(Chile Atacama 2)
আতাকামায় আমাদের গাইডের নাম ভ্যালেন্তিনো। অতিসপ্রতিভ হলেও একটু সবজান্তা জেন-জি। গাইডগিরিতে বেশ ফাঁকফোকর ছিল। তার মুখেই শুনলাম, আতাকামার ইন্ডিজিনাস অধিবাসী বা ভূমিপুত্রদের নাম লিকান আনতাই (Likan Antai)। তারা ইনকাও হতে পারে বা অন্য কোনও আদিবাসী, তবে মূলত যাযাবর এবং কৃষক ছিল। তাদের সংস্কৃতিতে নিজস্ব উপজাতীয় ভাষায় কথা বলার কারণে জিভ কেটে ফেলা ও তার মাধ্যমে ভয়ঙ্কর সংস্কৃতিগত গণহত্যার (cultural genocides) নিয়ম ছিল।
সে ছিল এক কনকনে শীতভোর। বাসে চড়ে আমরা যাচ্ছিলাম জনমানবশূন্য আতাকামার সূর্যোদয় দেখতে। রূপসী আতাকামার অন্যতম অলঙ্কার হল চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাহাড়ের মাথায় গীজার। আইসল্যান্ডে এমন একাধিক জিওথার্মাল গীজার বা উষ্ণ প্রস্রবণ দেখার সৌভাগ্য হলেও তার সংখ্যা আতাকামার ধারেকাছে নয়। এখানে থরে থরে এমন স্বতঃস্ফূর্ত গীজার তখন আমাদের ছবির দুর্দান্ত ব্যাকড্রপ।
আরও পড়ুন: আতাকামা’র মরুদ্যানে
শ্বাসকষ্টজনিত কারণে ওষুধের রক্ষাকবচ নেওয়াই ছিল। আমার প্রচুর জল খাওয়ার বাতিক, তাই ঈশ্বর এই যাত্রায় রক্ষে করলেন। বাস থেকে মরুভূমির লালমাটিতে অবতরণ করে সত্যিই মনে হল মঙ্গলগ্রহে নামলাম। অক্সিজেনের স্বল্পতার কারণে উচ্চতাজনিত শ্বাসকষ্ট হওয়ার কোনও স্কোপ নেই। এমন আবহে আমার গান পায়। মনে পড়ে রবি ঠাকুরকে, আর উদাত্ত গলায় তাঁর গান দু-চার লাইন গাইলেই ডিপ ব্রিদিং হয়। অতএব ঠিক করলাম, গান গেয়েই আতাকামাকে অভিবাদন জানাব।

প্রবল ঠান্ডা তখন, শূন্যের নিচেই তাপমান। তবে চার লেয়ার শীতপোশাকের কারণে অতি মনোরম ছিল সেই ভোর। সূর্যদেব সেখানে একটু বেশিই আগে উঠে পড়েন। দেখা হল তাঁর সঙ্গে। আন্দিজের কোল আলো করে উঠে পড়েছেন। গীজারের গরমজল ছুঁয়ে পরখ করতে বেশ লাগল সেই ঠান্ডায়। পৃথিবীর সবচাইতে বড় এই জিওথার্মাল ফিল্ডের নাম ‘দ্যা ক্রাইং গ্র্যান্ডফাদার’।
ফেরার পথে চোখে পড়ল ১৩ হাজার ফুট উঁচুতে পাহাড়ের মাথায় বিধ্বস্ত টেরেনে সাজানো গোছানো এক ছিমছাম গ্রাম, যার নাম মাচুকা (Machuca)। এখানেই নাকি এখানকার ভূমিপুত্র ইন্ডিজিনাস অধিবাসীরা এখনও বাস করে।

পুরো গ্রামে হয়তো বা ২০ থেকে ২৫টি ঘর। কাদামাটি দিয়ে টিপিক্যাল Adobe স্ট্যাইলে নির্মিত এবং খড় দিয়ে তৈরি, দেখতে খুবই আকর্ষণীয় এই ঐতিহ্যবাহী ঘরগুলো। এত উঁচুতে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ায় গ্রামের বাসিন্দারা বিদ্যুতের জন্য সম্পূর্ণভাবে সৌরশক্তির উপর নির্ভরশীল। এই মরুপাহাড়ের দেশে যেমন আছে পাহাড়ি শিয়াল, তেমনই আছে পুমা, বুনো গাধা আর আছে পেরুর একমেবাদ্বিতীয় উট প্রজাতির লামা। এক দল লামা আমাদের যাত্রাপথের সামনে এসে পড়ল। ছবিও তুলতে দিল নির্বিবাদে।

মাচুকা গ্রামের পথে যেতে যেতে বিশাল এক জলাশয় পড়ল। থামলাম সেখানে ছবি তুলতে। ভাদো দে পুতানা (Vado de Putana) নাম এই হ্রদের। এ যেন মরুভূমির মাঝে এক মরুদ্যান। সেখানে প্রচুর পেরুভিয়ান পেলিকান, ফ্লেমিঙ্গো জলে মুখ ডুবিয়ে মাছ খেতে ব্যাস্ত। আর মাথার উপরে অজস্র গাঙচিল (Andean Gull), আরও সব দুর্লভ প্রজাতির পাখি উড়তে দেখা গেল।
সেদিনের ব্রেকফাস্ট ছিল সেই পাহাড়, জলাশয়, পাখিদের স্বর্গরাজ্যে। সামান্যই আয়োজন করেছিল গাইড। ফ্রুট জ্যুস, অ্যাভোকাডো স্যান্ডুইচ, কফি আর মাফিন। সেই আবহে টেবিল পেতে চাদর বিছিয়ে বেশ অভিনব কায়দায় ব্রেকফাস্ট সেরে আবার চলা। এবার হোটেলে ফিরে বিশ্রাম। আবারও বিকেলের জন্য প্রস্তুতি।

মরভূমির সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতাও হল। সূর্যাস্ত দেখার জন্য আতাকামার সবচেয়ে বিখ্যাত জায়গা হল ‘ভ্যালে দে লা লুনা’ বা চাঁদের উপত্যকা। এই মুন ভ্যালি এবং সল্ট মাউন্টেন চিলির ন্যাশানাল রিজার্ভের আওতায়, যার নাম লস ফ্লেমেনকোস ন্যাশনাল রিজার্ভ (Los Flamencos National Reserve)। গ্রেট দুনে (Great Dune) নামের একটি বিশাল বালির পাহাড়চুড়োয় উঠে আমরা সূর্যাস্ত দেখার জন্য জড়ো হব তখন। লাখ লাখ বছরের বাতাস ও সামান্য বৃষ্টির কারণে পাহাড় ও গিরিখাতগুলো ক্ষয়ে গিয়ে অদ্ভুত সব আকৃতি ধারণ করেছে। গিরিপথ বা ক্যানিয়নগুলোর মধ্য দিয়ে হাঁটার সময় মনে হয় কোনও দক্ষ শিল্পীর ক্যানভাসের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। অচেনা সে পথের মাঝে লুকিয়ে আছে অজানা বিস্ময়।

পড়ন্ত রোদ্দুরে স্যান্ডিউনসের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মসৃণ কালো ও সূক্ষ্ম বালির পাহাড় দেখে স্তম্ভিত হতে হয়। এই সেই মুন ভ্যালি। ভিনগ্রহে পা রেখেছি মনে হল। মনে হল, কেউ যেন পাহাড়ের ঢালের উপর দিয়ে ইস্ত্রি চালিয়ে সমান করে দিয়েছে। এই সময় বেশ একটা ঝোড়ো হাওয়া দেয়। তীব্র হাওয়ার কারণেই এমন টেক্সচার পাহাড়ের। সদলবলে বালিয়াড়ির উপর দিয়ে হাঁটার অনুভূতি সত্যিই বেশ উপভোগ্য। যদিও কষ্টকর ও ক্লান্তিকর। তবে মনে যুদ্ধজয়ের আনন্দ।

সূর্যাস্তের সময় আকাশ ও চারপাশের পাহাড়ের রং এত দ্রুত বদলায় যে মনে হয় চোখের সামনে উন্মুক্ত এক জাদু ক্যানভাস। কোনও শিল্পী রং তুলি দিয়ে যেন লাইভ পেইন্টিং করছেন। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় আলোছায়ার খেলা। এমন ল্যান্ডস্কেপ বিরল। ধীরে ধীরে ‘সূর্যডোবার পালা আসে যদি আসুক, বেশ তো!’ পুরো উপত্যকা তখন এক অদ্ভুত নীরবতায় ঢেকে যাচ্ছে। ঘনিয়ে আসছে অন্ধকারের রহস্যময়তা।

মরুভূমির নিয়ম মেনে আবহাওয়া দ্রুত পালটে যেতে থাকল। দিনের বেলার চড়া রোদ ছিল, সেই গরম নিমেষেই উধাও হয়ে তীব্র ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করল। পা চালিয়ে বাসে উঠে পড়ি আমরা। এবার সানপেড্রো শহরের মধ্যে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো আমাদের। শপিং করছে প্রচুর মানুষ। চিলির বৈচিত্র্যময় হস্তশিল্প যেন পথঘাট আলো করে রেখেছে। সন্ধের ঝুলে একটা পিৎজেরিয়া দেখে ঢুকে পড়ি আমরা। ঠাণ্ডার ধার বাড়তে থাকে।

ভোরবেলায় চার স্তরের শীত পোশাক আর সন্ধেয় দুটি। খেয়ে হেঁটেই ফিরে আসি আমাদের অ্যাডোবি স্টাইল চালাঘরে। আতাকামার এক একদিন এক একটা বিস্ময় অপেক্ষা করছিল যেন। মরুশহরের শেষ বিস্ময়ের অপেক্ষার অবসান হল বহুপ্রতীক্ষিত অ্যাস্ট্রোনমিকাল ট্যুর দিয়ে। কারণ চিলি হল এই অ্যাস্ট্রোনমির পীঠস্থান। আমজনতা তো আর বৈজ্ঞানিক অব্জারভেটরিতে যেতে পারবে না, তাই আমাদের জন্য বরাদ্দ এই ট্যুরিস্ট অবজারভেটরি। তবে সেখানেও বেশ উন্নতমানের টেলিস্কোপ রয়েছে।

রাত ৮টায় কনকনে ঠান্ডায় খোলা আকাশের নিচে আমরা। বাসে করে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে নামলাম গিয়ে এক প্রকান্ড মাঠের সেই অবজারভেটরিতে। উদ্দেশ্য কিছু জ্ঞান আহরণ, আর মূলত টেলিস্কোপে চোখ রেখে স্কাই ওয়াচ। শহরে আকাশের আলো আর দূষণের জন্য যেসব গ্রহ-তারকা খালি চোখে দেখা যায় না, সেখানে তা দৃষ্টিগোচর হয়। তবে বাধ সাধল সেদিনের পূর্ণিমার চাঁদ। তার আলো সামান্য হলেও আড়াল করল নক্ষত্রপুঞ্জ, ধূমকেতু এসবকে। এরে কয় আন্দিয়ান কসমোভিশন!
অন্ধকার ঘরে প্রথমে ওয়েলকাম পর্ব হল স্থানীয় সব খাবারদাবার দিয়ে। স্বাস্থ্যকর ফাইন ইভনিং স্ন্যাক্সের আয়োজন, সঙ্গে চা কফি। কিনোয়া, পেঁয়াজ, টম্যাটো, সিল্যান্ত্রো দিয়ে এক সুন্দর টক টক চাট ঠিক আমাদের ঝালমুড়ির মতো, স্কিউয়ারে গাঁথা পনিরের মাথায় দেওয়া অলিভ, কিনোয়া কুকিজের মাথায় সিদ্ধ বীটের স্লাইসের উপর আমন্ড। সঙ্গে আরও দুটো হেলদি বেকড আইটেম।
এতক্ষণ ঘরের মধ্যে বোঝা যাচ্ছিল না, বাইরের ঠাণ্ডাটা ঠিক কেমন। চার স্তরের শীতপোশাকও কম মনে হল অত রাতে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমাদের মাথায় আকাশের খোলা সামিয়ানা। সেখানে ফুটফুটে তারা। টেলিস্কোপে চোখ রেখে বেশ অনেকটা সময় পার হল।
জ্যোতির্বিজ্ঞান, রাশিচক্র, নক্ষত্রপুঞ্জ এসবের পাওয়ারপয়েন্ট অবধি ঠিকঠাক ছিল। তারপরেই জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে আধুনিক যুবক যুবতীর মাথাব্যথা দেখে বেশ আশ্চর্য হলাম। উপস্থিত সবার জন্ম, সময়, স্থান জেনে তারা নিমেষেই সব বলে দিচ্ছে। ভারতবাসীর কাছে তা বড়ই হাস্যকর, আর মোটেও আশ্চর্যের নয়। মনে মনে বললাম, ‘ইহ বাহ্য আগে কহো আর’।
তারপর শুরু হল আকাশ পর্যবেক্ষণ। এতক্ষণ ঘরের মধ্যে বোঝা যাচ্ছিল না, বাইরের ঠাণ্ডাটা ঠিক কেমন। চার স্তরের শীতপোশাকও কম মনে হল অত রাতে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমাদের মাথায় আকাশের খোলা সামিয়ানা। সেখানে ফুটফুটে তারা। টেলিস্কোপে চোখ রেখে বেশ অনেকটা সময় পার হল। ওই গোলার্ধে যাদের দেখা যায়, তাই অনেক। ধ্রুবতারা সেখানে দেখা যায় না। তার বদলে দেখা যায় Southern Cross, যা দক্ষিণ মেরুর দিকে নিশানা দেয়।
সপ্তর্ষি মণ্ডল আর পেঁজা তুলোর মতো নীহারিকা দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পার। মহাশূন্যে ভাসমান ধূলিকণা, হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও অন্যান্য আয়নিত গ্যাসের এক বিশাল মেঘের মতো পুঞ্জকেই নীহারিকা বা নেবুলা বলে জানতাম। এবার তা চাক্ষুষ দেখা গেল টেলিস্কোপের সাহায্যে।
সবচাইতে আকর্ষণীয়, বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ দেখা গেল টেলিস্কোপের মধ্যে দিয়ে, যা কলকাতায় বসে স্বপ্নের অতীত।
সপ্তর্ষি মণ্ডল আর পেঁজা তুলোর মতো নীহারিকা দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পার। মহাশূন্যে ভাসমান ধূলিকণা, হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও অন্যান্য আয়নিত গ্যাসের এক বিশাল মেঘের মতো পুঞ্জকেই নীহারিকা বা নেবুলা বলে জানতাম। এবার তা চাক্ষুষ দেখা গেল টেলিস্কোপের সাহায্যে। এই করতে করতে সেই বিশাল পাথুরে মাঠের উপর পেতে রাখা ম্যাটে শয়ন নিলাম একে একে। শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখা আর সেই সঙ্গে প্রার্থনা। মনে মনে আকাশের মধ্যে তারাদের দেশে চলে যাওয়া বাবা-মায়েদের স্মরণ করে ভাল থাকতে বলা। তারপরের সেশন ছবি তোলা।
সেই ঠাণ্ডায় জড়ভরত লাগছে। কখন বাসে গিয়ে বসব, আর হোটেলে ফিরে কোনওমতে ডিনার সেরে আয়েস করে ঘুম দেব তা নয়! এদের রাত ছোট, তামাশা বড়।
পরদিন আমাদের ঘরে ফেরার গান, যা গাইতে বড় কষ্ট হল। আতাকামা ছেড়ে পাবলো নেরুদার জীবন ও সাহিত্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর উদ্দেশ্যে যাত্রা। ‘আমার দেশ ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না, আমার কবিতা চিলির মাটি ও মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।’…এ তো নেরুদারই জীবন দর্শন ছিল।
হোটেলের প্যাকড ব্রেকফাস্ট নিয়ে কালামা বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম ভোর ভোর। এয়ারপোর্টের ক্লোক রুম থেকে আমাদের মেন ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ আগেভাগেই সুন্দর ব্যবস্থা করে পাঠানো হয়েছিল সান্তিয়াগোর হোটেলে। আন্দিজের কোলে চিলির এই পুরনো শহরটির রূপ আরেকরকম। আমরা পৌঁছলাম বেশ সন্ধের ঝুলে। হোটেলে মালপত্র রেখে আমাদের এবার একদিকে সান্তিয়াগোর সান্ধ্য রূপ, আর অন্যদিকে উদরপূর্তির চেষ্টা।
বহুদিন বিদেশে ঘুরতে ঘুরতে বাঙালির কমফোর্ট মিল কিছু ডাল-ভাত-ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের আশায়। হাতের মুঠো দিশা দেখাল কিছু দূরেই এক বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর। অগত্যা মধুসূদন। সেখানেই ডিনার সারা হল। ভাতের পাশাপাশি রুটিও মিলল। একটু হলেও স্বাদবদল। সবচাইতে বড় কথা হল বাংলাভাষায় কথা বলে একটু শান্তি যেন। তবে বাংলাদেশি রান্নার ধারেকাছে নয়। সেই সবেতেই বিদেশিদের মন জয় করার জন্য সে রান্নার সংকরায়ন হয়েছে। বাসমতীর ভাতে পড়েছে রামধনু রং। ম্যারিনেটেড মুরগির টুকরোতেও তেমনি ছোঁয়া। দুধের স্বাদ কোনওমতে ঘোলে মেটে আর কী।

যিশুখ্রিস্টের বারোজন প্রধান শিষ্যের একজন সেন্ট জেমস, এর অপর একটি নাম সান্তিয়াগো। স্পেনীয় ও পর্তুগিজ বিশ্বে প্রচলিত এই নামটি একাধিক শহরের। স্প্যানিশ বিজয়ীরা যখন লাতিন আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন করতে শুরু করে, তখন তারা তাদের এই পবিত্র সাধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নতুন নতুন শহরের নাম ‘সান্তিয়াগো’ রাখত। তাই চিলির রাজধানী সান্তিয়াগো ছাড়াও কিউবা ও ডমিনিকান রিপাবলিকে এই নামের বিখ্যাত শহর রয়েছে।

পরদিন ব্রেকফাস্ট সেরে পায়ে হেঁটেই শহরে ঘোরাঘুরি। গন্তব্য টাউন স্কোয়ার প্লাজা দে আরমাস (Plaza de Armas)। ভাগ্যে ছিল, তাই ৩১শে মে রবিবারে সেখানে মহাধুমধাম দেখা হল। জমিয়ে মেলা বসেছে। খাবারদাবারের স্টল। হস্তশিল্পের মেলা। এগিয়ে যেতে যেতে দেখি বর্ণাঢ্য উৎসবের মঞ্চ। একটি নয়, একাধিক। আর সেখানে যেন হট্টমেলা। শহরের আপামর জনসাধারণের ঢল নেমেছে। চিলির সবথেকে বড় উৎসব দিয়া দে লস পাট্রিমনোনিয়োস (Día de los Patrimonios) পালিত হচ্ছে তাদের ন্যাশানাল হেরিটেজ ডে-তে।
চিলির Ministry of Cultures, Arts, and Heritage মহাসমারোহে আয়োজন করে এই উৎসবের। আবারও পেট্রিমনি মোটেও পুরুষতান্ত্রিকতা নয়। এ হল তাদের প্রাচীনত্বকে বরণ করে নেওয়ার এক অঙ্গীকার। যাতে কেউ ভুলে না যায় এই অঞ্চলের আদি ঐতিহ্য, সংস্কৃতির বহমানতা। উপচে পড়ছে লোকজন সেখানে। নবীনদের হাত ধরে প্রাচীনের নবীকরণ।

এ যেন এক ঐতিহ্যের গণতান্ত্রিকীকরণ। চিলির সাধারণ নাগরিক, খেটে খাওয়া মানুষ যেন দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে সেটাই এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য। প্লাজা দে আরমাসের চারপাশের ঐতিহাসিক ভবন, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং বড় বড় মিউজিয়ামগুলিও সেদিন সবার জন্য সম্পূর্ণ ফ্রিতে খুলে দেওয়া হয়। এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উদযাপনের সে এক বিপুল আয়োজনে একদিকে যেমন বিচিত্র সব শহুরে পোশাকে নাচগান, বাদ্যযন্ত্রের তুমুল শব্দে সরগরম, সেই চত্ত্বর তেমনই আদিবাসী ঐতিহ্য এবং আধুনিক চিলিয়ান সংস্কৃতির মেলবন্ধন প্রশংসনীয়।

সেই ফাঁকে মাঠের ধারে সব চিত্রশিল্পীরা তাদের হাতে আঁকা ছবি, স্যিলুয়েট বিক্রি করছে। একজন শিল্পীর কাছ থেকে একটি অরিজিনাল ছবিও কিনে ফেললাম অপ্রত্যাশিতভাবে। সেদিন আবার উৎসবের ডিলে অর্ধেক দামে পাওয়া গেল। পরদিন বাসে চড়ে যাওয়া-আসায় মোট ঘণ্টা চারেকের পথ রঙিন শহর ভালপারাসিও (Valparasio) পাড়ি দিল আমাদের বন্ধু। যেখানে পাবলো নেরুদার বাড়ি ও মিউজিয়াম লা সেবাস্তিয়ানা (La Sebastiana)। মন উচাটন হলেও সেই মুহূর্তে শরীর সায় দিল না মোটেও। গল্প শুনে এবং ছবি দেখে মন ভরানো ছাড়া কোনও উপায় নেই তখন। কারণ এরপরেই আমাদের লাতিন আমেরিকার শেষ দেশ আর্জেন্টিনার জন্য পা বাড়াতে হবে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত