(Eli Cohen 16)
আর্জেন্টিনা মিশনের আগেও এলি কোহেনকে পুরোদস্তুর এক মিশনে যেতে হয়েছিল নিজেকে মোসাদের যোগ্য প্রমাণ করার জন্য। সেই মিশনেই গুপ্তচর দুনিয়ার অন্ধকার দিকেরও এক ঝলক দেখা হয়েছিল। ভিন্ন নামে ভিন্ন পরিচয়ের সেই মিশন এলিকে জানান দিয়ে গিয়েছিল, অনাগত দিনে কোন কণ্টাকীর্ণ পথ তাঁর জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে।
শুরু হল এলি কোহেন ষষ্ঠদশ পর্ব।
পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫)
‘দু’টো লোক পিছু নিয়েছে’
প্রথম ফোন থেকেই এলি বুঝলেন, যে জগতে পা রাখতে চলেছেন, তা গোপনীয়তার মোড়কে মোড়া। ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল অজ্ঞাত ভারী কণ্ঠস্বর— ‘তেল আভিভের অ্যালেনবি স্ট্রিটের ঠিকানায় কাল ঠিক সকাল সাতটায় চলে আসবে। কিছু একটা বলে বাড়ি থেকে বেরিও। কখন ফিরবে তার কিন্তু কোনও ঠিক নেই।’
যা বোঝার, তা বুঝে গেলেন এলি। এখন থেকে নাদিয়ার সঙ্গেও বুঝেশুনে কথাবার্তা বলতে হবে।
তাই পরদিন বেরনোর সময় নাদিয়া যখন জিজ্ঞাসা করল, ‘ফিরছ কখন?’, উত্তরটা তৈরি রেখেছিলেন এলি।

‘ঠিক জানি না। ওরা বলছিল শহরের বাইরে কাজ আছে। তা যদি যেতে হয় তবে দেরি হবে। কখন ফিরব তাই ঠিক নেই।’
তেল আভিভের অ্যালেনবি স্ট্রিটে সেন্ট্রাল পোস্ট অফিসের কাছে ফিকে হয়ে যাওয়া লেবু রঙের অফিস বাড়িটা খুঁজে বার করতে এলির খুব একটা অসুবিধা হল না। তিনতলায় অফিস। আর পাঁচটা গড়পড়তা অফিসের মতোই কর্মব্যস্ততা শুরু হচ্ছে। লোকেদের দ্রুত পদচারণা, নিচু স্বরে কথা। হুবহু আর পাঁচটা অফিসের মতো।
তিন তলারই একটা ঘরে নীল চোখের ইদঝাকের সঙ্গে আলাপ হল এলির। হাত মেলানোর সময়ই এলির মালুম হল লোকটা বেশ শক্তিশালী।
এক টেবিলের ড্রয়ার থেকে রাজ্যের পেন, ইরেজার, পেপার ক্লিপ ছাড়াও আরও চার-পাঁচ রকমের অফিসে ব্যবহৃত জিনিস বার করে টেবিলে ছড়িয়ে দিল ইদঝাক।
একগাল হেসে ইদঝাক বলল, ‘ইদঝাক কিন্তু আসল নামই। কোনও ছদ্মনাম-টাম নয়। আর অফিস দেখে হতাশ হয়ো না। এখনও ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারিনি। যাই হোক, কাজের কথায় আসি।’
এক টেবিলের ড্রয়ার থেকে রাজ্যের পেন, ইরেজার, পেপার ক্লিপ ছাড়াও আরও চার-পাঁচ রকমের অফিসে ব্যবহৃত জিনিস বার করে টেবিলে ছড়িয়ে দিল ইদঝাক।
‘ভাল করে দেখে নাও টেবিলের উপরে ছড়ানো জিনিসগুলো। তারপর চোখ বন্ধ করে এগুলোর নাম বলো।’
এলির এবার একটু মজাই লাগল। এই মেমোরি গেম তো সেই আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সে খেলে আসছে। তার অবসর সময়ে হবিই ছিল জানালার ধারে বসে রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলো নম্বর প্লেট মনে রাখা। ফলে ইদঝাকের দেওয়া মেমোরি গেম টেস্ট তো এলির বাঁ হাতের খেল।
হলও তাই। এলি গড়গড় করে টেবিলে ছড়ানো জিনিসগুলোর নাম নির্ভুলভাবে বলে গেলেন। আলেকজান্দ্রিয়ার গাড়ির নম্বর গোনার গল্প তো আর ইদঝাক জানে না। জানার কথাও নয়। তাই ইদঝাক তো থ।
‘তোমার স্মরণশক্তি দারুণ তো।’
চারিদিকে জিনিসপত্র, লোকজনকেও দেখতে বলল ইদঝাক। অর্থ্যাৎ প্রথম পরীক্ষায় যে পাশ, সেটা এলি বুঝে গেলেন।
তবে প্রশংসার মধ্যেই কিন্তু দ্বিতীয় পরীক্ষাটা লুকিয়ে ছিল। চারপাশের সন্দেহজনক লোক চিহ্নিত করা। ইদঝাক হাতে কলমে এই বিদ্যেটা এলিকে শেখাতে নেমে পড়ল।
‘চল, এই চত্বরটা একটু ঘুরে আসি।’
এই বলে এলিকে নিয়ে তেল আভিভের রাস্তায় নেমে পড়ল ইদঝাক।
হাঁটতে হাঁটতে এলিকে বলল, ‘একজন পাক্কা চরের প্রথম গুণ হচ্ছে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়া।’
এলি একটু অবাকই হলেন, ‘হঠাৎ এই কথা?’
অফিস থেকে বেরোতেই দু’টো লোক পিছু নিয়েছে। এমনিতে সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকলেও তুমি বুঝতে পারবে না। আর পাঁচটা পথচারীর সঙ্গে কোনও তফাৎ নেই। কোনও অস্ত্র নেই ওদের কাছে। একদম আমজনতা যা করে, তাই করছে।
গলা নিচু করে ইদজাক বলল, ‘অফিস থেকে বেরোতেই দু’টো লোক পিছু নিয়েছে। এমনিতে সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকলেও তুমি বুঝতে পারবে না। আর পাঁচটা পথচারীর সঙ্গে কোনও তফাৎ নেই। কোনও অস্ত্র নেই ওদের কাছে। একদম আমজনতা যা করে, তাই করছে।’
‘তাই নাকি? কোথায়?’
এদিক ওদিক তাকালেন এলি। কই তেমন কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না।
ইদঝাক মুচকি হাসল।
‘ওরকম করে থোড়াই কে নজর রাখছে বোঝা যাবে।’
‘তাহলে?’
‘উপায় আছে। প্রাথমিকভাবে কোথাও দাঁড়িয়ে কাগজ পড়ার ভান করো, আর আড়চোখে খেয়াল করো কে যেতে যেতে দুম করে তোমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল।’

এলি তাই করলেনও। খবরের কাগজের স্ট্যান্ড থেকে কাগজ কিনে বাস স্ট্যান্ডে এলেন। ভান করলেন কাগজ পড়ার। কিন্তু আড়চোখে খেয়াল করছিলেন পথচারীদের। হঠাৎ দেখলেন রাস্তার উল্টোদিকের পেভমেন্টে একজন লম্বামতো লোক হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল, তাঁর দিকে তাকাল, তারপর হনহন করে জনারণ্যে মিশে গেল।
অফিস ফিরে ইদঝাককে সেই কথা বলতেই সে মুচকি হাসল। একটা ক্যামেরায় তোলা কিছু ছবি এনে এলিকে দেখাল। সচকিতে এলি দেখলেন এই সব ছবি তাঁরই বাস স্ট্যান্ডে কাগজ পড়ার।
অবশ্য শত চেষ্টা করেও ইদঝাকের কথামতো দ্বিতীয় জনের কোনও খোঁজ পেলেন না এলি। যাক গিয়ে, একজনের তো খোঁজ মিলেছে।
অফিস ফিরে ইদঝাককে সেই কথা বলতেই সে মুচকি হাসল। একটা ক্যামেরায় তোলা কিছু ছবি এনে এলিকে দেখাল। সচকিতে এলি দেখলেন এই সব ছবি তাঁরই বাস স্ট্যান্ডে কাগজ পড়ার। আর কী আশ্চর্য একটা লোক তাঁরই পাশে দাঁড়িয়ে কাগজটা পড়ার চেষ্টা করছে। কই তিনি তো কিছু বোঝেননি।
ইদঝাক বলল, ‘এই হল সেই দ্বিতীয় জন। সবে মাত্র লাঞ্চে বেরিয়েছে। ফিরে এলেই আলাপ করিয়ে দেব।’
কাল সকালে মিশন শুরু হচ্ছে, এজেন্ট ০৮৮
এরপরের দুই মাস কেটে গেল ঝড়ের বেগে। সময়টা যে কীভাবে কেটে গেল একের পর এক প্রশিক্ষণে, তা এলি নিজেই বুঝতে পারলেন না। বার্তা আদানপ্রদানের সময় কীভাবে সেটাকে সাংকেতিক মোড়কে মুড়তে হবে থেকে বিভিন্ন ধরনের অ্যাথলেটিক খেলাধুলোর মতো হরেক রকমের প্রশিক্ষণ।
সবেতেই এলি তাঁর দক্ষতার পরিচয় দিলেন। ইজরায়েলি ইনটেলিজেন্সও বুঝতে পারছিল এতদিন পর সত্যি সত্যিই তারা হীরের টুকরোর খোঁজ পেয়েছে। তবে কিছু অগ্নিপরীক্ষা এখনও বাকি। সুদিনের পরীক্ষায় তো এলি হাসতে হাসতে পাস করেছে। কিন্তু যদি দুর্দিন আসে? সেই কঠিন সময়ের আঁচও তো এলিকে পেতে হবে। ফলে ঘুঁটি সাজানো হল সেই সময়ের সঙ্গে এলিকে পরিচয় করানোর জন্য।
সুখের পৃথিবী থেকে গুপ্তচরের নির্মম বাস্তবে নেমে আসার মতো ঝটকা খাওয়ার পালা এ বার এলির। গুপ্তচর দুনিয়ার এক ঝলক নরক দর্শনও হয়ে গেল তাঁর।
আর এলি? এতসব চিন্তা তাঁর মাথাতেই আসেনি। এতদিন যেসব জিনিস গোয়েন্দা গল্পে পড়ে এসেছেন, সেই জীবনেই তিনি ঢুকে পড়েছেন। মনে মনে সেই আনন্দ উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছেন। উপরন্তু নাদিয়া সন্তানসম্ভাবা। ফলে স্ত্রীকে নিয়েও চিন্তা রয়েছে।
ফলে সেই সুখের পৃথিবী থেকে গুপ্তচরের নির্মম বাস্তবে নেমে আসার মতো ঝটকা খাওয়ার পালা এ বার এলির। গুপ্তচর দুনিয়ার এক ঝলক নরক দর্শনও হয়ে গেল তাঁর।
মাস দুয়েক বাদে ইদঝাকের ঘরে ফের ডাক পড়ল। বলা হল, তাঁকে এক আপাতনিরীহ অপারেশনে যেতে হবে।
ইদঝাক যা বলল, তা সংক্ষেপে হল এরকম।
এলিকে দিন দশেকের জন্য তেল আভিভ থেকে ৬৩ কিলোমিটার দূরের জেরুজালেমে যেতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে এলিকে যেতে হবে ছদ্মনামে, ছদ্মপরিচয়ে।
কী সেই পরিচয়?
এলির নতুন নাম হবে মার্সেল ক্যুঁবো। আদতে সে মিশরীয় ইহুদি, কিন্তু এখন থাকে দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখান থেকে ট্যুরিস্ট ভিসায় ইজরায়েল বেড়াতে এসেছে। কথা বলবে ফরাসি আর আরবিতে।
অজানা শহরে পাঠিয়ে দেওয়ার আগে ইদঝাকের সতর্কবানী— ‘এরকম হতেই পারে কেউ তোমাকে চিনে ফেলল। তখন তার সঙ্গে কোনও রকমের বাদানুবাদে না গিয়ে তাকে বলবে সে চিনতে ভুল করেছে। তারপর যত তাড়াতাড়ি পার, সেখান থেকে জনারণ্যে মিশে যাবে।’
তা মার্সেলের কাজ কী হবে? কিছুই না, যতটা সম্ভব চেনা পরিচিতের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
তবে অজানা শহরে পাঠিয়ে দেওয়ার আগে ইদঝাকের সতর্কবানী— ‘এরকম হতেই পারে কেউ তোমাকে চিনে ফেলল। তখন তার সঙ্গে কোনও রকমের বাদানুবাদে না গিয়ে তাকে বলবে সে চিনতে ভুল করেছে। তারপর যত তাড়াতাড়ি পার, সেখান থেকে জনারণ্যে মিশে যাবে। মানে এক সাধারণ ট্যুরিস্টের মতো এদিক ওদিক ঘুরবে। আর একটা কথা। চোখ কান খোলা রেখে চলবে। তোমার পিছু নেওয়া হতে পারে। তোমার সামান্যতম ভুলও সব ভণ্ডুল করে দিতে পারে। কাল থেকেই তোমার মিশন শুরু।’
নাদিয়ার কথা মনে পড়ল এলির। অন্তস্বত্ত্বা স্ত্রীকে কথা দিয়েছেন এই সময় তার পাশে থাকবেন। আমতা আমতা করে এলি বললেন, ‘খুব তাড়াতাড়ি আমাদের সন্তান আসছে। সন্তান আসার পর মিশনে গেলে হয় না?’

ইদঝাকের চোয়াল শক্ত হল, ‘রাষ্ট্রীয় মিশন ব্যক্তি স্বার্থের উর্দ্ধে। কাল সকালে মিশন শুরু হচ্ছে, এজেন্ট ০৮৮।’
এজেন্ট ০৮৮। এলির শিঁরদাড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। তার মানে তিনি এখন মোসাদের এজেন্ট! স্বপ্নকে কি ছুঁয়ে ফেললেন তিনি?
ছোটবেলা থেকেই তো ‘প্রোমিজড ল্যান্ড’-এর জন্য জীবন উৎসর্গ করার কথা ভাবতেন এলি। সেই রাতের পর রাত ডিনার টেবিলে মোমবাতির আলোয় বাবার কাছে শোনা দু’হাজার বছরের এক প্রতীক্ষার কাহিনি। আজ হয়তো সেই প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে, কিন্ত ইজরায়েলের চারদিকে এখন শত্রু। এখন অরি নিধন করে বাঁচতে হবে। সব সময় অরি নিধন মারণাস্ত্র দিয়ে হয় না। দরকার হয় মগজাস্ত্রেরও। এজেন্ট ০৮৮ সেই বৃহত্তর মহাসমরেরই এক সৈনিক।
৬০-এর দশকে পশ্চিম এশিয়ায় যে ক’টা হাতে গোনা আন্তর্জাতিক হোটেল ছিল, কিং ডেভিড ছিল তার অন্যতম। এর সুবিশাল লাউঞ্জ ছিল প্রকৃতপক্ষে গোটা পশ্চিম এশিয়ার যোগাযোগস্থল।
সান্ধ্য লং ড্রাইভ আর নেটওয়ার্কিং
সব আগে থেকে ঠিক করাই ছিল। নতুন নামে পাসপোর্ট জোগাড় হয়ে গেল। তারপর ট্যাক্সি ভাড়া করে জেরুজালেম যাত্রা শুরু করলেন এলি ওরফে মার্সেল ক্যুঁবো ওরফে এজেন্ট ০৮৮। উঠলেন শহরের নামিদামি হোটেল কিং ডেভিডে।
অনেক ভেবেচিন্তেই এলির কিং ডেভিডে ওঠা। ৬০-এর দশকে পশ্চিম এশিয়ায় যে ক’টা হাতে গোনা আন্তর্জাতিক হোটেল ছিল, কিং ডেভিড ছিল তার অন্যতম। এর সুবিশাল লাউঞ্জ ছিল প্রকৃতপক্ষে গোটা পশ্চিম এশিয়ার যোগাযোগস্থল। কত যে ব্যবসায়িক আর রাজনীতির ডিল এইসব সোফায় বসে কফি খেতে খেতে হয়, তার কোনও ইয়ত্তা নেই। তাই নেটওয়ার্ক তৈরির কাজে কিং ডেভিডের লবিকে কাজে লাগানোর কথা ভাবলেন এলি।
নতুন নামে হোটেলের রেজিস্টারে সই করলেন। একদম মিশরীয়-দক্ষিণ আফ্রিকীয় পর্যটক।
ঠাঁই হল তিনতলার এক ঘরে। ঘরটা বেশ বড়। জানালা খুললে জেরুজালেমের অনেকটাই দেখা যাচ্ছে। ঘড়িতে তখন সকাল প্রায় সোয়া এগারোটা। জামাকাপড় ছেড়ে নতুন টি-শার্ট পরে বিছানায় একটু শুলেন। ক্লান্তি, অজানা টেনশনে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লেন তা এলি নিজেও জানেন না। ঘুম ভাঙল ২টো নাগাদ ডোর বেলের আওয়াজে। সাত তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে দেখেন টেলিগ্রাম হাতে হোটেলের স্টাফ দাঁড়িয়ে।
দরজা বন্ধ করে টেলিগ্রাম খুলে এলি দেখলেন ইদঝাকের টেলিগ্রাম।
এরপর বেশ ওয়েলড্রেসড হয়ে বেরোলেন, যেন দেখেই বোঝা যায় বেশ রইস পর্যটক। সন্ধ্যার পরিকল্পনা হল সিনেমা দেখা আর নাইট ক্লাবে যাওয়া। আশা করি নাইট ক্লাবে জেরুজালেমের কয়েকজন রইস কেষ্টবিষ্টুর সঙ্গে আলাপ হয়ে যাবে।
‘এখনও পর্যন্ত লা জবাব। লোকজনের সঙ্গে মেশার চেষ্টা কর। নেটওয়ার্ক বাড়াও- ওয়াই’
এলি মুচকি হাসলেন। উফ! এদের তর সয় না! একটু ভাল করে ঘুমাতেও দেবে না!
সারাদিন অবশ্য আর কিছু হল না। আরও ঘণ্টা তিনেক ঘুমিয়ে নিচে হোটেলের রেস্তোরাঁয় গিয়ে সাপার সারলেন এলি।

এরপর বেশ ওয়েলড্রেসড হয়ে বেরোলেন, যেন দেখেই বোঝা যায় বেশ রইস পর্যটক। সন্ধ্যার পরিকল্পনা হল সিনেমা দেখা আর নাইট ক্লাবে যাওয়া। আশা করি নাইট ক্লাবে জেরুজালেমের কয়েকজন রইস কেষ্টবিষ্টুর সঙ্গে আলাপ হয়ে যাবে।
পরিকল্পনামাফিক টিকিট কেটে এক হলে ঢুকেও পড়লেন। একটা ছেঁদো প্রেমের হলিউড মুভি চলছিল সেখানে। এলি অবশ্য অত ভেবে চিন্তে ঢোকেননি। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল সময় কাটানো। নাইট ক্লাব তো খুলবে রাতে। তো এই সময়টা তিনি করবেনটা কী? তাই সিনেমা হলে ঢোকা। তা মুভির এমনই হাল যে, এলির পক্ষে হলে বসে থাকা সম্ভব হল না। খানিকটা দেখার পর বেরিয়ে পড়লেন হল থেকে।
রাস্তার পাশে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক সুবেশ ভদ্রলোক বনেট খুলে ইঞ্জিন দেখছেন। গাড়িতে এক মহিলাও বসে। সম্ভবত লোকটির স্ত্রী। বোঝাই যাচ্ছে গাড়ি বিগড়েছে।
কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক ওদিক হেঁটে একটা ট্যাক্সি নিলেন।
ক্যাব চালক শুধোল, ‘যাবেন কোথায় স্যর?’
‘শহরের বাইরে চল। কোনও তাড়া নেই। একটু ঘুরব আর কী।’
সামনের আয়নায় এলিকে ভাল করে জরিপ করল ক্যাব চালক।
‘হমম। সান্ধ্যভ্রমণ। ভাল খসবে কিন্তু।’
এলি মুচকি হাসলেন।
‘কী ভাবছ ভাড়া মেটাতে পারব না?’
ক্যাব চালক আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়ি যখন শহরের বাইরে চলে এসেছে, তখন হঠাৎ এলি চিৎকার করে উঠলেন, ‘থামাও। থামাও।’
রাস্তার পাশে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। এক সুবেশ ভদ্রলোক বনেট খুলে ইঞ্জিন দেখছেন। গাড়িতে এক মহিলাও বসে। সম্ভবত লোকটির স্ত্রী। বোঝাই যাচ্ছে গাড়ি বিগড়েছে।
গাড়ি থামিয়ে চালক পিছনে তাকাল।
‘কী হল স্যর?’
বনেট থেকে মাথা তুলে ভদ্রলোকও এলিকে দেখলেন। মনে হল সুবেশ এই তরুণকে বিশ্বাস করা যায়। তারপর বললেন, দুম করে মাঝ রাস্তায় গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বনেট খুলে তাই কারণটা বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
‘আরে দেখছ না গাড়িটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। দেখা যাক, কোনও সাহায্য করা যায় কি না।’
চালক কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত।
‘ওকে বস। আপনি বলছেন তাই থামালাম। না হলে নির্জন হাইওয়েতে গাড়ি এরকম করে থামাই না।’

চালকের কথার উত্তর না দিয়ে এলি ততক্ষণে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছেন। ভদ্রলোককে নিজের পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন কী হয়েছে।
বনেট থেকে মাথা তুলে ভদ্রলোকও এলিকে দেখলেন। মনে হল সুবেশ এই তরুণকে বিশ্বাস করা যায়। তারপর বললেন, দুম করে মাঝ রাস্তায় গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বনেট খুলে তাই কারণটা বোঝার চেষ্টা করছিলেন।
ক্যাব চালক ততক্ষণে গুটি গুটি এলির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বিজ্ঞের মতো নিদান দিল ‘গাড়িতে বসে আর একবার স্টার্ট দিন তো। অনেকসময় খানিক পরে স্টার্ট নিয়ে নেয়।’
কিন্তু, কিছু হল না। মিনিট দশেক ধস্তাধস্তির পরও গাড়ি এক ইঞ্চিও নড়ল না।
‘আমি তো ঘুরতেই বেড়িয়েছিলাম। চলুন শহরে আপনাদের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসি। গাড়ি সারাইয়ের মেকানিককে খবর দিলে হাইওয়ে থেকে গাড়ি নিয়ে যাবে। খামোখা রাতে এই নির্জন হাইওয়েতে কী করবেন?’
তখন এলি প্রস্তাব দিল।
‘আমি তো ঘুরতেই বেড়িয়েছিলাম। চলুন শহরে আপনাদের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে আসি। গাড়ি সারাইয়ের মেকানিককে খবর দিলে হাইওয়ে থেকে গাড়ি নিয়ে যাবে। খামোখা রাতে এই নির্জন হাইওয়েতে কী করবেন?’
একটু দোনামোনা করে ভদ্রলোক রাজি হয়ে গেলেন।
দম্পতিদের বাড়িতে নামিয়ে এলি হোটেলে ফিরে এলেন। এই রাতে আর নাইট ক্লাবে যাওয়ার দরকার নেই। এই দম্পতিই জেরুজালেমের উঁচুতলার মানুষ।
নেটওয়ার্কিং শুরু হয়ে গিয়েছে।
তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস- ইজরায়েল-আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে- এলি কোহেন-দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) এলি বেন-হানান- আওয়ার ম্যান ইন দামাস্কাস-এলি কোহেন
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত