(Samabay Dibas)
প্রতি বছর জুলাই মাসের প্রথম শনিবার পালিত হয় আন্তর্জাতিক সমবায় দিবস। এই বছর ২০২৬ সালের ৪ঠা জুলাই সেই দিন। এই বছরের মূল ভাবনা ‘শান্তিপূর্ণ বিশ্বের জন্য সমবায়’। ১৯২৩ সাল থেকে এই দিনটি পালন করে আসছে ‘ইন্টারন্যাশানাল কোঅপারেটিভ অ্যালায়েন্স’। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় এই বিষয়টি উত্থাপিত হলে, ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসের প্রথম শনিবার তা পালন করার রীতি শুরু হয়।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনের বাঘ বিধবা কথা…
প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট ভাবনার উপর নির্ভর করে এই দিনটি পালিত হয়। সমবায় ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গ্রাম বা সমাজের ইতিহাস ভারতবর্ষের বিস্তৃত তালিকায় নেই। সমবায় উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে গান্ধীজির সবরমতী আশ্রম, শান্তিনিকেতনের শ্রীনিকেতনের কথাই আমাদের মনে উঁকি দেয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলার পশ্চিম সুন্দরবনের গোসাবা দ্বীপেও শুরু হয়েছিল সমবায় ভিত্তিতে গ্রাম গড়ে তোলার মহতী উদ্যোগ। অখণ্ড সুন্দরবনাঞ্চলের দ্বীপগুলির মধ্যে একমাত্র গোসাবাতেই প্রথম এই কাজের সূচনা। আজও ‘গোসাবা’, ‘স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটন ও সমবায়’ এসব শব্দ একে অপরের সঙ্গে জড়িত হয়েই এখানে উচ্চারিত হয়।

ড্যানিয়েল ম্যাকিনন হ্যামিলটন ১৮৬০ সালের ৬ই ডিসেম্বর গ্লাসগো শহরের অদূরে হেলেন্সবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৮০ সালে তিনি প্রথমে ভারতবর্ষের বোম্বাই শহরে আসেন, তারপর এসে পৌঁছান তৎকালীন কলকাতা শহরে। ইতোমধ্যেই ভারতবর্ষে সমবায় উদ্যোগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৮৯১ সালে পাঞ্জাব প্রদেশের পাঞ্জোয়ারে ভারতের প্রথম সমবায় ভিত্তিতে চাষের জমি তাঁর নজরে এসেছিল। এই সমবায় উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন ক্রস্থওয়েট ও এডওয়ার্ড ম্যাকলাগন।
১৯০৪ সালের ২৪শে মার্চ ভাইসরয় লর্ড কার্জনের শাসনকালে সমবায় ঋণদান সমিতি আইন পাশের সঙ্গেও জড়িয়ে ছিলেন ড্যানিয়েল হ্যামিলটন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বসিরহাট মহকুমার ১৪৯ নম্বর লটের ২৫১৪ বিঘা জমি ও ১৪৩ নম্বর লটের ৯৭৪৩ বিঘা জমি ইজারা লাভ করেন তিনি। উল্লেখ্য, ১৪৯ নম্বর লট ছিল গুয়াসাবা বা গোসাবা দ্বীপাঞ্চল। ১৯০৩ সালের এপ্রিল মাস নাগাদ এই দ্বীপের জঙ্গল হাসিল করে গ্রাম গড়ে তোলার কাজের সূচনা হয়ে যায়। এই সময় থেকে এখানকার নাম হয় ‘স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটন এস্টেট’।

১৯১৫ সালেই সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত দ্বীপাঞ্চলে সূচনা হয় ‘গোসাবা সমবায় ব্যাঙ্ক’-এর। অল্প সময়ের মধ্যেই এই সমবায় ব্যাঙ্কের শাখা ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের গ্রামগুলিতে। ১৯১২ সালে সমবায় আইন সংশোধিত হয়ে গ্রামবাসীদের নগদ ঋণ প্রতিদানের পরিবর্তে কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য দেওয়ার বিধান চালু হয়। আর তাতেই ড্যানিয়েল সাহেবের গোসাবায় কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯১৮ সালের ৬ই ডিসেম্বর, স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের জন্মদিনেই গোসাবা দ্বীপে শুরু হয় ‘গোসাবা সমবায় ভাণ্ডার’।
গ্রামের মানুষজনও এর ফলে কম দামে ভাল মানের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহজেই পেতে থাকেন এই প্রতিষ্ঠান থেকে। এই নোনা জমিতে কৃষিকাজের উন্নতির জন্য নিরন্তর ভাবনা চলতে থাকল সাহেবের জমিদারি এস্টেটে। সে জন্য ১৯১৯ সালে এখানে ‘গোসাবা আদর্শ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র’ও প্রতিষ্ঠা হল। নদীর নোনাজল আর লবণাক্ত আবহাওয়াকে সঙ্গে নিয়েই অধিক ফলনশীল ধান ফলানোর চেষ্টা এই সময় থেকেই চলতে থাকে এই গ্রামে।

উল্লেখ্য, সেই সময় পাটনাই জাতের নতুন ধান ‘গোসাবা ২৩’ বীজের আবিষ্কার হল এখানেই। ঢাকার মানিকগঞ্জের জমিদার পার্বতীশঙ্কর চৌধুরীর থেকে স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটন প্রথম ধান বাঁচানোর জন্য ধর্মগোলার কথা জেনেছিলেন। সাহেবের উদ্যোগে গোসাবায় গ্রামবাসীদের ধান রক্ষার জন্য সমবায় ভিত্তিতে গড়ে তুললেন ‘গোসাবার ধর্মগোলা’। এই গ্রামের মানুষজন সংঘবদ্ধভাবে সমবায় থেকে ন্যূনতম মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনতে বিশেষ সক্রিয় হয়েছিল।
১৯১৮ সালের ৯ই জানুয়ারি স্যর ড্যানিয়েলের উদ্যোগ কলিকাতার রাইটার্স বিল্ডিং-এ ‘নবম প্রাদেশিক বৈঠকের’ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনাসভার ভিত্তিতে ১৯১৯ সাল পরবর্তী সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ‘বঙ্গীয় প্রাদেশিক সমবায় সংগঠনের’ আজীবন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটন। ১৯২২ সালেই গোসাবায় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ‘গোসাবা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্ক’। স্থানীয় ধর্মগোলা পরিচালনা থেকে আইনশৃঙ্খলা ও অন্যান্য বিষয় পরিচালনার দায়ভার চলে আসে এই সমবায় ব্যাঙ্কের উপর। গ্রামের মানুষের কাছে বিশেষ আস্থার স্থান হয়ে ওঠে এটি। এখানকার কৃষকদের ও গ্রামীণ শিল্পীদের উৎপাদিত দ্রব্যাদি নিয়ে ১৯২৮ সাল থেকে শুরু হয়েছিল প্রদর্শনী। সকলেই তাতে বিশেষ উৎসাহিতও হয়। গ্রামের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এসবেরও উন্নতি হতে থাকে এই সমবায়ের মাধ্যমেই।

গোসাবা সমবায় ব্যঙ্ক থেকেই কৃষকরা ঋণ, বীজ, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর জোগান পেতেন। একইভাবে অন্যান্য পেশাজীবী মানুষরাও সবরকমের সহায়তা পেয়ে আনন্দে দিন কাটিয়েছেন সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত গ্রামে। সমবায় সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য গোসাবায় একটি পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তিনিই নিয়েছিলেন। এই সমবায় থেকে স্যর ড্যানিয়েলের সই করা ‘গোসাবার এক টাকার নোট’ চালু করা হয়েছিল। এই উদ্যোগ শুধু সুন্দরবনের ইতিহাসে নয়, ভারতবর্ষের আর্থিক ইতিহাসেও এক যুগান্তকারী ঘটনা। ব্যাঙ্কের চেকের আকারে এক বান্ডিল নোটের প্রচলন করা হয়। এই এক টাকার নোটের পরিবর্তে গোসাবা সমবায় ব্যাঙ্ক থেকে গ্রামবাসীরা তাঁদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহজেই পেয়ে যেতেন।
স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের সমবায় ভিত্তিতে গড়ে তোলা গ্রামের কর্মকাণ্ড দেখতে ১৯১৬ সালে এসেছিলেন তৎকালীন গভর্নর লর্ড কারমাইকেল, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, ১৯৩২ সালের ৩০শে ডিসেম্বর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৩৫ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি গান্ধীজির একান্ত সচিব মহাদেব সরদেশাই প্রমুখরা
গোসাবার এই সমবায় আন্দোলনে সাহেব স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের একান্ত সহযোগী ছিলেন ডাক্তার সুধাংশুভূষণ মজুমদার। সাহেবের স্ত্রী মার্গারেট হ্যামিলটন সবসময়ই তাঁর এই গ্রাম স্বনির্ভরতার কাজে পাশে ছিলেন সর্বতোভাবেই। গোসাবার সমবায় কর্মকাণ্ডে আনন্দিত হয়ে ময়ূরভঞ্জের মহারাজা রামচন্দ্র ভঞ্জদেও, স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটনকে আটশো একর জমি দান করেন সমাবায় গ্রাম গড়ে তোলার জন্য। ময়ূরভঞ্জের স্থানীয় মানুষজন গোসাবা গ্রামে এসে প্রশিক্ষণ নিয়ে গিয়ে সেখানে তা প্রয়োগ করেছিলেন।
গোসাবায় স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের সমবায় ভিত্তিতে গড়ে তোলা গ্রামের কর্মকাণ্ড দেখতে ১৯১৬ সালে এসেছিলেন তৎকালীন গভর্নর লর্ড কারমাইকেল, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, ১৯৩২ সালের ৩০শে ডিসেম্বর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯৩৫ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি গান্ধীজির একান্ত সচিব মহাদেব সরদেশাই প্রমুখরা। ১৯৩৯ সালের ৬ই ডিসেম্বর ভারতপ্রেমী সমবায় আন্দোলনের শীর্ষ নক্ষত্র স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটন পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুপরবর্তী সময়েও এগিয়ে গিয়েছে তাঁর এসব কর্মকাণ্ড। বর্তমানে সুন্দরবনের সমৃদ্ধ দ্বীপাঞ্চল এই গোসাবা। আজও গোসাবার প্রতিটি মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন স্যর ড্যানিয়েল হ্যামিলটনের নাম। ভারতবর্ষে সমবায় আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি।
তথ্যঋণ: সৌমেন দত্ত – স্যর ড্যানিয়েল ও গোসাবার আখ্যান
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত