মাথার মুকুটে কোহিনূর হিরে, লোকে কৈনূর, কৈনূর বলে চিৎকার করছে, রানি হাত নাড়ছে, তারপর এল মার্শাল টিটো আর ক্রুশ্চেভ।

যে প্রশ্নই করা হোক, গণেশ মণ্ডল তার নিজের মতো জবাব দেবে। প্রশ্নকর্তা একজন, সে হল শিবু, হরিনাথ একাডেমি থেকে মাধ্যমিক ফেল, তার কানের কাছে চিৎকার করে বলল, চিনের চেয়ারম্যান?

—তোমার ছোটবেলায়?

গণেশ মণ্ডল বলল, সাইরেন? হ্যাঁ, সকাল ন’টায় বাজত, যুদ্ধ শেষ হবার পরেও বাজত।

—কবে বন্ধ হল?

—চিনের প্রধান মন্ত্রী চৌ এন লাই এসেছিল, একেবারে চিনাদের মতো দেখতে, সব সময় হাসছে।

যে প্রশ্নই করা হোক, গণেশ মণ্ডল তার নিজের মতো জবাব দেবে। প্রশ্নকর্তা একজন, সে হল শিবু, হরিনাথ একাডেমি থেকে মাধ্যমিক ফেল, তার কানের কাছে চিৎকার করে বলল, চিনের চেয়ারম্যান?

গণেশদা বলল, তার ভাই রণ জানে, কিন্তু রণ কোথায় কেউ জানে না।

সেই কবের কথা। রণকে এই সুবীর, আবীর, সুজয় অজয়রা কেউ দ্যাখেনি। তাদের জন্ম তো শতাব্দী শেষের মুখে। রণ আর চিনের চেয়ারম্যানের কথা তাদের পূর্বজন্মের। এবং পূর্বজন্মের কথা কেউ মনে রাখতে পারে না, যদি না কেউ তাকে চিনে ফেলে। চিনবে কী করে? চেহারা, নাম, বয়স, ঠিকানা, সব বদলে গেছে, নতুন জন্মে সে যখন বড় হয়ে চেনা দেবে, আগের জন্মের লোকজন বুড়ো হয়ে সব মরে যাবে।

গণেশ বলল, রাশিয়ানরা কিন্তু এখন কাঁদতে পারে, চিনাদের কান্না আইন করে বন্ধ, সহ্য করে থাক, কান্না এলে, আইন ভাঙলে জেল জরিমানা ফাঁসি।

গণেশ বলল, চিনারা শুধু হাসে, ওদেশে কান্না নাই।

—কে বলল?

গণেশ বলল, রাশিয়ানরা কিন্তু এখন কাঁদতে পারে, চিনাদের কান্না আইন করে বন্ধ, সহ্য করে থাক, কান্না এলে, আইন ভাঙলে জেল জরিমানা ফাঁসি।

Summer Story
তারপর এল রানি এলিজাবেথ, মাথার মুকুটে কোহিনূর হিরে

এই যে শিবু, আবু, হাবু আর বাবুরা, এদের কেউ কেউ চাকরি করত। ছ বছর, আট বছর চাকরি করে বাড়ি বসে গেছে। স্কুল টিচার। হরিনাথে করত তিনজন, এমএলএ খুশি হয়ে দিয়েছিল চাকরি। বদলে দিয়েছিল যথাসাধ্য। শিবুও পেয়েছিল মাধ্যমিক ফেল হয়েও। তারপর আইন আদালত করে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। নতুন সরকার আসতেই পাড়ার ক্লাবে পার্টির পতাকা, দেওয়ালে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি বদলে দিয়ে আশা করে আছে। 

গণেশ বলে, সে যা বলে, সব সত্যি, এই দুনিয়ায়, ভাই সবই হয়, সব সত্যি সব সত্যি। ছোটবেলায় সে মেমসায়েব দেখেছে একাশি নম্বর বাড়ি থেকে কুকুর নিয়ে বেরিয়ে আসছে, সঙ্গে তারই বয়সি ফুটফুটে একটি শিশু কন্যা। লাল চুল, সাদা চামড়া নীল চোখ, ফটাস ফটাস ইংরেজি বলে। গণেশের কোমরে দড়ি বাঁধা প্যান্টুল আর গেঞ্জি। বৈশাখের বিকেল। রোদ পড়ে গেলেও কত সময় আলো থাকে, দখিনা বায়ু বইতে আরম্ভ করেছে, এ পাড়ায় তখন যেমন দখিনা বাতাস বইত, এখন আর বয় না। তাদের বস্তিতে বাতাসই ঢোকে না।

—আগে ঢুকত?

এমন কথার জবাব নেই। একটু থেমে গণেশ বলল, প্যাকেটে পোরা বাতাস এখন, তখন খোলাবাজারে বাতাস বইত, উন্মত্ত বাতাস সারা পাড়ায় খেলে বেড়াত।

গণেশ বলে, বাতাস আকাশ থেকে নেমে আসত।

—দেখেছ? 

গণেশ বলে, তখন কত মেঘ করত, ওই জলট্যাঙ্কি মেঘে ঝিমঝিম করত!

—ভলুম মেপে দেখতে?

শুনতে পেল মনে হয় গণেশ মণ্ডল, বলল, মাপতে হয় না, কেউ ওজনে কম দিত না তখন।

এমন কথার জবাব নেই। একটু থেমে গণেশ বলল, প্যাকেটে পোরা বাতাস এখন, তখন খোলাবাজারে বাতাস বইত, উন্মত্ত বাতাস সারা পাড়ায় খেলে বেড়াত।

আবীর দত্ত, যে আবু কবিতা লেখে। ছাপাও হয়। নামী পত্রিকায় কবিতা লিখে দু’বারে পাঁচশো করে হাজার পেয়েছে, সে মনে মনে কবিতা ভাঁজতে লাগল। গণেশ স্যার তাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, কবিতা হল, লিখলি?

কানে খাটো বলে গণেশ মণ্ডল জোরে কথা বলে, এত জোরে যে রাস্তার ধারের বাড়িগুলির লোক ঘরে বসেই গণেশের কথা শোনে, ওই গণেশ যাচ্ছে, ঘণ্টার চেয়েও গলার জোর বেশি, মাইক লাগানো আছে মুখে। গণেশের জিজ্ঞাসায় রাস্তার লোক দাঁড়িয়ে পড়ে। তারা সব সকালে বাজার সেরে চান করে খেয়ে অফিস যাওয়া মানুষ। তাদের কয়েক মিনিট লেট হবেই। কবিতা? কবি? কে কবি? আবীর হনহনিয়ে হাঁটবে যে উপায় নেই, আবু কিছু লিখলি?

সেই ঘণ্টা পরপর বাজত, মাঝে গ্যাপ থাকত কম। তা শোনা যেত মহেন্দ্র বিশ্বাস রোডের দু’দিকের বাড়ি থেকে। সব বই বগলে ছুটত, গণেশদা টাইম দেয় না একদম।

আবীর ঘাড় হেলায়। কিছুই মুখে বলে না। তাকে দেখছে মৌসুমীর দাদা। মৌসুমীর সঙ্গে তার চিঠি চালাচালি হয় গোপনে, মৌসুমী তার কবিতা পড়ে দেয়, ভাল না মন্দ, ছাপা হবে কি হবে না। ওম, মা মঙ্গল চণ্ডী! শেষ চিঠিতে সে লিখেছিল, তোমার কবিতা বুঝতে পারি না কেন আবু? আবু জবাব দেয়নি এখনও। দেবে নিশ্চয়, কিন্তু কী দেবে ভাবতে হচ্ছে।

গণেশ তাদের বলেছে, ভরত নকুল গল্প লিখত, পত্রিকা ছেপে বের করত, তার জন্য নিশ্চয়ই টাকা পেত, তাকে লিখতে বলেছিল, কিন্তু যে কানে খাটো, সে কী করে কবিতা লিখবে, রেডিয়োর গান অল্প শুনতে পায়, আর কাক কোকিলের ডাক খুব কাছে না হলে পায় না।

আবীর জিজ্ঞেস করে, পত্রিকার নাম ছিল কী?

গণেশ মণ্ডল বলল, আর একটু না শুনলে সে বোবা হয়ে যেত, কানে না শুনলে মুখে ভাষা আসে না, নকুল বলেছিল।

Summer Story
বস্তির ঘরে টেকা যাচ্ছে না একদম, একমাত্র গাছতলা ভরসা

কতকালের কথা সব, কত জন্মের কথা, হাবু, আবু, বাবুরা কিছুই জানে না। গণেশ মণ্ডল রিটায়ার করে গেছে অনেকদিন, তারা যখন হরিনাথে ফেল মারত, গণেশদা স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক হাতে ঘণ্টা মানে কাঁসি তুলে ধরে অন্য হাতে পেটাত, ঢং ঢং ঢং। ছুটির ঘণ্টা দিত যেমন, স্কুল আরম্ভের ঘণ্টাও। সেই ঘণ্টা পরপর বাজত, মাঝে গ্যাপ থাকত কম। তা শোনা যেত মহেন্দ্র বিশ্বাস রোডের দু’দিকের বাড়ি থেকে। সব বই বগলে ছুটত, গণেশদা টাইম দেয় না একদম। নিজে কানে খাটো, কিন্তু ঘণ্টাধ্বনি শুনিয়ে দিতে তার মতো কে পারত?

গণেশ সকালবেলায় পুজোপাঠ সেরে, গৃহলক্ষ্মীকে জলবাতাসা দিয়ে বেরিয়ে পড়ে ধুতি ফতুয়া আর রবারের জুতো পরে। বোশেখ পেরিয়ে জষ্টিতে তাপ-উত্তাপ খুব বেশি। ভোট হয়ে সব উল্টেপাল্টে গেছে, তাতে আরও উত্তাপ বেশি। আবু বাবু হাবুরা কোথায়? গণেশের বন্ধু তারা। হরিনাথের ছাত্র। গণেশের আর যারা বন্ধু ছিল, তারা হয় বস্তি ছেড়ে কোঠাবাড়ি, ফ্ল্যাটে গিয়ে সেঁধিয়েছে, না হয় মরে গেছে। তার বয়স ৭৮/৭৯ হবে। কয়েক বছর ধরে ৭৬ চলছে। গণেশ গিয়ে ডাকতে আরম্ভ করে— হাবুরে বাবুরে।

তার দুই ছেলে গেছে বর্ধমান আর হায়দরাবাদ। তিনখানা ঘর নিয়ে রয়েছে দু’জন। নকুল চ, আবার কবিতা লিখবি, আবু তোর খোঁজ করছিল।

এমনি করে এল আজ। আজ যে তারিখ হবে, সেই তারিখ। তখন বেলা সাড়ে এগারোটা। বস্তির ঘরে টেকা যাচ্ছে না একদম। একমাত্র গাছতলা ভরসা। নকুল যে ফ্ল্যাট বাড়ির টঙে গিয়ে উঠেছিল, চারতলা, উপরে জ্বলন্ত ছাদ। গণেশ বলেছিল, বরং ফিরে চ, দু’খানা ঘর তোকে দেব। তার দুই ছেলে গেছে বর্ধমান আর হায়দরাবাদ। তিনখানা ঘর নিয়ে রয়েছে দু’জন। নকুল চ, আবার কবিতা লিখবি, আবু তোর খোঁজ করছিল।

—কে আবু?

—কবিতা লিখে পাঁচশো করে পায়।

—পায়? নকুল রায় অবাক।

—নকুল তুই ফিরে চ, আমার কোনও বন্ধু নেই।

নকুল বলল, ফিরে গিয়ে কী করব?

—গল্প লিখবি, কবিতা লিখবি, পাঁচশো পাবি।

নকুল এল না। বলেছিল, আর হবে না, হাত নেড়ে নেড়ে বুঝিয়েছিল। তারপর তো নকুল আজই মরে গেল। গণেশ সক্কাল সক্কাল ফোনে কিছু শুনেছিল, সবটা শোনেনি। নকুলের ছেলে বকুল বারবার ফোন করছিল, গণেশকাকা সব্বোনাশ হয়ে গেছে। শেষে হোয়াটস আপে মেসেজ দিল, পিতা ঠাকুর নকুল রায় নাই। 

সেই মেসেজ পেয়ে চোখ মুছল গণেশ। সেই মেসেজ নিয়েই বেরিয়েছে পথে। যাকে সম্ভব বলছে, মেসেজ দেখ, মারা গেছে নকুল। চাদ্দিকে চুরিচামারির এত খবর, তার ভিতরে নকুলের মৃত্যু সংবাদ হারিয়ে গেল। চুরি আর ‘চোর চোর’-এ সবাই ব্যস্ত। গণেশ এখানে দেখল, সেখানে দেখল, সব জায়গায় নেই তারা, হাবু, আবু, বাবুরা। শ্মশানে গেল? এক জায়গায় থাকতে পারত। বাজারের ফুটপথে চায়ের দোকান বন্ধ। 

গণেশের বুক হু হু করতে লাগল। ঠিক তখনই একটা লোক এল একা একা? নীল ধুতি, হলুদ জামা, সাদা পাগড়ি। এ কে? ও নকুল এ কে? কোথায় নকুল, এখন সে আগুনে পুড়ছে।

দোকান রাখা চলবে না। কতকালের দোকান। এই দোকানে বসে নকুল ভরত দুই লেখক গল্প নিয়ে কথা বলত। গণেশ হাঁ করে চেয়ে থাকত। যা শুনত, বুঝত না। যা বুঝত, শুনতে পেত না। গণেশ দাঁড়াল কদম গাছটির ছায়ার নিচে। ঘাম হচ্ছে খুব। পাড়াটা কেমন হয়ে গেল। বন্ধুরা সব দূরে গিয়ে মরে গেল। গণেশকে সকলে ফেলে গেল। হরিনাথ ইস্কুল উঠে গেল। ঘণ্টা আর বাজে না। তারামার মন্দিরে ঘণ্টা বাজায় গণেশ। সকালে বাজাতে গিয়ে ঘণ্টাধ্বনি শোনেনি, তখন কি নকুল মারা গেল সেই সাজিরহাটে? 

কদমতলে ছায়া আছে। কদমতলে দাঁড়িয়ে রোদে তাতা শহর দেখতে লাগল গণেশ। পুরো পাড়া ভয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। বুলডোজার আসে যদি? বুলডোজার কি ভুল করতে পারে না? গেরস্তের বাড়ির উপর হামলা চালায় যদি, পরে বলবে সরি। বস্তির উপর হামলা চালায় যদি। গণেশের বুক হু হু করতে লাগল। ঠিক তখনই একটা লোক এল একা একা? নীল ধুতি, হলুদ জামা, সাদা পাগড়ি। এ কে? ও নকুল এ কে? কোথায় নকুল, এখন সে আগুনে পুড়ছে। লোকটি জিজ্ঞেস করল, কবে বিস্টি নামতে পারে বলতে পারেন?

Summer Story
বস্তি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় দাঁড়ালেই ঘাড় উঁচু করে কপালে জোড় হাত রেখে প্রণাম

গণেশ ঠিকই শুনল, বলল, মৌসম ভবন কী বলছে?

লোকটি বলল, কিছু বলছে না, খবর নেই?

গণেশ বলল, অত মায়না নেয়, খবর নেই বললে হবে, তুমি কে?

সে হেসে বলল, পথিক।

—পথিক মানে?

—পথিক, বিস্টির খোঁজ করছি।

—কেন কী হবে?

পথিক বলল, জল চাই।

আহারে দুঃখের ভিতরে, শোকের ভিতরে তার মনে পড়তে লাগল অবাক জলপান। পথিক, পথিক বলিসনে, ডায়লগ বল। সে বলল, অনেক রকম জল হয়, খর জল, মিঠে জল, নদীর জল, মেঘের জল।

—জল, ওই ট্যাঙ্কে আছে।

—আমি তো পাচ্ছি নে, জল পাই কোথায় বলতে পারেন?

—জলপাই, এ পাড়ায় ছিল তার গাছ, কেটে ফেলে দিয়েছে, বাজারও বসেনি, বাজারে আসে। 

—না স্যর জল।

—জল, জল কী হবে, জলপাই না?

—না স্যার পানীয় জল।

আহারে দুঃখের ভিতরে, শোকের ভিতরে তার মনে পড়তে লাগল অবাক জলপান। পথিক, পথিক বলিসনে, ডায়লগ বল। সে বলল, অনেক রকম জল হয়, খর জল, মিঠে জল, নদীর জল, মেঘের জল।

Summer Story
আহারে দুঃখের ভিতরে, শোকের ভিতরে তার মনে পড়তে লাগল অবাক জলপান

—পানীয় জল? পথিক জিজ্ঞেস করল।

—পানীয় জল, বোতল পানি, কত কোম্পানি আছে, আজ সব বন্ধ।

পথিক বলল, জলের কল।

—পাম্প চলেনি, সকাল থেকে আলো নেই।

—খালবিল পুষ্করিণী?

গণেশ বলল, শুকায় গেছে, নকুল নেই, আমার বন্ধুরা কেউ নেই।

বৃষ্টি আসবে কবে? পথিক জিজ্ঞেস করল।

মৌসুমী মানে মরসুমী জানে?

কে মরসুমী?

গণেশ বলল, আবু তাকে কবিতা লেখে।

—কে আবু? কত যে জানতে চায় পথিক। আবুকে জেনে তার কী হবে? কবিতা হবে?

শেষে গণেশ বলল, নকুল তুই সংসার কর, ও জিনিসে শুধু ঢেলেই যাবি, ফেরত আসবে না। নকুল তখন বিয়ে করল।

তবু গণেশ বলল, আবীর দত্ত, কবিতা লিখে পাঁচশো পায়। বলে নকুলের কথা ভাবল। বেচারি। শুধু লোন আর লোন, পত্রিকা বের করতে টাকা ব্যয় করে কিছু ফেরত আসে না। কত আর খরচ করবে। শেষে গণেশ বলল, নকুল তুই সংসার কর, ও জিনিসে শুধু ঢেলেই যাবি, ফেরত আসবে না। নকুল তখন বিয়ে করল।

পথিক বলল, নকুল কে?

—মেঘের মালিক, ও মরসুমী, জল নামবে কবে?

Summer Story
কোথায় নকুল, এখন সে আগুনে পুড়ছে

হাসল মৌসুমী মেঘ, বলল, সময় হলে ডাকব স্যার।

—জলের ট্যাঙ্ক শুকিয়ে যাচ্ছে মরসুমী?

মৌসুমী হাসল আবার, বলল, ভাববেন না স্যর, এসে যাব।

—নকুল নেই, তার বডির সঙ্গে মেঘ পুড়ছে নাকি মরসুমী?

মৌসুমী বলল, সহ্য করতে শিখুন, চাইলেই যে জল আসবে, বৃষ্টি আসবে তা নয়, সারা দেশের দরকার, রেশন চালু হবে মরসুমী জলের। 

—কী যে বলেন স্যর! এসব বলা বারণ।

মৌসুমী আঁচল উড়িয়ে চলল। বাসস্টপে রোদের ভিতর দাঁড়িয়ে আছে আবীর। তাকে নিয়ে আজ রোদের ভিতরে ঘুরবে। আবীর তাতে কবিতা পাবে। সেই কবিতা লিখবে তাকে। মৌসুমী বলল, আজ রোদ বেশি, গরম কম।

পথিক বলল, তেষ্টা বেশি জল কম।

মৌসুমী বলল, সহ্য করতে শিখুন, চাইলেই যে জল আসবে, বৃষ্টি আসবে তা নয়, সারা দেশের দরকার, রেশন চালু হবে মরসুমী জলের। 

পথিক বলল, তাহলে জল পাব না?

—তাই বললে হয়, ও ফটিক জল, ঠান্ডা পানি, বরফ পানি, পথিককে জল দাও, বরফ জল, আমি দাম দেব। গণেশ মণ্ডল হেঁকে বলল।

কিন্তু কী হল? সে যে সব শুনতে পাচ্ছে, বলতে পারছে, তা কেমন করে? নকুল নকুল, তোর চিতার আগুন নেভাতে মরসুমী বায়ু ঢুকছে, বলতে বলতে রোদে নামল গণেশ মণ্ডল। তার চোখের জল শুকিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু একটা ঠান্ডা বাতাস ধেয়ে এল। পথিক পথিক, তুমি কোথায়? রোদের ভিতর পথ হারাইয়াছ? আইস, এক ট্যাঙ্কি জল তোমায় দিব, মরসুমী মেঘ এল বলে।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of অমর মিত্র

অমর মিত্র

অমর মিত্রের জন্ম ১৯৫১ সালে বসিরহাটে। তবে বহুদিন কলকাতাবাসী। ১৯৭৪ সালে 'মেলার দিকে ঘর' গল্প লিখে সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। প্রথম উপন্যাস 'নদীর মানুষ' ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় অমৃত পত্রিকায়। প্রথম গল্পের বই 'মাঠ ভাঙে কালপুরুষ'-ও ওই সালেই। রাজ্য সরকারি চাকরি করেও আজীবন সাহিত্যসাধনায় ব্রতী। ২০০৬ সালে 'ধ্রুবপুত্র' উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ২০০১ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান 'অশ্বচরিত' উপন্যাসের জন্য। ২০২২ সালে গাঁওবুড়ো গল্পের ইংরেজি অনুবাদ প্রথম এশিয়ান লেখক হিসেবে ও হেনরি পুরস্কার। ২০০৪ সালে সম্মানিত হন শরৎ পুরস্কারে।
Picture of অমর মিত্র

অমর মিত্র

অমর মিত্রের জন্ম ১৯৫১ সালে বসিরহাটে। তবে বহুদিন কলকাতাবাসী। ১৯৭৪ সালে 'মেলার দিকে ঘর' গল্প লিখে সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। প্রথম উপন্যাস 'নদীর মানুষ' ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় অমৃত পত্রিকায়। প্রথম গল্পের বই 'মাঠ ভাঙে কালপুরুষ'-ও ওই সালেই। রাজ্য সরকারি চাকরি করেও আজীবন সাহিত্যসাধনায় ব্রতী। ২০০৬ সালে 'ধ্রুবপুত্র' উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। ২০০১ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান 'অশ্বচরিত' উপন্যাসের জন্য। ২০২২ সালে গাঁওবুড়ো গল্পের ইংরেজি অনুবাদ প্রথম এশিয়ান লেখক হিসেবে ও হেনরি পুরস্কার। ২০০৪ সালে সম্মানিত হন শরৎ পুরস্কারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

অমর মিত্র
বিতস্তা ঘোষাল
হেমেন্দ্রকুমার রায়

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com