(KC Nag)
অঙ্কে ভাল নম্বর পাবে বসুন্ধরা। মাধ্যমিকের প্রি-টেস্ট। পুজোর আগে ওই শেষ পরীক্ষা। ফুল মার্কস একশো। বাহান্ন নম্বরের উত্তর দিয়ে এসেছিল। বাড়ি ফিরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল। বাড়ি থেকে পঞ্চাশ মিটার দূরত্বের মধ্যে বড় মাঠ। মাঠের মাঝে মানুষ, গাছপালা। তার পাশ দিয়ে বসুন্ধরার সাইকেল। সাইকেলের স্পিড বাড়ল। মাঠের শেষে যমের পুকুর। কথিত আছে: একদা মরণাপন্ন গ্রামের জমিদারের স্বপ্নে স্বয়ং যমরাজ এসে বলেছিল, ‘গ্রামের পশ্চিমদিকে আমার নামে একটা বড় পুকুর কেটে রাখ। তাতে তোর আয়ু আরও দেড়শো বছর বৃদ্ধি পাবে’।
জমিদার চার মাস বাদেই মারা যান। তবে, ওই স্বপ্নের চোটে গ্রামবাসীরা একটা পুকুর পেয়েছিল। কেউ কেউ অবশ্য বলে, ওইসব গাঁজাখুরি গল্প। আশেপাশের গ্রামে সেই সময় কেউ খুন-টুন হলে দেহটা রাতের অন্ধকারে এই পুকুরে ফেলে দেওয়া হত। স্নান করতে গিয়ে বিপদে পড়ত গ্রামবাসীরা। তেল মেখে সাঁতার কাটতে নেমে জল খেয়ে ফুলে যাওয়া বেঢপ ডেডবডি যখন-তখন হাত-পায়ে লেগে গেলে কারই বা ভাল লাগে!
গ্রামের কোনও মাতব্বরের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল নামটা। ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল নতুন গল্প। এই পুকুরের পাহারাদার স্বয়ং যমরাজ। এখানে রাতদুপুরে দেহ (তখনও দিনেদুপুরে বা প্রকাশ্য দিবালোকে অত খুন হত না। আর হলেও, আলো নিভিয়ে অন্ধকার করে দেওয়া হত।) ফেলতে এলে তার বিচার পুকুরপাড়ে বসেই যমরাজ করে দেবে।

যে কোনও কারণেই হোক, এরপর সেখানে আর খুন করা দেহ ফেলতে দেখা যায়নি কাউকে। যে মাতব্বরের মাথা থেকে এই নাম বেরিয়েছিল, দেখা যায়নি তাকেও। এইসব গ্রামীণ ইতিহাসের টুকরো-টাকরা অন্ধকারে সিসের খণ্ডের মতো টুপ করে গলে গিয়ে যে খোলামেলা দিন নিয়ে এল, তার মধ্যে দিয়েই সাইকেল চালিয়ে পুকুরের ঘাটে এসে বসল বসুন্ধরা। ওর পাশে প্রভাত। ওদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মন্টু, যার ভাল নাম ইরাবান।
‘প্রভাত’ নামের ছেলের সঙ্গে ‘বসুন্ধরা’ নামের মেয়ের কী করে প্রেম হয়, এই কথা যে পাঠক ভাবছেন, তিনি দয়া করে আরও দু’সেকেন্ড সময় নিয়ে এ কথাও একবার ভেবে দেখবেন যে, ঠিক কোন অপরাধে ‘ইরাবান’ নামের ছেলের ডাকনাম ‘মন্টু’ হয়ে গেল!
কেসি নাগ তো খুব কঠিন। কয়েকবার অশোক স্যার ইস্কুলে করিয়েছিল। কিছুই বুঝতে পারিনি। পরীক্ষায় কি অত কঠিন প্রশ্ন দেয়? তাহলে তো সবাই ফেল করবে! বিকেলবেলায় পুকুরপাড়ে বসে প্রভাত বলল।
একই ক্লাসে পড়ে দুজনে। আলাদা ইস্কুল। এক কোচিং। প্রভাত ছত্রিশ নম্বরের উত্তর দিয়েছে। বলছে চার পাবে। বসুন্ধরা একটু বেশি গর্বিত। পনেরো-ষোল বছর বয়সী মেয়েদের থুতনিতে একটা গর্ব থাকে না? যা দেখলে মনে হয়, চাঁদ এসে পাপীর হাতের ছাপ রেখে গেছে, ঠিক তেমনটা। সে কিছুতেই পঞ্চাশের কমে নামতে রাজি নয়। বসুন্ধরা থেমে থেমে বলল, ‘কেসি নাগটা করলে পারতিস। কত করে বললাম তোকে! শুনলি না! বইটা কিনলিও না! প্রি-টেস্টে ফেল করে গেলে যদি টেস্টে বসতে না দেয়, একটা বছর নষ্ট হয়ে যাবে তোর। কী হবে বল তো তখন আমাদের?’
জীবনের বহু সোনার টুকরো রুপোর টুকরো যে আদতে লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট কথার ভারের মধ্যে, যা আগলে রেখে সুখের ভিতর নেমে যাওয়া যায়, ওই বয়সে প্রভাত বা মন্টুর মাথা তা বোঝার জন্য প্রস্তুত ছিল না বলেই ‘আমাদের’ শব্দটা আলাদা করে কানে লাগল না। তার বদলে ইরাবান নামের বন্ধুটির মনে পড়ল, কেসি নাগের বই কিনবে কী করে প্রভাত? ওর বাবার কারখানা তো কবে থেকে বন্ধ! ওর যে কয়েকটা বই আছে, সবই পনেরো বছরের পুরনো সরকারি বই। সেগুলোও প্রভাতের নয়। ইরাবানেরও নয়। পাড়াতুতো এক দিদির কাছ থেকে চেয়েচিন্তে নেওয়া। দুই বন্ধু ভাগ করে পড়ে। কোচিংয়ে সবাই জ্ঞান দিয়ে গিয়েছে! ভাগ্যিস বইয়ের নাম জানতে চায়নি কেউ!

কেসি নাগ তো খুব কঠিন। কয়েকবার অশোক স্যার ইস্কুলে করিয়েছিল। কিছুই বুঝতে পারিনি। পরীক্ষায় কি অত কঠিন প্রশ্ন দেয়? তাহলে তো সবাই ফেল করবে! বিকেলবেলায় পুকুরপাড়ে বসে প্রভাত বলল।
পাকা পাকা কথা বলিস না প্রভাত! বসুন্ধরার বিনুনিটা ডানদিকে ঘাড়ে পড়েছিল। সেটা বাঁদিকে চলে গেল। ও প্রভাতের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর বাবা-মায়ের রেলের চাকরি। বছরে দু’বার এসি কামরায় বসে সমুদ্র-পাহাড়। ‘কত করে বলেছিলাম বল তো তোকে। আমার একটা কথা শুনলি না তুই। একটু চেষ্টা করলে কী ক্ষতি হয়ে যেত তোর?’
ঘণ্টায় কত কিলোমিটার গতিতে এই সময়টা পেরোল মন্টু? হাওয়ার অনুকূলেই বয়ে যাচ্ছিল। তবে, খুব দ্রুত নয়। ঘণ্টায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ কিলোমিটারের বেশি হবে না বোধহয়।
বসুন্ধরা কাঁদছে। পুজোর আগের বিকেলবেলায় ওই পুকুরপাড়ে দু’জন বসে আছে। আর এক বন্ধু মন্টু অল্প একটু দূরে। বসে থাকা দু’জনকে আশ্বিনের শেষ বেলার আলোয় মনে হল দুটো মৃতদেহ। অন্ধকার বাড়লে পুকুরে পিছন থেকে ঠেলে ফেলে দিলেই হয়। নাকি, জমিদার আর যমরাজ? পুজোর আগের ওই আলোর ভিতরেও মনে হল অনেকগুলো চোর-ডাকাত লুকিয়ে আছে। তাদের মুখগুলো অশোক স্যারের ক্লাসে দেখা কেশবচন্দ্র নাগের ছবির মতো।

অশোক স্যার বলেছিল, ‘প্রতিটা অঙ্ক পেরোলে তুমি একটা নতুন মানুষ। অঙ্কটা করে ফেলার পর যার একটা নতুন মন তৈরি হল। অঙ্ক মানে তো একটা লড়াই। এই লড়াইটার পুরস্কার হিসেবেই অঙ্কটা চলে যাওয়ার আগে আমাদের ওই নতুন মনটা দিয়ে যায়। যা দিয়ে আমরা পরের অঙ্কটা করি অথবা অঙ্ক থেকে দূরে সরে যাই।’ মন্টু সরে এল। সরতে সরতে পঁচিশ-ত্রিশ বছর পেরিয়ে গেল সে।
ঘণ্টায় কত কিলোমিটার গতিতে এই সময়টা পেরোল মন্টু? হাওয়ার অনুকূলেই বয়ে যাচ্ছিল। তবে, খুব দ্রুত নয়। ঘণ্টায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ কিলোমিটারের বেশি হবে না বোধহয়। কারণ, দুটো ল্যাম্পপোস্ট হাওয়ার প্রতিকূলে পড়ে রইল, যার একটির সারাজীবনের জ্যোৎস্না স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো কান্না পেয়েছিল, আর একটির দিকে তাকিয়ে কোনও গভীর নতুন পাটিগণিত পরিহাসের চোখ নিয়ে অপেক্ষা করছিল, তাদের কথা এখনও ভোলেনি সে।

আজ যার একশো নব্বই বছরের জন্মবার্ষিকী, সেই কেসি নাগের বইয়ের সব অধ্যায়েরই শেষের দিকের অঙ্কগুলো সমাধানে তুঙ্গ সাফল্যের একটা স্বাদ পাওয়া যায় বলে জানে সে। শুনেছে। কোনওদিন নিজে তা পায়নি। প্রতিটি সাফল্যের গল্পের নেপথ্যেই তো কিছু হিম-কালো বিষাদ থেকে যায়। আগে থেকে ঠিক করে রাখার পরেও যাচ্ছেতাইভাবে এলোমেলো হয়ে যায় সবকিছু। এক পিঠ দৃশ্যমান মনে হলে পরক্ষণেই খেয়াল পড়ে অপর পিঠ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে! সফলতার নানা বিন্দুকেই নিয়তির মতো পাহারা দিয়ে যায় এমন সব বাস্তুচ্যুতি।
এক বন্ধুর চোখের জল এবং আরেক বন্ধু অতিরিক্ত স্থির— তারপর তারা কোথায় চলে গেল স্টেশন ছেড়ে তা আর জানা হল না কখনও—
যার বই না থাকার কারণে এক বন্ধুর চোখের জল এবং আরেক বন্ধু অতিরিক্ত স্থির— তারপর তারা কোথায় চলে গেল স্টেশন ছেড়ে তা আর জানা হল না কখনও— দুনিয়া যা ভাবে ভাবুক, ভুল ক্যালকুলেশনেই তার জন্মবার্ষিকী পালন করতে চায় পাড়াতুতো দিদির সরকারি বই থেকে অঙ্ক করা একদা বন্ধু মন্টু মুন্সি।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত