(Anik Dutta)
২০১২। ‘অপরাজিতা তুমি’, ‘নোবেল চোর’, ‘চারুলতা ২০১১’ এরকম কিছু ছবির আসা যাওয়া চলছে। বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ানোর সংকল্প নিয়ে আমার মতো শহুরে দর্শক গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে মাল্টিপ্লেক্সের গদি আঁটা দামি সিটে বসে পপকর্ন আর ন্যাচোস চিবোতে চিবোতে সেই সব ‘ভাল’ ছবি দেখছি। তাতে অবিশ্যি ‘১০০% লাভ’, ‘খোকাবাবু’ বা ‘ম্যাচো মস্তানা’–রা থেমে থাকেনি।
এসব পোষ্টারের নিচে তথাকথিত ‘ভাল’ ছবির পোস্টার হারিয়ে যেতে সময় লাগে না, হপ্তা তিন বড়জোর চার সপ্তাহ আয়ু তাদের। কিন্তু কিছুদিন যাবৎ অফিস যাতায়াতের পথে একটা ছবির পোস্টার চোখে পড়ে প্রায় রোজ দিন। অভিনব নাম ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’! লোকজনের মুখে মুখে সে নাম ফিরে ফিরে আসে। রবিবারের বাজারে টুবুদার সঙ্গে ফোনে গ্যাঁজানোর সময় তার গলায় বিস্ময় ঝরে পড়ে। ‘আরে কাল ভূতের ভবিষ্যৎ দেখতে গেসলাম, কী ভালো ছবি রে! পুরো ছবি জুড়ে পাঠভবন পাঠভবন গন্ধ!’ কলকাতার পাঠভবন স্কুলে পড়ার সূত্রে আমাদের এই আবেগতাড়িত হওয়ার ব্যাপারটা রীতিমতো সংক্রামক এবং সর্বজনবিদিত।
আরও পড়ুন: বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কবিতা নিয়ে
‘বল কী? পরিচালক কে?’
‘আরে কে এক অনীক দত্ত। অ্যাড-এর লোক। এবার ফিচার ধরেছে!’
শুরু হয় অনুসন্ধান। সে সময় আমাদের স্কুলের ‘প্রাক্তনী’–র সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের কাছ থেকে জানা যায় আরে হ্যাঁ, অনীক দত্ত তো পাঠভবন পাস আউট, ১৯৭৮ ব্যাচ।
‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর পোস্টার হারিয়ে যায়নি বাজারচলতি সিনেমার ভিড়ে। মাল্টিপ্লেক্সের শো-এর হিসাব নস্যাৎ করে সে ঢুকে পড়েছিল প্রাইম টাইমে। বাংলা, ভারতের অন্য শহর এবং বিদেশের নানা শহরে সেই ছবি প্রদর্শিত হয়েছিল। চলেছিল প্রায় ১০০ দিন!

কেন ভাল লেগেছিল এই ছবি? ভাবতে গিয়ে মনে হয়েছে, আঁটসাঁট কাহিনির সঙ্গে নির্মেদ সংলাপের মেলবন্ধন, যার মধ্যে লুকিয়ে থাকে ননসেন্সিকাল ভাব, যে পরে অনুপ্রাস আর pun-এর অলঙ্কার, আর এই দুয়ে মিলে কঠিন কথা খুব সহজে বলে দিতে পারে সে সূক্ষ্মভাবে। এর মধ্যে কোথাও যেন ছাপ রেখে যান সুকুমার, পরশুরাম আর শিব্রাম, যা অনীকদা আত্মস্থ করেছিল তাঁর স্কুল জীবনে।
২০১৫ সালে পাঠভবনের ৫০ বছর। সেখানেই আলাপ অনীকদার সঙ্গে। এর মাঝে ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ রিলিজ় করেছে ২০১৩ তে। ‘প্রাক্তনী’–র কাজেকম্মে মাঝে সাঝে হিন্দুস্তান পার্কের বাড়িতে যাওয়া। সঙ্গী পিনাকী। এটা সেটা আব্দার। একদিন যাওয়া হল বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে। তখন আমাদের চোখে ‘পাঠভবন প্রাক্তনী’–কে নতুনভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন। আমাদের সঙ্গে অনীকদা, সিধুদা (সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়) আর মৈত্রীশ (ঘটক)। কাজের কথা যা হল, তার থেকে বেশি হল স্কুলের পুরনো গপ্পো।
‘সল্টলেক স্টেডিয়ামের সামনে ওই কুৎসিত মূর্তিটা ভাঙা উচিৎ’, বলেছিল অনীকদা সেদিন সন্ধ্যায়। সাত বছর লাগল সেটাকে উৎপাটন করতে। জানি না, তুমি দেখে গেলে কি না দাদা…
২০১৭-তে ‘মেঘনাদবধ রহস্য’! ছবিতে আর্ট এক্সহিবিশনে ভিড় জমাতে কিছু ‘বোদ্ধা’ জনগণের মুখ দরকার। পিনাকী এসে খবর দিল অনীকদা যেতে বলেছে। নির্দিষ্ট দিনে আমরা ‘আকার প্রকার’-এ হাজির। কায়দা করে সাদা শার্টের ওপর এক খানা জ্যাকেট পরে গেছি। হঠাৎ শুনি অনীকদা মনিটরে বসে চেঁচাচ্ছে ‘এই সপ্তর্ষি, জ্যাকেট খোলো’! কী যে দুঃখ পেলাম, সে আর কী বলি! ২০১৮-তে মৈত্রীশ স্কুলে ‘উমা সেহানবিস মেমোরিয়াল লেকচার’-এর প্রথমটিতে আসে। সেখানেও বাধ্য ছেলের মতো বেঞ্চিতে অনীকদা।

২০১৯। বরাবর বাম আদর্শে বিশ্বাসী অনীকদা। বিগত সরকারের অত্যাচার, অনাচার তখন টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়াকে গ্রাস করেছে। অতএব অনীক দত্তকে আটকাও। বন্ধ করে দাও তাঁর ছবি, যা কি না সেন্সরের সিলমোহরে রিলিজ়ের যোগ্য বলে বিবেচিত ততদিনে। প্রত্যেক মাল্টিপ্লেক্সের কাছে পৌঁছে যায় মৌখিক ফতোয়া, ‘ভবিষ্যতের ভূত’ দেখানো যাবে না। বলা হয়েছিল, ‘টেকনিক্যাল ইস্যুর জন্য সিনেমাটা দেখানো যাবে না। ওপর মহল থেকে অর্ডার আছে।’ কে বা কারা ছায়ার মতো সেদিন বাধা দিয়েছিল, সে সবাই জানতেন। রাস্তায় নেমেছিল প্রতিবাদের ঢল। একাধিকবার। অবশেষে মাসখানেক পরে রিলিজ় হয় ছবি। আটকানো যায় না তাকে।
পাঠভবনের আরেক প্রাক্তনী শিল্পী চিত্রভানু মজুমদারের সঙ্গে এক ঘরোয়া আড্ডায় উপস্থিত হল অনীকদা। দিনটা ৩১ জুলাই ২০১৯। কথায় কথায় উঠে এল কলকাতার রাস্তায় যত্রতত্র মূর্তি বসানোর প্রবণতা। ‘সল্টলেক স্টেডিয়ামের সামনে ওই কুৎসিত মূর্তিটা ভাঙা উচিৎ’, বলেছিল অনীকদা সেদিন সন্ধ্যায়। সাত বছর লাগল সেটাকে উৎপাটন করতে। জানি না, তুমি দেখে গেলে কি না দাদা…

COPD-এর সমস্যা অনীকদাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। কোন একটা কাজে একবার বোলপুর যাওয়ার টিকিট কাটা হল। দেখি রাতের বেলা ফোন। বুঝতে পারছি নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। টিকিট ক্যানসেল করতে হল। কোভিডকালে তৈরি হয়েছিল ‘বরুণবাবুর বন্ধু’। পাঠভবনকে ভোলেনি অনীকদা। একটা লম্বা দৃশ্য জুড়ে স্কুলের গাড়ি বারান্দা। তার মধ্যে সেই ছবির মধ্যমণি আবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পিনাকী এই ছবির সঙ্গে জড়িত থাকায় তার কাছ থেকে রোজ গল্প শুনি। একদিন মজা করে বলল ‘জানো তো, অনীকদা এত টেনশন করে, ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন নাম হয়েছে ‘প্যানিক দত্ত’!
অনীকদার সঙ্গে এর মাঝে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে এদিক ওদিক। দেখলেই বোঝা যেত শরীরটা ঠিক নেই। হয়তো বা মনও। কোনওরকমে শেষ হয়েছিল ২০২৫ সালে ‘যত কাণ্ড কলকাতায়’-এর কাজ।
২০২২। পাঠভবন আর রায়বাড়ির সম্পর্ক সর্বজনবিদিত, এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। অনীকদার মনের মাঝে যে মানুষটা আশৈশব ছাপ ফেলেছিলেন তিনি অবশ্যই সত্যজিত, এবং এই বোধ থেকেই ওরকম মাপের একজন মানুষের বায়োপিক বানানোর সাহস দেখাতে পারে অনীকদা। আমাদের প্রাক্তন মাস্টারমশাই এবং স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সত্যজিতের এক দীর্ঘ কথোপকথনের সূত্র ধরে ‘অপরাজিত’–র কাহিনি ডালপালা মেলে। সাদাকালো ক্যানভাস জুড়ে অনীকদা এক ইতিহাসকে তুলে আনে সবার সামনে।
একটা ঘটনা মনে পড়ল। ওই সময়ে কোনও একদিন গিয়েছিলাম সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। সুশান্তদা গ্রামোফোন রেকর্ডের সংগ্রাহক, এবং এই ব্যাপারে চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া। রাতে শুতে যাওয়ার আগে একখানা পোস্ট করেছিলাম ফেসবুক। পরের দিন সকাল সাতটায় ফোনে অনীকদা। কী ব্যাপার? ‘অপরাজিত’-এর prop নিয়ে তখন কাজকম্ম চলেছে। সত্যজিৎ পঞ্চাশের দশকে নাকি কিছু লং প্লেয়িং রেকর্ড সংগ্রহ করেছিলেন, যা তখন সদ্য চালু হয়েছে বিলেতে। ছবিতে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সত্যজিতের বৈঠকখানায় দেখা যাবে, সেরকম কিছু রেকর্ড। তাই খোঁজ চলছে সেরকম জ্যাকেটের ছবি। একেই বলে সত্যজিতের যোগ্য শিষ্য। ছবির খুঁটিনাটি নিয়ে no compromise।

ফোনে একদিকে অনীকদা অপর পারে সুশান্তদা– মাঝে আমি; দুই গ্রহের মাঝে এক স্যাটেলাইট!
অনীকদার সঙ্গে এর মাঝে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে এদিক ওদিক। দেখলেই বোঝা যেত শরীরটা ঠিক নেই। হয়তো বা মনও। কোনওরকমে শেষ হয়েছিল ২০২৫ সালে ‘যত কাণ্ড কলকাতায়’-এর কাজ।
বোলপুরে এক নিঃসঙ্গ আস্তানায় পাওয়া যায় তাঁর প্রাণহীন দেহ। সেদিন বহু রাতে আসে অনীকদার ফোন। ভাঙা, জড়ানো গলা। ‘করুণাময় চলে গেল?’ বুঝলাম সতীর্থের মৃত্যু মানতে পারছে না অনীকদা।
ডিসেম্বর মাসে এক সন্ধ্যায় চলে যায় আমাদের আরেক পাঠভবন প্রাক্তনী করুণাময় শুর। বোলপুরে এক নিঃসঙ্গ আস্তানায় পাওয়া যায় তাঁর প্রাণহীন দেহ। সেদিন বহু রাতে আসে অনীকদার ফোন। ভাঙা, জড়ানো গলা। ‘করুণাময় চলে গেল?’ বুঝলাম সতীর্থের মৃত্যু মানতে পারছে না অনীকদা।
সেদিনের পর তোমার সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি অনীকদা। আর, এখন তো তুমি এসব থেকে অনেক দূরে। ভালো থেকো দাদা। তোমাদের মতো মানুষদের আরও বেশি দিন বাঁচা প্রয়োজন তাহলে হয়তো আমাদের মতো মানুষদের বাঁচার পথটা খানিক সহজ হয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
2 Responses
খুব ভালো লাগলো ।
Very nicely written!