(Mani Sankar Mukherjee)
তারাশঙ্কর, অন্নদাশঙ্কর এবং মণিশঙ্কর— বাংলা সাহিত্যের এই সুবিখ্যাত ত্রয়ীর মধ্যে সদ্যপ্রয়াত শংকরকে (১৯৩৩-২০২৬) নিয়ে বিদগ্ধ মহলে আলোচনা কমই হয়েছে। গদ্য রচনার উৎকর্ষে এবং শৈলীতে শংকরকে সুনীল এবং শীর্ষেন্দুর সমগোত্রীয় বলা যায়। বিষয়বস্তুর বিচারে শংকরের সাহিত্য এক নতুন ধারার প্রবর্তক— তাই বাংলার মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত পাঠক সমাজে দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শংকরের মায়াজাল বিস্তৃত।
কী কারণে তারকাখচিত রবীন্দ্রোত্তর সাহিত্যে শংকরের প্রতি বাঙালির এই অফুরান ভালবাসা? তাঁর লেখাতে পুনঃপৌণিকতার দোষ আছে, তাঁর সাহিত্য স্মৃতিনির্ভর, ঘটনাবহুল, সেখানে কল্পনার বিকাশ কম এই ধরনের সমালোচনা হয়েছে। তবু কেন বাঙালি মানসে শংকরের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী?
আমার সঙ্গে শংকরবাবুর ব্যক্তিগত পরিচয় অল্প ক’বছরের। তবু, তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যা যা দিক দেখেছি, সাহিত্যে সেই গুণগুলিই যেন প্রকাশিত, বিকশিত হয়ে উঠেছে। এই নিবন্ধে তারই কিছু ঝলক থাকল পাঠকদের জন্য।
ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্দ্ধে শিবপুর বিই কলেজে পড়াকালীন শংকর ছিলেন সবার নিত্যসঙ্গী। নতুন নতুন বই বেরোচ্ছে, নতুন সিনেমাও। তারপর কেটে গেছে অর্ধ শতাব্দী, শংকরের সৃষ্টিও নতুন পথে বয়ে চলেছে। অবসর গ্রহণের দীর্ঘ অবকাশে, কয়েক বছর আগে, ইচ্ছে হল মানুষটিকে জানবার।
শিবরামের কথায়, গরুর চেয়ে গরুর দুধ ভাল অর্থাৎ সাহিত্যিকের চেয়ে তাঁর সাহিত্য শ্রেয়। তবুও যোগাযোগ করলাম, এবং বুঝলাম শিবরামের কথা সর্বৈব সত্য নয়।

২০১৯ সালের প্রথমদিকে, কোনও এক বিকেলে চারটে নাগাদ চৌরঙ্গির সিইএসসি অফিসে দেখা করার কথা ছিল। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে, পৌঁছুতে কিছু দেরি হল। গিয়ে শুনলাম, উনি আমার জন্য অপেক্ষা করে একটি জরুরি মিটিং-এ চলে গিয়েছেন। সামান্য অনুতাপ হল। তবে বুঝলাম সময় নিষ্ঠা কাকে বলে।
আমার ধারণা, শংকরের জীবনে শৃঙ্খলা এবং সময়নিষ্ঠা এসেছে ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছ থেকে। এই সাহেবের কাছে শংকরের কৃতজ্ঞতা ছিল অপরিসীম। সারা জীবন তাঁর গুণ-কীর্তির প্রশংসা করে গিয়েছেন। এই ভদ্রলোকই শংকরের সুপ্ত প্রতিভার প্রথম আবিষ্কারক।
বাঙালি এবং ইংরেজ চরিত্রের বিশিষ্ট গুণগুলোর সমাবেশ শংকরের চরিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে এবং তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে এক অনন্যতা দিয়েছে, এই বিষয়ে সন্দেহ নেই। কর্পোরেট এবং ব্যবসায়িক জগতের কর্মব্যস্ততার মধ্যে থেকেও যে তিনি এত যুগ ধরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন, তার সূত্রও এর মধ্যেই পাওয়া যাবে।
শংকর তখন কলকাতার শেরীফ। আমাকে একটি দুষ্প্রাপ্য বই এর উল্লেখ করে লিখলেন, আমি তার সন্ধান দিতে পারি কি না। খোঁজ করে জানলাম বইটির নাম ‘The Sheriffs of Fort William from 1775 to 1926’— ১৯২৬ সালে প্রকাশিত বইটির লেখক Charles Moore। বইটির text, ইন্টারনেট থেকে উদ্ধার করে পাঠাই— পেয়ে খুশি হয়েছিলেন।
শংকরের সাহিত্যের যা কিছু বৈশিষ্ট্য, তার মূলে ছিল রচয়িতার অতলান্ত জীবন প্রেম, মানুষকে বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা এবং এক প্রগাঢ় মমতাবোধের সঙ্গে মানব চরিত্রের নানা দিককে উন্মোচন করা। এর সঙ্গে সত্যনিষ্ঠা এবং তথ্যনিষ্ঠা। কর্পোরেট দুনিয়ার কথা এভাবে এর আগে কেউ বলেননি। কলকাতা-হাওড়া-শিবপুরের কথা এমন সার্বিকভাবে খুব কম জনই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। গুণ এবং গুণীকে মর্যাদা দেওয়া, এক অগাধ ঔৎসুক্য এবং সত্যকে সহজভাবে নেওয়ার মানসিকতা শংকরের ঘটনাবহুল রচনাগুলিকে উৎকৃষ্ট সাহিত্যের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। বাংলার সাধারণ পাঠক-পাঠিকা এবং সত্যজিৎ রায়ের মতো প্রতিভা সেই মূল্যায়নে কখনও ভুল করেননি। তেমন কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করি।
শংকর তখন কলকাতার শেরীফ। আমাকে একটি দুষ্প্রাপ্য বই এর উল্লেখ করে লিখলেন, আমি তার সন্ধান দিতে পারি কি না। খোঁজ করে জানলাম বইটির নাম ‘The Sheriffs of Fort William from 1775 to 1926’, ১৯২৬ সালে প্রকাশিত বইটির লেখক Charles Moore। বইটির text ইন্টারনেট থেকে উদ্ধার করে পাঠাই— পেয়ে খুশি হয়েছিলেন।
একবার বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত সম্বন্ধে আমার একটি এক পাতাজোড়া প্রবন্ধ দৈনিক স্টেটসম্যানে প্রকাশিত হয় (দুটি পত্র, দুটি চরিত্র: প্রসঙ্গ সুরেন্দ্রনাথ ও কাত্যায়নীদাস; ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৮)। আমার পিতৃদেব কাত্যায়নীদাস ভট্টাচার্য্য ছিলেন সুরেন্দ্রনাথের প্রিয় ছাত্র, পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের অধ্যাপক। সুরেন্দ্রনাথের প্রধান কীর্তি ‘A History of Indian Philosophy (vol.1), Cambridge University Press’-এর শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ইংরেজিতে আরেকটি ছোট লেখা The Telegraph পত্রিকায় লিখেছিলাম।
লেখা দু’টি পড়ে শংকর খুশি হয়েছিলেন, এবং আরেকটি অভিনব তথ্য দিয়েছিলেন। জানিয়েছিলেন, এই বিখ্যাত অধ্যাপকের সঙ্গে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকারের কথা। Bombay Talkies-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং কর্ণধার হিমাংশু রাই ছিলেন সুরেন্দ্রনাথের শ্যালক। (তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় রাজি না হওয়ায়) শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এই কোম্পানির অনেক চলচ্চিত্রের কাহিনি এবং চিত্রনাট্যকার ছিলেন। এ ব্যাপারে অধ্যাপক দাশগুপ্তের হাত ছিল। কিন্তু এই দুর্লভ সাক্ষাৎকারটি কোথাও খুঁজে পাইনি।
প্রখ্যাত আইএএস অফিসার বি এন যুগন্ধরের মৃত্যুর পর আমার একটি লেখা পড়ে, শংকর মন্তব্য করেছিলেন, ‘Why did we not know this when he was alive? India is a great place for obituaries but not for the living. Currently he is better known as Satya Nadella’s father.’
জ্যোতির্ময় দত্তের আত্মজীবনীমূলক বই ‘আমার নাইবা হল পারে যাওয়া’ বইটিতে শংকরের সপ্রশংস উল্লেখ আছে। জ্যোতির্ময় লিখছেন, ‘বিখ্যাত লেখক শংকরও এসে আমাদের কাছে উঠেছিলেন। শংকর খুব সহজ সরলভাবে আমেরিকানদের আত্মতৃপ্তির বেলুন ফুটো করে দিয়েছিলেন স্টেট ডিপার্টমেন্ট আয়োজিত এক ডিনারে।’
‘প্রশ্নোত্তর বক্তৃতার সময় তাঁকে একজন শুধোয় “আচ্ছা, আপনাদের এত খাদ্যাভাব, প্রোটিনের এত অনটন, আপনারা গরু খান না কেন? গরুর তো অভাব নেই আপনাদের দেশে!” শংকর উত্তর দিলেন “বারবার এ প্রশ্নটা কেন করেন বলুন তো আপনারা? আমাদের দেশে তো বানরেরও অভাব নেই। আমেরিকানরা বানর খায় না কেন সে প্রশ্ন তো কেউ করে না। আপনাদের যা রেওয়াজ সেটাই সর্বত্র চল হবে এ কেমন কথা! আমেরিকায় তো প্রচুর কুকুর দেখি, আমি তো কই প্রশ্ন করিনি আপনারা কুকুর খান না কেন?” আমেরিকানদের কাছে কুকুর ‘হোলি ডগ’। কুকুরকে নিয়ে তাদের এত আবেগ যে সবাই শিউরে উঠেছিল।’ শংকর এই অংশটি দেখতে চেয়েছিলেন, এবং পেয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘I have immensely enjoyed Jyotirmoy’s story’।

প্রখ্যাত আইএএস অফিসার বি এন যুগন্ধরের মৃত্যুর পর আমার একটি লেখা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘Why did we not know this when he was alive? India is a great place for obituaries but not for the living. Currently he is better known as Satya Nadella’s father.’
সাধু মহাপুরুষদের কথা শংকরের লেখায় বারবার এসেছে। বিশেষত শ্রীরামকৃষ্ণ এবং বিবেকানন্দ সম্পর্কে। সম্পূর্ণভাবে তথ্যনিষ্ঠ হয়েও যে শ্রদ্ধানত হওয়া সম্ভব, শংকরের লেখা তার প্রমাণ। পরে সাক্ষাতেও, আমি এই প্রবণতা লক্ষ করেছি। পরবর্তীকালে যাঁরা বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন— মানুষ হিসেবে তাঁদেরও যে অনেক সাধারণ ব্যাপার ছিল, এটা ভক্তরা মানতে চান না। অরবিন্দ কিংবা বিবেকানন্দর চেহারা অল্প বয়সে কেমন ছিল, তার সত্যনিষ্ঠ বিবরণেও অনেকে অসন্তুষ্ট হতেন।
Times of India-তে প্রকাশিত (জুলাই, ২০১৯) আমার এবং আমার কন্যার একটি ছোট লেখা পড়ে, শংকর উত্তর দিলেন, ‘The Dadaji 5article is very moving don’t give him up. Let the world know why we are so reluctant to apply spiritual thoughts in running our corporations and our Governments.’
যাই হোক, অনেক আলোচনার পর আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, উনি প্রখ্যাত ঐতিহাসিক-অধ্যাপক সুমিত সরকারের শ্রীম লিখিত ‘কথামৃত’ গ্রন্থটি সম্পর্কে বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Kaliyuga, Chakri, and Bhakti: Ramakrishna and His Times, (Economic and Political Weekly, July 18, 1992) এবং পরে বাংলায় অনুবাদিত ‘কলিযুগ চাকরি ভক্তিঃ রামকৃষ্ণ ও তাঁর সময়’ পুস্তিকাখানি পড়েছেন কি না। খুব আগ্রহ দেখালেন, এবং হাতে লিখে সমস্ত রেফারেন্স নিলেন, পড়বেন বলে।
আমার জীবনে এক মহাপুরুষের (শ্রীযুক্ত অমিয় রায়চৌধুরী, আধ্যাত্মিক জগতে যিনি দাদাজি নামে বরেণ্য) সান্নিধ্যলাভ হয়েছিল। দাদাজি সংসার ধর্ম পালন করে গিয়েছেন, কোনও আশ্রম করেননি, কাউকে ঋত্বিক করে যাননি। বিশেষত ‘মানুষ গুরু হতে পারে না, নামই গুরু’ এই মতবাদের সাক্ষাৎ নিদর্শন ছিলেন। এই জন্য তাঁর প্রচার সাধারণভাবে নেই। দেশ বিদেশের বরেণ্য সব ব্যক্তিত্ব দাদাজির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বহু বই আছে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং দাদাজির দর্শনের প্রসঙ্গে।
The Times of India-তে প্রকাশিত (জুলাই, ২০১৯) আমার এবং আমার কন্যার একটি ছোট লেখা পড়ে শংকর উত্তর দিলেন, ‘The Dadaji 5 article is very moving don’t give him up. Let the world know why we are so reluctant to apply spiritual thoughts in running our corporations and our Governments.’
এইরকম খোলা মন, উদার স্বভাবের সদাশিব মানুষ ছিলেন বলেই শংকর বঙ্গ হৃদয়ের এক মণি হতে পেরেছিলেন। অসম্ভব কর্মব্যস্ততার মধ্যে থাকতেন, ‘When I am free I am not relaxed, and when I am relaxed I am not free’ লিখেছিলেন একবার।
ঋত্বিক ঘটক শুরু করেছিলেন শংকরের ‘কত অজানারে’ উপন্যাসটির চিত্রায়ন । এর সম্বন্ধে কিছু আলোচনা হয়েছিল। ঋত্বিকের শতবর্ষ উদযাপনের সময় হয়তো প্রসঙ্গ উত্থাপন না করাই শ্রেয়।
এবার শংকরের সঙ্গে সাক্ষাতের কিছু কথা। বেলা দশটার পর শংকরের ফ্ল্যাটে পৌঁছোই। দক্ষিণ কলকাতার বন্ডেল রোডে। সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির মতোই জীবনযাপন করতেন, আড়ম্বরহীন প্লেইন লিভিং অ্যান্ড হাই থিংকিং। স্ত্রী বিগত, একাই থাকতেন।
আমাদের সেদিন আলোচনা শুরু হল সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে। তবে, এ ব্যাপারে এত লেখালেখি হয়েছে, আমার নতুন কিছু সংযোজন করার নেই। কিছুদিন আগেই বইমেলায় দেখা হয়েছিল যখন, তাঁর ‘সত্যজিৎ শতাব্দী— সমকালের স্মৃতি, বিস্মৃতি ও কিছু বিভ্রান্তি’-এর তৃতীয় সংস্করণ তখন দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সেই দিন অর্থাৎ ২০২২ সালের ৫ই মার্চ উনি সব কপি নিজে সাইন করে দিচ্ছিলেন। সত্যজিৎ স্মৃতিকথায় ভরপুর, সঙ্গে ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ বই দুটিও একত্রে গ্রথিত।

যাঁরা এই ছবি দুটো দেখেছেন, তাঁরা বুঝতে পারবেন সত্যজিৎ কেন কোন বিশেষ জায়গায় চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে মূল কাহিনি থেকে সরে এসেছেন। শংকর অফিস পালিয়ে প্রথম দিনের ম্যাটিনি শো’তে বীণা সিনেমায় ‘পথের পাঁচালী’ দেখতে গিয়েছিলেন। এও জানান, সরলমনা বিভূতিভূষণের খুব ইচ্ছে ছিল, তাঁর কোনও একটা বই চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হোক। ‘আমার বই সিনেমার অযোগ্য এই বেদনাময় ধারণা নিয়েই তাঁর অকাল মৃত্যু।’ বইখানি একটি সত্যজিৎ শংকর অমনিবাস বটে।
ঋত্বিক ঘটক শংকরের ‘কত অজানারে’ উপন্যাসটির চিত্রায়ন শুরু করেছিলেন। এর সম্বন্ধে কিছু আলোচনা হয়েছিল।ঋত্বিকের শতবর্ষ উদযাপনের সময় হয়তো প্রসঙ্গ উত্থাপন না করাই শ্রেয়।
একবার শংকর যখন রেলওয়ের অতি সামান্য কর্মচারী, হঠাৎ তখন ফোন আসে স্বয়ং বড় কর্তা জগজিৎ সিংয়ের। উনি ফোন পেয়েছেন বিধান রায়ের কাছ থেকে এই মর্মে যে, একজন বিশিষ্ট ভদ্রমহিলার সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত বাঙালি রেল কর্মীকে পাঠাতে হবে।
শংকরের নানা স্মৃতিমূলক লেখায় হাওড়া এবং শিবপুরের কথা বারবার এসেছে। কিন্তু এই জেলার সবচেয়ে গর্বের প্রতিষ্ঠান বিই কলেজ নিয়ে বিশেষ কিছু লেখেননি। ঐতিহ্যবাহী এই কলেজের (বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, শিবপুর) সব খবর উনি রাখতেন, বহু বিশিষ্ট প্রাক্তনীর সঙ্গে ওঁর হৃদ্যতা ছিল। এই ব্যাপারে উনি যা বলতেন, তার অর্থ— শিবপুরের সঙ্গে বি.ই. কলেজের বিশেষ আত্মিক যোগ ছিল না। কলেজ তার নিজস্ব স্বকীয়তার ভাস্বর— শিবপুরে অবস্থিত, এই মাত্র।
দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের পরিচিতা শ্রীমতি বেলা সেনের সম্বন্ধে, যাঁর প্রচেষ্টায় ‘পথের পাঁচালী’র জন্য সরকারের সাহায্য এবং অনুদান আসে। সে কথা সবাই জানেন। একবার শংকর যখন রেলওয়ের অতি সামান্য কর্মচারী, হঠাৎ তখন ফোন আসে স্বয়ং বড় কর্তা জগজিৎ সিংয়ের। উনি ফোন পেয়েছেন বিধান রায়ের কাছ থেকে এই মর্মে যে, একজন বিশিষ্ট ভদ্রমহিলার সঙ্গে একজন বিশ্বস্ত বাঙালি রেল কর্মীকে পাঠাতে হবে। যিনি একসঙ্গে ট্রেনে চড়ে লখনউ স্টেশনে পৌঁছে, ভদ্রমহিলাকে প্রথম শ্রেণির ওয়েটিং রুমে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রামের পর সেখান থেকে কাঠগোদামের ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাস কুপে বসিয়ে দিতে পারবেন।
এই দায়িত্ব তরুণ শংকরের উপর ন্যস্ত হয়েছিল। সেটি তিনি সুন্দরভাবে পালন করেছিলেন। শ্রীমতি সেন থাকতেন রানিক্ষেতে, পরবর্তীকালে শংকরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় দৃঢ় হয়। ভদ্রমহিলার প্রতি শংকরের শ্রদ্ধা ছিল অকৃত্রিম।
এইরকম সজীব এবং চির-সবুজ ছিল শংকরের মন। বিস্তৃতহৃদয় শংকরের অসম্ভব জনপ্রিয়তা তাঁর সাহিত্যের সুষ্ঠু মূল্যায়নের বাধা হয়ে উঠেছে, কয়েক দশক আগে শরৎচন্দ্রের মতোই প্রায়। নতুন প্রজন্ম শংকরকে নতুন করে পড়বে, নতুন করে আবিষ্কার করবে, নতুন কালের পরিপ্রেক্ষিতে। সন্দেহ নেই, তাঁর অনেক সৃষ্টিই কালোত্তীর্ণ।
নিবন্ধটির শিরোনাম মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভূমির প্রতি’ কবিতা থেকে গৃহীত
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত