(Planning Commission 1)
ইংরেজি নববর্ষের অপরাহ্নে যোজনা ভবনের প্রধান সভাকক্ষ কানায় কানায় পরিপূর্ণ। শতাধিক চেয়ারের একটিও খালি নেই। বরং যাঁরা নির্ধারিত সময়ের পরে এসেছেন, তাঁদের অনেকেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। অনেকের ধারণা নববর্ষ উপলক্ষ্যে প্ল্যানিং কমিশনের সচিব শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। আগেও এমনটা হয়েছে। একবার তো প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ অর্থাৎ ডেপুটি চেয়ারম্যান নববর্ষের দিন নিজের বাড়িতে আধিকারিকদের জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছিলেন। সভাকক্ষে বিরাজ করছে এক আশ্চর্য নৈঃশব্দ্য। রায় ঘোষণার আগে বিচারকের অপেক্ষায় আদালতের অবস্থা যেমন হয়, অনেকটা যেন সেইরকম। সচিবের আগমনের অপেক্ষায় সকলেই উদ্বিগ্ন।
অবশেষে তিনি এলেন, এবং তাঁর নির্দিষ্ট চেয়ারে উপবেশন করলেন, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সমবেত আধিকারিক-কর্মচারীদের সামনে উচ্চকিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন— ‘অবশেষে সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হয়েছে। কন্যা সন্তান। নাম নিতি।’
অতঃপর প্ল্যানিং কমিশনের সচিব সুদীর্ঘ ভাষণে জানিয়ে দিলেন, কীভাবে ২০১৪ সালের পনেরোই অগস্ট থেকে কত কসরৎ পরিশ্রম করে প্ল্যানিং কমিশন পুনর্গঠন করতে গিয়ে জন্ম নিল এক নতুন সংস্থা— ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফর ট্র্যান্সফর্মিং ইণ্ডিয়া’ বা সংক্ষেপে নিতি (নীতি নয়) আয়োগ। আরও জানানো হল, সংসদে পাস করা কোনও আইন অনুযায়ী নিতি আয়োগ স্থাপিত হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত অনুসারে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠিত হচ্ছে।
ইনস্টিটিউশন বলার পরে আবার কমিশন বা আয়োগ সংযোগ করার প্রয়োজনীয়তা অবিশ্যি ব্যাখ্যা করা হয়নি। তবে বাঙালিদের মধ্যে দু’একজন এই সুযোগে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা টেনিদার গল্পকে স্মরণ করে বললেন, ল্যাম্প পোস্টের বানানে দুটো ‘টি’ দিলে পোস্টটি যেমন শক্তপোক্ত হয়, এ-ও হয়তো সেইরকম কোনও অজুহাত। নিতি আয়োগের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের বিষয়েও আবছা আবছা একটা সাধারণ ধারণা উপস্থাপনার পরে উপস্থিত সকলের হাতে খাবারের বাক্স ধরিয়ে দিয়ে প্ল্যানিং কমিশনের ডেথ সার্টিফিকেট এবং নিতি আয়োগের বার্থ সার্টিফিকেট প্রদান পর্ব সম্পন্ন হল।

সভাকক্ষ ছেড়ে ঘরে ফেরার পথে সকলেই ভাবলেন, এতদিনে কিছু একটা হল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে সেই মে মাস থেকে যা ঢিলেঢালা অবস্থা চলছে, তার থেকে বোধ হয় এবার মুক্তি মিলবে। সাত-আট মাস ধরে দিশাহীনভাবে চলতে থাকা ৬৫ বছরের প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটি এবার নিশ্চয়ই একটা নির্দিষ্ট অভিমুখে এগোতে থাকবে। ২০১৫ সালের পয়লা জানুয়ারির দিল্লি ততক্ষণে আঁধার মেশানো ঘন কুয়াশার শীতল চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে।
কী আশ্চর্য সমাপতন! সংবিধান বা সংসদের কোনও আইনের মাধ্যমে নয়, বরং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নির্বাহী সিদ্ধান্ত (Executive Resolution) অনুসারে ১৯৫০ সালের ১৫ মার্চ প্ল্যানিং কমিশন গঠিত হয়েছিল। কাজেই প্ল্যানিং কমিশন বন্ধ করে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভাই নিলে আপত্তির কোনও কারণ নেই। ফলত, সংসদে বা আদালতে এই নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি।
প্ল্যানিং কমিশন গঠনের জন্য ১৯৫০ সালের ১৫ মার্চ যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, তার মধ্যেই সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
দুই
সদ্য ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি পেয়েছে দেশ। বিদায়বেলায় দেশের অর্থনীতির দুরবস্থা করে ব্রিটিশ বিদায় নিয়েছে। কয়েক বছর আগে ভারতের পূর্বাঞ্চল সরকারের তৈরি করা মন্বন্তরের শিকার হয়েছে। মারা গেছে কয়েক লক্ষ মানুষ। তার উপরে, যাওয়ার সময় ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে দেওয়ায় ভারতবাসীর অবস্থা সঙ্গীন। শরণার্থীদের পুনর্বাসন তো পরের কথা, তাদের মুখে দু’বেলা অন্ন জোগানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
দেশের মানুষ স্বাধীনতার আনন্দে মাতোয়ারা। তার উপরে মাস দুয়েক আগে সংবিধানসম্মতভাবে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী কোনও কাজ করা দরকার। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে প্রতিষ্ঠিত উদ্যোগপতিদের এগিয়ে আসার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। নতুন কোনও বিনিয়োগ নিয়ে তাঁদের তরফে কোনও প্রস্তাব পেশ করা হচ্ছে না। অগত্যা সরাসরি সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। পরিকল্পিত অর্থনীতির অনুসারী ও প্রতিসারী সব পক্ষই সরকারের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হল। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্ল্যানিং কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিল ভারত সরকার।

প্ল্যানিং কমিশন গঠনের জন্য ১৯৫০ সালের ১৫ মার্চ যে সরকারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, তার মধ্যেই সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
সেই নির্দেশ অনুযায়ী প্ল্যানিং কমিশনের দায়িত্ব হল—
(১) মানবসম্পদসহ দেশের যাবতীয় সম্পদের মূল্যানুমান (assessment) ও সম্পদগুলির বৃদ্ধির সম্ভাবনার সমীক্ষা।
একই বিজ্ঞপ্তিতে প্ল্যানিং কমিশনের পরিচালনা পরিষদের কাঠামো গড়ে দিয়ে সদস্যদের নাম জানানো হয়। চেয়ারম্যান: পদাধিকার বলে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। ডেপুটি চেয়ারম্যান: গুলজারিলাল নন্দ। সদস্য: ভি.টি. কৃষ্ণমাচারী, চিন্তামন দেশমুখ, জি এল মেহতা, আর.কে. পাতিল। সচিব: এন.আর. পিল্লাই। সহসচিব: তারলোক সিং।
(২) দেশের সম্পদের সবচেয়ে কার্যকর এবং সুষম ব্যবহারের জন্য একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার রূপরেখা প্রণয়ন।
(৩) অগ্রাধিকার নির্ধারণের ভিত্তিতে কোন পরিকল্পনাটি আগে সম্পন্ন করা উচিত, এমন পর্যায়গুলি নির্বাচন। এবং প্রতিটি পর্যায়ের যথাযথ সমাপ্তির জন্য অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব প্রণয়ন।
(৪) অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার কারণগুলি নির্ধারণ করে বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সফলতার জন্য যে শর্তগুলি আরোপ করা উচিত, তা নির্ণয় করা।
(৫) পরিকল্পনার প্রতিটি পর্যায়কে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য ভারী শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জামের মান নির্ধারণ।

(৬) পরিকল্পনার প্রতিটি পর্যায়ের বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতির সময়ভিত্তিক মূল্যায়নের পর নীতি ও ব্যবস্থাগুলির সমন্বয়ের সুপারিশ প্রণয়ন।
(৭) বর্তমান নীতি, ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থনৈতিক বিবেচনার জন্য উপযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন বা আনুষঙ্গিক সুপারিশ নির্ধারণ। এই ধরনের নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধানের জন্য কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারগুলির পরামর্শ গ্রহণ।
একই বিজ্ঞপ্তিতে প্ল্যানিং কমিশনের পরিচালনা পরিষদের কাঠামো গড়ে দিয়ে সদস্যদের নাম জানানো হয়। চেয়ারম্যান: পদাধিকার বলে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। ডেপুটি চেয়ারম্যান: গুলজারিলাল নন্দ। সদস্য: ভি.টি. কৃষ্ণমাচারী, চিন্তামন দেশমুখ, জি এল মেহতা, আর.কে. পাতিল। সচিব: এন.আর. পিল্লাই। সহসচিব: তারলোক সিং।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্ল্যানিং কমিশনের কাজ জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণের কল্যাণকে চূড়ান্তভাবে প্রভাবিত করবে। পরিশেষে বলা হয়, ভারত সরকার আন্তরিকভাবে আশা করে, প্ল্যানিং কমিশনের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সমাজের সমস্ত অংশের, বিশেষত শিল্পসংস্থাগুলির সার্বিক সমর্থন এবং শুভেচ্ছা পাবে।
নবগঠিত প্রতিষ্ঠানের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে একই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্ল্যানিং কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক এবং রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বোঝাপড়া ও পরামর্শ করে কাজ করবে। পরিকল্পনার নথি রচিত হওয়ার পর প্ল্যানিং কমিশন তা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কাছে সুপারিশ করবে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্ল্যানিং কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় এবং সমস্ত রাজ্য সরকার পালন করবে। এই প্রসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়— ভারত সরকার আত্মবিশ্বাসী যে, রাজ্যগুলি কমিশনকে সর্বাত্মক সাহায্য করবে, যাতে পরিকল্পনায় সর্বোচ্চ সমন্বয় এবং প্রচেষ্টায় ঐক্য নিশ্চিত করা যায়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, প্ল্যানিং কমিশনের কাজ জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণের কল্যাণকে চূড়ান্তভাবে প্রভাবিত করবে। পরিশেষে বলা হয়, ভারত সরকার আন্তরিকভাবে আশা করে, প্ল্যানিং কমিশনের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সমাজের সমস্ত অংশের, বিশেষত শিল্পসংস্থাগুলির সার্বিক সমর্থন এবং শুভেচ্ছা পাবে।
সদর দপ্তর নতুন দিল্লিতে স্থাপনের কথা ঘোষণা করে প্ল্যানিং কমিশনের সরকারি জন্মপত্র সমাপ্ত হয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত