(Constitutional Politics)
শব্দটার ভিতরেই একটা আরাম আছে। দলবদল। যেন জামা বদলানো, ঋতু বদলানো, কি একটা ট্রেন থেকে নেমে আর একটায় ওঠা। শব্দটা এত মোলায়েম যে, তার নিচে চাপা পড়ে যায় আসল লেনদেনটা, যেটা জামাও নয়, ঋতুও নয়, একজন মানুষের বিশ্বাস। ভোটদাতা যখন যন্ত্রের গায়ে একটা প্রতীকের পাশে আঙুল রাখেন, তিনি কোনও ব্যক্তিকে ভোট দেন না, একটা প্রতিশ্রুতিকে দেন। সেই প্রতিশ্রুতি যিনি বহন করবেন বলে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি যদি পরদিন সকালে অন্য শিবিরের চা খেতে চলে যান, তখন যা ঘটে, তার সঠিক নাম দলবদল নয়, তার নাম প্রতিশ্রুতিভঙ্গ। কিন্তু আমরা ভদ্র জাতি, কঠিন কথাকে নরম মোড়কে পরিবেশন করতে শিখেছি। তাই বিশ্বাসঘাতকতাকে বলি দলবদল, আর টেলিভিশনের পর্দায় সেই প্রহসন উপভোগ করি সন্ধের বিনোদনের মতো।
আরও পড়ুন: আদর্শই ক্ষমতার চালক না ক্ষমতাই আদর্শের অভিধান
দুটি সংখ্যা পাশাপাশি রাখুন, তাহলে আজকের বাংলার ছবিটা স্পষ্ট হবে। এবারের ভোটে রাজ্যে ভোটদানের হার প্রায় ৯৪ শতাংশ, যা রাজ্যের ইতিহাসে তো বটেই, দেশের কোনও সাধারণ নির্বাচনেই এর আগে দেখা যায়নি। আর ভোটের আগে, বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (SIR) নামে, এই রাজ্যের তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৯১ লক্ষ নাম, যার মধ্যে ২৭ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়েছিল অযোগ্য ঘোষণার পর। মেটিয়াবুরুজের মাসুদা বিবির মতো মানুষ, যাঁর পরিবার পাঁচ পুরুষ ধরে ওই ভিটেয়, আবিষ্কার করেছিলেন, তাঁর নামটি আর ভোটার তালিকায় নেই। অর্থাৎ একদল মানুষ ভোট দিতে পারলেন না, আর যাঁরা পারলেন, তাঁরা নজিরবিহীন সংখ্যায় লাইনে দাঁড়ালেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আঙুলে কালি নিয়ে ঘরে ফিরলেন এই ভরসায় যে, এবার অন্তত তাঁদের রায়ের একটা অর্থ থাকবে।
কালি শুকোতে লাগে দিন পনেরো। রায়টির হাতবদল হতে লাগল তার চেয়েও কম সময়।

৪ঠা মে ফল বেরোল, ১৫ বছরের শাসনের অবসান, বিধানসভায় গেরুয়া ঝড়, ২০৬টি আসন। তৃণমূলের ঝুলিতে ৮০। এটুকু গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম, ক্ষমতা আসে-যায়, মানুষ রায় দেয়। কিন্তু তারপর যা হল, তার কোনও অংশ ভোটদাতা লাইনে দাঁড়িয়ে কল্পনা করেননি।
৬ই মে তৃণমূলের পরিষদীয় দল শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা মনোনীত করে অধ্যক্ষকে জানাল। এদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা অভিযোগ তুললেন, ওই চিঠিতে স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। দায়ের হল এফআইআর, সিআইডি তদন্ত শুরু হল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে, আর দুই বিধায়ক দলবিরোধী কাজের অভিযোগে বহিষ্কৃত হলেন। কয়েক দিনের মধ্যে ৮০ জনের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক, অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুর সামনে হাজির হয়ে জানালেন, তাঁদের নেতা ওই বহিষ্কৃত ঋতব্রতই। অধ্যক্ষ রায় দিলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বহিষ্কার দুটি বৈধ নয়, অতএব ঋতব্রত এখনও দলেরই সদস্য, এবং সংখ্যার জোরে তিনিই বিরোধী দলনেতা। এক মাসের মধ্যে ঋতব্রত দাবি করলেন, তাঁর পিছনে এখন ৬৪ জন, অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি।
এই গোটা আয়োজনের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি একজনেরই। সেই মানুষটির, যিনি এপ্রিলের রোদে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি। তাঁকে জিজ্ঞেস করার কোনও ব্যবস্থা এই ব্যাকরণে নেই।
দিল্লিতেও একই চিত্রনাট্য। ২৯টি লোকসভা আসনের একজন প্রয়াত, বাকি ২৮-এর মধ্যে ২০ জন সাংসদ, কাকলি ঘোষদস্তিদারের নেতৃত্বে, অধ্যক্ষ ওম বিড়লার বাড়িতে গিয়ে পৃথক গোষ্ঠীর স্বীকৃতি চাইলেন, ঘোষণা করলেন তাঁরা মিশে যাচ্ছেন ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া নামের এক দলে, এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এনডিএ-র সঙ্গে কাজ করবেন। আর ৩রা জুলাই, কলকাতার মেট্রোপলিটন বিল্ডিংয়ে, বিদ্রোহী শিবির তৃণমূল ভবনের তালা বদলে, নতুন পোস্টার সেঁটে ঘোষণা করল, এটাই আসল দল, এটাই আসল সদর দপ্তর। নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন দুটি তৃণমূল দাঁড়িয়ে, দুই পক্ষই জোড়া ঘাসফুলের দিকে আঙুল তুলে বলছে ওটি আমার।
এই গোটা আয়োজনের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি একজনেরই। সেই মানুষটির, যিনি এপ্রিলের রোদে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁকে কেউ জিজ্ঞেস করেনি। তাঁকে জিজ্ঞেস করার কোনও ব্যবস্থা এই ব্যাকরণে নেই।

যে ভয়ে আইনটা জন্মেছিল
এ রোগ বাংলা আগে দেখেছে। ষাটের দশকের শেষ, রাজ্য জুড়ে সরকার গড়ে আর ভাঙে, যেন তাসের ঘর। বিধায়করা রাতারাতি রং বদলান, একের পর এক রাষ্ট্রপতি শাসন নেমে আসে ক্লান্ত অভিভাবকের মতো। হরিয়ানার সেই গয়া লাল, যিনি এক পক্ষকালে তিনবার দল পালটে দেশকে উপহার দিয়েছিলেন ‘আয়া রাম গয়া রাম’ প্রবাদটি, তিনিও ওই যুগেরই সন্তান। এই ব্যাধির ওষুধ হিসেবেই ১৯৮৫ সালে ৫২তম সংশোধনীর হাত ধরে সংবিধানে যুক্ত হল দশম তফসিল। আইনটির বক্তব্য ছিল দ্ব্যর্থহীন। ভোট প্রতীকের, ব্যক্তির নয়। যিনি ঘাসফুল দেখে জিতে এসে অন্যত্র গিয়ে বসবেন, তিনি ভোটদাতার সঙ্গে প্রতারণা করলেন, আর তার একমাত্র শাস্তি সদস্যপদ খোয়ানো। পদত্যাগপত্র লেখারও প্রয়োজন নেই, আচরণই যথেষ্ট।
আইনের অক্ষরগুলি আজও অটুট। কিন্তু ভিতরের প্রাণটি কখন যেন নিঃশব্দে বেরিয়ে গেছে। এককালে একটি ফাঁক ছিল, দলের এক-তৃতীয়াংশ ভাঙলে তাকে বৈধ বিভাজন বলে চালানো যেত, আর সেই ফাঁক গলেই চলত পাইকারি দলবদলের কারবার। ৯১তম সংশোধনী সেই দরজায় হুড়কো দিল। রইল কেবল একটি পথ, চতুর্থ অনুচ্ছেদের সংযুক্তি, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে গোটা দলটি অন্য দলে বিলীন হয়ে যায়।
কিহোতো হোলোহান মামলায় সর্বোচ্চ আদালত অধ্যক্ষকে বিচারকের আসনে বসিয়েছিল বটে, বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার দরজাটিও খোলা রেখেছিল। তবে বিচারকের নিরপেক্ষতা তো ধারা দিয়ে বাঁধা যায় না। কেইশাম মেঘচন্দ্র মামলায় আদালত বলে দিয়েছিল, এমন আবেদনের নিষ্পত্তি যুক্তিসংগত কাল, সাধারণত ৩ মাসের মধ্যে, হওয়া বিধেয়।
আজ যে ২০ জন সাংসদ শিবির বদলাচ্ছেন, তাঁরা এই সংযুক্তির অঙ্কটিকেই ঢাল করছেন। আঠাশের দুই-তৃতীয়াংশ প্রায় উনিশ, কুড়িতে সংখ্যাটা মিলেও যায়। কিন্তু আইন কেবল অঙ্কে থামে না। প্রাক্তন লোকসভা মহাসচিব পি ডি টি আচারি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, চতুর্থ অনুচ্ছেদের রক্ষাকবচ তখনই খাটে যখন মূল রাজনৈতিক দলটি অন্য দলে মেশে, এবং তার আইনসভার সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ তাতে সম্মতি দেন। সাংসদেরা একা মিশতে পারেন না। এই যুক্তিতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অধ্যক্ষের কাছে ২০টি পৃথক অযোগ্যতার আবেদন জমা দিয়েছেন।
আর সেই দলটি, যার আশ্রয়ে আঠাশ বছরের একটি সংগঠনের কুড়িজন সাংসদ মিশে যেতে চাইছেন? এনসিপিআই নথিভুক্ত হয় ২০২৩-এর জানুয়ারিতে, কমিশনের খাতায় তার ঠিকানা হাওড়া জেলার সাঁকরাইলের একটি বাড়ি। এটি নথিভুক্ত অথচ অস্বীকৃত দল। ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে যার মোট আয় দেখানো হয়েছে এক লক্ষ তেরো হাজার টাকা, আর যিনি নথিভুক্তির সময় সভানেত্রী ছিলেন, সেই আইনজীবী শেউলি কুন্ডু জানিয়েছেন তিনি সম্প্রতি ইস্তফা দিয়েছেন, ফলে দলটি এখন কার, তা স্পষ্ট নয়। সংখ্যাটি আবার পড়ুন। এক লক্ষ তেরো হাজার টাকা। ভারতের সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম আঞ্চলিক শক্তির কুড়িজন প্রতিনিধি এই ঠিকানায় গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন। রাজনীতিতে এমন বিনয় বিরল।

ঠিক এখানেই আইনটি মুখ ঘুরিয়ে নেয়। এই আবেদনের বিচার করবেন অধ্যক্ষ, যিনি শাসক জোটেরই লোক। কিহোতো হোলোহান মামলায় সর্বোচ্চ আদালত অধ্যক্ষকে বিচারকের আসনে বসিয়েছিল বটে, বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার দরজাটিও খোলা রেখেছিল। তবে বিচারকের নিরপেক্ষতা তো ধারা দিয়ে বাঁধা যায় না। কেইশাম মেঘচন্দ্র মামলায় আদালত বলে দিয়েছিল, এমন আবেদনের নিষ্পত্তি যুক্তিসংগত কাল, সাধারণত ৩ মাসের মধ্যে, হওয়া বিধেয়। এবার পাশে রাখুন বাস্তবের ছবিটি। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভাঙার পর অধ্যক্ষ রায় শোনাতে সময় নিয়েছিলেন প্রায় দেড় বছর, আর সেই সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে কারও একটি চুলও বাঁকা হয়নি। যতদিনে বিচার এল, ততদিনে সরকার আয়ুর অর্ধেক পথ পার। এই বিলম্বই আসল দণ্ড। ভোটদাতা ন্যায় চান, তাঁর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ঘড়ির কাঁটা, আর বলা হয়, অপেক্ষা করুন।
প্রতীকের দর, মহারাষ্ট্রের আয়নায়
যন্ত্রের গায়ে যে জোড়া ঘাসফুল দেখে তিনি বোতাম টিপেছিলেন, সে প্রতীক শেষপর্যন্ত কার, তার ফয়সালা করবে নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী প্রতীক আদেশের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে। কীসের ভিত্তিতে, তার মানদণ্ড আছে, ৫০ বছরের প্রাচীন। কংগ্রেস ভাঙার সময় সাদিক আলি মামলায় সর্বোচ্চ আদালত তিনটি পরীক্ষা বেঁধে দিয়েছিল। দলের আদর্শ ও লক্ষ্য কোন গোষ্ঠী বহন করছে, দলের গঠনতন্ত্র কে মানছে, আর সংগঠনে ও আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কার হাতে। লক্ষ করবেন, তিন পরীক্ষার মধ্যে বিধায়ক গোনা কেবল একটি, তাও তার অর্ধেক মাত্র।
কমিশন যদি এবারও সাদিক আলির তিন পরীক্ষা তাক থেকে না নামায়, তবে বুঝতে হবে ৫০ বছরের একটি সাংবিধানিক দাঁড়িপাল্লা নিঃশব্দে অবসর নিয়েছে।
অথচ সাম্প্রতিককালে কমিশন হিসেবটি প্রায় উলটো দিক থেকে কষে। শিবসেনার নাম আর তির-ধনুক তুলে দেওয়া হল একনাথ শিন্ডের হাতে, শরদ পাওয়ারের ঘড়ি চলে গেল ভাইপো অজিতের কব্জায়। দুবারই যুক্তি ছিল অভিন্ন, সাংগঠনিক পরীক্ষা মেলানো দুরূহ, অতএব বিধায়কের সংখ্যাই ভরসা। এবং আশ্চর্য সমাপতনে দুবারই প্রতীকের মালিকানা পেলেন সেই পক্ষ, যিনি তখন শাসকের ছত্রছায়ায়। একবার হলে বলা যেত কাকতালীয়। পরপর দুবার ঘটলে সেটিকে নকশা বলে পড়ে নেওয়ার অধিকার নাগরিকের জন্মায়। কমিশন যদি এবারও সাদিক আলির তিন পরীক্ষা তাক থেকে না নামায়, তবে বুঝতে হবে ৫০ বছরের একটি সাংবিধানিক দাঁড়িপাল্লা নিঃশব্দে অবসর নিয়েছে।
এখানেই সবচেয়ে টাটকা রায়টি স্মরণে রাখা কর্তব্য। সেই শিবসেনা মামলাতেই সুভাষ দেশাই রায়ে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ সতর্ক করেছিল, কোন গোষ্ঠী আসল দল তা স্থির করতে গিয়ে কেবল আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতার অন্ধ অনুসরণ চলবে না, আইনসভার বাইরে দলের নেতৃত্বের কাঠামোটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। সেই একই রায় আরও একটি কথা বলেছিল, যা এ মামলায় সরাসরি খাটে। হুইপ নিয়োগের অধিকার মূল দলের, বিধায়কদের দলের নয়। মূল দল ও পরিষদীয় দলের এই ফারাকটিকে সর্বোচ্চ আদালত আগেও আঁকড়ে ধরেছে।

ন্যায়ের খাতিরে এটুকুও বলা দরকার। ঋতব্রত গোষ্ঠীর দাবি নিছক ক্ষমতার লোভ নয়। তাঁর অভিযোগ, সাংসদদের নিজের এলাকার প্রশ্ন স্বাধীনভাবে তোলার অধিকার ছিল না, প্রশ্ন আসত কেন্দ্রীয় গবেষণা দলের হাত ঘুরে। অভিষেকের বিরুদ্ধে স্বাক্ষর জালিয়াতির এফআইআরও ঝুলে আছে। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের প্রশ্নটি তাই বানানো নয়। কিন্তু সুভাষ দেশাইয়ের দাঁড়িপাল্লায় সংখ্যাই শেষ কথা নয়। প্রশ্নটি থেকেই যায়, ২৮ বছরের সংগঠনটির আত্মা আজ কার কাছে বন্ধক রাখা।
সভাঘর, নাকি রঙ্গমঞ্চ
এবার আসি সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গায়, আর গোড়াতেই একটি সত্য স্বীকার করে নিই যা আমরা প্রায় বিস্মৃত হয়েছি। বিরোধী দলনেতা কথাটি এত শুনি যে ধরে নিই এ বুঝি সংবিধানের কোনও গম্ভীর অলংকার। অথচ ভারতের সংবিধানে এই পদের একটি অক্ষরও নেই। কলকাতা হাইকোর্ট নিজেই ভরসা করেছে এক ঔপনিবেশিক আমলের আইনের উপর, বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি (মেম্বার্স এমোলুমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৩৭-এর তিন নম্বর ধারার উপর, যেখানে বলা আছে বিরোধী দলনেতা সেই ব্যক্তি যিনি সভায় সর্বাধিক সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধী দলের নেতা, আর সংশয় দেখা দিলে অধ্যক্ষের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ও অখণ্ডনীয়। অধ্যক্ষ নির্বাচিত হন শাসকের সংখ্যায়। অর্থাৎ যে আসনটির একমাত্র ধর্ম শাসককে জেরায় জেরায় জর্জরিত করা, সেই আসনে কে বসবেন তার চাবিকাঠিও ঘুরপথে শাসকেরই কোমরে বাঁধা। ১৯৩৭ সালের একটি বেতন আইন আজ বাংলার গণতন্ত্রের ভারসাম্য ঠিক করে দিচ্ছে, এর চেয়ে বড় বিদ্রূপ আর কী হতে পারে।
দ্বিতীয় সত্যটি আরও তাৎপর্যবহ। বিধানসভায় এই বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত একটিও দলত্যাগের আবেদন দায়ের হয়নি। লোকসভায় কুড়িটি, বিধানসভায় শূন্য। মমতা শিবির গিয়েছে উচ্চ আদালতে, অধ্যক্ষের এজলাসে নয়।
সুসময়ে এই ফাটল কার্পেটের তলায় ঢাকা থাকে। বাংলায় এখন দুঃসময়, তাই ফাটলটি দেওয়াল জুড়ে চিড় ধরিয়েছে। বিচারপতি কৃষ্ণ রাও শুনানির সময় প্রশ্ন তুলেছিলেন, দল যাঁকে বহিষ্কৃত বলে অধ্যক্ষকে জানিয়েছে, তাঁকেই নেতা মেনে নিলে সেই বহিষ্কারের কোনও পরিণতি থাকে না কেন, আর অধ্যক্ষ বিদ্রোহীদের প্রস্তাব গ্রহণে যেন অতিরিক্ত উৎসাহী ছিলেন। তবু আদালত স্থগিতাদেশ দেয়নি, কারণ ওই ১৯৩৭ সালের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ৮০ জনের মধ্যে ৫৮ জনই সংখ্যাগরিষ্ঠ, আর অধ্যক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
দ্বিতীয় সত্যটি আরও তাৎপর্যবহ। বিধানসভায় এই বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত একটিও দলত্যাগের আবেদন দায়ের হয়নি। লোকসভায় কুড়িটি, বিধানসভায় শূন্য। মমতা শিবির গিয়েছে উচ্চ আদালতে, অধ্যক্ষের এজলাসে নয়। এর পিছনে কৌশল থাকতে পারে, শাসকের অধ্যক্ষের আদালতে গিয়ে আর কী লাভ, এমন হিসেব অযৌক্তিক নয়। কিন্তু ফল যা দাঁড়ায় তা এই, যে প্রশ্নের সাংবিধানিক মীমাংসা হওয়ার কথা ছিল, তা ঝুলে থাকছে নিছক রাজনৈতিক সুবিধার সুতোয়।

আর এই ঝুলন্ত অবস্থাতেই বাংলার সভাঘর পেয়েছে এমন এক বিরোধী দলনেতা, যাঁর গোষ্ঠীর সাংসদেরা প্রকাশ্যেই শাসক জোটের দিকে হাত বাড়িয়ে বসে আছেন। মমতা শিবিরের অভিযোগ, তৃণমূল ভবন দখল হয়েছে প্রশাসন ও পুলিশের মৌন সম্মতিতে, আর বিদ্রোহীরা অন্য কারও হাতের পুতুল। বিদ্রোহীরা তা অস্বীকার করেছেন।
সৎ বিশ্লেষণের দায় থেকেই বলা প্রয়োজন, অভিযোগ এখনও অভিযোগমাত্র, প্রমাণিত সত্য নয়। তবু নাগরিকের দুশ্চিন্তা ব্যক্তির সততা নিয়ে নয়, কাঠামোটি নিয়ে। ধরে নেওয়া যাক, নিছক তর্কের অনুরোধে, বিরোধী দলনেতার রাজনৈতিক আয়ু নির্ভর করছে শাসকের প্রশ্রয়ের উপর। তাহলে সভায় যা অভিনীত হবে তার নাম বিরোধিতা নয়, তার নাম মহড়া।
এক লক্ষ তেরো হাজার টাকার একটি দল কী করে কুড়িজন সাংসদের আশ্রয় হয়ে ওঠে, তার টাকা কোথা থেকে আসে, সভানেত্রীর ইস্তফার পর সে দলের কর্তা কে, এই প্রশ্ন তোলাই এখন সাংবাদিকতার ব্রত।
প্রশ্নোত্তর পর্বে ছুরির মতো কোনও প্রশ্ন উঠবে না, কাটছাঁট প্রস্তাবে সরকারের কপালে ঘাম জমবে না, লোকলেখা কমিটির টেবিলে হিসেবের খাতা খুলে বসবে না কেউ। ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের গণতন্ত্রে সরকারকে জবাবদিহিতে বাঁধার প্রধান যন্ত্রটিই বিরোধী দল। সেই যন্ত্রের চাবি শাসকের হাতে গচ্ছিত থাকলে ২৯৪ আসনের সভাঘরটি টিকে থাকবে, ভিতরের গণতন্ত্রটি মরে যাবে। আর সেদিন সবচেয়ে নিঃস্ব হবেন সেই ভোটদাতা। কারণ তাঁর যে না, যে ক্ষোভ, তা আর কারও কণ্ঠ বেয়ে সভায় পৌঁছবে না। তাঁর ভোট রয়ে যাবে খাতায়, তাঁর স্বর মিলিয়ে যাবে শূন্যে।
তবে উপায়
তাহলে সেই মানুষটির সুরক্ষা কোথায়। সৎভাবে বললে, কোনও একটিমাত্র দরজায় তার সবটুকু ভরসা রাখা চলে না। আদালত, কমিশন, অধ্যক্ষ, প্রত্যেকের হাতে মীমাংসার এক-একটি টুকরো, প্রত্যেকেরই এক-একটি সীমা। তাই সমাধান আসবে না কোনও একটি রায়ের বজ্রনির্ঘোষে, আসবে কতগুলি নির্দিষ্ট দাবির নিরন্তর চাপে, যা নাগরিক আর সংবাদমাধ্যমকেই তুলে ধরতে হবে।
সবার আগে সময়ের দাবি। মেঘচন্দ্র রায়ের তিন মাসের সীমা লোকসভার ওই কুড়িটি আবেদনের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে মানা হোক, আর সংবাদমাধ্যম সেই ঘড়ি জনসমক্ষে টাঙিয়ে রাখুক। মহারাষ্ট্রের সেই দেড় বছরের নীরবতা বাংলায় ফিরে এলে ধরে নিতে হবে আইনটিকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। তার পাশে যুক্তির দাবি। প্রতীকের রায় যেদিকেই হেলুক, কমিশনকে সাদিক আলির তিন পরীক্ষা পৃথকভাবে, কারণ দর্শিয়ে, লিখিত রায়ে মীমাংসা করতে হবে। তার পাশে স্বচ্ছতার দাবি। এক লক্ষ তেরো হাজার টাকার একটি দল কী করে কুড়িজন সাংসদের আশ্রয় হয়ে ওঠে, তার টাকা কোথা থেকে আসে, সভানেত্রীর ইস্তফার পর সে দলের কর্তা কে, এই প্রশ্ন তোলাই এখন সাংবাদিকতার ব্রত।
এসব তাৎক্ষণিক। ক্ষতটির গভীরে যেতে হলে দুটি স্থায়ী ওষুধ। প্রথমত, দলত্যাগের বিচারভার অধ্যক্ষের রাজনৈতিক হাত থেকে সরিয়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন স্বাধীন ট্রাইব্যুনালের হাতে তুলে দেওয়া। এ প্রস্তাব কোনও দলের নয়, খোদ সর্বোচ্চ আদালত মেঘচন্দ্র রায়ের সংসদকে দিয়েছিল। ৬ বছর কেটে গেছে, সংসদ নড়েনি। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলনেতার পদটিকে ১৯৩৭ সালের একটি বেতন আইনের ব্যাখ্যা থেকে মুক্ত করে সুস্পষ্ট বিধিবদ্ধ ভিত্তি দেওয়া, যেখানে মূল দলের মনোনয়নই নির্ণায়ক হবে, অধ্যক্ষের বিবেচনা নয়।
বিরোধী আসনে আজ কে বসে আছেন, সে প্রশ্নের জবাব একদিন দেবে আদালত আর কমিশন। কিন্তু সেই আসনটি আদৌ জীবিত, না নিছক আসবাব, সেই মামলার একমাত্র বিচারক আমরা, যারা এপ্রিলের রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম।
আর সবশেষে সেই দাবিটি, যা কারও কাছে নয়, নিজেদের কাছে। ভোটদাতার হাতে যে অস্ত্রটিকে সবচেয়ে ভোঁতা মনে হয়, সেটিই আসলে সবচেয়ে ধারালো, তাঁর স্মৃতি। বিধানসভার কার্যবিবরণী কোনও গোপন দলিল নয়, প্রকাশ্য নথি। কে ক-টি প্রশ্ন তুললেন, কোন বিল বিনা বিতর্কে হাওয়ায় ভেসে পাশ হয়ে গেল, কোন কমিটি ক-বার আদৌ বসল, সবই সেখানে লেখা থাকে। পাঁচ বছর পর যেদিন আবার আঙুলে কালি লাগবে, সেদিন সেই খাতাটি খুলে দেখাই নাগরিকের একমাত্র, অথচ অমোঘ প্রতিশোধ। কারণ শেষ বিচারে সংবিধান একটি লিখিত অঙ্গীকার ছাড়া কিছু নয়, তাকে জীবিত রাখে কেবল মানুষের অনিদ্র চোখ।
আঙুলের কালি ফিকে হতে লাগে দিন পনেরো। জনরায় বাঁচার কথা ৫ বছর। এই দুই সংখ্যার মাঝখানের ফাঁকটুকুই সেই মঞ্চ, যেখানে গণতন্ত্র হয় শ্বাস নেয়, নয় অভিনয় শিখে ফেলে। বিরোধী আসনে আজ কে বসে আছেন, সে প্রশ্নের জবাব একদিন দেবে আদালত আর কমিশন। কিন্তু সেই আসনটি আদৌ জীবিত, না নিছক আসবাব, সেই মামলার একমাত্র বিচারক আমরা, যারা এপ্রিলের রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। এই দায়টুকু হাত থেকে ফেলে দিলে তারপর যা অবশিষ্ট থাকে, তার নাম আর বিরোধী আসন নয়। তার নাম দর্শকের গ্যালারি, যেখানে টিকিট কেটে বসে সকলে হাততালি দেয়, আর কেউ জানে না পর্দার আড়ালে কে চিত্রনাট্য লিখছে।
আইন ও মামলার তালিকা
● Bengal Legislative Assembly (Members’ Emolument) Act, 1937, s. 3 (India).
● Constitution of India, 1950, Tenth Schedule.
● Election Symbols (Reservation and Allotment) Order, 1968, para. 15 (India).
● Keisham Meghachandra Singh v. Hon’ble Speaker, Manipur Legislative Assembly, (2020) SCC OnLine SC 55.
● Kihoto Hollohan v. Zachillhu, 1992 Supp (2) SCC 651.
● Rajendra Singh Rana v. Swami Prasad Maurya, (2007) 4 SCC 270.
● Ravi S. Naik v. Union of India, 1994 Supp (2) SCC 641.
● Sadiq Ali v. Election Commission of India, (1972) 4 SCC 664.
● Subhash Desai v. Principal Secretary, Governor of Maharashtra, (2023) SCC OnLine SC 607.
সূত্রনির্দেশ
● Akashvani News. (2026, June 3). Ritabrata Banerjee appointed Leader of Opposition in West Bengal Assembly amid TMC split.
সূত্রনির্দেশ
● Akashvani News. (2026, June 3). Ritabrata Banerjee appointed Leader of Opposition in West Bengal Assembly amid TMC split. https://newsonair.gov.in/ritabrata-banerjee-appointed-leader-of-opposition-in-west-bengal-assembly-amid-tmc-split/
● Akashvani News. (2026, July 7). Assembly Election 2026: ECI revises voter list, removing over 91 lakh names in West Bengal. https://newsonair.gov.in/assembly-election-2026-eci-revises-voter-list-removing-over-91-lakh-names-in-west-bengal/
● Chowdhury, K. (2026, April). Voices erased: Meet Bengal’s deleted voters. The Diplomat. https://thediplomat.com/2026/04/meet-some-of-the-voters-deleted-from-west-bengals-electoral-rolls/
● Deccan Herald. (2026, June). Ritabrata Banerjee claims support of 64 rebel TMC MLAs in West Bengal Assembly. https://www.deccanherald.com/india/west-bengal/ritabrata-banerjee-claims-support-of-64-rebel-tmc-mlas-in-west-bengal-assembly-4037019
● India TV News. (2026, June 19). Abhishek Banerjee meets Om Birla, seeks disqualification of 20 rebel TMC MPs over merger row. https://www.indiatvnews.com/news/india/abhishek-banerjee-and-other-tmc-leaders-meet-om-birla-seeks-disqualification-of-20-rebel-party-mps-over-merger-row-2026-06-19-1045483
● Indiablooms. (2026, July 3). TMC power struggle deepens as rebels take over party headquarters, Mamata camp locked out. https://www.indiablooms.com/news/tmc-power-struggle-deepens-as-rebels-take-over-party-headquarters-mamata-camp-locked-out/details
● LawChakra. (2026a, June 8). TMC moves Calcutta High Court challenging Speaker’s decision to recognise Ritabrata Banerjee as Leader of Opposition. https://lawchakra.in/high-court/tmc-speaker-ritabrata-banerjee-leader/
● LawChakra. (2026b, June). Calcutta High Court refuses relief against Ritabrata Banerjee’s appointment as West Bengal Leader of Opposition amid TMC dispute. https://lawchakra.in/high-court/refuses-relief-ritabrata-banerjee-leader/
● National Herald India. (2026, June 19). ‘You will first be disqualified’: TMC takes rebel MPs battle to Speaker. https://www.nationalheraldindia.com/politics/you-will-first-be-disqualified-tmc-abhishek-banerjee-takes-rebel-mps-battle-to-speaker-om-birla
● Republic World. (2026, May 4). West Bengal election results 2026: With 206 seats BJP ends TMC’s 15-year rule. https://www.republicworld.com/elections/west-bengal-assembly-election-results-2026-live-updates-tmc-vs-bjp-mamata-banerjee-suvendu-adhikari-counting-trends-winners-leading-trailing-live-news
● The Federal. (2026, July 6). Battle for TMC name, symbol reaches decisive stage as rival camps face EC today. https://thefederal.com/category/states/east/west-bengal/battle-for-tmc-name-symbol-reaches-decisive-stage-as-rival-camps-face-ec-today-249178
● The Statesman. (2026, June). Rebel TMC MPs to merge with Nationalist Citizen Party; claim on Trinamool name, symbol likely in July. https://www.thestatesman.com/india/rebel-tmc-mps-to-merge-with-little-known-tripura-based-nationalist-citizen-party-of-india-1503605734.html
● ThePrint. (2026a, June). Behind NCPI, the refuge of TMC rebel MPs: A lawyer, ‘famous mathematician’ & motivational speaker. https://theprint.in/politics/behind-ncpi-the-refuge-of-tmc-rebel-mps-a-lawyer-famous-mathematician-motivational-speaker/2959882/
● ThePrint. (2026b, June). Calcutta HC refuses to stay Speaker’s recognition of Ritabrata Banerjee as Bengal Leader of Opposition. https://theprint.in/politics/calcutta-hc-refuses-to-stay-speakers-recognition-of-ritabrata-banerjee-as-bengal-leader-of-opposition/2963202/
● Wikipedia contributors. (2026). 2026 West Bengal Legislative Assembly election. Wikipedia. https://en.wikipedia.org/wiki/2026_West_Bengal_Legislative_Assembly_election
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত