(Nihar Ranjan Gupta)
সুঠাম পুরুষালি দেহ। পরনে ধুতি পাঞ্জাবি। মাথা ভর্তি সেই কোঁকড়ানো চুলের মালিক এক মনে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে চলেছেন। আয়নায় নিজের অবয়ব দেখেই বিস্মিত হচ্ছেন। তাঁর চোখেমুখে পুরু লেন্সের সেলুলয়েড চশমা। কালো ফ্রেম। অবিকল সাহিত্যের পাতা থেকে উঠে আসা কোনও চরিত্র। আয়নায় যিনি অবয়ব দেখছেন, তাঁর নিজেকে নিজেরই সৃষ্ট চরিত্রের মতো দেখতে লাগছে।
কিরীটী রায়কে তাঁর স্রষ্টা ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তের মতোই দেখতে। সচেতনভাবেই হয়তো কিরীটী রায়ের এই অবয়ব তিনি সৃষ্টি করেছিলেন। ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তর সেজ মেয়ে স্মৃতিচারণায় বলেছেন ‘বাবার বর্ণনায় কিরীটী রায় যেমন, বাবা নিজেও অনেকটা তেমনই দেখতে ছিলেন। হয়তো সচেতনভাবেই এমনটা সৃষ্টি করেছেন। বাবার মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল। কিরীটীর চোখে পুরো লেন্সের সেলুলয়েড চশমা। বাবাও ঠিক তাই।’
আরও পড়ুন: ঠাঁই মেলেনি সহজে: বাংলা সাহিত্যে নারী গোয়েন্দাদের কথা
ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্ত। পেশায় চিকিৎসক, নেশায় লেখক। গোয়েন্দা কিরীটীর স্রষ্টার গোয়েন্দা কাহিনি লেখার ইচ্ছেকে জাগিয়ে দিয়েছিলেন আরেক কিংবদন্তী লেখক আগাথা ক্রিস্টি। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি আগাথা ক্রিস্টির বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। সেখান থেকে ফিরে এসেই রচনা করেছিলেন কিরীটী রায়ের প্রথম উপন্যাস ‘কালো ভ্রমর’।

১৯১১ সালের ৬ই জুন বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলার নড়াইলে জন্ম নীহাররঞ্জন গুপ্তর। গ্রামের নাম ইটানা। বাবা সত্যরঞ্জন গুপ্ত। মা লবঙ্গলতা দেবী। বাবার ছিল বদলির চাকরি। ফলে বারবার স্কুল বদলাতে হত নীহাররঞ্জনকে। তবে শৈশবের বড় অংশ কেটেছিল নড়াইলে। পরে কলকাতায় পরিবারসমেত চলে আসেন। বাংলাদেশে যাতায়াত ছিল। ১৯৩০ সালে কোন্নগর হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর পাকাপাকিভাবে কলকাতায় বসবাস শুরু। কৃষ্ণনগর সরকারি কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় পাস করেন নীহাররঞ্জন। তারপর কলকাতার কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজে (বর্তমানে আর জি কর) ভর্তি হন।
চিকিৎসক হওয়ার চেষ্টার পাশাপাশি লেখালিখি ছিল তাঁর নেশা। নিজের প্রিয় বোনকে হারিয়েছিলেন একটি বিছের কামড়ে। বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিলেন সেই বোন। বোনের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে আহত করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য তখন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন তিনি। এরপর ইংল্যান্ডে গিয়ে মেডিকেল সায়েন্সে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও মানুষের সেবা করার ব্রত নিয়ে সেনা চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছিলেন। চট্টগ্রাম, বার্মা, মিশরসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কবিগুরুর সই এবং আশীর্বাদ নিয়েই লেখালেখির জীবনে পথ চলা শুরু করেন।
ভালবাসার কারণে এই দুই নারীর এমন মৃত্যু ডাক্তার গুপ্তকে রহস্য কাহিনি লেখার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তারপর আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে দেখা হওয়া, সব মিলিয়ে জন্ম হয় কিরীটী রায়ের মতো বুদ্ধিমান গোয়েন্দার।
মাত্র আঠারো বছর বয়সেই লিখেছিলেন প্রথম উপন্যাস ‘রাজকুমার’। প্রকাশিত হতেই যথেষ্ট প্রশংসিত হয়। এরপর ইংল্যান্ড থেকে ভারতে ফিরে রচনা করেছিলেন তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাস ‘কালো ভ্রমর’। গোয়েন্দা কিরীটীর জন্ম হয় এই উপন্যাসের হাত ধরে। তবে পরবর্তীকালে, কিরীটী রায়কে নিয়ে আরও উপন্যাস লেখার মূলত দুটি কারণ ছিল। তাঁর জীবনে দেখা দু’টি ঘটনা ডাক্তার নীহাররঞ্জনকে যাবতীয় রহস্য কাহিনি লেখার জন্য প্রাণিত করেছিল। দু’টি ঘটনাই ঘটে তাঁর পাড়ায়।
এক পুরনো বাড়িতে একদিন নিস্তব্ধ দুপুরে বাড়ির বধূ খুন হয়ে যায়। তাকে হত্যা করেছিল তার দেওর। বিধবা, অন্তঃসত্ত্বা বৌদিকে খুন করে দেওর নিজেও আত্মহত্যা করে। ছেলেটি যক্ষ্মায় আক্রান্ত ছিল। ছোটবেলায় আরেকটি মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। এক নারীর আত্মহত্যা। দুটি ঘটনার কেন্দ্রেই ছিল প্রণয়ঘটিত সমস্যা। ভালবাসার কারণে এই দুই নারীর এমন মৃত্যু ডাক্তার গুপ্তকে রহস্য কাহিনি লেখার দিকে টেনে নিয়ে যায়। তারপর আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে দেখা হওয়া, সব মিলিয়ে জন্ম হয় কিরীটী রায়ের মতো বুদ্ধিমান গোয়েন্দার।

লক্ষ করলে দেখা যায়, কিরীটী রায়ের বেশিরভাগ রহস্য কাহিনিগুলি প্রণয়, ভালবাসা এবং সম্পর্কজনিত জটিলতাকে কেন্দ্র করে রচিত। প্রায় দুশোটিরও বেশি উপন্যাস লিখেছেন ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্ত। পঁয়তাল্লিশটিরও বেশি উপন্যাস থেকে তৈরি হয়েছিল সিনেমা। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক গল্প এবং উপন্যাস লেখক হিসেবেই আমরা তাঁকে চিনি। কিন্তু শিশুসাহিত্য লেখার দিকে তাঁর বড় ঝোঁক ছিল। ‘সবুজ সাহিত্য’ নামে একটি শিশুতোষ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন।
চিকিৎসা, লেখালেখির পাশাপাশি বেড়াতে বড় ভালবাসতেন। সপ্তাহের ছয় দিন চিকিৎসা, পুজোপাট নিয়েই সময় কাটাতেন। ধর্মতলায় চেম্বার ছিল তাঁর। তবে রবিবার সকাল হলেই অস্থির হয়ে উঠতেন লেখক। এক সর্দারজি ছিলেন তাঁর গাড়ির ড্রাইভার। সর্দারজির আসার অপেক্ষায় বসে থাকতেন লেখক। খাওয়ার বিষয়ে শৌখিন ছিলেন। ইলিশ মাছ খেতে খুব ভালবাসতেন। আর ভালবাসতেন আড্ডা দিতে। মাঝে মাঝেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন আড্ডা দিতে।
চার কন্যাসন্তানের গর্বিত পিতা ছিলেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত। সে সময় চারটি কন্যা সন্তানের পিতা বলে কেউ মজা করলে রেগে উঠতেন রীতিমতো। বোনেরা এবং কন্যারা বড় আপন ছিল।
সাহিত্য মহলের আড্ডার তখন খুব জনপ্রিয়তা। রবিবার কখনও কখনও ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তের গোলপার্কের বাড়িতেই বসত সাহিত্য আড্ডার আসর। বাড়ির নাম ছিল ‘উল্কা’। স্রষ্টার একটি গল্পের নামেই বাড়িটি। আবার, কখনও কখনও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতেও বসত আড্ডাচক্র। দুপুরের খাবার ভুলে শুধু মুড়ি চানাচুর মেখে সন্ধে পর্যন্ত চলত আড্ডা। টালা পার্কে তারাশঙ্করের সেই বাড়িতে বসে সেই সময়ের জনপ্রিয় সব সাহিত্যিকরা নিজেদের লেখার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতেন।
সাধারণত দুপুরবেলাটুকুই নীহাররঞ্জনের লেখার জন্য বরাদ্দ থাকত। সেই সময় বাড়িতে কথা বলাও পছন্দ করতেন না। এমনকি লেখার ঘরে বাড়ির লোকের প্রবেশেও বাধা থাকত। তাঁর সৃষ্ট বহু চরিত্রই তাঁর ব্যক্তিগত জীবন থেকে নেওয়া। যেমন, তাঁর গাড়ির ড্রাইভার সর্দারজি অনেকটাই কিরীটী রায়ের গাড়ির চালক হীরা সিংহের মতো। লেখকের প্রিয় পোষ্যের নাম ছিল জ্যাকলিন।

চার কন্যাসন্তানের গর্বিত পিতা ছিলেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত। সে সময় চারটি কন্যা সন্তানের পিতা বলে কেউ মজা করলে রেগে উঠতেন রীতিমতো। বোনেরা এবং কন্যারা বড় আপন ছিল। তবে কেউ পুত্রের কথা বললে নিজের মানসপুত্রের কথা উল্লেখ করতেন। কে সেই মানস-পুত্র? গোয়েন্দা কিরীটী রায়। কিরীটী রায়ের বিষয়ে ভারি আবেগপূর্ণ মনোভাব ছিল তাঁর। স্বয়ং উত্তম কুমারকেও এই চরিত্রের জন্য ফিরিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি তিনি।
কিরীটী রায়ের চরিত্রে অভিনয় করতে চেয়ে একবার উত্তম কুমার নিজে নীহাররঞ্জনের বাড়ি আসেন। প্রস্তাবটি সরাসরি স্রষ্টা ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তকেই দিয়েছিলেন। সহানুভূতিশীল মনোভাবাপন্ন, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী গোয়েন্দা কিরীটী রায়ের চরিত্রে অভিনয় করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন মহানায়ক। কিন্তু স্বয়ং স্রষ্টার তাঁকে এই চরিত্রের জন্য পছন্দ ছিল না! উত্তম কুমারকে বাড়িতে দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছিলেন নীহাররঞ্জন। যথাসাধ্য আপ্যায়ন করে খেতে দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজি হননি উত্তম কুমারের প্রস্তাবে। ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মহানায়ককে। আসলে উত্তম কুমার নয়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দ ছিল তাঁর। যদিও তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীকালে কিরীটী রায়কে পর্দায় দেখা গেছে। অনেক অভিনেতাকেও পাওয়া গিয়েছিল এই চরিত্রে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, সাহিত্যের সেই সুবাস কেউ ছুঁতে পারেননি।
সাহিত্যের প্রতি নিবেদিত প্রাণ, দক্ষ চিকিৎসক এবং নিষ্ঠাবান মানুষটি জীবনকে বরাবর নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। যে কোনও ক্ষেত্রেই প্রত্যাশাহীন থেকেছেন।
ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তের বহু উপন্যাস এবং গল্প থেকে সিনেমা তৈরি হয়েছে। আজীবন সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছেন। লেখালেখি করে গেছেন আমৃত্যু। বাংলাদেশে তাঁর বাড়িটি সাহিত্যকর্মের কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। প্রতিদিন সকালে স্নান সেরে পুজোয় বসতেন। পুজো করতে ভালবাসতেন বলে বাড়িতে গোপাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শোনা যায়, স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন মূর্তি প্রতিষ্ঠার।

সাহিত্যের প্রতি নিবেদিত প্রাণ, দক্ষ চিকিৎসক এবং নিষ্ঠাবান মানুষটি জীবনকে বরাবর নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। যে কোনও ক্ষেত্রেই প্রত্যাশাহীন থেকেছেন। তবে তাঁর সৃষ্ট চরিত্র কিরীটী রায়কে নিয়ে যতটা চর্চা হয়েছে, অন্য সাহিত্য কীর্তি সেই তুলনায় কিছুটা আড়ালেই থেকে গেছে। বিশেষ করে তাঁর শিশুসাহিত্য অনালোচিতই থেকেছে। আজকের সাহিত্যপথে শিশুসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রেও ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তের নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হোক, এমনটাই কাম্য।
তথ্যসূত্র
১. কিরীটী তত্ত্ব-প্রমথনাথ বিশী
২. কিরীটী সমগ্র- প্রথম এবং দ্বিতীয়
৩. কিরীটী-জনক নীহাররঞ্জন গুপ্ত সম্পর্কে কিছু জানা অজানা কথা – করবী সেন
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত