(Bismillah Khan)
উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ।
সে এক প্রাচীন শহরের মাঝে ডালপালা মেলে গজিয়ে ওঠা প্রকাণ্ড বটবৃক্ষের নাম। তার শেকড় সেই শহরের পবিত্র মাটির এত গভীরে প্রবেশ করেছিল যে, কোনও শক্তিই যেন সেই মহীরুহকে মাটি থেকে আলাদা করতে পারত না। কিন্তু তার ছায়ায় বসে কান পাতলে শোনা যেত, সহজ সরল কোনও রাগের সরগমের মূর্ছনা। আবার, কখনও বা শোনা যেত কাজরি বা চৈতীর কোনও চেনা সুর।
কিন্তু, হঠাৎই একদিন সে বটবৃক্ষ হারিয়ে গেল। ২১শে আগস্ট, ২০০৬ সালে, প্রসারিত ডালপালা আর মাটির গভীর থেকে শিকড় উপড়ে সে বটবৃক্ষ তার নিজের পার্থিব অস্তিত্ব মুছে প্রিয় শহর থেকে হারিয়ে গেল।
আরও পড়ুন: তিরঙ্গা বরফি ও ইতিহাসের একটি আন্দোলন
তার ফলে সে শহর কিন্তু থেমে যায়নি— স্তব্ধ হয়ে যায়নি মানুষের আনাগোনা, হারিয়ে যায়নি ভোরের আজানের সুরে ভৈরবীর তান কিম্বা সংকটমোচন মন্দিরের কোনও জলসায় কাজরির ধুন। কোনওটাই বদলায়নি, কিছুই হারায়নি। শুধু হারিয়ে গেছেন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ— যিনি তাঁর প্রিয় শহর বেনারসে নিজেকে অনেক দিন ধরেই একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছিলেন। আর সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছিল তাঁর চিরসঙ্গী সেই সানাই, যা শুনতে গোটা বিশ্ব আজও কান পেতে থাকে।
গোটা বেনারস শহরেই উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ ছিলেন সবার হাতের নাগালের এক মানুষ। যে কোনও সময় তাঁর দেখা পাওয়া যায়। যখন তখন তাঁর দুটো হাত ধরতে পারা যায়, আর স্পর্শ করতে পারা যায় তাঁর বাজনা— মনে হয় যেন, ‘এ এমন বড় কথা কী?’

খাঁ সাহেবের খ্যাতির প্রসার মাপার মতো ফিতে হয়তো আজও কারও কাছে নেই। অথচ এই মানুষটি, সুদীর্ঘ নব্বই বছরের জীবনে তাঁর স্বাভাবিক জীবনধারা ও শিল্পীসত্তাকে অভিন্ন করে তুলেছিলেন এবং বেনারস শহরের কোলাহলে মিশে গিয়েছিলেন। শহরটাকে বড্ড ভালবাসতেন যে। আর তাই যখন সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁর কাছে প্রস্তাব আসে সেখানে গিয়ে সানাই শেখাবার, তিনি সহজেই বলে দিলেন, “যেতে পারি যদি আমার গঙ্গা আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে দাও।”
যে কোনও মানুষের পক্ষেই, শহরের মাঝে থেকে নিজেকে হারিয়ে ফেলার যথেষ্ট যুক্তি থাকতে পারে। অনেক মানুষ আছেন, যারা একই স্থানে বসবাস করে, নানাভাবে হারিয়ে গিয়েও, আবার ঠিক ততটাই নতুন কোনও রূপে বা আঙ্গিকে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারেন। অনেকে মনে করেন, গাছের মতো একই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানেই কিছুটা কম বেঁচে থাকা। যেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, বা বসে বসে, বা শুয়ে শুয়ে মরে যাওয়া মানেই জীবনের মানে কিছুটা কম হয়ে যাওয়া। যেন প্রতিদিনের মৃত্যুর মধ্যে অমরত্বও কিছুটা কম পড়ে।
ভিতর থেকে আনন্দে থাকা আত্মারা শোকের মুকুট পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন হয়তো। যাঁরা যশস্বী, তাঁরা অনেকেই আবার, বিদেশে বসে নিজেদের দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর আশেপাশের বহু মানুষই তেমনটা করেছেন। তাঁরা হয়তো চলে গেছেন, কিন্তু মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন খাঁ সাহেব।
বিসমিল্লাহ খাঁ বোধহয় ব্যতিক্রমী ছিলেন। এসব তাঁর জীবনদর্শনের পরিসরের বাইরে ছিল। সেই কারণেই বহু শিল্পীর সঙ্গে তাঁর পার্থক্য ছিল। বহুলাংশে শিল্পীরা ভিটে কিংবা দেশই ছেড়ে চলে গেছেন। তারপর দূরে গিয়ে নিজেদের মাটির জন্য হাহাকার করেছেন। এগুলিকে বলা যেতে পারে এক ‘অলংকৃত’ স্থানচ্যুতির হাহাকার।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু ধার করা বেদনা। ভিতর থেকে আনন্দে থাকা আত্মারা শোকের মুকুট পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন হয়তো। যাঁরা যশস্বী, তাঁরা অনেকেই আবার, বিদেশে বসে নিজেদের দেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর আশেপাশের বহু মানুষই তেমনটা করেছেন। তাঁরা হয়তো চলে গেছেন, কিন্তু মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছেন খাঁ সাহেব।
কারণ উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ এই বিষয়টিকে উল্টো দিক থেকে দেখেছিলেন। তিনি একটি জায়গার মধ্যে থেকেই সমগ্র পৃথিবী ঘুরে এসেছিলেন। তিনি প্রচুর ঘুরেছেন, কিন্তু পথ হারাননি। আর যদি কখনও হারিয়েও গিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত ঘরে ফিরে এসেছেন। তিনি তাঁর হড়হা সরাই বা দালমন্ডির চেনা সেই গলিগুলি— যার সঙ্গে তাঁর আত্মিক যোগ— তারই মধ্যে ঘুরেছেন এবং সেই পথ ধরে হেঁটেই অন্যদের জীবনে প্রবেশ করেছেন। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘মুক্তিদায়িনী’ নদীটির ঘাটেও ঘুরেছেন। আবার যখন চেয়েছেন, তখন কোনও মন্দিরের নহবতখানাতেও সানাই হাতে বসে থাকতে দেখা গেছে তাঁকে।
এভাবে ঘুরতে ঘুরতেই তাঁর বাজনা শহরের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। সে রয়ে গিয়েছে ঘরানাহীন হয়ে— বেনারসি বিস্মিল্লাহর সানাই রূপে। তাই আজ বেনারসে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ-র সঙ্গে জড়িত প্রতিটি স্থানকেই আমাদের ধারণায়, তাঁর সানাইকে গড়ে তোলার এক-একটি পর্ব বলে মনে হয়। যেন, এর বাইরে কিছুই নয়। আমরা তাঁকে এখনও খুঁজে চলেছি তাঁর চেনা শহরের অলিতে গলিতে।
জেদ, আপস, সংঘাত, হতাশা, এবং স্বপ্ন— এই সব উপাদান দিয়ে মানুষের চারপাশে সৃষ্টি হয়েছে এক ঘন পর্দার আস্তরণ। এ সবকিছুই তো মানুষের সামাজিক পরিচয়। বিসমিল্লাহ এই উপাদানগুলির থেকে মুক্ত থেকে তাঁর শিল্পের শরীর নির্মাণ করেছিলেন।
তবে, নিজেকেই একবার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়— বেনারস শহরের মধ্যে আমরা সত্যিই কি বিসমিল্লাহর সানাই খুঁজছি? কেনই বা খুঁজছি? এ তো অজানা কিছু নয়— আমরা তো বরাবরই নানা জাগতিক কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা হয়ে বেনারসকে লুকিয়ে থাকার জন্য ব্যবহার করেছি। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁও হয়তো তাই করেছিলেন। খুঁজে কী হবে?
জেদ, আপস, সংঘাত, হতাশা, এবং স্বপ্ন— এই সব উপাদান দিয়ে মানুষের চারপাশে সৃষ্টি হয়েছে এক ঘন পর্দার আস্তরণ। এ সবকিছুই তো মানুষের সামাজিক পরিচয়। বিসমিল্লাহ এই উপাদানগুলির থেকে মুক্ত থেকে তাঁর শিল্পের শরীর নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ও তাঁর সানাই তো এইসব উপাদান দিয়ে তৈরি হয়নি এবং বেড়ে ওঠেনি।

উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই তৈরি একদিকে যেমন হিন্দুদের আনন্দ নিয়ে, তেমন মুসলমানদের শোকেও কেঁদেছে তাঁর বাজনা। জীবনের শেষ বছরটি বাদ দিলে, সারা জীবন তিনি বেনারসে মহরমের পঞ্চম ও অষ্টম দিনে কারবালার বীরদের আত্মত্যাগের স্মরণে চোখের জলের নজরানা পেশ করেছেন। হুসেইনের শোক বাজিয়েছেন। মাতমের মিছিলের সামনে বাজতে থাকা সেই সানাই ছিল শোকের নেতৃত্বদায়ী একটি সুর। ঠিক যেমন বালাজি মন্দিরের প্রাত্যহিকী শোভাযাত্রায় সর্বাগ্রে থেকেছে উস্তাদের বাজনা।
উস্তাদ তাঁর জীবনযাপনের সরলতাকেই শিল্পের নকশায় ঢেলে দিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের সেই সরল, দরিদ্র অথচ গভীর শিল্পকর্মকে, তাঁর সানাইয়ের অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ের সঙ্গে যুক্ত না করে তাঁর শিল্পের মূল্যায়ন করলে তা অসম্পূর্ণ এবং অনেকটাই ব্যর্থ থেকে যাবে।
ধর্ম বা জাতি নির্বিশেষে, কোনও আনন্দের অনুষ্ঠানে যে সুরগুলি বেজেছে, তিনি সেগুলি এমন এক অসম্ভব স্বাভাবিক সরলতায় বাজিয়েছেন, যার তুলনা মেলা কঠিন। এই কথাটি বারবার উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তাঁর জটিল শিল্পীসত্তার গভীরে প্রবেশ করেও সেই ঐতিহ্যবাহী সুরগুলির ‘মূল’ একটুও বদলে যায়নি।
একটি পৃথিবী ছিল, যা বিসমিল্লাহকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সেই পৃথিবীর সঙ্গে আপন স্বপ্নের পৃথিবীর মতো ব্যবহার করতেন এবং নিজের প্রকাশের মধ্য দিয়ে শিল্পের সেই স্বপ্নময় জগতকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তুলতেন। তাঁর শিল্পের গন্তব্য ছিল— প্রদত্ত পৃথিবীটিকে স্বপ্নের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত করা।
ধর্ম বা জাতি নির্বিশেষে, কোনও আনন্দের অনুষ্ঠানে যে সুরগুলি বেজেছে, তিনি সেগুলি এমন এক অসম্ভব স্বাভাবিক সরলতায় বাজিয়েছেন, যার তুলনা মেলা কঠিন। এই কথাটি বারবার উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তাঁর জটিল শিল্পীসত্তার গভীরে প্রবেশ করেও সেই ঐতিহ্যবাহী সুরগুলির ‘মূল’ একটুও বদলে যায়নি।
সাধারণত কোনও লোকজ রূপ যখন কোনও শিল্পীর অনুশীলন ও অভিজ্ঞতা, চেতনায় পরিপূর্ণ হয়, তখন তা ক্রমশ পরিণত এবং গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। বুনো পরিবেশ ধীরে ধীরে একটি পরিচ্ছন্ন বাগানে পরিণত হয়। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁর পথ ছিল উল্টো। আর আজ পরিস্থিতি এমন যে, তাঁর সানাই থেকে বেরিয়ে আসা রূপগুলিই যেন আসল এবং অবিকৃত রূপ বলে মনে হয়।
উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ দীর্ঘ এক জীবন পেয়েছিলেন। সেই সঙ্গে পেয়েছিলেন ইতিহাসের এক অদ্ভুত, ক্রমপরিবর্তনশীল সময়। তাঁর শিল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রহস্য লুকিয়ে আছে এই সত্যটির মধ্যেই।
কিন্তু সময়ের বিচার— আজ সেই ‘অনুষ্ঠানগুলি’ এবং তাদের প্রবল আয়োজকদের যতটা মনে রাখা হয়, তার প্রধান কারণই হল, সেইসব আসরে বিসমিল্লাহর সানাইও ছিল বলে। অনুষ্ঠানগুলি ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
১৯১৬ সালের ১৮ই মার্চ বিহারের ডুমরাঁওয়ে জন্ম। জন্মের কিছুদিন পর, ১৯২২ সালের দিকে তিনি মামার কাছে বেনারসে চলে আসেন। মামাই তাঁর গুরু ছিলেন। পরবর্তী সময়ে উস্তাদ তাঁর সম্পত্তিরও উত্তরাধিকারী হন। ১৯৪০ সালে মামা এবং ১৯৫৭ সালে জ্যাঠামশাইয়ের মৃত্যুর পর একটি মস্ত পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে।
সেটি ছিল আন্দোলনমুখর অগ্রগতির যুগ। যদিও একই সময়ে রাজা-মহারাজাদের দরবারেও ছিল তাঁর নিত্য যাতায়াত। দুই স্থানেই ছিল সঙ্গীত। বিসমিল্লাহ দু’জায়গাতেই নিঃসংকোচে অংশ নিতেন। প্রায়মৃত সামন্ততান্ত্রিক মেহফিলগুলিতে তিনি নতুন প্রাণ দিয়েছিলেন, আবার গণতন্ত্রের নতুন দরবারেও আলো ছড়িয়েছিলেন।

খুব লজ্জিত হতে হয় এই কথা ভেবে যে, বেনারস ও তার আশপাশের ছোট-বড় বহু তথাকথিত রাজা এবং গণতন্ত্রের নতুন দিগ্গজদের কাছে তিনি, প্রায় শেষদিন পর্যন্ত, শুধুমাত্র দরবারি শিল্পী হিসেবে নিছক এক বাজনাদার ছিলেন। ‘বড় বড় রাজনৈতিক দলের নামজাদা নেতাদের সামনে, তাঁদের ছোটখাটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে, চেয়ারে আসীন শ্রোতাদের এক ধাপ নিচে, মাটিতে বসেও কিন্তু ততটাই নিষ্ঠার সঙ্গে বারবার তাঁর বাজনা বাজিয়েছেন।
কিন্তু সময়ের বিচার— আজ সেই ‘অনুষ্ঠানগুলি’ এবং তাদের প্রবল আয়োজকদের যতটা মনে রাখা হয়, তার প্রধান কারণই হল, সেইসব আসরে বিসমিল্লাহর সানাইও ছিল বলে। অনুষ্ঠানগুলি ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই প্রজন্ম বড় হয়ে একদিন দেখবে, বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে বেনিয়াবাগের মাঠ। হয়তো শুনবে, সেই মাঠেই একদিন এই মহান মানুষটির দেহ লক্ষ লক্ষ মানুষের শেষ দর্শনের জন্য রাখা হয়েছিল। কতটা অনুভব করবে, বলা কঠিন।
এই বিচিত্র সব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ অনেক কিছু শিখেছিলেন। এছাড়া রাজাদের মেহফিলে তিনি তাঁর চিরস্থায়ী সঙ্গীত-সহচরদেরও খুঁজে পেয়েছিলেন। সিদ্ধেশ্বরী ও গিরিজা, বৈজনাথ প্রসাদ সারঙ্গিয়া, বিলায়েত খাঁ এবং অনোখেলালের সঙ্গে এই সব আসরেই তাঁর দেখা হয়েছিল। তাঁদের এই যুগলবন্দি জীবনভর চলেছে, মৃত্যুর পরেও তার রেশ থেকে গেছে। সেই সুর এখনও চলছে, এবং তার প্রতিধ্বনি আজও যে কোনও মুহূর্তে শোনা যেতে পারে। উস্তাদকে খুঁজে পাওয়া যায় কেবল কষ্ট আর আশার শর্তে। নয়তো তিনি তো চলে গিয়েছেন আজ দুই দশক হয়ে গেল!
তাই, আজ কুড়ি বছর পর তাঁর মহল্লার আজকের একটি প্রজন্ম— যারা অভিভাবকদের হাত ধরে রাস্তা পার হতে শিখছে এবং আধুনিক স্কুলে ইউনিফর্ম পরে, কাঁধে বইয়ের বোঝা নিয়ে ইতিহাস ভূগোল পড়তে যাচ্ছে, তারা কি চিনবে এই উস্তাদকে? তারা বিসমিল্লাহকে হয়তো চিনবে তাদের পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে— তাঁর বাড়ির দেওয়াল স্পর্শ করে নয়। এখনই চোখে পড়েছে, উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে, তারা শুধু শুকনো হাসি হেসে দেয়।
এই প্রজন্ম বড় হয়ে একদিন দেখবে, বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রয়েছে বেনিয়াবাগের মাঠ। হয়তো শুনবে, সেই মাঠেই একদিন এই মহান মানুষটির দেহ লক্ষ লক্ষ মানুষের শেষ দর্শনের জন্য রাখা হয়েছিল। কতটা অনুভব করবে, বলা কঠিন। এই মাঠ বিসমিল্লাহর অত্যন্ত প্রিয় স্থান। এখানেই বসে তিনি স্থানীয় ফুটবল দলের অসংখ্য ম্যাচ দেখেছেন এবং ফুটবলারদের পৃষ্ঠপোষকতাও করেছেন। কত আড্ডা, গল্পের রোজনামচা মিশে আছে এই মাঠের ধূলিকণায়।
বর্ষার কোনও এক সকালে কাদায় ভরা সেই মাঠে উদ্দেশ্যহীন, যুক্তিহীনভাবে বসে থাকা— এও যেন তাঁকে খুঁজে পাওয়ারই একটি উপায়। কিন্তু মাঠটির অন্য সব বিদ্রূপও চোখে পড়ে। জানা যায়, এক সময় এই মাঠেই নিজের যুবযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে এক যুব ছাত্রনেতা রাজনারায়ণ, মহারানি ভিক্টোরিয়ার পাথরের মূর্তি ভেঙে দিয়েছিলেন। কয়েক দশক ধরে জায়গাটি ফাঁকা পড়ে ছিল— সেও যেন উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ-র অনুপস্থিতির মতোই।
‘বাবুল’ ছবিতে শমশাদ বেগমের একটি গানের সঙ্গেও তাঁর সানাই সঙ্গত করেছিল। এই সমস্ত কাজই তিনি করেছিলেন প্রায় খেলাচ্ছলে, লীলার মতো করে। স্বাভাবিকভাবেই, সেই সময় অর্থ কোনও বড় বিষয় ছিল না।
বেনারসের আর এক দিগ্গজ, উপন্যাস-সম্রাট প্রেমচন্দের মতো উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ-ও সিনেমা এবং মুম্বই থেকে বারবার পালিয়ে বেড়িয়েছেন। অবশ্য প্রেমচন্দের মতো তিনি ব্যর্থ হননি। তবু পালিয়ে চলে এসেছিলেন বেনারসে। কারণ এই জায়গাটি ছাড়া অন্য কোথাও তাঁর স্থায়ী হওয়ার কথা তো তিনি ভাবেন না।
১৯৪১ সালের কাছাকাছি তাঁর মুম্বই যাতায়াত শুরু হয়। সেখানে সুরকার নওশাদ এবং বসন্ত দেশাই তাঁর বন্ধু হয়ে ওঠেন। ‘কিনারা’ নামে একটি ছবিতে তিনি পার্শ্ব-নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ও করেন। ছবির নায়িকা ছিলেন গীতা বালি। পুরনো মানুষজন বলেন, ছবিটি বেনারসেও প্রদর্শিত হয়েছিল।

এই সময়েই কাপুর পরিবারের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ও সখ্য হয়। আর তার বিনিময়ে আমাদের সিনেমা-সভ্যতা, উপহার হিসেবে পায় এক অসাধারণ সঙ্গীতখণ্ড— ‘আওয়ারা’ ছবির বিখ্যাত গান ‘ঘর আয়া মেরা পরদেশি’-তে মুখড়া ও অন্তরার মাঝখানে এবং দুটি অন্তরার মধ্যবর্তী অংশে যে সানাই শোনা যায়।
সেই সুর চিরকালীন আশা এবং ভালবাসার এক স্বাক্ষর-সুর হিসেবে বেঁচে থাকবে।
‘বাবুল’ ছবিতে শমশাদ বেগমের একটি গানের সঙ্গেও তাঁর সানাই সঙ্গত করেছিল। এই সমস্ত কাজই তিনি করেছিলেন প্রায় খেলাচ্ছলে, লীলার মতো করে। স্বাভাবিকভাবেই, সেই সময় অর্থ কোনও বড় বিষয় ছিল না।
পরবর্তী সময়ে যে সানাইগুলি আমরা শুনেছি, সেগুলির মধ্যে উস্তাদকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকি থেকে যায়। তাঁর উত্তরাধিকারী এবং পুত্র নায়ার হুসেনও আজ আর পৃথিবীতে নেই। নায়ার ছাড়াও তাঁর আরেক পুত্র জামিন এবং ভাগ্নে মুমতাজ হুসেন অসাধারণ সানাই বাজান।
কিছুদিন পর, ১৯৫৬ সালের ঠিক আগে, প্রযোজক-পরিচালক বিজয় ভট্টের ব্যবসা তখন প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। তিনি সঙ্গীতকে কেন্দ্র করে একটি ছবি বানাতে চাইছিলেন। বসন্ত দেশাইয়ের মাধ্যমে তিনি উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁকে ডাকলেন।
আবারও প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে বাজাতে হবে উস্তাদকে। তিনি বসন্ত দেশাইকে আশ্বস্ত করলেন যে ‘খরমাস’—যে সময়ে বিয়ে বা অন্য কোনও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান হয় না— সেই সময় উস্তাদ এবং তাঁর মতো অন্যান্য শেহনাইবাদকেরা ফাঁকা থাকেন। তাই খরমাসের পরে তিনি কাজটা করতে মুম্বই পৌঁছে যাবেন।
এই ছবিতে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ অনেক কিছু বাজিয়েছিলেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে যা বাজে; শ্রাবণ-ভাদ্রের সবুজে যখন দৃশ্য আরও সবুজ হয়ে ওঠে তখন যা বাজে; আবার হৃদয় ভেঙে গেলে যে সুর বাজে— সবই। আর তাই, একটি স্থানীয় সুর যখন উস্তাদের নিঃশ্বাসের মধ্যে অনুবাদ হয়ে ‘গুঞ্জ উঠি শেহনাই’ ছবির বিখ্যাত গানে পরিণত হয়, তখন তার কথা— ‘দিল কা খিলৌনা হায় টুট গয়া’— আর সেই গানে লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। এই ছবির একটি ছোট অথচ বিশেষ সৌভাগ্য ছিল— ছবিটি বিসমিল্লাহর বন্ধু হয়ে ওঠা বিজয় ভট্টকে আবার সমৃদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে যে সানাইগুলি আমরা শুনেছি, সেগুলির মধ্যে উস্তাদকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়ার বড় ঝুঁকি থেকে যায়। তাঁর উত্তরাধিকারী এবং পুত্র নায়ার হুসেনও আজ আর পৃথিবীতে নেই। নায়ার ছাড়াও তাঁর আরেক পুত্র জামিন এবং ভাগ্নে মুমতাজ হুসেন অসাধারণ সানাই বাজান। তাঁর শিষ্য শৈলেশ ভাগবত এবং কাদির দরবেশের দেশ বিদেশে যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে।
উস্তাদ তাঁর প্রায় এক ডজন শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠান করতেন। এঁরা সবাই দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে সঙ্গত করেছেন। তাঁর অসম্পূর্ণ ও থেমে যাওয়া নিঃশ্বাসকে পূর্ণ করেছেন। এতে নিশ্চয়ই অনেক সুবিধা হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিটাও হয়েছে।
কিন্তু যে জিনিসটি এই সমস্ত শিষ্য তাঁদের গুরুর আশীর্বাদ এবং নিজেদের সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটিই তাঁদের সীমাবদ্ধতাও।
তাঁদের কাউকেই সানাই বাজালে, শুনে আলাদা করে চেনা যায় না। শ্রোতা যদি চোখ বন্ধ করেন এবং শিষ্যরা তাঁদের সর্বোচ্চ দক্ষতায় বাজান, তাহলেও সেই সুর বিসমিল্লাহ খাঁ-এর থেকে আলাদা কিছু বলে মনে হয় না। উস্তাদের ছায়া তাঁদের অন্তরের এত গভীরে ঢুকে গেছে যে, তার হাত থেকে নিস্তার নেই, কোনও প্রতিকারও নেই।
আসলে সানাই হল নিঃশ্বাসের বাদ্যযন্ত্র। আর মঞ্চে একটি সানাই মানেই একটি নিঃশ্বাস যেন কম পড়ে যায়।

উস্তাদ তাঁর প্রায় এক ডজন শিষ্যকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠান করতেন। এঁরা সবাই দীর্ঘ সময় তাঁর সঙ্গে সঙ্গত করেছেন। তাঁর অসম্পূর্ণ ও থেমে যাওয়া নিঃশ্বাসকে পূর্ণ করেছেন। এতে নিশ্চয়ই অনেক সুবিধা হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিটাও হয়েছে— তাঁদের ছোট ছোট নিঃশ্বাসগুলি শেষ পর্যন্ত উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ-র সেই বৃহৎ কেন্দ্রীয় নিঃশ্বাসের মধ্যে মিশে গেছে।
এঁরা প্রত্যেকেই উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ-র খণ্ডিত অভিব্যক্তি, খণ্ডিত উপস্থিতি। তাঁদের শিল্প যেন উস্তাদের অনুপস্থিতিরই প্রমাণ।
প্রায় দুশো মানুষের তাঁর পরিবার, আজ তাদের বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট। কিন্তু ভিতরের কোথাও কোথাও এখনও দ্বিতীয় এক বিসমিল্লাহর জন্য অস্থির অপেক্ষা চলছে। পরিবারের বেশ কয়েকজন পুরুষ সানাই নিয়ে পরিশ্রম করছেন। ফলে স্পষ্ট যে, তাঁদের কাছে সানাই কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় নয়। এটি একটি জীবন ধারা। এই সন্তুষ্টি এবং এই অস্থির অপেক্ষার মধ্যেই বিসমিল্লাহ খাঁ বেঁচে আছেন।
গঙ্গার জলের সঙ্গে মিশে আছে তাঁরও জল— তাঁর অস্তিত্বের জল। আগামী প্রজন্মের কাছে যদি উস্তাদের স্মৃতির সেই আলো না থাকে, তাহলে বেনারসের বহু জায়গাকেই ফাঁকা, নিঃসঙ্গ এবং অন্ধকার বলে মনে হবে।
ইতিহাসে কোনও বড় হস্তক্ষেপ কখনও কখনও ইতিহাসের গতিপথই ওলটপালট করে দেয়। বিসমিল্লাহ খাঁ-এর অস্তিত্বের গুরুত্ব এখানেই যে, তিনি তাঁর সময়ের ভূগোলের মধ্যেও থেকে গিয়েছেন। তাঁর স্মৃতি ছাড়া বেনারসের বহু জায়গাকেই যেন আর ঠিকমতো চেনা যায় না। যেমন, গঙ্গার জলের সঙ্গে মিশে আছে তাঁরও জল— তাঁর অস্তিত্বের জল। আগামী প্রজন্মের কাছে যদি উস্তাদের স্মৃতির সেই আলো না থাকে, তাহলে বেনারসের বহু জায়গাকেই ফাঁকা, নিঃসঙ্গ এবং অন্ধকার বলে মনে হবে।
তবুও আশা রাখা যায়— যতদিন সানাই বাজবে এবং নিজেকে এই দেশের মানুষের সুখ দুঃখের সঙ্গে যুক্ত করবে, ততদিন হয়তো উস্তাদ হারিয়ে গিয়েও বেঁচে থাকবেন।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত