(Rustic cooking 25)
মানুষেরা কেউ ছায়া খুঁজছে, কেউ বা রোদ। এই জ্যৈষ্ঠের দিন, গুমোট গরম। এই গরমে আম পাকে, কাঁঠাল পাকে, পেকে টুকটুকে হয় লিচু। অনেক আগে ইস্কুলের ছুটি পড়লে সক্কলে বলত আম-কাঁঠালের ছুটি। এখনও সেসব ছুটি পড়ে, কিন্তু আম কাঁঠালের বনে হারিয়ে যাওয়ার সুখ নেই।
আরও পড়ুন: বনজ কুসুম: পর্ব – [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১] [১২] [১৩] [১৪] [১৫] [১৬] [১৭] [১৮] [১৯] [২০] [২১] [২২] [২৩], [২৪]
গাঢ় সবুজ কাঁঠালপাতায় ছায়ারা শান্ত, সবুজ। সবুজ শ্যাওলা জমা পুকুরের জল যেমন নিস্তরঙ্গ! এমন গ্রীষ্মদিনের দুপুরেরাও তেমনই। এমন দিনে ঘরের আগল এঁটে যারা ঘুমিয়ে আছে, তারা সেই স্থির নুয়ে পড়া বাঁশঝাড়ের ছায়ার মতো স্থির পুকুর বুঝিবা। আর রোদ্দুর আগলে যারা ধান শুকোচ্ছে, ডাল শুকোচ্ছে, নুনিয়ে রাখা মুড়ির চাল মেলে দিচ্ছে— তারা কি এই আতপ্ত দিনকেই ভীষণ করে চাইছে না?

এই চাওয়া আর না চাওয়ার মাঝে এক চিলতে ফাঁক। জীবনের গুছিয়ে তোলা সংসারখানা যেন গোলাঘরের মতো। সেখানে কেবলই শস্য মজুত হচ্ছে দিনেরাতে। এই রোদ জল রান্নাঘর আর লতিয়ে ওঠা কুমড়োর ডগা নিয়ে সে হামেশাই ব্যস্ত। এসব ব্যস্ততায় অবশ্য বড়বাবুর অকারণ তাগাদা নেই। এই তাগিদ মানুষের নিজেরই। তাই গ্রীষ্মদিনের ক্লান্তিও তাকে জিরোতে দেয় না। তার কেবলই মনে হয় বর্ষা আসার আগে গেল বারের বড়িগুলো আরেকটু রোদ খাইয়ে নিই। জাতা পেতে হাত ঘুরিয়ে তিল ভেঙে নিই। এই মনে হওয়ারা গ্রামের গ্রীষ্মে টিকে আছে এখনও।
ছুটি কি আর কেবল ইস্কুলেরই চাই? রান্নাঘরও ছুটি চায় সময়ে সময়ে। তার জলঢালা ভাত, তার আম-কাঁঠালের সঙ্গতি সেসব ছুটি পাইয়ে দেয়।
শহরের গ্রীষ্ম বরং একটু অন্যরকম। সেখানেও ব্যলকনিতে, বারান্দায় মানুষ রোদ্দুর খোঁজে ঠিকই, কিন্তু উঠোন তার হারিয়ে গেছে হয়তো কবেই। ফেলে আসা গ্রীষ্মদিনের ছবি খুঁজতে খুঁজতে আমি তাই পৌঁছে যাই করমচার ফুলে ভরা গাছ পেরিয়ে ফলসার সবুজ গুটি ভরা ডাল পেরিয়ে কোন সে দিকশূন্যপুরে। সেই যেখানে ভরদুপুরেও জটলা করে ছেলের দল কাটারি নিয়ে তালশাঁস পাড়ে, কাদায় নেমে ল্যাটা মাছ ধরে, শোল মাছ ধরে, খুঁজে পেলে গজালও ধরে! রান্নাঘর সেসব মাছ কুটে বেছে আম দিয়ে শোল মাছের টক রাঁধে, ল্যাটা (টাকি) মাছ পোড়ায়। লেবু লঙ্কা পেঁয়াজ দিয়ে টাকি মাছ মাখলে সে কী স্বাদ!
কাগজি লেবুর গাছখানা এলিয়ে পড়েছে। জলঢালা ভিজে ভাতে ডলে ডলে লেবু মাখলে সে গন্ধ বারান্দায় উঠোনে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ আবার পাকা আম দিয়ে, পাকা কাঁঠাল দিয়ে পান্তা খায়। সেসব ভাবতে গেলে আম-কাঁঠালের ছুটিতে খানিক রান্নাঘরেরও ছুটি মেলে। ছুটি কি আর কেবল ইস্কুলেরই চাই? রান্নাঘরও ছুটি চায় সময়ে সময়ে। তার জলঢালা ভাত, তার আম-কাঁঠালের সঙ্গতি সেসব ছুটি পাইয়ে দেয়।

তবে, ওই যে বললাম— মানুষের জীবনটা একখানা গোলাঘরের মতো। সে কেবল জীবনের শস্য মজুত করতে চায়। সেই শস্য মানুষভেদে বদলে বদলে যায়। বরং খানিক বুঝিয়েই বলি না হয়। আন্দামানের গ্রামগুলো এখনও পুরনো স্মৃতি দিয়ে ঘেরা। তাদের নিকোনো উঠোন, কানের ভারী ঝুমকো, পাতায় ভাজা মাছ এসব দেখলে ফিরে যেতে হয় কয়েক দশক।
তবু কী আশ্চর্য দেখুন, তারা আম জাম কাঁঠালের বাগান কেটে ফেলছে প্রতিদিন। চারিদিকে কেবলই সুপারি বাগান। বাড়ি বাড়ি এসে পাইকাররা সুপারি আর সুপারির খোলা কিনে নিয়ে যায়। অনন্ত সুপারিবাগানের ছায়ায় ঘুরে ঘুরে আমি কেবলই দেখি, এক কোঁকড়া চুলের কিশোর বসে বসে পেতলের রেকাবিতে মাদ্রাজি আম খাচ্ছে আনমনে। দাম দিয়ে কেনা জিনিস মানুষ হিসেব করেই খায়। ফেলে ছড়িয়ে খাওয়া আম-কাঁঠালের ছুটিরা তাই হারিয়ে যায় ফুরিয়ে যায়।

অনন্ত সুপারি বনের সারির মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার ভয় করে। সারা পৃথিবী জানে মনোক্রপে মড়ক সে বড় ভয়ানক। সেসব কিছু না হোক। মানুষেরা ছায়া পাক। আর কিছু রোদ্দুরও পাক। যে রোদে অজস্র ঝরে পড়া আমের আমসি শুকোয়, আম তেল রোদ খায়, আমসত্ত্ব আলো মাখে। এই আলো আর ছায়া খুঁজে বেড়ানোর গ্রীষ্মদিনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। এই আমার দেশ। এই আমাদের রান্নাঘর। আম কাঠালের গন্ধে নীলমাছিরা ফিরে আসুক না হয়। যারা হারিয়ে যায়, তাদের নামে কি রান্নাঘর হ্যান্ডবিল বিলি করে? ফিরে এসো নীল মাছি। আম কাঁঠালের ছুটি পড়ে গেছে।
মটর ডালের বড়া দিয়ে কুমড়ো শাকের ঝোল
উপকরণ: মটর ডাল, কুমড়োর ডগা এবং পাতা, পোস্ত, সর্ষের তেল, কালো জিরে, কাঁচা বা পাকা লঙ্কা, আদা, নুন, হলুদ।

পদ্ধতি: মটর ডাল সারারাত বা পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। ডাল ভাল করে ভিজে গেলে জল ঝরিয়ে ধুয়ে নিয়ে আদা-কাঁচা লঙ্কা দিয়ে বেটে নিন। বাটা ডালে নুন, অল্প হলুদ আর কালো জিরে দিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে বড়া ভেজে নিন। সাইজ আপনার পছন্দমতো করতে পারেন। অন্যদিকে কুমড়োর ডগা আঁশ ছাড়িয়ে কেটে রাখুন। শাকগুলো কুচিয়ে রাখুন। কড়াইতে বড়া ভাজা হয়ে গেলে তেল তুলে নিন বা এমন ভাবেই তেল দিন যাতে বড়া ভাজাও শেষ হয়, তেলও শেষ হয়ে যায়। প্রায় তেলবিহীন ওই কড়াইতে জল দিন। জলে নুন আর চেরা কাঁচালঙ্কা দিন। জলটা ফুটে উঠলে শাক আর কুমড়োর ডাঁটাগুলো দিন। সব বেশ সেদ্ধ হয়ে গেলে বড়াগুলো দিয়ে অল্প ফুটিয়ে নিন। সব শেষে আগে থেকে বেটে রাখা পোস্তবাটা দিন।
এবার আরেকটি পাত্রে অল্প তেল গরম করুন। তেলে লঙ্কা আর কালো জিরে ফোড়ন দিন। শাক এবং বড়ার ঝোলের উপর ফোড়নটি দিয়ে দিন। ঢাকা দিয়ে কিছুক্ষণ রাখুন। একেবারেই হালকা পাতলা ঝোল, কিন্তু গরমের দিনে মন্দ লাগে না।
আম দিয়ে ভাপা দই
উপকরণ: আম, ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধ বা কনডেন্সড মিল্ক, জল ঝরানো টক দই, প্রয়োজন হলে সামান্য চিনি।

পদ্ধতি: টক দই জল ঝরিয়ে নিন। জল ঝরানো দই দেড় কাপ হলে চিনি দিয়ে জ্বাল দেওয়া ক্ষীর অর্থাৎ কনডেন্সড মিল্ক এক কাপ নিন। এই দুটিকে ভাল করে মিশিয়ে নিন। মিক্সি ব্যবহার না করাই ভাল। আমেরও শাঁস বের করে মোলায়েম করে ছেঁকে নিন। এই আম ওই মিশ্রণে মেশান। যে পাত্রে দইটি জমতে দেবেন, তাতে অল্প ঘি বুলিয়ে নিন এবং আমের মিশ্রণটি ঢেলে দিন। এই পাত্রের মুখটি খুব ভাল করে কিছু দিয়ে আটকে দেবেন যাতে জল বা বাষ্প না ঢুকতে পারে। আরেকটি পাত্রে জল ফুটতে দিন। ফুটন্ত জলের উপরে পাত্রটি বসিয়ে ১৫-২০ মিনিট ভাপিয়ে নিন। এই ভাপানো দই ফ্রিজে দুই-তিন ঘণ্টা ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন। যদি ফ্রিজ ব্যবহার না করে থাকেন, তাহলে জলের উপর বসিয়ে রেখে সম্পূর্ণ ঠান্ডা হতে দেবেন। তাজা আমের টুকরো দিয়ে সাজিয়ে দিতে পারেন এই আম দই বা ভাপা আম দই।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত