(Bus Ticket)
এমন একটা সময় গেছে, যখন কলকাতার বেসরকারি বাসমালিকদের আর্থিক অনটনের ছাপ পড়েছিল তাঁদের বাস টিকিটে। সম্প্রতি ইজরায়েল-ইরানের যুদ্ধ আবহে আন্তর্জাতিক স্তরে পেট্রোল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশের মতো আমাদের দেশেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মোকাবিলা নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা চলছে। জ্বালানির দাম ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম। গৃহস্থের কপালে ভাঁজ পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বেসরকারি বাসমালিকদের কপালেও। তাই, এবার ভাড়া না বাড়িয়ে উপায় নেই।
এমন অবস্থা যে এই প্রথম, তা তো নয়। বিগত পঞ্চাশ-ষাট বছর কি তার আগের কথাই যদি ধরি, তাহলে দেখব, এমন অবস্থা আগেও একাধিকবার ঘটেছে। সমস্যার মোকাবিলা করতে বাসমালিকরা ভাড়া যতটা বাড়াতে চায়, সরকারপক্ষ ততটা বাড়াতে রাজি হয় না। সরকারের যুক্তি, ভাড়া বেশি বাড়ালে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষের অসুবিধা হবে, আবার বাসমালিকদের যুক্তিও ফেলার নয়। বাসের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রাংশ, টায়ার, মোবিল ইত্যাদি সবকিছুর দামই উর্ধ্বমুখী, ফাটা চাকায় তাপ্পি লাগিয়ে আর কতদিন চালানো যায়! মাঝে মধ্যেই অফিসটাইমে খানাখন্দে ভরা রাস্তায় হঠাৎ টায়ার ফেটে সে এক কেলেঙ্কারি। এর জেরে বাস ড্রাইভার, কন্ডাক্টরের সঙ্গে অফিসমুখী যাত্রীদের ভাড়া ফেরতের হিসাব নিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড বেঁধে যায়।
ফলে বাসমালিকদেরও খরচ বাঁচানোর নানা উপায় খুঁজতে হয়। যেমন রোজকার বাসের নির্দিষ্ট ট্রিপ কমিয়ে আনা। অনেকক্ষণ পরপর বাস ছেড়ে, ঠাসাঠাসি করে, একই বাসে প্রায় দেড়খানা বাসের যাত্রী তুলে, বাসের ভিতরে যতগুলি লাইট জ্বলে তার অর্ধেক নিভিয়ে রেখে। আর একটা নতুন জিনিস তাঁরা চালু করেছিলেন, তা হল টিকিট ছাপানোর বিষয়ে। নতুন পরিষ্কার কাগজে টিকিট না ছাপিয়ে, সরকারি-বেসরকারি অফিসের ওজনদরে বিক্রি হওয়া পুরনো বাতিল কাগজে টিকিট ছাপিয়ে ছাপার খরচ কমানো।
যতদূর মনে পড়ে, ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সাল বা তার কিছু আগে-পরে এই টিকিট ছাপা শুরু হয়। এই ধরনের টিকিটগুলো যে কতরকমের হত, তার কোনও ঠিক ছিল না। দেখলে অবাক লাগত, হাসিও পেত। এমনই অবাক করা বহু টিকিট আজ আমার সংগ্রহে। তাদেরই কয়েকটি ভাগে ভাগে দেখে নেওয়া যাক।
(১) খুবই কম দামের পাতলা কাগজ, যার দুই পিঠই সাদা (কখনও বা দুয়েকটি অন্য হালকা রং-এর)। তারই এক পিঠে ছাপানো হয়েছে।

(২) পিছনদিকে লেখা টাইপ করা বা অন্য কিছু ছাপা আর সামনের দিকে টিকিট ছাপা।

(৩) এ ভারি অদ্ভুত টিকিট, যার দুপিঠেই কিছু না কিছু ছাপা আছে। তার উপরেই টিকিট ওভারপ্রিন্ট করা।

(৪) দেখে মনে হয়, এ যেন নানান বিজ্ঞাপনের টুকরো অংশ

সাধারণ আমজনতার কাছে ট্রাম-বাসের টিকিট হল ‘Use and Throw’ গোছের একটা জিনিস, যতক্ষণ গাড়িতে আছে, ততক্ষণই তার মূল্য। গাড়ি থেকে নামলে আর কোনও দাম নেই। কাজেই টিকিট কী কাগজে ছাপা হচ্ছে, বা তার মান কীরকম, তাতে কারওর কিছু যায় আসে না। অধিকাংশ যাত্রীই তাই মনে করেন। কিন্তু আমরা দেশে তো বটেই, বিদেশ ভ্রমণে গেলেও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের সুন্দর সুন্দর এন্ট্রি টিকিটগুলি সঙ্গে রেখে দিই। আবার, সেইসব দেশের নানা পরিবহনের টিকিটগুলিও যত্ন করে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের দেখাবার জন্য। একইভাবে বিদেশিরাও ভারত ভ্রমণে এসে নানা দর্শনীয় স্থানের এন্ট্রি টিকিটের সঙ্গে সঙ্গে গণপরিবহনের টিকিটও সযত্নে রেখে দেন।
একবার ভাবুন তো, দেশে ফিরে ভারত ভ্রমণের স্মৃতি হিসাবে তাঁরা যখন এমন সব বাসের টিকিট তাঁদের নিকটজনদের দেখাবে, তখন এই দেশ সম্পর্কে তাঁদের কেমন প্রতিক্রিয়া হবে! আমাদের পরিবহনের দৈন্যদশা কীভাবে তাদের মানসচক্ষে ফুটে উঠবে। এ আমাদের ভারি লজ্জার বিষয়। কিন্তু উপায়ও তো নেই!
টিকিট হাতে পেয়েই সেই বিদেশি পর্যটকদের ‘চক্ষু চড়কগাছ’। ভাবখানা এমন যে ‘এ আবার বাসের টিকিট নাকি’। বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তারা কতবার যে দেখল, আর নিজেদের মধ্যে হাসতে হাসতে কত কী বলল, তা বুঝতে পারলাম না।
এমনই একটি ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলাম আমি নিজেই। একবার কলকাতার দক্ষিণে গড়িয়া থেকে একটি বেসরকারি বাসে উঠেছি। গন্তব্য ডালহৌসি পাড়ায় আমার অফিস। বাস কালীঘাট আসার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু যাত্রী বাসে উঠে পড়ল। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিদেশি পর্যটক, সঙ্গে এদেশের একজন গাইড। গাইডবাবুর কাছেই জানা গেল, তাঁরা চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, মনুমেন্ট, ভিক্টোরিয়া ইত্যাদি ইতিমধ্যেই দেখে নিয়েছেন। এবার সকাল সকাল বেরিয়ে পরে দু-একটি জায়গা দেখে, সোজা কালীঘাট স্টপেজে নেমে, ট্রাম ডিপোর পাশেই গ্রিক চার্চ দেখে, উল্টোদিকে কালীঘাটের বিখ্যাত কালীমন্দির দর্শন করে যাবেন ধর্মতলার নিউ মার্কেটে।
যথাসময়ে কন্ডাক্টর তাঁদের ভাড়া নিয়ে এমনই কয়েকটি টিকিট ধরিয়ে দিল গাইডবাবুর হাতে। তিনি আবার সেগুলি পর্যটকদের হাতে হাতে দিয়ে দিলেন। আমরা আশেপাশের যাত্রীরা যেমন ইতিমধ্যেই পেয়েছি, এবং এই ধরনের টিকিটে ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
তাঁদের মধ্যে দু-একজন বেশ যত্ন করে তাদের টিকিটটি মানিব্যাগের ভিতরে রেখে দিল। বুঝতে অসুবিধা হল না, তাঁরা দেশে ফিরে এমন অদ্ভুত ও হাস্যকর বাস টিকিট সবাইকে দেখাবে, আর হাসিঠাট্টায় মাতবে।
কিন্তু টিকিট হাতে পেয়েই সেই বিদেশি পর্যটকদের ‘চক্ষু চড়কগাছ’। ভাবখানা এমন যে ‘এ আবার বাসের টিকিট নাকি’। বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তারা কতবার যে দেখল, আর নিজেদের মধ্যে হাসতে হাসতে কত কী বলল, তা বুঝতে পারলাম না। তবে এটুকু বুঝলাম, তাঁরা হয়তো বলতে চাইছেন— এমন বাসের টিকিট তাঁদের বাপের জন্মে দেখেনি। তাঁদের মধ্যে দু-একজন বেশ যত্ন করে তাদের টিকিটটি মানিব্যাগের ভিতরে রেখে দিল। বুঝতে অসুবিধা হল না, তাঁরা দেশে ফিরে এমন অদ্ভুত ও হাস্যকর বাস টিকিট সবাইকে দেখাবে, আর হাসিঠাট্টায় মাতবে।
আমরা পড়লাম লজ্জায়। কিন্তু সংকটকালে এমন বিকল্প ব্যবস্থা আমরা তো সকলেই মেনে নিয়েছিলাম। এতে কারওর দোষ নেই। কারণ এমন ব্যবস্থা আমজনতার সুবিধার জন্যই। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হয়, গত শতক থেকে এই শতক পর্যন্ত বাংলার পরিবহন ব্যবস্থার খণ্ডচিত্র টিকিটের চেহারাতেই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
2 Responses
Wonderful!
খুবই ভালো লাগলো, এতগুলো তথ্য যত্ন সহকারে সংগ্রহ করা মুখের কথা নয়। আরো এমনি লেখা পাঠানোর জন্য অনুরোধ রইল। আপনাকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন দাদা। অপেক্ষায় রইলাম।