(Ong Bong Chong 6)
হুতোম লিখেছিলেন, ‘হুজুকে কলকাতা।’ লিখেছিলেন, ‘হেতা নিত্য নতুন নতুন হুজুক, সকলগুলিই সৃষ্টিছাড়া আজগুব।’ গল্প করে, তাস ও বড়ে টিপে বাতকর্ম্ম করতে করতে নিষ্কর্মা লোকেরা আজগুব হুজুক তোলে। ইংরেজদের হাত-যশে গড়ে ওঠা কলিকাতা কমলালয়ে সেই হুজুক সবই কর্ণ ও চক্ষুর পক্ষে পরিতৃপ্তি প্রদায়ী, নাটুকে। কিছু না পেলে ‘জ্যাটাকে গঙ্গাযাত্রা’ দিতে হয়। ইংরেজিতে যাকে বলে spectacle, তা তৈরি করাই উনিশ শতকের কলকাতার বাঙালিদের কাজ। বাবু বাঙালিরা একরকম করে করতেন। আবার, বাবুশ্রেণির বাইরে যাঁরা, তাঁরা আরেকভাবে করতেন। বাবুদের পুজো আর জেলে-পাড়ার সঙ দুই-ই সেকালের কলকাতার দৃশ্যবস্তু, অংশগ্রহণকারী আর উপভোগকারী দুই পক্ষই জানেন দেখানোর জিনিস আর দেখার জিনিস। যা দেখনে কা চিজ্, তার সঙ্গে মিলে-মিশে একাকার হয়ে যাওয়া অর্থহীন। মনের বাইরে দেখো, মনের ভেতরে দেখো না। মনের ভেতরে দেখলেও স্বপ্নিল নেশার মতো দেখো তদ্গত হয়ে যেও না।
আরও পড়ুন: অংবংচং ১, ২, ৩, ৪, ৫
উনিশ শতকে হুজুগ শব্দটি হুতোমের কলমে বাংলা শব্দ ভাণ্ডারে বিশেষ মর্যাদা পেল। উনিশ শতকে প্রথমে অপেশাদার বা বাবু থিয়েটারের পরে পেশাদার থিয়েটারের পত্তন হল। থিয়েটারকে ঘিরে কতরকম হুজুগ। নবীন বসুর বাড়িতে বিদ্যাসুন্দরের অভিনয় হবে। মঞ্চ যেন গোটা বাড়ি, সত্যি সুড়ঙ্গ কাটা হল বাগানে, সুড়ঙ্গ মুখ গিয়ে উঠছে ঘরে। কে বলে এসব হুজুগ নয়! এই অলীক কুনাট্যের বাইরে যখন ক্রমে পেশাদার মঞ্চকে ঘিরে বাংলা থিয়েটার বিস্তার লাভ করল, তখনও কি হুজুগের শেষ আছে! দর্শক টানার জন্য অমরেন্দ্রনাথ দত্ত মঞ্চে কতরকম চমকদার মায়া তৈরি করলেন। সেই সব দেখনদারিত্বের টানে কলকাতার হুজুগে দর্শক হাজির। ক্ষণিক আমোদ মজা লোটা। দেখার চিজ দেখে পয়সা উসুল।

সাহেবি আমলের এইসব কলকাতা-কেন্দ্রিক নাটকীয়তা ক্রমে সমালোচিত ও পরিশীলিত হবে। যেমন ব্রাহ্মধর্মনিষ্ঠরা হিন্দু ধর্মের উৎসবের হুজুকের বিরোধিতা করবেন। দেবেন্দ্রনাথরা দুর্গাপুজোর খরচেপনায় বিরক্ত। নাটকের হুজুক নিয়েও দেবেন্দ্রনাথের চিন্তার অবধি নেই। ঠাকুরবাড়ির নানা শাখায় যে শৌখিন থিয়েটারের ব্যবস্থা তার দিকে দেবেন্দ্রনাথ সন্দেহের চোখে তাকান, সাবধান করে দেন। হুজুকেপনা আর শিথিল চারিত্রিকতার ভয় তাঁর মনে।
রবীন্দ্রনাথ ক্রমে নাটকের উচ্চাভিলাষী সাধারণ রঙ্গমঞ্চে ম্যাজিক সৃষ্টিকারী অভিনয় কৌশল থেকে শতহস্ত দূরে চলে যান। তিনি দুই রঙ্গমঞ্চের কথা ভাবেন, একটি বহির্মঞ্চ অন্যটি অন্তর্মঞ্চ। বহির্মঞ্চ হল রঙ্গমঞ্চ। সেখানে লোক টানার জন্য নানা রং-ঢং। সিন আঁকানো হচ্ছে। ট্র্যাপ ডোর দিয়ে বঙ্কিমের উপন্যাসের রোহিণী মঞ্চে ঝাঁপ দিচ্ছেন। অভিনেতা ঘোড়ায় চেপে মঞ্চে ঢুকে পড়ছেন। বিদেশে আবার বাস্তবধর্মী দৃশ্যাবলি মঞ্চে তৈরি করার জন্য হাজার হাজার টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের মনে হচ্ছে বিদেশে মঞ্চমায়া সৃষ্টি করার জন্য যে টাকা ব্যয় করা হয় তার কিছুটা উপনিবেশে, ভারতবর্ষে, ব্যয় করলে কত দুর্ভিক্ষের সুরাহা হত।

এই বহির্মঞ্চ বা রঙ্গমঞ্চের দৃশ্যময় হুজুকে ব্যয়-বাহুল্য থেকে বাঁচার অন্য উপায় আছে। সে উপায় হল দর্শকের অন্তর্মঞ্চের প্রতি মনোনিবেশ। দর্শক তো কেবল বাইরের চোখ দিয়ে দেখেন না, নাটকটি তেমন হলে ভেতরের চোখ দিয়েও দেখেন। বাইরের চোখ দিয়ে যখন দেখছেন, তখন সেই বাহারে চমকপ্রদ চোখটানা দৃশ্যবস্তুর সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ একাত্ম হচ্ছেন না। নিজের অন্তরকে বাঁচিয়ে হুজুকে আমোদ উপভোগ করছেন। তবে যখন ভেতরের চোখ খুলে যায়, অন্তর্মঞ্চ জেগে ওঠে; তখন আর হুজুক নয়, মন অবগাহন করে, নিস্নাত হয় দৃশ্যের গভীরের ফল্গুধারায়। তার জন্য তেমন উপায় উপকরণ লাগে না। বাইরের মঞ্চ বহুব্যয়ে নির্মাণের দরকারই নেই।
উনিশ শতকের এই নাটুকেপনা আর নাটকের হুজুকের প্রতিষেধক হিসেবে রবীন্দ্রনাথ যে ‘অন্তর্মঞ্চ’-এর কথা ভেবেছিলেন তা কিন্তু পরম্পরাহীন নয়। সাহেবি থিয়েটারের আগে এ বঙ্গে নাট্য ছিল। সে নাট্যের এক সবিশেষ বিবরণ আছে ‘চৈতন্যভাগবত’-এ। বৃন্দাবনদাস বিরচিত চৈতন্যভাগবত গ্রন্থে চৈতন্যদেবের নাট্যলীলার বিবরণ আছে। সে নাট্য অবশ্য সকলের জন্য নয়, ভক্তদের জন্য। এখনকার ভাষায় যাকে বলে intimate theatre, এ যেন তারই প্রাগাধুনিক ভক্তিমণ্ডলীয় রূপ। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে স্টকহোমে স্ট্রিন্ডবার্গ মঞ্চের মাপের বদল ঘটিয়ে যে intimate theatre তৈরি করেছিলেন, এখন অবশ্য intimate theatre বলতে তা বোঝায় না। বোঝায় নাট্য প্রয়োগের জন্য এমন একান্ত পরিসর যা দর্শক ও অভিনেতা উভয় পক্ষের মধ্যে সহযোগ আর পারস্পরিক অংশগ্রহণের বৌদ্ধিক-আবেগদীপ্ত অবকাশ তৈরি করে। চৈতন্যভাগবতে যে নাট্যের বিবরণ আছে, তাও ভক্তমণ্ডলীর সঙ্গে চৈতন্য ও তাঁর পরিকরদের সংযোগের উপায় তৈরি করেছে। দর্শকদের মনের চোখ গেছে খুলে। এ বহির্মঞ্চের নাট্য নয়, অন্তর্মঞ্চের নাট্য। তীব্র আনন্দ-আবেগে ভক্তরা আকুল।
চৈতন্যদেব স্থির করে দিলেন, কে কোন রূপে বিরাজ করবেন। ‘গদাধর কাছিবেন রুক্মিণীর কাছ’, ‘নিত্যানন্দ হইবেন বড়াই আমার’। শুধু তাই নয় চৈতন্যদেব স্ত্রী বেশ ধারণ করবেন।
চৈতন্যদেবের করা সেই নাটকটির নাম কী? বৃন্দাবনদাস লিখেছেন, ‘লক্ষ্মীকাছে প্রভু নৃত্য করিলা যেমনে।।’ কাছ শব্দের অর্থ নট সজ্জা। অর্থাৎ লক্ষ্মীর নটসজ্জায়, মেয়ে সেজে চৈতন্যদেব নৃত্য করছেন। বোঝা যায় নাটকটি সংলাপধর্মী নয়। চৈতন্যদেবের পরিকরেরা বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের বেশ ধারণ করছেন। নানা অঙ্গভঙ্গী করছেন। আর তাতেই ভক্ত বৈষ্ণবেরা তাঁদের মনের মঞ্চে সেই চরিত্রগুলিকে সত্য হয়ে উঠতে দেখছেন। তাঁরা পুলকিত। আনন্দাশ্রু বিগলিত। এ তো বাইরের মঞ্চের মায়ায় উল্লসিত জনতার হুজুক নয়। চৈতন্য পরিকরদের মধ্যে কে কী কাছ গ্রহণ করেছিলেন? বৃন্দাবনদাসের জীবনী গ্রন্থে তার বর্ণনা আছে। চৈতন্যদেব স্থির করে দিলেন, কে কোন রূপে বিরাজ করবেন। ‘গদাধর কাছিবেন রুক্মিণীর কাছ’, ‘নিত্যানন্দ হইবেন বড়াই আমার’। শুধু তাই নয় চৈতন্যদেব স্ত্রী বেশ ধারণ করবেন। ‘প্রকৃতিস্বরূপা নৃত্য হইবে আমার’। বৃন্দাবনদাস এই নাট্যের বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘সর্বরঙ্গচূড়ামণি চৈতন্য গোসাঞি’— রঙ্গ মানে অভিনয় ক্ষমতা, চৈতন্যদেব অভিনয় ক্ষমতায় শ্রেষ্ঠ।

চৈতন্যদেবের পরিকরেরা নানা সাজে ভক্তদের সামনে এলেন।
‘প্রথমে প্রবিষ্ট হৈলা প্রভু হরিদাস।/মহা দুই গোঁপ করি বদন-বিলাস।।/ মহাপাগ শিরে শোভে ধটী পরিধান।/ দেখিয়া সবার হৈল বিস্ময় গেয়ান।।’ হরিদাস বৈকুণ্ঠ কোটালের ভূমিকায়।
তারপরে এলেন শ্রীবাস। ‘মহা দীর্ঘ পাকা দাড়ি ফোটা সর্বগায়।/ বীণা কান্ধে কুশ হস্তে চারি দিগে চায়’। তিনি নারদ সেজেছেন।
চৈতন্যদেব নাটকে রুক্মিণী সেজেছেন। সাজ অতিক্রম করে চরিত্রে প্রবেশ করেছেন। বৃন্দাবনদাস লিখেছেন, ‘আপনা না জানে প্রভু রুক্মিণী আবেশে’। এই আবেশে আত্মগত। নিজেকে রুক্মিণী বলে ভাবছেন চৈতন্যদেব। দর্শকেরা মুগ্ধ। নাট্যমঞ্চ তো গৃহাঙ্গন। দর্শক-ভক্তদের সঙ্গে একই সমতলে অভিনেতা। বাইরের কাছ বা সজ্জা অভিনেতা-দর্শক উভয় পক্ষ বিস্মৃত হচ্ছেন। সম্মুখে রুক্মিণীকে দেখে তাঁরা বিগলিত। তাঁদের সময়ের বোধ হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা যেন সকলে রুক্মিণীর দেশ-কালে প্রবিষ্ট। রুক্মিণী ভাবগ্রস্ত চৈতন্যদেবের মুখে দীর্ঘ আত্মগত স্বগতোক্তি। বৃন্দাবনদাস তা উদ্ধার করেছেন। এত দীর্ঘ স্বগতোক্তি অপর চরিত্রের মুখে নেই।

ভাগবতকার লিখেছেন ‘কারুণ্য সারদা রাগেন গীয়তে’। এই নাট্যে সংলাপের কাঠামো পূর্বনির্ধারিত নয়। স্বতঃস্ফূর্ত। কখনও কখনও ভক্ত-দর্শক বাক্য-যোজনা করেছেন। অদ্বৈতাচার্য চৈতন্যদেবের কাছে নাট্যাভিনয়ের অনুমতি চেয়েছিলেন, ‘মোরে আজ্ঞা প্রভু কোন কাছ কাছিবার।।/ প্রভু বোলে যত কাছ সকলি তোমার।/ ইচ্ছা অনুরূপে কাছ কাছ আপনার।।’ অদ্বৈত তাই করলেন। যে পরিকর যে বেশ গ্রহণ করছেন অদ্বৈত অভিলাষ হলে তাঁর সঙ্গে বাক্য বিনিময় করছেন। পরিকরদের অদ্বৈত বলেন, ‘নৃত্যগীতপ্রিয় বড় আমার ঠাকুর।/ এথায়ে নাচহ ধন পাইবা প্রচুর।।’ তখন রমাবেশে গদাধর মনোহর নাচ শুরু করলেন, ‘সময়-উচিত গীত গায় অনুচর।’
বাইরে লিঙ্গ পরিচয়ে পুরুষটি অন্তরের পরিচয়ে নারী হয়ে উঠছেন। চৈতন্যদেব পরমা প্রকৃতি হয়ে স্তনদান করছেন। ‘মাতৃভাবে বিশ্বম্ভর সভারে ধরিয়া।/ স্তনপান করায়ে পরম স্নিগ্ধ হৈয়া।।’
স্ক্রিপ্টেড নয়, পারস্পরিক অংশ গ্রহণে মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে। কখনও কখনও কেবল নৃত্য আর আঙ্গিক অভিনয়। সেই আঙ্গিক অভিনয় বাহ্য, শেষ অবধি দিব্য অনুভূতিতে প্রবেশ। ‘যে গায় যে দেখে সব ভাসিলেন প্রেমে।।’ দুই পক্ষের দূরত্ব রইল না। অন্তর্লোকের অনুভূতিতে সব এক হয়ে গেল। বাইরের গৃহ-পরিসরটির উপর অন্তরের উপলব্ধি আরোপিত। বহির্মঞ্চই অন্তর্মঞ্চ তখন। নারী পুরুষ ভেদ থাকছে না। বাইরে লিঙ্গ পরিচয়ে পুরুষটি অন্তরের পরিচয়ে নারী হয়ে উঠছেন। চৈতন্যদেব পরমা প্রকৃতি হয়ে স্তনদান করছেন। ‘মাতৃভাবে বিশ্বম্ভর সভারে ধরিয়া।/ স্তনপান করায়ে পরম স্নিগ্ধ হৈয়া।।’

এই যে নাট্য, এ এক আশ্চর্য আধ্যাত্মিক দৃশ্য। প্রাগাধুনিক পর্বে পরিকর-সমাজে চৈতন্যদেব এই অন্তর্মঞ্চের উদ্বোধন ঘটিয়েছিলেন। নাট্য সেখানে দিব্যানুভূতির উপায়। স্থান-কালের সীমা অতিক্রম করার উপকরণ। এই দিব্য-আধ্যাত্মিক অন্তর্মঞ্চের জাগরণ ঘটানোর যে সাধনা মরমিয়া ধর্ম সাধকেরা এই বঙ্গে করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণত না হলেও এক অর্থে তার উত্তরাধিকারী। একদিকে বঙ্গভঙ্গের সময় বাংলা-ভাঙার সাহেবি রাজনৈতিক কৌশলের বিরোধিতা করে রবীন্দ্রনাথ গান লিখছেন। সেই গান গাইতে গাইতে হিন্দু-মুসলমান বাঙালি একসঙ্গে পথে। তাঁদের অন্তর্মঞ্চে অখণ্ড বঙ্গের ছবি জেগে উঠছে। আবার, ‘মুক্তধারা’ নাটকে ধনঞ্জয় বৈরাগী প্রকৃতি-বিনষ্টকারী প্রযুক্তির বিরুদ্ধে গান গেয়ে পাড়ায় পাড়ায় রাজার বিরুদ্ধে প্রজাদের খেপিয়ে তুলছেন। জীবনে-নাটকে মিলে-মিশে একাকার। এ হুজুগ নয়, অন্তত রবীন্দ্রনাথ হুজুগের বিরুদ্ধে অংশগ্রহণের ও চিত্তজাগরণের বিপ্লব সাধন করতে চাইছেন।
বৈশাখ মাস রবীন্দ্রনাথের মাস। তবে এ বঙ্গে এখন সবই হুজুক। মরমিয়া চৈতন্যদেব ও আধুনিক-মরমিয়া রবীন্দ্রনাথের দিন গিয়েছে। আধ্যাত্মিক একান্ত নাটকের ধারা অতিক্রম করে বঙ্গদেশের বহির্মঞ্চে রাজনীতির ধর্মীয় হুজুক শুধু দৃশ্য নির্মাণ করছে। আর দৃশ্যলোলুপ জনতার জল জমছে তারই চারপাশে আবার কেটেও যাচ্ছে। এই তো হুতোমের দেশ, নকশার দেশ। চৈতন্যদেব-রবীন্দ্রনাথ এদের কেউ হন না।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত