(Kolkata Bus Ticket)
সব ব্যবসার ক্ষেত্রেই মাঝে মাঝে খারাপ সময় আসে বা খরা লাগে, আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কেটেও যায়।
পেট্রোল, ডিজেল ইত্যাদি জ্বালানির দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকার কারণে একসময় বেসরকারি বাস মালিকেরা অতিরিক্ত খরচের বোঝা সামাল দেওয়ার কয়েকটি পথ অবলম্বন করেছিলেন। তার একটি হল সরকারি- বেসরকারি অফিস বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের বাতিল কাগজপত্র কমদামে কিনে তাতেই বাসের টিকিট ছাপিয়ে ছাপার খরচ কমানো।
আরও পড়ুন: বাসের টিকিটে বাংলার ছবি
এত সবের পর বাস ভাড়া খুব বেশি বাড়েনি ঠিকই, কিন্তু নানা লেখা বা ছবি ছাপা কাগজের উপর ছাপানোর জন্য টিকিটগুলো দেখতে অতি বিশ্রী লাগত। কিন্তু উপায়ও ছিল না। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সকলেই এটা মেনে নিয়েছিল। টিকিট ছাপানোর এই ব্যবস্থা কিছুকাল বজায় থাকার পর এল সেই সুসময়, যখন বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলি নানান কিছুর বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য বাসের টিকিটকেই একটি উপযুক্ত মাধ্যম হিসেবে ভাবতে শুরু করল।
এর পরই শুরু হল সেই পুরনো টিকিটের জায়গায় নতুন টিকিট দেওয়া। উন্নতমানের কাগজে ছাপা ঝকঝকে রঙিন বিজ্ঞাপনের ছবি ও লেখা সমেত সেই টিকিটগুলি সকলেরই মন জয় করে নিয়েছিল। বিজ্ঞাপনদাতারা এই সার কথাটা বুঝেছিলেন যে, রাস্তার বড় বড় হোর্ডিং বা পত্রপত্রিকায় ছাপানো বিজ্ঞাপনের আবেদন যতটা তাড়াতাড়ি মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে, একখণ্ড ছোট কাগজে ছাপা বিজ্ঞাপন তার চাইতে অনেক কম সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছতে পারে। তাঁদের মনে ছাপ ফেলতে পারে। তাঁদের মন জয় করে নিতে পারে।

টিকিট হাতে পাওয়ার পর প্রায় সকলেই একবার চোখ বুলিয়ে তাঁদের দেওয়া ভাড়াটা দেখে যাচাই করে নেয়, আর ঠিক তখনই তাঁদের চোখে পড়ে সেই বিজ্ঞাপনটি। এতেই বিজ্ঞাপনদাতাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধি হয়। কারণ যাত্রাপথে ওই সময়টা যেহেতু যাত্রীদের কোনও কাজ থাকে না, তাই যেতে যেতেই ওই সব বিজ্ঞাপন থেকে অনেকে তাঁদের কাঙ্খিত বস্তুর সন্ধান পেতে পারেন।
এবার আসি ওই সব বিজ্ঞাপনের কথায়। কী নেই সেই সব বিজ্ঞাপনে। এক এক বাসের টিকিটে এক এক রকম বিজ্ঞাপন। আবার একই রুটে ভাড়ার তারতম্য অনুযায়ী টিকিটে আলাদা আলাদা বিজ্ঞাপন ছাপা। এ যেন বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি।
একবার ভেবে দেখুন তো। আপনাকে ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহ করতে হচ্ছে না। প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করার সময়টুকুতে এমন কত হাতে গরম খবর চটজলদি পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে।
সকালে উঠে চায়ের সঙ্গে কোন বিস্কুট খাবেন, রোজকার রান্নায় কোন তেল ব্যবহার করা দরকার, চুলের সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্য কোন নারকেল তেল ব্যবহার করবেন, রান্নার স্বাদ বাড়াবার জন্য কোন স্বাস্থ্যসম্মত মশলা ব্যবহার করবেন, গরমের দিনে ঠান্ডা পানীয় ‘রোজ সিরাপ’ আর ‘কে সি পালের’ ছাতা, এমন সব বিজ্ঞাপনের শেষ নেই।

আবার বাঙালির নববর্ষ উদযাপন বা শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদীয়া দূর্গাপুজো থেকে লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো, ভাইফোঁটা হয়ে জগদ্ধাত্রী পুজো পর্যন্ত বাসের টিকিটে বিজ্ঞাপনের অন্য চমক থাকত। শহরের কোন কোন দোকানে বড়বাজারের দামে সস্তায় ভাল ভাল বেনারসি, কাঞ্জিভরম, সিল্ক, তাঁত, শুটিং, সার্টিং বা রেডিমেড পোশাক এত এত ডিসকাউন্টে পাওয়া যাচ্ছে তার খবরও থাকত। কেউ বলছেন, টিকিটটি সঙ্গে আনলে আমরা বিক্রীত মূল্যের ওপর শতকরা এত ছাড় দেব। কেউ লিখছেন, আমাদের দোকানে ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা আছে। ওদিকে চৈত্র সেল বা বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষের বিজ্ঞাপনও দেখার মতো।
একবার ভেবে দেখুন তো। আপনাকে ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহ করতে হচ্ছে না। প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করার সময়টুকুতে এমন কত হাতে গরম খবর চটজলদি পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। আপনার সন্তানের পরীক্ষার ফল ভাল না হওয়ায় আপনি চিন্তায় আছেন? কুছ পরোয়া নেই। তার জন্য আছে বিজ্ঞাপনদাতারা। একটা টিকিটে লেখা আছে ‘আপনার সন্তানের Result আশানুরূপ না হওয়ায় আপনি কি চিন্তিত? ওর স্মৃতিশক্তি ও মনসংযোগ বাড়াতে আজই ‘ALOHA’ তে ভর্তি করুন’।
বাস টিকিটের বিজ্ঞাপনের প্রতি যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কেউ কেউ আবার জনপ্রিয় বাংলা ও হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহার করে।
ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য হাজারও ট্রেনিং সেন্টারের বিজ্ঞাপনের হাতছানি। ওই বিজ্ঞাপন দেওয়া টিকিটটি সঙ্গে করে নিয়ে গেলে কোর্স ফি-তে আকর্ষণীয় ছাড়। এমনকি Course শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনও কাজে ১৪ হাজার টাকা স্যালারির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথাও লিখতে ভোলেনি। অন্য একটি টিকিটের বিজ্ঞাপন বলছে ‘টাকা চাই?’ এখনই পেতে পারেন ‘পার্সোনাল লোন’। আবার, আপনার পরিবারের সবার সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে নানা ফ্যামিলি হেলথ সেন্টারের বিজ্ঞাপন ছাপা অন্য একটি টিকিটে। শেষ টিকিটে আপনার ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধির জন্য আরেকধরনের বিজ্ঞাপনের হাতছানি।
বাস টিকিটের বিজ্ঞাপনের প্রতি যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য কেউ কেউ আবার জনপ্রিয় বাংলা ও হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকাদের বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যবহার করে। এমনকি ‘RAUNAQ’ কোম্পানির জলের ট্যাঙ্কের বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনদাতা তো এক জাদুকরকেও হাজির করেছেন যেখানে তিনি বলছেন ‘It is not my jadu, It’s my choice’!

কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়ায় নতুন নতুন বই বেরোচ্ছে। তারই টাটকা খবর টিকিটের মাধ্যমে একেবারে হাতে হাতে পেয়ে যাচ্ছেন। টিকিট সঙ্গে নিয়ে গেলে আগ্রহী মানুষেরা আকর্ষণীয় ছাড়েই কিনতে পারবেন। এমন সুযোগও সেই সময় পাওয়া যাচ্ছিল বাসের টিকিটের মাধ্যমেই।
আপাততুচ্ছ পরিবহনের নানা মাধ্যমের এই সব টিকিটেই লুকিয়ে আছে সমসাময়িক যুগের আর্থ-সামাজিক অবস্থার চিত্র। কখনও তা সরাসরি নজরে আসে, তো কখনও তা খুঁজে নিতে হয়।
এমন কতশত বিজ্ঞাপন যে তখন বাস টিকিটে প্রকাশিত হত, তার হিসাব কে রাখে! এতে যাত্রীরাও যেমন খুশি হতেন, তেমন খুশি হতেন বাস মালিকেরাও। কারণ টিকিট ছাপানোর খরচটা বহন করতেন বিজ্ঞাপনদাতারাই। সঙ্গে হয়তো কিছু বাড়তি আয় হত বাসমালিকদের।

পরিশেষে একটা কথা না বললেই নয়। গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় নানা যানবাহনের টিকিট সংগ্রহ করে ও এই নিয়ে লেখালেখি করতে গিয়ে একটা বিষয় বেশ বুঝতে পেরেছ। তা হল, এই সব পরিবহনের টিকিটগুলি নিছক অপ্রয়োজনীয়, বাতিল বা ফেলনা মনে করার কোনও কারণ নেই। আপাততুচ্ছ পরিবহনের নানা মাধ্যমের এই সব টিকিটেই লুকিয়ে আছে সমসাময়িক যুগের আর্থ-সামাজিক অবস্থার চিত্র। কখনও তা সরাসরি নজরে আসে, তো কখনও তা খুঁজে নিতে হয়। অতীত ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কখনও কখনও যে এগুলিও অমূল্য উপাদান হিসাবে কাজে আসবে না, তা কে বলতে পারে!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত