(Rabindra Vonita)
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ভণিতা ব্যবহারের প্রথাটি প্রধানত আত্মপরিচয় সংরক্ষণ ও স্বত্বাধিকার রক্ষার একটি মাধ্যম ছিল। চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলী থেকে মঙ্গলকাব্যে প্রতি পদের শেষে ‘ভনে’, ‘গাহে’, ‘কহে’ ইত্যাদির সাহায্যে কবিরা নিজেদের নাম যুক্ত রাখতেন। তখন মুদ্রণযন্ত্র ছিল না, মৌখিক আবৃত্তি বা নিজের হাতে লেখা পুথির মাধ্যমেই সাহিত্য সংবাহিত হত। উনিশ শতকের গোড়ায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই আধুনিক যুগের সূচনা এবং প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ হয়। এই পরিবর্তন লেখকদের ভণিতার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বাংলা সাহিত্যে পদার্পণ করছেন, ততদিনে গ্রন্থ প্রকাশনা ও মুদ্রণ ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত। সে কারণে কাব্যের শেষে নাম লিখে মালিকানা প্রমাণের কোনও বাস্তব প্রয়োজন ছিল না বললেই চলে। তবু রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতা ও গীতিসাহিত্যে বারবার ‘রবি’ শব্দটিকে ফিরিয়ে এনেছেন এক অভিনব আধুনিক শিল্পকৌশলে। ছোটবেলায় লেখা ‘গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে’-তে এর আরম্ভ। শিখ ভজনের ভাবানুবাদ হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই, সংগীত জগতে উদীয়মান সূর্যের মতোই তাঁর পদার্পণ করতে চাওয়ার সুপ্ত বাসনা ধরা দিয়েছে গানটিতে। রবীন্দ্রনাথের বহু ছদ্মনামের মধ্যে একটি ছিল ‘ভানুসিংহ’। রবি বা সূর্যের সমার্থক বলেই এটির চয়ন করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: প্রাচ্যবাণীর ভাবনায় স্বামী বিবেকানন্দ
বৈদিক সংস্কৃতে ‘সূর্য’ শব্দটির মধ্যে যে সপ্তাশ্ববাহিত রথাসীন পৌরুষ তেজোদীপ্তির আভাস রয়েছে, সেই তুলনায় ‘রবি’ বা ‘ভানু’ অনেকখানি কমনীয় ও কবিত্বধর্মী। তাই ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’তে ‘ভানু গায়’, ‘ভানুসিংহ বন্দিছে’, ‘ভানু গাহিছে’, ‘ভনে ভানু’, ‘প্রণমে ভানু’, ‘ভানু তব দাস’, ‘ভানু হাসতহিঁ’ ইত্যাদি ভণিতাগুলি লক্ষ করা যায়। এখানে অবশ্য তিনি বৈষ্ণব পদকর্তাদের অনুসরণ করেছিলেন। তবে ১৮৮০-এর দশকে ‘ভারতী’, ‘বালক’সহ নানা পত্রিকায় ও এককভাবে কবিতা প্রকাশের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘রবি’ শব্দটি ঘুরেফিরে এসেছে।
মধ্যযুগীয় ভণিতার যে প্রথাগত নাম-চিহ্নায়ন, তাকে রবীন্দ্রনাথ রূপান্তরিত করলেন আধুনিক কাব্যের বহুস্তরীয় প্রতীকে, একই সঙ্গে শ্লেষ ও দ্ব্যর্থক রূপকে। ‘রবি’ সেখানে কেবল কবিসংজ্ঞার বাহ্যিক পরিচয় হয়ে থাকেনি; বরং হয়ে উঠেছিল মহাজাগতিক সূর্য, অভ্যন্তরীণ চেতনার আলোকসংকেত এবং কবির নিজস্ব অস্তিত্বের এক গভীর দ্যোতনা।
১২৮৯ বঙ্গাব্দে ‘ভারতী’র অগ্রহায়ণ সংখ্যায় ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় তিনি লিখছেন ‘এয়েছে রবির কর’। আপাতদৃষ্টিতে এটি প্রভাতসূর্যের আলোকচ্ছটার কথা বলে, যা গুহাবন্দি বরফকে গলিয়ে নির্ঝরতুল্য মুক্ত জীবনের গতি দেয়।
রবীন্দ্রনাথের প্রারম্ভিক পর্বের রচনায় ‘রবি’ শব্দের ব্যবহারে এক সচেতন অথচ সূক্ষ্ম শ্লেষ ও বহুমাত্রিকতা লক্ষ করা যায়। ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’-এর ‘পরিত্যক্ত’, ‘আমি হারা’-র মতো বেশ কিছু কবিতায় একাধিকবার এই শব্দের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। ‘পরিত্যক্ত’ কবিতার “ফুল গেল, পাখি গেল, আলো গেল, রবি গেল, /সবাই গেল, সবই গেল গো—”-এ থাকা একাকিত্বের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের অনুমান– “জোড়াসাঁকোর বাড়ি হইতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও তাঁহার পত্নী হঠাৎ বেড়াইতে চলিয়া গেলে কবির মনে যে আঘাত রাখিয়াছিল তাহাই কি ‘পরিত্যক্ত’ কবিতায় ব্যক্ত হইয়াছে?”
১২৮৯ বঙ্গাব্দে ‘ভারতী’র অগ্রহায়ণ সংখ্যায় ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় তিনি লিখছেন ‘এয়েছে রবির কর’। আপাতদৃষ্টিতে এটি প্রভাতসূর্যের আলোকচ্ছটার কথা বলে, যা গুহাবন্দি বরফকে গলিয়ে নির্ঝরতুল্য মুক্ত জীবনের গতি দেয়। কাব্যপাঠের গভীরে প্রবেশ করলে অনুধাবন করা যায়, এটি তরুণ রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব কবিচেতনার নবজাগরণ, সৃজনশীলতার উন্মেষ এবং যৌবনের গতিমানতার এক অনবদ্য প্রতীক। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘রবিরশ্মি’তে এই বিষয়কে সমর্থন জানিয়ে লিখছেন– “‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিপ্রতিভারই আত্মজীবনচরিত; ইহা কবিপ্রতিভারই স্বপ্নভঙ্গ বা জাগরণ। ইহার মধ্যে এক বিপুল কবিপ্রাণ, সহৃদয় সহানুভূতি ও সহমর্মিতা উদ্বেল হইয়া উঠিয়াছে।”

“…প্রভাতসঙ্গীত আমার অন্তরপ্রকৃতির প্রথম বহির্মুখ উচ্ছ্বাস, সেইজন্যে ওটাতে আর কিছু বাছ-বিচার নেই।”- ‘জীবনস্মৃতি’তে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনা, এই কাব্যগ্রন্থেরই আরেকটি কবিতা ‘প্রভাত উৎসব’-এও দেখা গেছে। সেখানে তিনি লিখেছেন– “নিজের গলা হতে কিরণমালা খুলি/ দিতেছে রবি-দেব আমার গলে তুলি!” কবি এখানে সূর্যপ্রতিম যশঃপ্রার্থী।
একই ভাবের প্রতিফলন ঘটেছে ‘পুরাতন’ কবিতার “উঠেছে প্রভাত রবি/আঁকিছে সোনার ছবি”-এর মতো অংশে। সেখানে জরা ও পুরাতনকে বিদায় জানিয়ে নবীন রবির আত্মপ্রকাশ বস্তুত কবির নিজস্ব সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশের রূপক। ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুর সঙ্গে এর যোগ অতি ঘনিষ্ঠ। সূর্য হল নতুন সকাল, আশা ও প্রাণোচ্ছ্বাসের রূপকল্প। প্রভাত-সূর্য পৃথিবীর বুকে নতুন রূপ সৃষ্টি করে। অতীতের বিষাদকে শূন্য করে জীবনের প্রবাহকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। ‘ভবিষ্যতের রঙ্গভূমি’তে আবার তিনিই বলেছেন যখন ফুল (বা আমাদের প্রেম বা আনন্দ) প্রথম ফুটে উঠেছিল, তখন চারদিকে নতুন আশা ও আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। সূর্যের কিরণে এবং বসন্তের বাতাসে চারদিক আনন্দে মেতে উঠেছিল। এটিও একটি অধ্যায়ের সূচনা, জীবনের প্রারম্ভিক আনন্দ ও উজ্জ্বলতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’ গানের মধ্য দিয়ে ‘রবির আলো’র দিকে ছুটে চলার আকুলতা, বা পরে ‘শিশু ভোলানাথ’-এর বিভিন্ন কবিতায় ‘রবি’র সহজ সরল অথচ দ্যোতনাময় উপস্থিতি প্রমাণ করে ‘রবি’ শব্দটি কবিগুরুর মানসলোকে এক স্থায়ী আত্মবোধের রূপক হিসেবে বিরাজ করত।
কবি দেখিয়েছেন মানবজীবন সাময়িক, কিন্তু পৃথিবী ও প্রকৃতি অবিনশ্বর। আমরা চলে গেলেও প্রতিদিন সূর্য উঠবে, সকাল-সন্ধ্যা হবে, মানুষ কাজ থেকে ফিরে আসবে, সন্ধ্যাকাশে তারাদের দল দেখা দেবে। এখানে কোথাও যেন শোক ও শোকোত্তীর্ণ হওয়ার প্রয়াস রয়েছে। এর কারণ কাদম্বরী দেবীর অকালমৃত্যু। তাই অতীতকালের প্রয়োগে লেখা হয়েছে- “নব রবি উঠেছিল”। রবীন্দ্রনাথ মধ্যযুগীয় কবিদের মতো ছন্দের শেষে কৃত্রিমভাবে নাম বসাননি; বরং কবিতার মূল ভাব ও রূপকল্পের ভেতরে ‘রবি’ শব্দটি এমনভাবে বুনেছেন, যাতে একাধারে তা প্রকৃতির সূর্য এবং কবি রবীন্দ্রনাথ— দুটি অর্থকেই ধারণ করে অপূর্ব নান্দনিক দ্ব্যর্থকতার সৃষ্টি করে।
এই শব্দপ্রয়োগের আরেকটি অত্যন্ত নিবিড় ও ব্যক্তিগত মাত্রা উন্মোচিত হয় ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের ‘মেঘদূত’ কবিতার শেষ চরণে। কবি লিখছেন, “রবিহীন মণিদীপ্ত প্রদোষের দেশে”, যা অত্যন্ত বেদনাঘন। কালিদাসের মেঘদূতের যক্ষবধূ ‘বিরহিণী প্রিয়া’র একাকিত্বের পটভূমিতে কবি যখন নিজের মানসপটকে মেলাচ্ছেন, তখন সেই ‘রবিহীন’ অবস্থা কেবল সূর্যালোকহীন অন্ধকারকে বোঝায় না; তা রবি-হীন অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যবঞ্চিত জীবনের এক সকাতর সংকেত বহন করে। এই কাব্যিক বিরহভাবনার অন্তরালে কবিগৃহের পারিবারিক ব্যস্ততা কিংবা মৃণালিনী দেবীর সাময়িক নিঃসঙ্গতা ও কবির নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের এক পরোক্ষ ছায়াপাত ঘটেছে। গাজীপুরে লিখিত কবিতাগুলির মধ্যেও সেই ছবিই দেখা দিয়েছিল।

একইভাবে পরবর্তীতে ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি’ গানের মধ্য দিয়ে ‘রবির আলো’র দিকে ছুটে চলার আকুলতা, বা পরে ‘শিশু ভোলানাথ’-এর বিভিন্ন কবিতায় ‘রবি’র সহজ সরল অথচ দ্যোতনাময় উপস্থিতি প্রমাণ করে ‘রবি’ শব্দটি কবিগুরুর মানসলোকে এক স্থায়ী আত্মবোধের রূপক হিসেবে বিরাজ করত।
বিরহ, আত্মজাগরণ, বাল্যচপলতা বা আধ্যাত্মিক মুক্তি— জীবনের নানা পর্বেই তিনি নিজের নামটিকে কাব্যের প্রধান উপাদানে পরিণত করেছিলেন। ‘পূরবী’তেও ধরা দিয়েছে এই ধারা— “বাজে পূরবীর ছন্দে রবির শেষ রাগিণীর বীন”। এখানে অপরাহ্ণের আলো ও জীবন-সায়াহ্নের এক গম্ভীর অনুভূতির নাম। ষাটোর্ধ্ব বয়সে পৌঁছানো রবীন্দ্রনাথ যখন পূরবীর সুরে নিজস্ব রোমান্টিকতাকে আবার জাগিয়ে তোলেন, তখন সে কাব্য কেবল সন্ধ্যার রূপবর্ণনা থাকে না; তা হয়ে ওঠে জীবনের অন্তিম লগ্নের এক আত্মনিবেদন। আকাশে তখন অস্তগামী রবি হেলে পড়ছে অন্ধকারের দিকে, আর পৃথিবীর বুকে রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষ সূর্যাস্তকে আবাহন করছেন সন্ধ্যার এই করুণ ও মধুর শেষ রাগিণীতে।
তাঁর কাব্যপ্রবাহ নিবিড়ভাবে দেখলে বোঝা যায় যে পুরাতনী ভণিতার যে রূপটিকে আধুনিক যুগ কিছুটা অপ্রয়োজনীয় মনে করে বর্জন করেছিল, তাকেই তিনি এক মনস্তাত্ত্বিক ও আধুনিক কাব্যালংকারে উন্নীত করেছেন।
প্রত্যেক কবির কাব্যরচনার কোনও একটি উৎস থেকেই থাকে। কবিতায় সেকথাই হয়তো প্রকট না হয়ে প্রচ্ছন্ন হয়েই থেকে যায়। সেজন্যই বৈষ্ণব কবির কাছে রবীন্দ্রনাথেরও মরমী প্রশ্ন থাকে “কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমচ্ছবি”। প্রথম ও মধ্যবয়সে যে ‘রবি’ শব্দটি কবির রচনায় কখনও শ্লেষে, কখনও নবজাগরণের রূপকে, কখনও বিরহবেদনার ইঙ্গিতে ব্যবহৃত হয়েছিল, পরিণত বয়সে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা বিশ্বচেতনা ও সর্বব্যাপী আলোকের দর্শনে গিয়ে মিশে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ কোনও লিখিত প্রমাণ রেখে যাননি যে, এই ধরনের শব্দবন্ধের প্রয়োগ কতটা সচেতন ছিল, কিন্তু তাঁর কাব্যপ্রবাহ নিবিড়ভাবে দেখলে বোঝা যায় যে পুরাতনী ভণিতার যে রূপটিকে আধুনিক যুগ কিছুটা অপ্রয়োজনীয় মনে করে বর্জন করেছিল, তাকেই তিনি এক মনস্তাত্ত্বিক ও আধুনিক কাব্যালংকারে উন্নীত করেছেন। নিজের নামটিকে কেবল প্রচারমুখী পরিচয়ের মাধ্যম না বানিয়ে, বিচিত্র প্রকৃতির মহাজাগতিক সত্য ও ব্যক্তিগত কবিসত্তার মেলবন্ধনে পরিণত করেছিলেন। ফলে রবীন্দ্রসাহিত্যে ‘রবি’ কেবল একটি নাম বা আকাশের জ্যোতিষ্ক হয়ে থাকেনি; বরং হয়ে উঠেছে তাঁর স্বকীয় আত্মানুসন্ধানের চিরন্তন স্বাক্ষর।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত