(LGBTQ Pride Day)
জীসা সেদিন খুবই ব্যস্ত ছিল আগামী সপ্তাহে রেনবো মার্চের প্রস্তুতিতে। তার মধ্যেই সময় বের করে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, বা বলা চলে আমরা মুম্বই থেকে আহমেদাবাদ গিয়েছিলাম তার সঙ্গে দেখা করতে।
জাতীয় স্তরে টেলিভিশনে কাজ করার একটা সুবিধে হল, উত্তর ও পশ্চিম ভারতের নানা প্রান্তে কাজের সূত্রে ভ্রমণ। পেশাগতভাবে আমার কাজ চ্যানেলের তরফ থেকে সিরিয়ালের গল্প পরিদর্শন করা— একবার ঠিক করা হল LGBTQAI++ মানুষদের গল্প নিয়ে এক ধারাবাহিক হবে। সে গল্পের প্রেক্ষাপট গুজরাট— দিদি আর ভাইয়ের সংসার দ্বারকার কাছে এক অজ পাড়াগাঁয়ে। দিদি একদিন জানতে পারল তার ভাই রূপান্তরকামী। শরীর পুরুষের হলেও মনে সে নারী। দিদি এসব কিছুই বোঝে না, কিন্তু ভাইয়ের কষ্ট বুঝতে পারে। প্রাণপাত করে দিদি চেষ্টা করে ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণের। সমাজ সংসারের পরোয়া না করে এক অজানা পথে ভাইয়ের হাত ধরে হাঁটতে থাকে দিদি।
সেই গল্প করার সময় ঠিক হল— নিজের চোখে রূপান্তরকমী মানুষের জীবন দেখব আমরা— তাদের মুখে শুনব তাদের গল্প।
গল্পের পটভূমি গুজরাট বলেই আহমেদাবাদ শহরে আসা। উদ্দেশ্য অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনা।

জীসার সঙ্গেই ছিল আমাদের প্রথম ইন্টারভিউ— জীসা রূপান্তরের প্রসেসের মধ্যে আছে— প্রায় চারমাস। ঝকঝকে বুদ্ধিমতী মেয়ে পেশায় চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট— বিদেশে চলছে তার চিকিৎসা। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাস তার একদিনে আসেনি। বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই সে বুঝেছিল, আর পাঁচটা ছেলেদের মতো তার ক্রিকেট খেলতে ভাল লাগে না, ভাল লাগে মাধুরী দীক্ষিতের মতো ‘ধক ধক করনে লাগা’ গানের সঙ্গে নাচতে।
কিন্তু এর পরিনতি কী হতে পারে, ভেবে ভয়ে শিউরে উঠত জীসা। ‘মনে হতো শেষে কি মেয়ে সেজে ট্রাফিক সিগন্যালে ভিক্ষা করা আমার পরিনতি হবে?’ জীসা তাই তার মনের মধ্যের মেয়েটিকে প্রাণপণে মেরে ফেলতে চাইত। জিমে গিয়ে ছেলেদের মতো মাসল বানানোর চেষ্টা করে, একটি মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেরও চেষ্টা করে। বাড়িতে খুবই চাপের পরিস্থিতি ছিল। ভাই ছোট, বাবা ক্যানসারে মারা গেছেন। তাই লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোয় মন দেয় সে।
জের পরিচয়কে অস্বীকার না করে বাঁচার যে সাহস সে অর্জন করেছে, তা তাকে আশাবাদী করে রেখেছে। এখন কোনও বিয়েবাড়িতে গেলে সে খোলা মনে, নির্ভয়ে, মাধুরী দীক্ষিতের মতো নাচতে পারে। হয়তো এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এরই মধ্যে এক বহুজাতিক মোবাইল কোম্পানিতে কাজের সুযোগ হয়। সেখানে একদিন তার প্রোমোশন হয়, কিন্তু সেই দিন সে খুশি হতে পারেনি। এই মেকি পুরুষের জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল জীসা— মনে হচ্ছিল একটার পর একটা চাকরির উন্নতি তাকে নিজের আসল স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে— সেদিনই কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে সে। বাড়িতে মা আর ভাইকে জানায় তার মনের ইচ্ছের কথা। আর্থিক সক্ষমতা আর শিক্ষা তাকে রূপান্তরের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। তার সঙ্গে তার পারিবারিক কাউন্সেলিংও শুরু হয়েছিল।
নিজেকে এই নতুন করে পাওয়ার পর্বে জীসার জীবন থেকে খোয়া গেছে প্রেম। তার পুরুষসঙ্গী তাকে পুরুষ হিসেবেই পেতে চায়— নারী হিসেবে নয়। কিন্তু নিজের পরিচয়কে অস্বীকার না করে বাঁচার যে সাহস সে অর্জন করেছে, তা তাকে আশাবাদী করে রেখেছে। এখন কোনও বিয়েবাড়িতে গেলে সে খোলা মনে, নির্ভয়ে, মাধুরী দীক্ষিতের মতো নাচতে পারে। হয়তো এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি— নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা।

প্রেম হারানোর দুঃখ আমরা সেদিন প্রায় সবার মুখে শুনেছিলাম। জীসার পর আলাপ হয়েছিল মেহেরের সঙ্গে। মেহের মেয়ের শরীরে আটকে থাকা এক পুরুষ, প্রেম যাঁর জীবনে বারবার অপমান নিয়ে এসেছে। গুজরাটের এক অজ পাড়াগাঁয়ে সম্পন্ন পরিবারে জন্ম, দাদু গ্রামের সরপঞ্চ, মা অল্প বয়সে বিধবা হয়ে শশুরবাড়িতেই থাকতেন। ছেলেবেলা থেকেই মেহের বুঝে গেছিলেন, তিনি আর পাঁচটা মেয়ের মতো নন, কিন্তু তিনি কী, তা নিজেও জানতেন না।
এই সময় গ্রামে আসেন এক সমাজকর্মী দম্পতি— তাঁরা মেহের আর তাঁর মাকে বুঝতে সাহায্য করেন, মেহের শরীরে নারী হলেও মনে সে পুরুষ। মেহেরের অল্পশিক্ষিত মা তার আগে এমন কিছু কোনওদিন শোনেননি, কিন্তু এটা বুঝেছিলেন, তাঁর মেয়ের জীবনটা কঠিন হতে চলেছে, আর তাই তিনি ঠিক করেন মেয়ের হাত কখনও ছাড়বেন না। মা-মেয়ে আহমেদাবাদে চলে আসেন পরিবারের সঙ্গে কঠিন লড়াই করে। বয়স যখন আঠারো-উনিশ, মেহেরের মনে এক নারীর প্রতি প্রেমের বোধ জেগে ওঠে। সেই মেয়েটি মুম্বইয়ে পড়তে এসেছিল, মেহেরও তার সঙ্গে চলে আসেন মুম্বই। কিন্তু ততদিনে মেয়েটির জীবনে অন্য পুরুষ চলে এসেছে। মানসিকভাবে চূড়ান্ত ভেঙে পড়েন মেহের। তাঁর স্থান হয় মানসিক হাসপাতালে। কড়া ডোজের অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট খেয়ে তাঁর সারাক্ষণই ঘুম পেত।
বিশালের পুরোপুরি মেয়ে হয়ে ওঠা মেনে নিতে পারেনি সে। সম্পর্ক ভেঙে যায়। বিশাল ফিলিপিন্স গিয়ে নিজের সার্জারি করায়, আর পাশাপাশি অলটারনেটিভ মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে। সেই লেখাপড়ার জোরেই আজ সে এক কাউন্সেলরের কাজ করে
এমন পরিস্থিতিতে ডাক্তার ঠিক করেন, মেহেরকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হবে। শকের আগে তাঁর শরীরে অ্যানাস্থেসিয়া দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরিমাণ অপর্যাপ্ত ছিল। অসুখের ঘোরে মেহেরকে আচ্ছন্ন দেখে ডাক্তার ভাবেন অ্যানাস্থেসিয়া কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে যখন মেহেরকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়, প্রবল যন্ত্রণায় তিনি চিৎকার করে ওঠেন। প্রথম প্রেমের যন্ত্রণা ভুলে গেলেও, সেই শকের যন্ত্রণা আজও মেহেরকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়।
একটার পর একটা প্রেম ভাঙতে ভাঙতে মেহের যখন ক্লান্ত, তখন তাঁর জীবনে আসে এক নারী। তাঁরা ঠিক করেন, এক সঙ্গে থাকবেন। কিন্তু, সমাজে যাতে অসুবিধা না হয়, তাই মেয়েটি মেহেরকে বলে, মেয়েদের মতো পোশাক আর চালচলন রপ্ত করতে। মেহের অনিচ্ছাসত্ত্বেও গায়ে তোলেন সালোয়ার কামিজ, লম্বা করেন মাথার চুল।

তাতেও অবশ্য প্রেম টেকেনি। মেয়েটি অন্য এক পুরুষের জন্য মেহেরকে ছেড়ে চলে যায়।
সে সময় মেহেরের মনে হয়, পুরোপুরি পুরুষ হলে হয়তো জীবন অন্যরকম হবে। তাই ব্রেস্ট রিকনস্ট্রাকশন সার্জারি করে নিজের স্তন ছোট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সার্জারির পর স্তনবৃন্ত থেকে সমস্ত অনুভূতি চলে যায় তাঁর— অসাড় হয়ে যায় শরীরের এক মাত্র অঙ্গ, যা মেহরকে যৌনতায় উত্তজিত করত। এরপর মেহের আর কোনও সার্জারির দিকে এগোননি। নিজের শরীর-মন-একাকিত্ব সবটুকুকে মেনে নিয়েছেন। এখন মেহের তাঁর মতো খাঁচায় বন্দী মেয়েদের সাপোর্ট গ্রুপ চালান আহমেদাবাদে।
১৮ বছর বয়সে এক পুরুষ তাকে ধর্ষণ করে। বাড়িতে এই বিষয়ে কোনও সাহায্য পায়নি সোনাল। বিচার পেতে লোকাল থানায় গেলে পুলিশ তাকে জোর করে নগ্ন করে আবার ধর্ষণ করে— ভয় দেখায়, ৩৭৭ ধারায় তাকে জেলে ভরে দেওয়া হবে।
প্রেম হারানোর যন্ত্রণার পাশাপাশি সেদিন শরীর নিয়ে অসহায়ত্বের কথাও বারবার উঠে আসছিল বিভিন্ন রূপান্তরকামী মানুষের কথায়। যেমন, ক্যাটরিনার আগের নাম ছিল বিশাল। শরীরে মনে এখন সে পুরোপুরি নারী। কিন্তু এই নারীজীবন পেতে খোয়া গেছে তার পাঁচ বছরের ভালবাসা। সে যখন রূপান্তরকামী ছিল, সে সময় গুজরাট থেকে দূরে এক পুরুষের সঙ্গে ঘর বেঁধেছিল। তার সঙ্গী তাকে ছেলে হিসেবেই চাইত। বিশালের পুরোপুরি মেয়ে হয়ে ওঠা মেনে নিতে পারেনি সে। সম্পর্ক ভেঙে যায়। বিশাল ফিলিপিন্স গিয়ে নিজের সার্জারি করায়, আর পাশাপাশি অলটারনেটিভ মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে। সেই লেখাপড়ার জোরেই আজ সে আয়ুষ্মান ভারত স্কিমের অধীনে এক সংস্থায় কাউন্সেলরের কাজ করে। আজ সে একা, কিন্তু মুক্ত।

সবার জীবনে অবশ্য এই উত্তরণ ঘটে না। সোনাল যেমন পেশায় যৌনকর্মী। সমকামী বা উভকামী পুরুষ তার ক্লায়েন্ট। ইন্সটাগ্রামে তার গ্ল্যামারাস ছবি দেখে অনেকেই যোগাযোগ করেন। এই পেশায় সে প্রায় পাঁচ বছর আছে। কিন্তু তার আগে তার জীবনটা ছিল আলাদা। ১৮ বছর বয়সে এক পুরুষ তাকে ধর্ষণ করে। বাড়িতে এই বিষয়ে কোনও সাহায্য পায়নি সোনাল। বিচার পেতে লোকাল থানায় গেলে পুলিশ তাকে জোর করে নগ্ন করে আবার ধর্ষণ করে— ভয় দেখায়, ৩৭৭ ধারায় তাকে জেলে ভরে দেওয়া হবে।
সোনাল আইন নিয়ে অবহিত ছিল না তখনও। কিন্তু পোড় খেতে খেতে শিখে গেছে তার ক্ষমতা আর সীমাবদ্ধতা। সে জানে, মনে মনে সে মেয়ে হলেও, বাইরে মেয়েদের মতো নিখুঁত সাজলেও, আইন তার দিকে নয়। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস করার পর কোনও ছেলে মেয়েটির সঙ্গে থাকতে না চাইলে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী মেয়েটি ছেলেটির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে ছেলেটির জেল হতে পারে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৭৬ ধারা অনুযায়ী, একটি পুরুষ কোনও মহিলাকে ধর্ষণ করলে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হয়। কিন্তু এইরকম কোনও আইনের আওতাতেই কোনও রূপান্তরকামী নারী বিচার পান না। তাই তাদের অবস্থা সমাজে সবচেয়ে দুর্বল। আইন বা রাষ্ট্র. কেউই তাদের সুরক্ষা দিতে পারে না।

সোনাল নিজের জীবনের নানা ওঠাপড়ায় ভেঙে পড়েনি। সে স্বপ্ন দেখে, তার জমানো টাকায় একদিন সার্জারি করে সত্যি সত্যি পূর্ণাঙ্গ মেয়ে হয়ে উঠবে। সোনালের কথায়, ভারতে সরকারি হাসপাতালে এই সার্জারি করতে লাগে ২০ লাখ টাকা, আর থাইল্যান্ডে ৫০ লাখ টাকা। সোনাল থাইল্যান্ডেই যাবে। কারণ সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা অনেক উন্নত। যে দেহ সোনালের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা, এখন তাকেই হাতিয়ার করে সোনাল স্বপ্ন দেখে নতুন জন্মের।
রূপকথায় যে কোনও গল্পের শেষে নায়িকা ভাল ঘর ভাল বর সব পায়। কিন্তু এই সত্যি রূপকথার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অত্যাচার, বঞ্চনা আর প্রতারণার ইতিহাস।
সেদিন সবার মুখেই শুনেছিলাম, এঁদের শৌচালয় ব্যবহারে খুব সমস্যা। শরীর এঁদের জন্য যে লিঙ্গ ধার্য করেছে, তাঁদের মন তা মানতে রাজি নয়। তাই সমাজনির্দিষ্ট লিঙ্গের শৌচাগারে যেতে তাঁদের অস্বস্তি হয়, অত্যাচার, অপমানের আশঙ্কা হয়। তাই যখন অর্থ উপার্জন করতে বেরিয়ে খুবই কম জল খান এঁরা, তাতে শরীরে নানা সমস্যা বাসা বাঁধে। সেদিন আমরা তাদের জল খেতে দিয়ে বলেছিলাম নিশ্চিন্তে তাঁরা নিজের পছন্দ মতো শৌচাগার ব্যবহার করতে পারেন। ওই সামান্য সুবিধে পেয়ে ওঁদের মুখে যে তৃপ্তির হাসি দেখেছি, আজও তা মনে আছে।
সেদিন এঁদের গল্পে একটাই কঠিন সত্য ধরা পড়েছিল— এই রূপান্তরকামী মানুষদের একই সঙ্গে শরীর, মন, রাষ্ট্র ও পরিবার, সবার সঙ্গে লড়তে হয়। রূপকথায় যে কোনও গল্পের শেষে নায়িকা ভাল ঘর ভাল বর সব পায়। কিন্তু এই সত্যি রূপকথার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অত্যাচার, বঞ্চনা আর প্রতারণার ইতিহাস। জাদুকাঠি নয়, কঠিন সংগ্রামে ভর করেই তাঁরা দাবি জানিয়ে চলেন নিজস্ব অস্তিত্বের।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত