(Bengali Share Market)
বাঙালি জীবনে শেয়ার বাজারের ব্যাপারটা নেহাতই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে গণ্য হয়েছে একসময়। বঙ্গ সাহিত্যের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, আর পাঁচটা অসাধু ব্যবসার সঙ্গে শেয়ার বিনিয়োগ বা কেনাবেচা করে দু-পয়সা কামানোর ব্যবস্থাকে কখনই ভাল চোখে দেখা হয়নি। এক টুকরো শেয়ার সার্টিফিকেট, বা কোম্পানির কাগজের ভিতরে কী এমন ঐশ্বর্য লুকিয়ে আছে, যার জন্য কেউ তাকে দশ টাকায় কিনে ১০০ টাকায় অন্য কাউকে বিক্রি করে দিতে পারে, বা হঠাৎ অপর পারের ক্রেতা তা ১০০ টাকা দিয়ে কিনতে উৎসাহী হয়— এসব জটিল এবং কূট প্রশ্নের উত্তর গত শতাব্দীর নব্বই দশকের আগে খোঁজ করবার মানসিকতা বাঙালিদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায়নি।
আরও পড়ুন: এবার ভাল থেকো অনীকদা
বরং শেয়ার বাজারের কারবারিরা যে একধরনের জুয়ায় আসক্ত ফাটকাবাজ— এ নিয়ে একটা শক্তপোক্ত জনমত গড়ে উঠেছিল। আর ‘জুয়া’-র কথা যখন এসেই পড়ল, তখন তার সূত্রে ‘জুয়াচোর’ বা ‘জোচ্চোর’ শব্দের আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারাপদ রায় বলেছিলেন ‘ভয় এবং লোভ, মানুষের এই দুই প্রবৃত্তি নিয়ে জোচ্চোরদের কারবার’। সুতরাং তাস-দাবা-পাশার সমান্তরালে শেয়ার বাজার আর রেসের মাঠ সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে ছিল গোল্লায় যাওয়া ও সর্বস্বান্ত হওয়ার কানাগলি।

আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে বাংলা কাহিনির চিত্রবীক্ষণে ধরা পড়ে ‘ব্রহ্মচারী এন্ড ব্রাদার-ইন-লস’-র ধুলিধূসরিত অফিস ঘর, যার দুই কাণ্ডারি শ্যামলাল গাঙ্গুলি এবং তাঁর শ্যালক বিপিন চৌধুরী। ‘শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড’ নামে এক কোম্পানি খুলে জঙ্গলের মাঝে পড়ে থাকা এক ভগ্নদশা মন্দির নিয়ে তারা ব্যবসা ফাঁদে। তীর্থযাত্রী আকর্ষণের সবরকম ব্যবস্থা। দর্শনী ও প্রণামী তো আছেই, তাছাড়া মহাপ্রসাদ, সেবার ফুল থেকে সুগন্ধি আর বোতলে ভরা চরণামৃত বিক্রি— সব মিলিয়ে দেদার রোজগারের ধান্দা। সঙ্গী তাদের বিখ্যাত ব্যবসাদার গন্ডেরিরাম বাটপারিয়া আর দত্ত সলিসিটরস কোম্পানির অংশীদার, দুঁদে উকিল শ্রীযুক্ত অটলবিহারী দত্ত।
কোম্পানির মূলধন দশ লক্ষ টাকা, যা দশ টাকা হিসাবে ১০০০০০ অংশে বিভক্ত অর্থাৎ এক লাখ শেয়ার; শুরু হয় নিজেদের মধ্যে শেয়ার বাঁটোয়ারা। গন্ডেরিরামের বুদ্ধি চৌখস। শেয়ার বাজারের গতিপ্রকৃতি তার দিব্য জানা আছে— জিনে তার ফাটকা বাজার। ‘লিখে লিন– ঢাই লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি হয়ে গেছে। হামি এক লাখ লিব, বাকি দেড় লাখ শ্যামবাবু, বিপিনবাবু অটলবাবু সমান হিসসা লিবেন’।

আর তারপরই লাভের ঘি ঘরে তোলার মোক্ষম দাওয়াই ‘ডরেন কেনো? শেয়ার পিছু তো অভি দো টাকা দিতে হোবে। ঢাই লাখ টাকার শেয়ারে সির্ফ পচাস হাজার দেনা হ্যাঁয়। প্রিমিয়ম মে সব বেচে দিব— সুবিস্তা হোয় তো আউর ভি শেয়ার ধরে রাখবো। বহুত মুনাফা মিলবে।… দো চার দফে হম লোগ আপনা আপনি শেয়ার লেকে খেলবো, হাঁথ বাদলাবো, দাম চড়বে, বাজার গরম হোবে, তখন সব কোই শেয়ার মাংবে, দাম কা বিচার করবে না’!
এই সোজাসাপটা বৈষয়িক বেহিসাবে বাঙালি কোনওদিনই অভ্যস্ত হতে পারেনি। ‘পাপের ধন প্রায়শ্চিত্তে যায়’ এই ভেবে খানিক বৈরাগ্য সাধনে মুক্তির খোঁজ করেছে সে। আর শেষ রক্ষা না করতে পারলে শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেডের অপর শেয়ারহোল্ডার, অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ বিচক্ষণ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রায়সাহেব শ্রীযুক্ত তিনকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ‘হাতে রইল পেন্সিল’ বলে লাইনের শেষে দাঁড়িয়ে তাঁকে বিলাপ করতে দেখা গেছে।
আফিমের দামে ওঠাপড়া শুরু ১৮৩০ সালের পর থেকে, আর ঠিক এই সময় থেকেই বোম্বে এবং কলকাতার মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা নিয়মিতভাবে এই কারবার শুরু করে দেন।
সাধারণ বাঙালি শেয়ার বাজার বিমুখ হলেও কলকাতাকেন্দ্রিক ধনী বাবুদের মধ্যে সহজে পয়সা কামানোর স্পৃহা বরাবরই ছিল। ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ডমরুধর ‘গ্র্যান্ড স্বদেশী কোম্পানী লিমিটেড’ বানিয়ে ব্যবসা ফেঁদেছিল এঁটেল মাটি থেকে কাগজ বানাবার। ‘দেশে ধন্য ধন্য পড়িয়া গেল। সকলে বলিতে লাগিল আর আমাদের ভাবনা নাই। যখন এঁটেল মাটি হইতে কাগজ প্রস্তুত হইবে, তখন বালি হইতে কাপড় হইবে। বিদেশ হইতে আর কোন দ্রব্য আর আমাদিগকে আমদানি করিতে হইবে না। দেশ টাকায় পূর্ণ হইয়া যাইবে। এই কথা বলিয়া কলকাতার বাঙ্গালীরা একদিন সন্ধ্যাবেলা আপন আপন ঘর আলোকমালায় আলোকিত করিল’।
ডমরুধর এও বুঝেছিল, উগ্র বক্তা কয়েকজন বড়লোককেই ডিরেক্টর বানাতে হবে যারা ‘সকল প্রকার কারুকার্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্বন্ধে ধুরন্ধর’! গ্র্যান্ড স্বদেশির শেয়ার হু হু করে বাজারে কাটল শতকরা পঁচিশ টাকা লভ্যাংশের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে। কেউ- কোনও টাকার মুখ দেখল না। লাভের খাতা শূন্য দেখিয়ে ডমরু টাকাপয়সা আত্মসাৎ করে আইনকে গন্ডেরিরামের মতো বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে, গ্র্যান্ড স্বদেশিকে নিয়ে একদিন মিলিয়ে গেল শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরীর মতোই।

শহর কলকাতায় ফাটকা কারবার শুরু হয় মোটামুটিভাবে ১৮ শতকের শেষ দিকে, মূলত আফিম মশলা এবং কাঁচা পাটকে কেন্দ্র করে। আফিমের দামে ওঠাপড়া শুরু ১৮৩০ সালের পর থেকে, আর ঠিক এই সময় থেকেই বোম্বে এবং কলকাতার মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা নিয়মিতভাবে এই কারবার শুরু করে দেন। ব্যবসা ও মুনাফা দুইই ফুলে ফেঁপে ওঠে। একই সময়ে নেতাজি সুভাষ রোডে, যেখানে এখন চার্টার্ড ব্যাঙ্কের অফিস, সেখানেই এক নিম গাছের নিচে শেয়ার বাজারের গোড়াপত্তন হয়।
১৮৫৯-৬০ সালে আফিমের ফাটকা বাজারে বিশাল লোকসান হওয়ার ফলে, রামগড়ের একটি ব্যাঙ্ক ফেল করে যায়। আর তারপরেই কারবারিরা আফিমের মৌতাত ছেড়ে অন্যান্য ব্যবসা— যেমন, তুলো, চট এবং তেজারতি কারবারে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। শেয়ার বাজার রমরমিয়ে ওঠে। কোম্পানির ক্ষেত্রে ‘সীমিত দায়বদ্ধতা’ (Limited Liability) আইনি স্বীকৃতি পায় ১৮৫০-এ। সুতরাং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঋণপত্রের পাশাপাশি এবার শুরু হয় ইকুইটি শেয়ারের বেচাকেনা।
সেই সময় নাকি শেয়ারের অধিকাংশ দালাল ছিলেন বাঙালি এবং শেয়ার বাজার থেকে যে শুধু মাড়োয়ারিরাই তখন পয়সা করেছেন, তা নয়, বাঙালি বাবু শ্রেণিও উপার্জন করেছেন মোটা অঙ্ক।
ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গল, আগ্রা ব্যাঙ্ক, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রবর্তিত বেঙ্গল বন্ডেড ওয়্যারহাউস ডকিং কোম্পানি, স্টিম টাগ কোম্পানি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার তখন বাজারের রত্ন, আজকের ভাষায় ‘blue chip’! চার্টার্ড ব্যাঙ্কের বাড়ি তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেলে শেয়ারের বেসাতি এবার উঠে আসে কাছেই এলাহবাদ ব্যাঙ্কের জমিতে। এরপর ১৯০৮ সালে তৈরি হয় ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশান।
কী আশ্চর্য! সেই সময় নাকি শেয়ারের অধিকাংশ দালাল ছিলেন বাঙালি এবং শেয়ার বাজার থেকে যে শুধু মাড়োয়ারিরাই তখন পয়সা করেছেন, তা নয়, বাঙালি বাবু শ্রেণিও উপার্জন করেছেন মোটা অঙ্ক। তাঁদের মধ্যে নাম করা যেতে পারে প্রসাদদাস বড়াল, তুলসীদাস রায়, শ্যামলাল লাহা, নন্দলাল রায়, গিরীন্দ্রমোহন পাইন, নবকৃষ্ণ দেব, রাজা রামমোহন রায় ও রানি রাসমণি।

গত শতকের নব্বই দশকের গোড়া থেকে শেয়ার বাজারের বাড়বাড়ন্ত, যা ১০০০ থেকে আজ সেনসেক্সকে ৭০ গুণ বাড়িয়ে তুলেছে। এবার বাঙালি আর মোটেই ভুল করেনি, সে ভবের তরী এমন এক ঘাটে ভিড়িয়েছে, যেখানে ধনস্থানে শনিলাভ ঘটে। শেয়ার বাজারে লোকে যেমন সর্বস্বান্ত হয়, তেমনই আবার রাতারাতি বড়লোকও হয়। শেয়ার বাজার হচ্ছে আসলে শাঁখের করাত। অদৃষ্টের চাকা এখানে দুদিকেই ঘোরে।
যে সময়ের কথা বলছি, সে সময়ে শনি-রবি বাদে হপ্তার বাকি পাঁচ দিন বাজার খোলা থাকত দিনে দুই ঘণ্টা— বেলা বারোটা থেকে দুটো। ঘণ্টা বাজতেই স্টক এক্সচেঞ্জের ফ্লোর জুড়ে হট্টগোল শুরু করে দিত বেশ কিছু মানুষজন। এরা স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য বা কার্ড হোল্ডার। তাদের সঙ্গে থাকত সেই সব ফার্মের প্রচুর কর্মচারী। আঙুলের ইশারায় চলত বেচাকেনা— লক্ষ কোটির দেয়ানেয়া। মোবাইল ফোন ছিল না। যার ফলে ফ্লোর থেকে অফিসে সংযোগ রক্ষার জন্য ছিল ফোনের হট লাইন। মুহুর্মুহু বেজে উঠত সেই ফোন।
বাঙালি ক্রমশ ব্যাঙ্ক ফিক্সড ডিপোজিট আর স্বল্প সঞ্চয়ের স্বাদের বদলে শেয়ার বাজার আর মিউচুয়াল ফান্ডের আস্বাদ পায়। অনলাইন ট্রেডিং ব্যবস্থায় শেয়ার বাজার ঢুকে পড়ে বাড়ির বেডরুমে, কম্পিউটার আর মুঠোফোনের সহায়তায়।
শেয়ার বাজার চিড়িয়াখানা নয়, কিন্তু চিড়িয়াখানার অনেক জন্তুজানোয়ারের নাম শেয়ার বাজারের দালালরা বহন করে। যেমন ‘বুল’ বা ষাঁড়, ‘বেয়ার’ বা ভল্লুক। এরা হচ্ছে যথাক্রমে ‘তেজিওয়ালা’ ও ‘মন্দিওয়ালা’। একই ঘটনা বা সংবাদকে অবলম্বন করে, কেউ ‘তেজি’ ধ্যান করে, আবার কেউ ‘মন্দি’। এরই ফলে হয় তেজি-মন্দির লড়াই। ‘তেজি’ এর পাল্লা ভারী হলে শেয়ারের ‘ভাও’ বাড়ে, ‘মন্দি’–র পালে হাওয়া পড়লে, কমে। তেজিওয়ালাদের সঙ্গে মন্দিওয়ালাদের লড়াই অনেক সময় সত্যিকারের ষাঁড়ের লড়াইকেও ম্লান করে দেয়।
কলকাতার শেয়ার বাজারে সবচেয়ে বড় তেজি-মন্দির লড়াই ঘটেছিল। আজ থেকে ৭০ বছর আগে— দুই ভাইয়ের মধ্যে। এঁরা হচ্ছেন কলকাতার মারোওয়ারি সমাজের বিখ্যাত ‘নাথানি’ পরিবারের বলদেওদাস ও রামেশ্বরলাল। সেদিন বাজারে দাঁড়িয়ে এক ভাই ক্রমাগত হাওড়া জুট মিলের শেয়ার বেচে গেলেন, আর আরেক ভাই তা কিনে গেলেন। দিনের শেষে দেখা গেল এক ভাইয়ের কাছে অপর ভাইয়ের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৯৪ লক্ষ টাকা। এক ভাই যখন অপর ভাইকে এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের ওপর ৯৪ লক্ষ টাকার চেক দিল, তখন ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের তো চক্ষু ছানাবড়া।

নব্বইয়ের দশক আসলে ভারতে শেয়ার বাজারের রেনেসাঁ। উদার অর্থনীতির কাঁধে চেপে বিদেশি বিনিয়োগ আসে। ভারতে শেয়ার বাজার খুলে যায় বিদেশি বিনিয়োগকারীর সামনে। ১৯৯২ সালে হর্ষদ মেহেতার আর্থিক কেলেঙ্কারি দেশের এই উদারনীতি এবং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে এক অর্থে চ্যালেঞ্জ জানায়। এবার শুরু হয় শেয়ার বাজার, আর্থিক পরিষেবা, বিমা প্রতিটি ক্ষেত্রকে আইনের বাঁধনে বেঁধে পরিকাঠামোগত পরিবর্তন সাধনের কাজ।
বাঙালি ক্রমশ ব্যাঙ্ক ফিক্সড ডিপোজিট আর স্বল্প সঞ্চয়ের স্বাদের বদলে শেয়ার বাজার আর মিউচুয়াল ফান্ডের আস্বাদ পায়। অনলাইন ট্রেডিং ব্যবস্থায় শেয়ার বাজার ঢুকে পড়ে বাড়ির বেডরুমে, কম্পিউটার আর মুঠোফোনের সহায়তায়। অলিতে গলিতে, পাড়ায় পাড়ায় এখন শেয়ার বাজারে কেনাবেচা আর মুনাফার হাতছানি। রাতদিন সাতদিন সমাজ মাধ্যমের আনাচেকানাচে উঠতি শেয়ারের টিপসের ঝুলি নিয়ে হাজির সবজান্তা প্যালারাম বিশ্বাস বা নন্দ গোঁসাই। বাঙালি এখন শেয়ার বাজারে তাল ঠুকে নেমে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, অতিমারি, যুদ্ধ, রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরিবর্তনের তুর্কি নাচন— কোনও কিছুই আর তাকে দাবিয়ে রাখতে পারে না, সে হয়ে ওঠে নিত্য দিনের সওদাগর!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত