Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ত্রিদিব মিত্র: কবিতা, সম্পাদনা বনাম অভিমান

তন্ময় ভট্টাচার্য

জুলাই ৪, ২০২৬

Tridib Mitra
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Tridib Mitra)

আজ থেকে তেরো বছর আগে সুবিমল বসাকের সঙ্গে যখন আলাপ হয়েছিল, তখনও হাংরি আন্দোলনের প্রথম প্রজন্মের সদস্যদের অধিকাংশই জীবিত। উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, দেবী রায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, ত্রিদিব মিত্র ও খোদ সুবিমল। একে একে চলে গেলেন প্রায় সকলেই। যদ্দূর জানি, সেই প্রজন্মের শেষতম প্রতিনিধি হিসেবে সুবো আচার্য আছেন এখনও।


আরও পড়ুন: পাঁচটি কবিতা


গত পরশু, অর্থাৎ ২ জুলাই চলে গেলেন কবি ও সম্পাদক ত্রিদিব মিত্র। জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর, থাকতেন হাওড়ার শিবপুরে। আমার সঙ্গে ত্রিদিবের পরিচয় পরোক্ষ। সরাসরি কখনও আলাপ হয়নি, কিন্তু পত্রপত্রিকা ও কবিতার সূত্রে, সেই সঙ্গে সুবিমল বসাকের মুখে তাঁর গল্প শুনে শুনে জন্মেছিল আশ্চর্য এক নৈকট্য। ষাটের দশকের সুবিমলের হাংরি বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। ১৯৬৩ সালে, কয়েকটি হাংরি বুলেটিন পড়ে ত্রিদিবের আগ্রহ জন্মায় এই আন্দোলনের প্রতি। অতঃপর, কফি হাউসের সূত্রে বাকিদের সঙ্গে পরিচয়।

Tridib Mitra
ত্রিদিব মিত্র

১৯৬৪-র গোড়াতেই ত্রিদিব মনস্থির করে ফেলেন, একটি পত্রিকা বের করবেন। নাম প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়— ‘ইঙ্গিত’। তবে অচিরেই সে নাম পাল্টে যায় ও আত্মপ্রকাশ করে ‘উন্মাদ’। ক্রমে হাংরি আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় সেটি। প্রথম সংখ্যা ত্রিদিব এককভাবে সম্পাদনা করলেও, পরবর্তী সংখ্যাগুলি ছিল ত্রিদিব ও আলো মিত্রের (তাঁর প্রেমিকা, পরবর্তীতে স্ত্রী) যুগ্ম সম্পাদিত। আলো মিত্র— তৎকালীন হাংরি আন্দোলনের একমাত্র মহিলা সদস্য।

সুবিমল বসাক সম্পাদিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকার একটি সংখ্যায় ‘ইয়েতি’ শীর্ষক আলো-র গদ্য চোখে পড়ে, নজর টানে এই অংশ— ‘…তুমি— হে আমার স্বর্গ ও নরক বেবুশ্যে কোলকাতার হাজার রাস্তায় লক্ষ ভিড় কোটি মানুষ দীর্ঘশ্বাস বিক্ষোভ ভর্ত্তি পোষ্টার এঁটে ছুটছে, ছুটছে, কোথায় জানা অজানার মধ্যে হাজার প্রশ্ন ও সন্দেহ, খাবি খাচ্ছে ১৯৬৮-র কোলকাতা, আর নাড়িভুঁড়ির মধ্যে আমি আলো তুমি ত্রিদিব আমি ত্রিদিব তুমি আলো আমরা ত্রিদিব ও আলো আমরা একজন…’।

Tridib Mitra
সুবিমল বসাক ও ত্রিদিব মিত্র, হাওড়া, ১৯৭০

ত্রিদিবের প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। হাংরি আন্দোলনের কবিদের মধ্যে খুব চর্চিত নাম নন তিনি। এর একটি কারণ, বিতর্কিত ও বিখ্যাত হাংরি জেনারেশন সংখ্যায় (১৯৬৪, যে-সংখ্যার সূত্রে কবিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল) তাঁর কোনও লেখা ছিল না। আর দ্বিতীয় কারণ, লেখালেখির জীবনকে দীর্ঘায়িত করেননি তিনি। ষাটের দশকে প্রকাশ করেননি কবিতার বইও। তবে বিভিন্ন জেব্রা, প্রতিদ্বন্দ্বী, হাংরি জেনারেশন, উন্মার্গ ইত্যাদি পত্রপত্রিকায় তাঁর কবিতা বেরোত নিয়মিত। ‘উন্মার্গ’-এর প্রথম সংখ্যায়, ‘আগডুম বাগডুম’ নামে ত্রিদিবের একটি গদ্য প্রকাশ পেয়েছিল, যাতে তৎকালীন সাহিত্য পরিস্থিতি ও লিটল ম্যাগাজিনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। 

‘উন্মার্গে’র প্রকাশও নতুন সৃষ্টির তাড়নায় অজানা প্রতিভা স্ফুরণের জন্য এবং পরীক্ষানিরীক্ষা মূলক নতুন ধরণের লেখা প্রকাশের জন্য। আর এই নবজাতকের জন্য শঙ্খধ্বনি হবে না, আনন্দের ফোয়ারা ছুটবে না।

শেষাংশে ত্রিদিব লিখছেন— ‘…অথচ deeply কিছু ভাসছে না, ডুবছে না— সবই ভাসা ভাসা, কাজেই দু’পা হাঁটতে না হাঁটতেই সব কিছুই ফেঁসে যায়, ভেস্তে যায় সব পূর্ব প্রকল্পিত পরিকল্পনা।

এই প্রচেষ্টাকে ফলবতী করবার জন্য বাংলার নামী দামী পত্রিকাদের বিশেষ কোনো দান নেই বললেই চলে— সব চেষ্টাই চলছে ছোট ছোট পত্রিকার মাধ্যমে। এই সব পত্রিকার লোকবল, অর্থবল নেই বললেই চলে, মাত্র নতুন কিছু সৃষ্টি করার তন্দ্রাবিহীন নিশ্চিত দৃঢ়তায় তরুণেরা এই দুর্গম পথকে থোড়াই কেয়ার করে।

Tridib Mitra
সুবিমল বসাকের আঁকা ত্রিদিব মিত্রের স্কেচ

‘উন্মার্গে’র প্রকাশও নতুন সৃষ্টির তাড়নায় অজানা প্রতিভা স্ফুরণের জন্য এবং পরীক্ষানিরীক্ষা মূলক নতুন ধরণের লেখা প্রকাশের জন্য। আর এই নবজাতকের জন্য শঙ্খধ্বনি হবে না, আনন্দের ফোয়ারা ছুটবে না, জনতার কেউ পড়বে না এবং শিল্পের প্রতি তার আন্তরিকতার জন্যই তার চলার গতি এবং লক্ষ্য হবে তীক্ষ্ণ তীরের মত একমুখী, অর্জুনের মত লক্ষ্যভেদী।’

ওপরের এই কথাগুলি বোধকরি ষাট বছর পেরিয়ে আজও প্রকৃত লিটল ম্যাগাজিনের ক্ষেত্রে সমান প্রযোজ্য।

সম্পাদক ত্রিদিব ষাটের দশকে বিবিধ প্রেক্ষিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার বেশ কয়েকটি সংখ্যার পাশাপাশি, সম্পাদনা করেছেন ইংরাজিতে হাংরি জেনারেশন নিউজলেটার— ‘Waste Paper’। এর উদ্দেশ্য ছিল হাংরিদের বিভিন্ন খবরাখবর দেওয়া, সেইসঙ্গে বিভিন্ন ইংরাজি লেখা প্রকাশ।

‘উন্মার্গ’-এর দ্বিতীয় সংখ্যায়, পত্রিকাটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে লেখা— ‘আমাদের মতই প্রেম ক্ষুধায় জর্জ্জরিত ভোগী এবং আমাদের মতই নিরাশ্রয় নিরন্ন নিরাসক্ত ত্যাগী পরিণত মস্তিষ্ক ও তীব্রবোধ সম্পন্ন নরনারীর জন্য সাহিত্য সংকলন বিনামূল্যে বিতরণার্থে।’

সম্পাদকীয়তে ত্রিদিব লিখেছিলেন— ‘Waste Paper is a Hungry Generation Quarterly. Apart from telling you what the Hungryalists are doing just now we have launched this mimeographed mag also to transmit Hungryalist woriks in English. Waste Paper will do its best to present before you the actual Hungry Scene.’

এরও বেশ কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ পায় ষাটের দশকের শেষ দিকে। এছাড়াও ১৯৬৮ সালে ত্রিদিব মলয় রায়চৌধুরীকে লেখা দেশবিদেশে ১৪ জন ব্যক্তির ২১টি চিঠি নিয়ে ইংরাজিতে একটি পুস্তিকা সম্পাদনা করেন। তাঁর স্ত্রী আলো সম্পাদনা করেন বাংলায় মলয়কে লেখা বিভিন্নজনের চিঠিপত্রের সংকলন। 

Tridib Mitra
‘প্রলাপ দুঃখ’ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ

‘উন্মার্গ’-এর দ্বিতীয় সংখ্যায়, পত্রিকাটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে লেখা— ‘আমাদের মতই প্রেম ক্ষুধায় জর্জ্জরিত ভোগী এবং আমাদের মতই নিরাশ্রয় নিরন্ন নিরাসক্ত ত্যাগী পরিণত মস্তিষ্ক ও তীব্রবোধ সম্পন্ন নরনারীর জন্য সাহিত্য সংকলন বিনামূল্যে বিতরণার্থে।’ বস্তুত, ব্যক্তি ত্রিদিবও ছিলেন এমনই, একই সঙ্গে তীব্র ও নিরাসক্ত।

সুবিমলের বক্তব্য— ‘…কাঁচা মাছ ও কাঁচা মাংস খাবার প্রতি নিষ্পাপ লোভ, ঘনঘন সিগারেট খাওয়া, হাওড়ার এক ধরনের অ্যাকসেন্টে কথা বলা, অনেক রাত ওব্দি জেগে জেগে সিগারেট পোড়ানো ও জীবনানন্দের কবিতা উচ্চারণ, মাতাল হওয়া মাত্র হু হু করে কথা ছোটা, রেস্টুরেন্টে পর্দার আড়ালে চুমু খাওয়া, আলোর সঙ্গে পথে বিপথে ধুলো পায়ে হাঁটাচলা শার্ট-সায়া ছেঁড়া-ছেঁড়ির কথা, হাওড়া স্টেশনে পোষ্টার মারা, এইসব, সব কিছু ত্রিদিব মিত্রের একার।’

হাংরি জেনারেশনের দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্য অরণি বসুকে দলে ভিড়িয়ে নেওয়ার নেপথ্যে মূলত ত্রিদিবই। ১৯৬৮-র জুলাই মাসে, ত্রিদিব ও সুবিমল শিবপুরেরই তরুণ কবিতাপ্রয়াসী অরণির সঙ্গে দেখা করতে হাজির হন তাঁর বাড়িতে।

ত্রিদিবের চিঠি, কবিতা, পত্রিকা সবেতেই হাংরিদের ভাবনা, স্বভাব, ভাষা ও অভ্যাসের প্রতিফলন। ফলে, তিনি যে বিচ্ছিন্ন একজন— এ-কথা মনে করার কথা অর্থহীন। রীতিমতো কার্ড ছাপিয়ে, ১৯৬৮ সালের রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীতে মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবরে ‘হাংরি জেনারেশনের শোকসভা’ পালন করেছিলেন আলো ও ত্রিদিব মিত্র। উপলক্ষ্য, ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার চতুর্থ সংখ্যার প্রকাশ। আবার এই ত্রিদিবই হাংরিদের অভ্যন্তরীণ খেয়োখেয়ি ও মতানৈক্য থেকে শতহস্ত দূরে— সচেতনভাবেই জড়াননি ওসবে। বহু পরে, ১৯৭৬ সালে সুবিমলকে একটি চিঠিতে ত্রিদিব লিখেছিলেন—

Tridib Mitra
সুবিমল বসাককে লেখা ত্রিদিব মিত্রের একটি চিঠির অংশ

‘সরে এসছি কোলকাতা থেকে কেননা কোলকাতা আমার কাছে ক্রমাগত ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। সুযোগ পেয়ে গেলাম। চলে এলাম। এখানেও যে ভালো আছি— তা নয়। প্রচণ্ড কাজের চাপে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে চেষ্টা কোরি সবসময়— যাতে কখনো নির্জনতায় নিজের মুখোমুখি একলা না দাঁড়াতে হয়। তবু পারি না। আগের মতই রাত্তিরে ঘুম আসতে চায় না— ভিড় করে পুরনো মুখ, শব্দ, টেবিল, বোতল, যৌথ ভ্রমণপঞ্জী, ইচ্ছা, স্বপ্ন— কুয়াশার মত প্রায়। চাঁদ হেলে পড়ে মাথার পিছনে। ঝিরঝির পাতারা হাওয়ায় হাওয়ায় তরংগধ্বনি তোলে। শূন্যতার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকি। উড়ে যায় খণ্ড খণ্ড মেঘের দল।’

এই সরে আসা শুধু কলকাতা থেকে নয়, লেখালেখি থেকেও। তবে তার আগের কয়েকটি পর্ব উল্লেখযোগ্য। হাংরি জেনারেশনের দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্য অরণি বসুকে দলে ভিড়িয়ে নেওয়ার নেপথ্যে মূলত ত্রিদিবই। ১৯৬৮-র জুলাই মাসে, ত্রিদিব ও সুবিমল শিবপুরেরই তরুণ কবিতাপ্রয়াসী অরণির সঙ্গে দেখা করতে হাজির হন তাঁর বাড়িতে। এর পর থেকে অরণিরও কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে হাংরিদের পত্রিকায়। কাছাকাছি বাসস্থান হওয়ার জন্য, অরণির সঙ্গে ত্রিদিবের একপ্রকার নৈকট্যও গড়ে ওঠে, যা বজায় ছিল ত্রিদিব লেখালিখি ছেড়ে দেওয়ার পরও। এমনকী, ত্রিদিবের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নামাঙ্কনও করেছিলেন অরণিই।

Tridib Mitra
ওয়েস্ট পেপার, সেপ্টেম্বর ১৯৬৯

ততদিনে প্রথম প্রজন্মের হাংরিদের প্রায় সকলেরই এক বা একাধিক বই বেরিয়ে গেছে। ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে, ত্রিদিব মিত্র প্রকাশ করলেন তাঁর প্রথম কবিতার বই— ‘প্রলাপ দুঃখ’। উৎসর্গ— ‘আত্মার আত্মীয় জীবনানন্দ দাশকে’। আরও বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ত্রিদিবের জীবনানন্দ-প্রীতি নজর টানে। প্রচ্ছদে শায়িত ত্রিদিবের নেগেটিভ ছবি, বুকের কাছে ‘রূপসী বাংলা’।

মলয় রায়চৌধুরীকে লেখা তাঁর একটি চিঠির একাংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে (১৯৬৮)— ‘…ওসব পরের খোসানো চোথা নিয়মটিয়মের কাঁথায় আগুন জ্বেলে, কেবল— আমি যা লিখছি তাই-ই কবিতা— একথাই এবং পৃথিবীর কবিতার যাবতীয় Form-কে ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো কোরে আমিই Living একথাই ঠিক।’

‘অরাজকতার মধ্যে জন্মের নিকষ আওয়াজ মনুষ্যত্বের স্মৃতিহীন সৌধ থেকে ঝাঁপ খেয়ে নিরালম্ব স্বাধীনতায় লক্ষ লক্ষ নপুং-এর জঘন্য বলাৎকার থেকে নিজেকে সরিয়ে ধর্মসভায় শিশুর ঠোঁটে খল্‌খল্‌ হেসে উঠেছিলাম আমি ত্রিদিব পাগলা ঘোড়ার মত দৌড়ে হাঁফিয়ে উঠছি জোচ্চুরি আর ভড়ংবাজির মধ্যে’

১৯৭২-এর ডিসেম্বরে প্রকাশ পায় ত্রিদিবের দ্বিতীয় ও শেষ কাব্যগ্রন্থ— ‘ঘুলঘুলি’। প্রকাশক সুবিমল বসাক। ত্রিদিবের কবিতাভাবনা বুঝতে, মলয় রায়চৌধুরীকে লেখা তাঁর একটি চিঠির একাংশ উদ্ধৃত করা যেতে পারে (১৯৬৮)— ‘…ওসব পরের খোসানো চোথা নিয়মটিয়মের কাঁথায় আগুন জ্বেলে, কেবল— আমি যা লিখছি তাই-ই কবিতা— একথাই এবং পৃথিবীর কবিতার যাবতীয় Form-কে ভেঙ্গে গুঁড়ো গুঁড়ো কোরে আমিই Living একথাই ঠিক।’

Tridib Mitra
‘প্রলাপ দুঃখ’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠা

দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরই আস্তে আস্তে সাহিত্যজগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন ত্রিদিব। একসময় চাকরি নিয়ে চলে যান মেদিনীপুরে (পরে অবশ্য আবার হাওড়ায় ফিরে আসেন)। বন্ধুমহলের অন্তর্ঘাতের সঙ্গে সম্ভবত মেলাতে পারছিলেন না তিনি। পাশাপাশি, আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বিপথগামী (তর্কসাপেক্ষ) হওয়াও বোধকরি তাঁর অভিমানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ত্রিদিবের খোঁজ তাতে বন্ধ হয়নি। ব্রিটিশ-আমেরিকান কবি জর্জ ডাউডেন বারংবার সুবিমলের কাছে ত্রিদিবের খোঁজ নিয়েছেন। তবে সুবিমলের সঙ্গেও যোগাযোগে ছেদ পড়েছিল।

বহু বছর পরে, ১৯৮২-তে, ডায়েরিতে ফের উল্লেখ— ‘আজ হঠাৎ ত্রিদিবের সঙ্গে রাস্তায় দেখা। Esplanade P.O. যাচ্ছিলুম। আমিই দেখে ডাকলুম। তারপর, আমরা একে-অপরকে তাকিয়ে দেখতে থাকলুম— প্রায় আট বছর পর দেখা। ও রোগা হয়েছে— চুল কমেছে। আমার স্বাস্থ্য নাকি ঠিক— তবে চুল পেকেছে ঝরে গেছে। প্রায় ঘন্টা দুয়েক গল্প চললো— আমার অফিসে গেল। আমার খবর রাখে।’

‘The best time to make friends is before you need them.’ ত্রিদিব বিশ্বাস করতেন এ-কথাটি। বন্ধুত্বের প্রতি প্রত্যাশা পূরণ না-হওয়ার অভিমানই কি তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিল লেখালিখি থেকে? আমরা জানি। অথবা, হয়তো জানি না কিছুই…

ত্রিদিব পূর্ণভাবে লেখালেখিতে ফেরেননি আর। নতুন কোনও বইও প্রকাশ হয়নি। তবে সুবিমলের সঙ্গে পরবর্তীতে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল আবার। ফোনমারফত কথাবার্তা হত, জানি। গত বছর চলে গেলেন সুবিমল। গতকাল, ত্রিদিব। বিরাশি বছর বয়সে। অসুস্থ ছিলেন অনেকদিন ধরেই। বিগত কয়েকমাস তক্কে তক্কে ছিলাম, যদি তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নেওয়া যায়। হাসপাতাল-বাড়ি-অসুস্থতা ইত্যাদি জটিলতার জন্য সম্ভব হয়নি। এখন ফুরিয়ে গেল সম্ভাবনাটুকুও।

Tridib Mitra
‘উন্মার্গ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা, ১৯৬৪

সুবিমলকে লেখা ত্রিদিবের একটি অপ্রকাশিত চিঠি, ১৯৬৬ সালের, সেটির মাধ্যমেই ত্রিদিবকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো যাক—

প্রি/সুঃ

তোমার সঙ্গে দেখা করে উঠতে পারি নি আর। মাঝে একদিন গিয়েছিলাম— রোববার সেদিন— তালা বন্ধ দেখে ফিরতে হল। দেখা করব জেনে চিঠি দিই নি। সুভাষ, শৈলেশ্বরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, জেব্রার কথা তুলতে বলল; সুভাষ— ৮/১০ পৃষ্ঠার কম ওর লেখা নেই— আর শৈলেশ্বর চুপচাপ। Howard Mccord-এর কথা তুলল শৈলেশ্বর। পাঠায় নি, পাঠাবেও না। ওরাও বলল Unity, Honesty. ব্যাপারটা কিরকম আশ্চর্য্য নয় কি! ভেবে দেখ। তবুও Unity… আমিও অবশ্য লেখা পাঠিয়ে উঠতে পারি নি। দিন দশেকের মধ্যে দেখা করব। জেব্রার খবর কি? জানাবে। দেরী থাকলেও। ‘উন্মার্গ’ বার করব ভাবছি ‘জেব্রা’ দেরী থাকলে। কিন্তু আর্থিক দুর্বলতার বাধা সরাতে পার্ছি না। করলে ৩/৪ ফর্মার কম নয়। কি করা যায় বল তো। বাসুদেবের ঠিকানা দিও; এ ব্যাপারে তুমিও ওকে লিখতে পার। চিঠির উত্তর তাড়াতাড়ি দেবে। কারণ আমার ছাপানো খুব শ্লথগতিতে চলে। কাগজের ভারটা কি তুমি নেবে? রাজী বলে আমি সুভাষের সঙ্গে দেখা করব। বহুদিন আমরা চুপচাপ। আমরা কি মৃত না নির্বাক— সন্দেহ জাগে মাঝেমাঝে। Mccordকে কি লেখা আর পাঠানো চলবে? কেমন আছ? লেখা— নতুন কি করলে? প্রীতি ও শুভেচ্ছা জেনো—

ত্রিদিব

অন্য একটি পোস্টকার্ডে (১৯৬৫), বক্তব্যের বিপরীত পিঠে ফাঁকা জায়গায় ত্রিদিব লিখেছিলেন— ‘The best time to make friends is before you need them.’ ত্রিদিব বিশ্বাস করতেন এ-কথাটি। বন্ধুত্বের প্রতি প্রত্যাশা পূরণ না-হওয়ার অভিমানই কি তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিল লেখালিখি থেকে? আমরা জানি। অথবা, হয়তো জানি না কিছুই…

চিত্র ঋণ: তন্ময় ভট্টাচার্য

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of তন্ময় ভট্টাচার্য

তন্ময় ভট্টাচার্য

জন্ম ১৯৯৪, বেলঘরিয়ায়। কবি, প্রাবন্ধিক ও স্বাধীন গবেষক। প্রকাশিত বই: বেলঘরিয়ার ইতিহাস সন্ধানে (২০১৬), আত্মানং বিদ্ধি (২০১৮), বাংলার ব্রত (২০২২), অবাঙ্‌মনসগোচর (২০২৩), বাংলার কাব্য ও মানচিত্রে উত্তর চব্বিশ পরগনা ও হুগলি জেলার গঙ্গা-তীরবর্তী জনপদ (২০২৩) ইত্যাদি। সম্পাদিত বই: না যাইয়ো যমের দুয়ার (ভ্রাতৃদ্বিতীয়া-বিষয়ক প্রথম বাংলা গ্রন্থ), দেশভাগ এবং (নির্বাচিত কবিতা ও গানের সংকলন), সুবিমল বসাক রচনাসংগ্রহ (২ খণ্ড)।
Picture of তন্ময় ভট্টাচার্য

তন্ময় ভট্টাচার্য

জন্ম ১৯৯৪, বেলঘরিয়ায়। কবি, প্রাবন্ধিক ও স্বাধীন গবেষক। প্রকাশিত বই: বেলঘরিয়ার ইতিহাস সন্ধানে (২০১৬), আত্মানং বিদ্ধি (২০১৮), বাংলার ব্রত (২০২২), অবাঙ্‌মনসগোচর (২০২৩), বাংলার কাব্য ও মানচিত্রে উত্তর চব্বিশ পরগনা ও হুগলি জেলার গঙ্গা-তীরবর্তী জনপদ (২০২৩) ইত্যাদি। সম্পাদিত বই: না যাইয়ো যমের দুয়ার (ভ্রাতৃদ্বিতীয়া-বিষয়ক প্রথম বাংলা গ্রন্থ), দেশভাগ এবং (নির্বাচিত কবিতা ও গানের সংকলন), সুবিমল বসাক রচনাসংগ্রহ (২ খণ্ড)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

মোহনা মজুমদার
বিতস্তা ঘোষাল

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
শমিতা হালদার
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

দেবার্চন চ্যাটার্জি
নির্মাল্য চ্যাটার্জি

উপন্যাস

[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com