(Bombay Duck)
তাঁরা আর লইট্যা মাছের কী জানেন, যাঁরা লইট্যা মাছ বলতে লইট্যার ঝুরোকেই শুধু জানেন!
তাঁরা আর লইট্যা মাছের কী বোঝেন, যাঁরা লইট্যা মাছ বলতে লইট্যার ব্রেড ক্রাম্ব ফ্রাই বা ব্যাটার ফ্রাইকেই শুধু বোঝেন!
লইট্যা মাছকে ঠিকভাবে জানতে ও বুঝতে হলে, তার রূপ-রস-গন্ধ পেতে হলে, স্বাদ ঠিকঠাক উপলব্ধি করতে হলে ঝুরি, ফ্রাই-ট্রাই চলবে না। ও সব আইটেমে লইট্যা মাছ আপনার কাছে, থুড়ি আপনার জিভের স্বাদকোরকে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে পারবে না। কেবল একটু ধরা দিয়েই চলে যাবে। কেবল তার ছোঁয়াটুকু আপনি পাবেন, কিন্তু তাকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন না মনপ্রাণ দিয়ে।
আরও পড়ুন: ভাজা মাছের উলটো পিঠ
লইট্যা মাছের স্বাদের আসল রস লুকিয়ে লইট্যা মাছের রসায়। আর লইট্যা মাছের রসা যিনি নিখুঁত রাঁধতে পারবেন, তাঁকে তুখোড় রন্ধনশিল্পী হিসেবে সম্মান দিতেই হবে। এই আইটেম ঠিকমতো নামাতে হলে কেবল দক্ষ রাঁধুনি হলেই চলবে না— রান্নায় সীমাহীন ধৈর্য, গভীর মনোসংযোগ ও তীক্ষ্ণ অনুমানক্ষমতা আবশ্যিক। কারণ, একটু এদিক থেকে ওদিক হলে লইট্যা মাছের রসা ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে। কেউ রসা বলতে পারেন, কেউ ঝালও বলতে পারেন, আবার কেউ লইট্যা মাছের কষা বললেও আপত্তি নেই।
এই প্রিপারেশনে লইট্যা মাছের টুকরোগুলো থাকবে মাঝারি মাপের। লম্বা মাছ হলে সাধারণত তিন টুকরো, ছোট মাছ হলে দু’টুকরো। রান্না হয়ে যাওয়ার পরেও মাছের একটা টুকরোর এতটুকুও কিন্তু ভাঙলে চলবে না। অটুট থাকতে হবে। একটা তেলতেলে মাখো মাখো গ্রেভিতে— হালফিলের কিছু রেস্তোরাঁ ও ইটারির পরিভাষায় সেমি গ্রেভি— লইট্যা মাছের টুকরোগুলো অর্ধেক ডোবানো থাকবে। তা বলে ভাসবে না কিন্তু। লইট্যার টুকরো ভাসছে মানে রসা-টা আসলে ঝোল টাইপের কিছু হয়ে গিয়েছে। এই প্রিপারেশন হবে জল ছাড়া। লইট্যা মাছ থেকে বেরনো জলেই রান্না হবে। মাছের তেলে মাছ ভাজা নয়, এ ক্ষেত্রে মাছ থেকে ছাড়া জলে মাছ রান্না।

এমনিতে লইট্যা (অনেকে লটে বলেও ডাকেন) হল শীতকালের মাছ। সামুদ্রিক এই মাছ বর্ষাতেও পাওয়া যায় ঠিকই, তবে শীতেই সাধারণত এর জোগান বিপুল। লইট্যা মাছের রসা দেখতে হবে সবজে-স্বর্ণাভ। সবজে ভাবটা আসবে রান্না হয়ে যাওয়ার পরে, তার উপরে বেশ কিছুটা কাঁচালঙ্কা চিরে ও শীতের ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। শীতের টোম্যাটো মানে সিজ়নের টোম্যাটোও লইট্যার রসায় পড়বে, তবে সেটা আদা-পেঁয়াজ-রসুন-হলুদ গুঁড়ো-শুকনো লঙ্কা বাটার সঙ্গে কষাতে কষাতে মিশে যাবে।
উচ্চাঙ্গের লইট্যা রসার রং লাল হবে না কখনও। কাশ্মীরি লঙ্কা দেওয়া যাবে না, টোম্যাটো দিতে হবে বুঝেসুঝে। তার পরেও লাল রং ধরলে বুঝতে হবে শুকনো লঙ্কায় গোলমাল ছিল, কিংবা টোম্যাটো বেশি পরিমাণে দেওয়া হয়েছে। কড়াইয়ে মশলা ভাল কষানো হয়ে গেলে, মানে মশলার মিশ্রণ থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে লইট্যা মাছের কেটে জল ঝরিয়ে রাখা টুকরোগুলো তার মধ্যে দিয়ে কড়াইটা ঢেকে রাখতে হবে, কম থেকে মাঝারি আঁচের মধ্যে।
লইট্যার গন্ধটা, আমার মনে হয়, একটু ভেটকি ঘেঁষা— নির্দিষ্ট করে বললে সামুদ্রিক ভেটকির মতো গন্ধ। যে কারণে আদা-রসুন-কাঁচালঙ্কা-পাতিলেবুর রস আর নুন-গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে জারিয়ে রাখা লইট্যার ফিলের ব্রেড ক্রাম্ব ফ্রাই কিংবা ব্যাটার ফ্রাই ভাজার সময়ে ভেটকি ফিশ ফ্রাই অথবা ভেটকি ব্যাটার ফ্রাই গন্ধ পাওয়া যায়।
লইট্যা মাছের নিজস্ব পিচ্ছিল ভাব দূর করতে ও আঁশটে গন্ধ তাড়াতে কেউ কেউ মাছের টুকরোগুলো নুন ও লেবুর রস মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে তারপরে জল দিয়ে ধুয়ে নিতে পরামর্শ দেন। আমি একেবারেই এটার পক্ষপাতী নই। পিচ্ছিল ভাব ও গন্ধটাই তো লইট্যা মাছের ইউএসপি। যাঁরা এটা পছন্দ করবেন না, তাঁদের লইট্যা মাছ খাওয়ারই বা কী দরকার!
ইলিশের একটি নিজস্ব গন্ধ আছে, সেটাও তীব্র আঁশটে। চাষ না-করা, প্রাকৃতিক ভাবে বড় হওয়া ভেটকির গন্ধও একেবারে তার নিজস্ব। ছোট ছোট বেলে মাছ ভাজা হলে ছোটবেলায় মনে হতো, বাড়িতে বুঝি ফিশ ফিঙ্গার হচ্ছে। লইট্যার গন্ধটা, আমার মনে হয়, একটু ভেটকি ঘেঁষা— নির্দিষ্ট করে বললে সামুদ্রিক ভেটকির মতো গন্ধ। যে কারণে আদা-রসুন-কাঁচালঙ্কা-পাতিলেবুর রস আর নুন-গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে জারিয়ে রাখা লইট্যার ফিলের ব্রেড ক্রাম্ব ফ্রাই কিংবা ব্যাটার ফ্রাই ভাজার সময়ে ভেটকি ফিশ ফ্রাই অথবা ভেটকি ব্যাটার ফ্রাই গন্ধ পাওয়া যায়।

তবে লইট্যার এই রকম ফ্রাই এবং ঝুরো-তে লইট্যার পিচ্ছিল ভাবটা মেরে দেওয়া হয়। লইট্যাকে সত্যি সত্যিই ভালবাসতে হলে তার লদলদে ভাবটাকেও গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া, লইট্যা মাছের শিরদাঁড়া বা মেরুদণ্ড নরম। মানে, লইট্যা মাছের কাঁটা একটাই এবং সেটা একেবারেই শক্ত নয়। ভাঙা বা দুর্বল দাঁত দিয়েও সেই কাঁটা বা শিরদাঁড়াকে নিঃশেষ করে ফেলা যায় অনায়াসে। লইট্যার ফ্রাই তৈরির জন্য কাঁটা বাদ দিয়ে মাছ পাতলা ও লম্বালম্বি করে কেটে নেওয়া হয়। আবার, লইট্যার ঝুরো-তে নরম কাঁটা মিশে গিয়ে তার আলাদা অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। সুতরাং, ওই নরম ও সুস্বাদু (হ্যাঁ, লইট্যা মাছের কাঁটারও নিজস্ব স্বাদ রয়েছে) কাঁটাকে ঠাহর করতে গেলে লইট্যা মাছের রসা ছাড়া উপায় নেই।
রসা রান্নার মাঝামাঝি অবস্থায় কষানো মশলার মধ্যে লইট্যা মাছের টুকরোগুলো দিয়ে কড়াই ঢেকে দেওয়ার পরেই রাঁধুনির অনুমানক্ষমতা, মনঃসংযোগ ও ধৈর্যের পরীক্ষা। রান্নার একটা পর্যায়ের পরে মাছ থেকে জল ছাড়তে শুরু করবে। কড়াইয়ের ঢাকনি খুলে সেটা ঝট করে দেখে আবার ঢাকা দিতে হবে।
লইট্যার ঝুরো ভেজা ভেজা বা রস রস থাকলে বুঝতে হবে, ওটা ঠিকঠাক ঝুরো হয়নি। লইট্যার ঝুরোর রং হওয়া উচিত লালচে-হলুদ। সেই রং কালচে-খয়েরি হওয়ার অর্থ, রান্নায় ধৈর্য ও পারদর্শিতার ঘাটতি ছিল।
লইট্যার জল বেরিয়ে লইট্যা মাছের টুকরোগুলোকে প্রথমে সিদ্ধ করবে। তার পরে ওই জলের সহায়তাতেই মশলাপাতির আভরণ গায়ে লাগিয়ে সেজে উঠবে মাছের টুকরোগুলো। সব শেষে গোটা ব্যাপারটা আপনাআপনিই থিতু হবে। কিন্তু সবটা আপনাআপনি হবে না। মাছের টুকরোগুলো কড়াইয়ের কষানো মশলায় ফেলে ঢেকে দেওয়ার পরে বার দুয়েক কড়াইয়ের দু’দিকের হাতল ধরে একটু নাড়িয়ে দিতে হবে, যাতে মাছ কড়াইয়ে লেগে না যায়।
খুব জোরে নাড়ালে কিন্তু বিপত্তি ঘটবে। তা হলে মাছের টুকরো ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা। তা ছাড়া, মশলা কষানোর পরে এই রান্নায় কিন্তু খুন্তির আর কোনও ব্যবহার নেই। কড়াইয়ে লইট্যা মাছের টুকরো দেওয়ার পরে খুন্তি দিয়ে কেরামতি করতে গেলে আইটেমটা আর লইট্যার রসা থাকবে না— ঘণ্ট পাকিয়ে ভরতা হয়ে যাবে। রসা-ই কিন্তু লইট্যা মাছের সব চেয়ে স্বাস্থ্যকর আইটেম। যেখানে মাছের খাদ্যগুণ লইট্যার যাবতীয় প্রিপারেশনের মধ্যে সবচেয়ে কম নষ্ট হচ্ছে।

রসা-তে রাঁধুনির নৈপুণ্য থাকা প্রয়োজন একেবারে উচ্চতম পর্যায়ে। আর লইট্যা মাছের ঝুরো-তে রাঁধুনির কেবল ধৈর্যের এবং কিছুটা শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা। কারণ, ঢিমে থেকে মধ্যম আঁচে লইট্যা মাছ সেখানে খুন্তি দিয়ে নাড়িয়ে যেতেই হবে, যেতেই হবে, যেতেই হবে…। ততক্ষণ, যতক্ষণ না লইট্যার ঝুরো শুকনো হচ্ছে। লইট্যার ঝুরো ভেজা ভেজা বা রস রস থাকলে বুঝতে হবে, ওটা ঠিকঠাক ঝুরো হয়নি। লইট্যার ঝুরোর রং হওয়া উচিত লালচে-হলুদ। সেই রং কালচে-খয়েরি হওয়ার অর্থ, রান্নায় ধৈর্য ও পারদর্শিতার ঘাটতি ছিল।
বহু বাড়িতে লইট্যা মাছ চটকে আদা-পেঁয়াজ-রসুন-লঙ্কা মাখিয়ে বেসন বা চালের গুঁড়োর ব্যাটারে ডুবিয়ে বড়া হয়। তবে আমার কাছে ও পদ না ঘরকা, না ঘাটকা। আবার লইট্যা ফ্রাইয়ের জন্য পাতলা করে, কাঁটা বাদ দিয়ে মাছ কেটে নেওয়াও অনেকের কাছে হ্যাপার। আমি তুলনায় একটা সহজ রেসিপি দিতে পারি।
ডাল-ভাতের সঙ্গে গোটা পাঁচ-ছয়েক খান। তার পরে অবধারিত গান গাইবেন— ‘এই খাবার যদি না-শেষ হয়, তবে কেমন হত, তুমি বল তো!’
এক-একটা লইট্যা মাছ থেকে দুটো টুকরো হয়, এমন ভাবে মাছ কেটে নিন। আদা-রসুন-পেঁয়াজ-কাঁচালঙ্কা-পাতিলেবুর রস, গোলমরিচের গুঁড়ো, নুন, মাস্টার্ড সস (যা কাসুন্দি বলে বিক্রি হয়) মাখিয়ে ঘণ্টখানেক জারিয়ে রাখুন। একটা পাত্রে কর্নফ্লাওয়ার নিন, শুকনো। ব্যাটার বা গোলা বানানোর দরকার নেই। মশলা মাখানো লইট্যা মাছের টুকরো একটার পর একটা ওই কর্নফ্লাওয়ারে মাখিয়ে সরষের তেলে ভেজে নিন। কড়া পানীয়ের সঙ্গে জমে ক্ষীর। ডাল-ভাতের সঙ্গে গোটা পাঁচ-ছয়েক খান। তার পরে অবধারিত গান গাইবেন— ‘এই খাবার যদি না-শেষ হয়, তবে কেমন হত, তুমি বল তো!’
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত