(Bengali Lifestyle)
একদল মানুষ লড়ে যাচ্ছে তাদের মতো করে। জীবনবোধ চেতনায় শিক্ষায় দরদে মরমে সব মিশে এখনও কোথাও কোনও আশা দেখতে পেয়ে নিজেকে বয়ে নিয়ে চলেছেন। আগে এরা সামগ্রিকভাবে একসঙ্গে দলমতনির্বিশেষে মিশে যেতেন, চলতেন। কিন্তু এই মুহূর্তের সামাজিক স্ট্রাকচার তাঁদের দূরে পাঠিয়ে দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে উগ্র, নীতিহীন, লাম্পট্যপ্রিয়, সস্তা, দ্বিধাহীন দিশাহীন কিছু জনৈক কেমন একটা দল বেঁধে হইচই করে চলেছে। শুধু হইচই নয়, তারা জীবনবোধের পাঠও পড়াচ্ছে। একা এবং কয়েকজন, ব্যস আর কেউ নেই, কারণ ক্ষমতা আর টাকার এক অসম বণ্টন আজ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
একজন মাষ্টারমশাইয়ের কথা শুনতে পান? একজন ফিজিক্স বা মাথেমাটিশিয়ান? নাহ এইসব টার্মগুলো আর নেই। একজন হিস্টোরিয়ান? না! সারাদিন শুধু ক’টা বিয়ে, কার সঙ্গে বিয়ে, আইটেম সং, বাচ্চা হবে কি না এই নিয়ে বেশিরভাগ মানুষ ব্যস্ত! এইসব খবরের লক্ষ লক্ষ ভিউ। যদি এসব এড়িয়ে যেতে চান তাহলে পারবেন না, সারাক্ষণ সুড়সুড়ি দিচ্ছে এই কুৎসিত কিছু লোকের উপর অর্বাচীন কিছু লোকের বিশ্বাস।
আরও পড়ুন: বিশ্বাসে মিলায় মাইক, পালটি বহুদূর
The high destiny of the individual is to serve rather than to rule। আইনস্টাইন মানুষের উদ্দেশ্যে বলছেন। এখন সম্পূর্ণ উল্টে গিয়ে শুধু রুল আর রুল করার ইচ্ছে। দেশ না হলে রাজ্য, রাজ্য না হলে জেলা, ফাইনালি কিছু না হলে পাড়া বা যে ক’জন আছে তাদের কাছে আমি মাতব্বর। যদি এই সময় রবীন্দ্রনাথ মারা যেতেন, গভীর সাধনায় তাঁকে যারা নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন, তাঁরা তাঁর ধারেকাছেও যেতে পারতেন না। কিছু ফেসবুকীয়, অর্বাচীন অশিক্ষায় ক্ষমতাধর, অথবা ক্ষমতার পা-চাটা রাজনীতির আখড়ায় পোড়খাওয়া পিশাচ, আমাদের রোবিন্দনাথ আমাদের রোবিন্দনাথ বলে তাঁকে দখল করে ক্ষমতা দেখাতেন।

একটু সিরিয়াস, একটু গভীরভাবে কেউ কিছু চাইলে সে ছিটকে পড়ছে, উঠে দাঁড়াতে সময় চলে যাচ্ছে। নাহ্, আর সে আশা পাচ্ছে না। যখন সব জলাঞ্জলি যাচ্ছে, ‘ন্যাংটোর নেই বাটপারের ভয়’ -এর মতো এদিক-ওদিক একে-ওকে ধরে জলের ওপরে নাক তুলে নিশ্বাস নিচ্ছে, বাকিরাও বুঝছে এছাড়া গতি নেই। লে ঝুলে পড় ক্ষমতার কোমর ধরে, তারপরে একটা জায়গা পেয়ে সে-ও শুরু করছে দাদাগিরি, এ এক অদ্ভুত লুপ।
“The intellect has a sharp eye for methods and tools, but is blind to ends and values.”
তা হলে কে আমি? এতদিন কী করলাম? তাই রিল দেখি, অন্যে কী করল দেখি। কারণ এতে চিন্তা নেই, মুক্ত মনে দেখা যায়। Unknown variable খুঁজে বের করতে হয় না, অঙ্ক না মেলাবার ভয় নেই।
সন্ধ্যে নামছে বিস্তীর্ণ জীবন চরাচরে, ফেলে আসা জীবনের গন্ধে এখনও ঘুম আসে, তবুও সামনে পথ পড়ে আছে। অস্তিত্বের সংকট, ক্ষমতার লোভ আমাকে নিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের গভীর জঙ্গলে, যা পাল্টে যায়নি কয়েক লক্ষ বছরে। যারা জেগেছিল, যারা ঝুলে পড়তে পারছে না অন্যের কোমর ধরে, তারা ঘুমিয়ে পড়ছে। তাই অন্ধকার আরও দুর্ভেদ্য হচ্ছে। তবে বিচ্ছিন্নভাবে লড়ে যাচ্ছে তাদের মতো করে। সেখানে কমিউনিটি তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তাদের ভাবভাবনার বিচ্ছুরণ ঘটছে না একটা আপাত সস্তা বয়ে চলা জগতে।

যদি এটাই সত্যি হয়, তাহলে সত্যি জীবনকে সহজভাবেই বয়ে নিয়ে চলা উচিত। যে জীবন দোয়েলের ফিঙের, সেই জীবন তো যা চাষির, তা-ই শাহরুখ খানের, তা-ই রবীন্দ্রনাথের। তফাত শুধু বাড়ি, গাড়ি, বিছানা এবং ভাবনায়। সেই ভাবনা নিয়ে যে যেমন ভাবে খুশি থাকুক। আমি আমার স্কেলে খুশি, রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্কেলে। তাহলে হাতে রইল ফাইনালি ইন্টেলেক্ট, যা থাকলেও ভাল, না থাকলেও জীবনপ্রবাহে কোনও ক্ষতি নেই।
অঙ্কের মানুষ ভাবেন অঙ্ক ছাড়া দুনিয়া অচল, সাহিত্যের মানুষ সাহিত্য, মুশকিল হয়ে যায় যখন রুচিহীন প্রায় অগভীর মানুষ ভাবেন তিনি যা করছেন তা ছাড়া দুনিয়া অচল, এবং ক্ষমতাধর লোক তাঁর পেছনে আছে বলে তিনি একটি উচ্চতায় পৌঁছে যাচ্ছেন— মুশকিল হয়ে যাচ্ছে সেখানে। তখন দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। আসলে অশিক্ষা। যেখানে শিক্ষা পৌঁছতে পারছে না, তা-ই ছেয়ে যাচ্ছে সস্তা, বাজারি, ছ্যাবলামোতে। সিস্টেম মেনে নিচ্ছে ওগুলোই। না মূল্য আছে মিনিমাম ভাল ভাবনার না আছে কাজের কদর। অস্তিত্ব আর বেঁচে থাকার সংকট আমাদের শেষে দেখিয়ে দিচ্ছে ছুঁড়ে ফেলা মৃতদেহটি আমার, একটু পরেই সমবেত আনন্দ, মৃত্যুশোক বিগতপ্রায় জাস্ট কয়েক ঘণ্টায়।

তা হলে কে আমি? এতদিন কী করলাম? তাই রিল দেখি, অন্যে কী করল দেখি। কারণ এতে চিন্তা নেই, মুক্ত মনে দেখা যায়। Unknown variable খুঁজে বের করতে হয় না, অঙ্ক না মেলাবার ভয় নেই। গভীর সাহিত্য খুঁড়ে ইতিহাস মেনে মস্তিষ্ককে সচল রাখার প্রয়োজন নেই। তাই আমিও যেভাবে বেঁচে আছি, শাহরুখ খানও সেভাবেই বেঁচে আছে। তফাত শুধু স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু আমার স্কেলে আমি স্বপ্ন দেখি, শাহরুখ তাঁর স্কেলে। দুজনেরই নিশ্চয় অপূর্ণতায় বিষণ্ণতা আসে। আনন্দের ব্যাপার, সেটাও যে যার মতো স্কেলে। বিষন্নতাও তাই।
বরং একপাল আরশোলা একটা পাখিকে এমন তাড়া করবে, শির উঁচিয়ে চিত্তে প্রবল ভয় নিয়ে পাখিটাই বলবে আরে আমিও আরশোলা, আমি তোমাদেরই দলে। আরশোলাকে প্রচুর লোক তালি দেবে।
কেউ নেই বলে দেওয়ার যে, যখন কিছু করার নেই, তখন শান্ত হয়ে কোথাও বসতে হয়। কিন্তু করার কিছু নেই সেটাই তো নেই। সব সময় কিছু করতে হবে এই অবস্থায় এখন দাঁড়িয়ে আছি কোটি কোটি পিঁপড়ের মতো আমরা। এই কোটি কোটি আমরা সর্বক্ষণ কিছু করে চলেছি, এমনটা প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে আছি। তাতে ক্ষমতা এলে দু-চারজন জো হুকুম করবে, না হলে পিঁপড়ের মতো পিষে মরবে, যে মারবে সে বুঝতেও পারবে না। মুশকিল হয়ে যাচ্ছে এই যে স্কেলটা এক হয়ে যাচ্ছে, না গেলেও ভাবছে আমি আপনি তেন্ডুলকর, হকিং, রবীন্দ্রনাথ, কপিল দেব সবার স্কেল এক। এখানেই পেঁচা কয় পেঁচানি, খাসা তোর চেঁচানি। কারওর আর মুক্তি নেই পেঁচার চ্যাঁচ্যানি থেকে। আরশোলাও পাখি, খরগোশও হাতি আর শেয়ালও বাঘ।

আগে এগুলো ভাবলে মুশকিল হয়ে যেত, কানমলা দেওয়ার লোক ছিল। এখন ভাবলে আর অসুবিধে নেই। কানমোলা দেওয়ার কেউ নেই। বরং একপাল আরশোলা একটা পাখিকে এমন তাড়া করবে, শির উঁচিয়ে চিত্তে প্রবল ভয় নিয়ে পাখিটাই বলবে আরে আমিও আরশোলা, আমি তোমাদেরই দলে। আরশোলাকে প্রচুর লোক তালি দেবে। আবার আরশোলা বেরোবে পাখি ধরতে, আর পাখিরা আরশোলাকে সম্মান দিতে। ব্যস, সব মিটমাট, জীবন সর্টেড।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত