(Deben Bhattacharya)
বেনারস। সুরের শহর বেনারস। বেনারসের পথে পথে, মন্দিরে মন্দিরে, ঘাটে ঘাটে, কোঠা বাড়িতে বাড়িতে, মহল্লায় মহল্লায় সুরের সাধনা। সুরের মোলায়েম রেশ ছড়িয়ে থাকে পাথর পাতা গলির প্রতিটি বাঁকে বাঁকে, ঘাটের প্রতিটি ধাপে, প্রতিটি চাতালে, তালপাতার ছাতায় ছাতায়, গঙ্গার অলস স্রোতে ঘুরে বেড়ানো নৌকার দাঁড়ের ছন্দে। বৈদিক হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, হিন্দু, মুঘল নানা জাতিধর্ম তাদের নিজস্ব সংগীত নিয়ে এসেছে গঙ্গার পশ্চিমকূলের এই শহরে। কিন্তু সব সংগীতের প্রবাহ মিশে বেনারস তৈরি করেছে এক নিজস্ব প্রবাহ, ঘরানা। প্রশস্ত নদীর উচ্চ তীরভূমি জুড়ে বেদজ্ঞ পণ্ডিতদের বসবাস ও তাঁদের টোল এবং গুরুগৃহ। উষাকাল থেকে শুরু হয় বেদগান ও মন্ত্রোচ্চারণ। সে সুরের পবিত্রতা ছড়িয়ে পড়ে বেনারসের আকাশে।
৫৯ নং সোনারপুরা। কাঠের বড় দরজা। তার উপরে সিমেন্টের আর্চে সিমেন্ট দিয়েই খোদাই করে লেখা, ‘ভট্টাচার্য ভবন, ৫৯ নং সোনারপুরা’। দরজার পাশে টানা বারান্দা। বারান্দা থেকে তিন ধাপ সিঁড়ি নেমে গেছে পাথরের স্ল্যাব বসানো গলিতে। বারান্দার উপর কাঠের পাল্লা দেওয়া চেম্বার। বারান্দায় লোহার কালো চারটে থামের উপর ঝুল বারান্দা। বারান্দায় কেয়ারি করা লোহার রেলিং। রেলিংয়ের উপর টানা কাঠের হাতল।
আরও পড়ুন: সাধের দেশ থেকে কী পেলেন সুহাসিনী
কবিরাজ উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য কালো কোটটা চাপিয়ে নিলেন সাদা শার্টের উপর। ধুতির কাছা ঠিক করে নিলেন। শার্টের বুকপকেট থেকে চেন টেনে ঘড়িটা বার করে দেখলেন। দুপুর বারোটা বেজে গেছে। সকাল ন’টা থেকে বারোটা অবধি চেম্বার। বাপ-ঠাকুরদার আমলের কবিরাজিবিদ্যা বংশপরম্পরায় চলছে। টোল, সংস্কৃত পড়ানো, পুজোপাঠ আর এই কবিরাজি। কিন্তু দেবুর এইসবে মন নেই। বংশের ছোট ছেলে দেবেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। ছোট থেকেই ছটফটে। বারমুখো। ছোটবেলায় জেঠুর টোলে পড়াশোনা। তারপর কাশীনাথ ভট্টাচার্য ও রেসিডেন্ট সাহেব জোনাথন ডানকানের কলেজ ‘সংস্কৃত কলেজ’-এ কিছুদিন পড়াশোনা। কিন্তু স্কুলকলেজের গণ্ডি বাঁধতে পারেনি দেবেনকে।
বেনারসের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চিঠিপত্র থেকে শুরু করে নানা গোপন জিনিস গোপনে পৌঁছে দেওয়ার কাজকে মুক্তির পথ ভেবেছিল দেবেন। রাতের পর রাত বেনারসের কোঠা বাড়িতে বিখ্যাত ক্লাসিক্যাল মিউজিকের আসরে দেখা যেত তাঁকে। সেই সময় দেবেনের বন্ধুত্ব হয় কবি, স্বভাব-বাউল লিউস থমসনের সঙ্গে, সঙ্গে এক গুচ্ছ ব্রিটিশ শিল্পী।

থমসনের সঙ্গে সবসময় দেখা যাচ্ছে দেবেনকে বেনারসের অলিতে গলিতে। ১৯৪৭ সালের এক পড়ন্ত বিকেলে বেনারসের কেদারনাথ ঘাটের শেষ সিঁড়িতে বসে আছে দেবেন ও থমসন। গোধূলির ম্লান আলো ছড়িয়ে পড়েছে।
Where to go? — থমসন বয়ে যাওয়া গঙ্গার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে।
নীরবতা।
This is my future, my destiny. শুধু ডান হাত প্রসারিত করল দেবেন গঙ্গার দিকে— এই বয়ে যাওয়া। ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। ব্রিটিশরা চলে যাচ্ছে দেশ ছেড়ে। দেবেনের প্রিয় বোহেমিয়ান ব্রিটিশ বন্ধুরা চলে যাচ্ছে!
What is your future plan? — প্রশ্ন করার পর থমসন তাকাল। কপালে ঝাপটে পড়া তীক্ষ্ণ চোখ। স্থির। চোখে জল থেকে ছিটকে উঠা লাল আলোর আঁকিবুকিঁ। গঙ্গার জলের উপর গোধূলির আলপনা ভাঙছে গড়ছে। শান্ত উত্তর এল—
This is my future, my destiny. শুধু ডান হাত প্রসারিত করল দেবেন গঙ্গার দিকে— এই বয়ে যাওয়া। ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছে। ব্রিটিশরা চলে যাচ্ছে দেশ ছেড়ে। দেবেনের প্রিয় বোহেমিয়ান ব্রিটিশ বন্ধুরা চলে যাচ্ছে!

এই গঙ্গা। প্রবাহ। জীবন। চলা। ভেসে যাওয়া অজস্র সুর-তাল-ছন্দে। ভোরে ধ্যানমগ্নতা থেকে জেগে ওঠার পবিত্র সুর, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপল্যের তাল-লয়-ছন্দ। দুপুরে একাকিত্ব, বিষণ্ণতার ঝিরিঝিরি গান। বিকেলে নববধূর লাস্যে ঢলে পড়ে গঙ্গা সন্ধ্যার মখমল। তারপর সন্ধ্যারতির শব্দ নিয়ে রাত্রির ধ্যানে। এই ছড়িয়ে থাকা সুরময় শব্দ তাকে বহুবার ঘরছাড়া করেছে।
ছোটবেলায় মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি শুনতে শুনতে তার সারা শরীরে সেই ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ত। সারা শরীর জুড়ে বেজে উঠত অজস্র ধ্বনির কলতান। তাকে তাড়া করত। দেবেন ছুটত ছাদ থেকে ছাদ, ছাদের পর ছাদ, গলির পর গলি। ছুটতে ছুটতে বাঙালিটোলা, ঘাসি গলি, মদনপুরা, সিঁড়ির পর সিঁড়ি, ঘাটের পর ঘাট, নদী-সমুদ্র পার হ’য়ে স্বভাব-বাউল দেবেন বেনারসের নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে পাড়ি দিল অজানা পথে অজানা সুরের খোঁজে।
ভোর হচ্ছে। দূরে কাঠের উপর কাঠ বাজানোর স্টোকাটো শব্দ। সেইদিকে গাড়ি চলল। বেদুইনদের গ্রাম। ডঃ তেশিও, গাইড, এগিয়ে এল— এভাবে যেখানে সেখানে নেমে পড়বেন না, বিপদ হবে। দেবেনের মাথায় বেদুইনদের সুর-গান-বাজনা; পৃথিবী তখনও শোনেনি, শোনাতে হবে।
মরুভূমির ভিতর দিয়ে যাচ্ছে দেবেন, গাড়ি চালাচ্ছে কলিন গ্লেনি। চারপাশ অসম্ভব সাদা হয়ে আছে। জর্ডনে ঢোকার আগে বেদুইনদের সম্পর্কে সাবধান করেছিল অনেকে। গাড়ি থামাল কলিন। গাড়ি বলতে একটা ছোট ভ্যান, ভিতরে দুটো বাঙ্ক আছে শোবার। দেবেন এত উজ্জ্বল চাঁদের আলো দেখেনি। তাই একটু বেরিয়েছিল, মায়াবি আলোয়। আচমকা একটা বন্দুকের ছায়া তার সামনে। দেবেন হাঁটে, ছায়াও হাঁটে। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠেই স্টার্ট।
ভোর হচ্ছে। দূরে কাঠের উপর কাঠ বাজানোর স্টোকাটো শব্দ। সেইদিকে গাড়ি চলল। বেদুইনদের গ্রাম। ডঃ তেশিও, গাইড, এগিয়ে এল— এভাবে যেখানে সেখানে নেমে পড়বেন না, বিপদ হবে। দেবেনের মাথায় বেদুইনদের সুর-গান-বাজনা; পৃথিবী তখনও শোনেনি, শোনাতে হবে।

জীবন হাতে নিয়েই দেবেন ভট্টাচার্য বেরিয়েছিল লন্ডন থেকে স্থলপথে ভারতের উদ্দেশ্যে, ১৯৫৫ সালে। হ্যাঁ স্থলপথে, একদম ম্যাপ দেখে দেখে চলা। প্রাচ্যের সুর ও গানের সম্পদ শোনাবে পাশ্চাত্যের আত্মম্ভরী জাতটাকে। শোনাবে মাঠের গান, পথের সুর। হাতে ছিল ৩০ কেজি ওজনের Gaumont-Kalee টেপ রেকর্ডার, একটা ট্রান্সফরমার আর গাড়ির ব্যাটারি, কারণ সালটা ১৯৫৫, অন্ধকার তখন পুবের দেশে অহঙ্কার।
অজানা রাস্তা, অজানা সুর। আসলে যুগোস্লাভিয়া থেকে রেকর্ডিং শুরু হল। গান-প্রার্থনা-ধ্বনি-তাল, যা সুরময়, শব্দময় পথে শোনা যায়, তাই তার রের্কডিং-এর বিষয়। দেবেন নিজে বলেছে— “In 1955, I made first overland journey to retrace the Gypsy route in reverse, from Europe to India, through the countries of West Asia. It took me over six months.”
স্কুলছুট, স্বভাব-বাউল দেবেনের এই সুরসন্ধানী যাত্রা আক্ষরিকভাবে শুরু হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। তখন লন্ডনে। এদিক ওদিক নানারকম কাজ করার পর বিবিসি’র বাংলা বিভাগে চাকরি পেল। বিবিসি কর্তাকে চিঠি লিখে বসল— তোমরা দু’শো বছর একটা দেশে ছিলে কিন্ত সেখানকার সংগীত শুনলে না, শোনালেও না বিবিসি-তে।
প্যারিস থেকে যুগোস্লাভিয়া হ’য়ে গ্রিস, সেখান থেকে তুর্কি, সিরিয়া, জর্ডন, ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের ভিতর দিয়ে ভারতে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে বহু গ্রাম বহু জায়গা ছিল অগম্য। দুরূহ পথ, পাহাড়-নদী-গ্রাম-মরুভূমি, ঢাউস টেপ আর ব্যাটারি কাঁধে নিয়ে দেবেন সংগ্রহ ক’রে আনল প্রান্তিক মানুষের গান, মাটির সুর। ভার্জিন মিউজিক।
স্কুলছুট, স্বভাব-বাউল দেবেনের এই সুরসন্ধানী যাত্রা আক্ষরিকভাবে শুরু হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। তখন লন্ডনে। এদিক ওদিক নানারকম কাজ করার পর বিবিসি’র বাংলা বিভাগে চাকরি পেল। বিবিসি কর্তাকে চিঠি লিখে বসল— তোমরা দু’শো বছর একটা দেশে ছিলে কিন্ত সেখানকার সংগীত শুনলে না, শোনালেও না বিবিসি-তে। কর্তার উত্তর এল, শোনাও দেখি, কেমন তোমাদের গান। চ্যালেঞ্জ। ঝুঁকির অপর নাম তো জীবন। দেবেন বেরিয়ে পড়ল।
আরও পড়ুন: বিস্মৃত পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন
“As I set out my first recording journey to India toward the end of 1953, my one man mobile unit consisted of a 12 volt car battery without the car and a vibrator for power supply in the villages in addition to the tape recorder and other accessories.” একটা স্পুল টেপরেকর্ডারসহ লটবহর কম নয়। সারা ভারতবর্ষ চষে ফেলল। দেবেন বিশ্বাস করে, ধান কাটার গান সংগ্রহ করতে হলে মাঠেই যেতে হবে, বিয়েবাড়ি থেকে তুলে আনতে হবে বিয়ের গান, প্রার্থনার গান মন্দিরে। তাই তার এই কঠোর দুর্গম অভিযান।
মনে রাখতে হবে সালটা ১৯৫৩, প্রান্তিক মানুষের গান, লোকসংগীত, লোকসংস্কৃতি তুলে আনছে দেবেন। শাস্ত্রীয় সংগীতও রেকর্ড করেছে সেই পরিবেশে। বিশ্বকে শোনাতে হবে। এই সময় দেবেন রেকর্ড করেছিল পূর্ণদাস বাউল, তাঁর ভাই লক্ষ্মণদাস বাউল, আব্বাসউদ্দিনের গান। বিদেশে বাউল গানকে প্রথম পরিচিত করানোর প্রাণপুরুষ দেবেন ভট্টাচার্য। আজকের বাউল গানের অর্থনৈতিক উড়ান, এই প্রচার, তা ওই ব্যতিক্রমী মানুষটার জন্য।
বাপ-ঠাকুরদার টোল আর সংস্কৃত পুঁথি দেবেনকে আটকে রাখতে পারে না। সারেঙ্গি বাজিয়ে যে ভিখারি গান গায়, তার পাশে বসে দেবেন কাটিয়ে দেয় সারাদিন।
ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার বাড়ি থেকে পালিয়েছিল দেবেন। জন্ম বেনারসে ১২ই ডিসেম্বর ১৯২১ সালে। সংস্কৃত পণ্ডিত বাবা উপেন্দ্রচন্দ্র ভট্টাচার্যের হাতের বেত হাতে থেকে গেল, আর মা রাজলক্ষী দেবীর চোখের জল হল পাথর। বাপ-ঠাকুরদার টোল আর সংস্কৃত পুঁথি দেবেনকে আটকে রাখতে পারে না। সারেঙ্গি বাজিয়ে যে ভিখারি গান গায়, তার পাশে বসে দেবেন কাটিয়ে দেয় সারাদিন।
আবার খেয়াল, ঠুংরি, গজল শুনতে শুনতে রাত ভোর হয়ে গেছে তার কেনারামের আশ্রমে, বাগেশ্বরী মন্দিরে দশাশ্বমেধ ঘাটে। এভাবেই খুঁটের দড়ি খুলে ফেলল দেবেন। লিউইস থমসনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল। থমসন দেখাল এক নতুন জগত। সে তখন বেনারসেই থাকত। সাল ১৯৩৫-৩৬। সেই সময় থমসনের মাধ্যমে বন্ধুত্ব হয় রেমন্ড বার্ণিয়েরের (Raymond Burnier) সাথে। বার্ণিয়ের তখন ভারতীয় শিল্প ও স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করছে। বন্ধু হল অ্যালেইন দ্যনিলিয় (Alain Danie’lou)। অ্যালেইন ভারতীয় মিউজিক নিয়ে কাজ করছিল। দেবেনের সামনে তখন বিস্তৃত ভুবনডাঙার মাঠ।
আরও পড়ুন: বিস্মৃত বিপ্লবী কল্পনা দত্ত
১৯৪৭। দেশ স্বাধীন হল। মহল্লায় মহল্লায়, গলিতে গলিতে স্বাধীনতার উৎসব। ব্রিটিশরা ফিরে যাচ্ছে দেশে। দেবেন তখন কখনও ইনসিওরেন্সের কাজ করছে, কখনও আর্মির ক্লার্কের কাজও করছে। ব্রিটিশ রয়াল ইঞ্জিনিয়ার অ্যালান কলকিউহানের (Alan Colquhoun) সাথে সফল সাক্ষাৎ হয় দেবেনের। ১৯৪৯ সালে দেবেন অ্যালানের সহযোগিতায় পাড়ি দিল লন্ডন। ৫ই নভেম্বর, ১৯৪৯, দেবেনকে দেখা যাচ্ছে কাজের সন্ধানে লন্ডনের কাছে টিলবারি শহরে ঘুরে বেড়াতে। পেটে অসম্ভব খিদে, মাথায় সুরের নেশা। শোনাতে হবে অশ্রুত গান বিশ্বের মানুষকে।
১৯৫৬ সালে দেবেনকে তথা মাটির গানকে স্বীকৃতি দিল সাদা চামড়ার বিশারদরা। দেবেনের সংগ্রহ করা গান বেরোল Angel Records থেকে, LP Record No. OCLC 11702845; ISBN/ISSN: Ang35515। রেকর্ডের নাম— Music On The Desert Road – A Sound Travelogue by Deben Bhattacharya। রেকর্ডের কনটেন্টে লেখা আছে— ‘Selected pieces from collection of over forty hours of recording made during an overland journey to India contains folk music of Turkey, Syria, Jordon, Iraq, Iran, Afganistan, Pakistan and India’.
বেলুচিস্তানের এক গ্রামে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে লজঝরে গাড়ি গেল ভেঙে। গাড়ির একদম নিচের সব যন্ত্রপাতি গেল খুলে। ধূ ধূ চারপাশ। কোনও লোকজন নেই। এক টাঙ্গাওয়ালা এল। তাকে ধরা হল।
এক বাঙালির হাত ধরে তৈরি নতুন ভ্রমণবৃত্তান্ত— Sound Travelogue। স্বীকৃতি আনল কিছু অর্থ। কিন্তু অজস্র অযুত শব্দমালা, আজানা সু্র, বিভিন্ন দেশের ঘুমপাড়ানি গান, নানা ভিখারির গান, ইত্যাদি পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা যে বিপুল সম্পদের হদিস দেবেন পেয়েছে, তা সংগ্রহের জন্য আরও অর্থ দরকার। নানান কাজ করল এই সময়। লেখা, অনুবাদ, বিবিসিতে লোকসুর শোনানো, টেলিভিশনের প্রোগ্রাম এইসব। ফের ঘর ছাড়ল দেবেন।
বেলুচিস্তানের এক গ্রামে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে লজঝরে গাড়ি গেল ভেঙে। গাড়ির একদম নিচের সব যন্ত্রপাতি গেল খুলে। ধূ ধূ চারপাশ। কোনও লোকজন নেই। এক টাঙ্গাওয়ালা এল। তাকে ধরা হল। সে বলল, এক সপ্তাহ সময় লাগবে। এদিকে ভিসা শেষ হ’য়ে গেলে পাকিস্তানে ঢোকা যাবে না। এক সপ্তাহ থেকে গেল গ্রামের মোড়লের বাড়ি। আনন্দে রেকর্ডিং করতে লাগল নানা ধরনের গান, বাজনা।
দিন সাতেক পর গাড়ি নিয়ে মোড়ল বর্ডার পার করে পাকিস্তানে ঢুকিয়ে দিল। এ ঘটনা ১৯৬০ সালে, যখন দ্বিতীয়বার দেবেন শুরু করেছিল তার সংগীতসন্ধানী যাত্রা, sound travelogue। এবারে রওনা হয়েছিল প্যারিস থেকে। ইরান অবধি তার রাস্তা ছিল আগের মতো। ইরানের বাম মরুদ্যান শহর থেকে ডানদিকে কোয়েত্তা হয়ে পাকিস্তানে ঢুকল। তারপর তিব্বত, চিন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড হয়ে প্রায় সমস্ত মঙ্গোলিয়ান লোকসংগীত সংগ্রহ করল দেবেন।
এবারের যাত্রার আরেকটি বৈশিষ্ট্য— সঙ্গে একটি ভাল রোলিফেক্স ক্যামেরা। দেবেন বুঝেছিল, এই বিশাল সম্পদ পরিবেশনের সাথে সাথে ছবিও দরকার। তাদের জীবন তুলে আনা প্রয়োজন। তুলেছিল মুভি। দেবেন বলত— ‘I had thought of several years that you are presenting ethnic music from another land, with another social back-ground, the visual element is a very important factor in presenting it.’
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রিফিউজি ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরেও গান সংগ্রহ করেছে দেবেন। সঙ্গে ছিল ঝর্ণা বসু। বাংলা তাকে আসন পেতে দেয়নি। সে একটু খেদের সাথেই বলেছিল— ‘Forty three years I have timed in Europe. I am a European, then I am Indian.’
দেবেন স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়েছিল মোট বাইশটা। সুইডিশ সরকার অর্থ সাহায্য করে তাকে স্বীকৃতি দেয়। প্যারিস তার জন্য দরজা খুলে রাখে। এই প্যারিসেই পিএইচডি করতে গিয়েছিল কলকাতার মেয়ে ঝর্ণা। ঝর্ণা বোসের সাথে দেবেনের আলাপ ১৯৬৯ সালে। দেবেন তখন সুইডেন আর প্যরিস করছে। রেকর্ড বেরোচ্ছে, ফিল্মের কাজ, বিবিসিতে অনুষ্ঠান, সুইডিশ টেলিভিশন, ফরাসি টেলিভিশন বিশ্বের সংগীতপ্রিয় মানুষ তাকে বরণ করে নিচ্ছে। অনিকেত দেবেন ১৯৭০ সালে ঝর্ণার সাথে ঘর বাঁধল। প্যারিসেই সংসার। দুই মেয়ে হল— শ্রীময়ী আর ঈশ্বরী।
বারবার বাংলায় এসেছে, বাংলার লোকগানকে বিশ্বের কাছে নিয়ে গেছে। এমনকি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের রিফিউজি ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরেও গান সংগ্রহ করেছে দেবেন। সঙ্গে ছিল ঝর্ণা বসু। বাংলা তাকে আসন পেতে দেয়নি। সে একটু খেদের সাথেই বলেছিল— ‘Forty three years I have timed in Europe. I am a European, then I am Indian.’
আরও পড়ুন: মাস্টারমশাই জ্যোতিষচন্দ্র, এক বিস্মৃত জ্যোতিষ্ক
দেবেন ভট্টাচার্যই বাংলার প্রথম Ethnomusicologist। বিস্ময় উদ্রেককারী তাঁর সংগ্রহ। বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা শতাধিক রেকর্ডের (Long Playing Disc) তালিকার দিকে তাকালে বোঝা যায় তাঁর বৈচিত্র্যের ব্যাপ্তি। ২৩শে জুলাই ২০০১। দেবেন ভট্টাচার্য মারা গেলেন প্যারিসে। প্যারিস সরকার এগিয়ে এল। তাঁর সমস্ত সংগ্রহ— প্রায় ৮০০ ঘণ্টা রেকর্ডিং, ফিল্ম, অজস্র ছবি প্যারিসের জাতীয় সংগ্রহশালায় (Bib lo de que Nationale de France) আর্কাইভে স্থান পেল। ওখানে লেখা আছে— “This collection (of Deben Bhattacharya) is the largest patrimony of 20th century memories”। না ভারতবর্ষে নয়, বাংলাতেও নয়।
মঞ্চে বাউল গান গাইছেন শিল্পী। ঝাঁকড়া চুল দুলছে। জমকাল আলো পিছলে পিছলে যাচ্ছে উদ্বাহু দর্শকের উপর। পেছনে ঝমঝম ড্রাম-কিবোর্ড-গিটার বাজছে। মঞ্চের পিছনের অন্ধকার থেকে একটি তর্জনী বড় হতে হতে আকাশ সমান হয়ে উঠল। দেবেনের সৌম্য হাসি সেই তর্জনীর পিছনে ক্রমশ স্পষ্ট— মাঠ ছাড়া মাঠের গান হয় না, নদী ছাড়া নদীর গান নকল, পথ ছাড়া পথের সুর আর কোথায় খুঁজে ফেরো!
দেবেন ভট্টাচার্যই বাংলার প্রথম Ethnomusicologist। বিস্ময় উদ্রেককারী তাঁর সংগ্রহ। বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা শতাধিক রেকর্ডের (Long Playing Disc) তালিকার দিকে তাকালে বোঝা যায় তাঁর বৈচিত্র্যের ব্যাপ্তি।
দেবেন ভট্টাচার্যের উল্লেখযোগ্য রেকর্ডিং
Calming world of lullabies
Bedouins of Middle East
Sounds of West Sahara – Mauritania
River Songs of Bangladesh
The Mirror of the Sky-The Songs of Bauls of Bengal (এই রেকর্ডিং-এর ১ নম্বরে পূর্ণদাস ও লক্ষণদাসের গান আর ৪ নম্বর রেকর্ডিংয়ে আব্বাসউদ্দীনের গান আছে)
Temple Bells & Drums of Bengali Kali Temples
Music & Chants of Great Religions
Folk music From Hungary
Music of Bali
Inside Afganistan
তাঁর তৈরি ছবির (Films) কিছু নাম
Waves of Joy: Anandalahari
The Chanting Lama
Village Life & Music of Hungary
Silk & Strings – Taiwan
Land Of Smiles- Thailand
Painted Ballads of India
Bali – Isles of Temple
Ecstatic Circle: Turkey
তাঁর লেখা:
The Mirror of the Sky, 1969 (for UNESCO)
The Gypsies
Songs of Krishna
Songs OF The Qawals of India: Islamic Lyrics Of Love Song
Songs of the Bards of Bengal
Villages d’Israel
তথ্যসূত্র – Parish to Calcutta Men and Music on The Desert Road: Deben Bhattacharya, Produced and Edited by Robert Millis, ঝর্ণা বসুর সঙ্গে একাধিকবার আলাপচারিতা, ফরাসি সংগীতজ্ঞ কেভিন ডালি ও বাংলাদেশের নাট্যব্যক্তিত্ব আলি জাকেরের সাক্ষাৎকার।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত