(British India Election)
১. ভারতে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রারম্ভিক দিনগুলি
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন সদ্য সমাপ্ত।
মনে প্রশ্ন আসে, আধুনিক ধাঁচের সংসদীয় নির্বাচন পদ্ধতি কি স্বাধীনতার পরেই প্রথম এই দেশে চালু হল? এই প্রশ্নের উত্তরে একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না বলা যায়। অনেকে বলবেন, এ কি সুকুমার রায়ের লেখা ‘হেঁয়ালি-নাট্য’? নির্বাচনের ঐতিহাসিক ভিত্তি ও আইনগত কাঠামোর সূচনা ঘটেছিল ব্রিটিশ আমলে; এ সত্য৷ তবে ওই ব্যবস্থায় সর্বজনীন ভোটাধিকার ছিল না— ভোটাধিকার ছিল সামান্য সংখ্যক মানুষের হাতে।
বিংশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার ধারাবাহিক বিবর্তন ঘটেছে। বিষয়টা বুঝতে ব্রিটিশ ভারতে নির্বাচনী ব্যবস্থার শুরুর দিনগুলির ইতিহাস নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
আরও পড়ুন: আদর্শ ক্ষমতার চালক, না ক্ষমতাই আদর্শের অভিধান
১৮৯২ সালের ‘ভারতীয় কাউন্সিল আইন’ ব্রিটিশ ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই আইনের মাধ্যমে ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রথমবার পরোক্ষ নির্বাচনী প্রতিনিধিত্ব ও সীমিত আকারে ভারতীয়দের অংশগ্রহণের নীতি চালু হয়। তখন পৌরসভা, জেলা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, বণিক সমিতি এবং জমিদারদের প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচনের জন্য প্রার্থী সুপারিশ বা মনোনয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় পরিষদের মোট ২৪ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ৫ জন ছিলেন ভারতীয়। এরা হলেন ফিরোজশাহ মেহতা (বোম্বে), লক্ষ্মেশ্বর সিং (বাংলা), রাসবিহারী ঘোষ, খেম সিং বেদি (পাঞ্জাব) এবং গঙ্গাধর রাও চিতনভিস। এই প্রতিনিধিরা ছিলেন আলংকারিক— বার্ষিক বাজেট নিয়ে আলোচনার অধিকার পেলেও আইন পাশ বা সংশোধনের ক্ষেত্রে ভারতীয় সদস্যদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। সমস্ত চূড়ান্ত ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের নিযুক্ত কর্মকর্তাদের হাতেই ছিল।

২ ‘মর্লি-মিন্টো রিফর্মস’— হিন্দু, মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে স্থায়ী রাজনৈতিক বিভাজনের সূত্রপাত
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভোটাধিকার ছিল সীমিত এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল জটিল। স্কুল পাঠ্যে ‘মর্লি-মিন্টো সংস্কার’ আইনের কথা পড়েছি, তবে সেই বয়সে দেশের অখণ্ডতা বিনষ্টে এই আইনের সুদূরপ্রসারী প্রভাবের বিষয়টা ঠিক বোধগম্য হয়নি।
১৯০৬ সালে ‘মর্লি-মিন্টো রিফর্মস’ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাশ করা হয়। ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড মিন্টো আর ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় ভারতের ‘সেক্রেটারি অব স্টেট’ ছিলেন লর্ড মর্লি। এই সংস্কারের ফলে ১৯০৯ সালে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এবং বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরদের অধীনে আইন পরিষদ গঠনের বিধান রাখা হয়; আইনসভাগুলোতে ভারতীয় প্রতিনিধিদের জন্য পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয়। প্রথম কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে মোট ৬৮ জন সদস্য ছিলেন, যার মধ্যে ২৭ জন নির্বাচিত সদস্য।
খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, মুসলমানদের জন্য আলাদা নির্বাচনী এলাকা ও তার জন্য নির্দিষ্ট নির্বাচকমণ্ডলী ছিল। ভারতবর্ষে এই প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকা তৈরি করা হয়।
এই ২৭ জনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলী দ্বারা নির্বাচিত ছিলেন ১৩ জন— বোম্বে (২), মাদ্রাজ (২), বাংলা (২), যুক্তপ্রদেশ (২), মধ্যপ্রদেশ (১), আসাম (১), বিহার ও উড়িষ্যা (১), পাঞ্জাব (১) এবং বার্মা (১)। হ্যাঁ, তখন বার্মা, আজকের মিয়ানমার একই আইনসভা দ্বারা শাসিত হত, একই দেশের অংশ ছিল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে বার্মার বারবার উল্লেখের পিছনে এটাই ছিল মূল কারণ।
যাই হোক, নির্দিষ্ট শ্রেণি ও বিশেষ নির্বাচকমণ্ডলীর জন্য বাকি ১৪টি আসন রাখা ছিল। এর মধ্যে ছিল ৬টি প্রদেশের (বোম্বে, মাদ্রাজ, বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা, যুক্তপ্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশ) জমিদারদের নির্বাচনী এলাকা থেকে একজন করে নির্বাচিত প্রতিনিধি; পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নির্বাচিত মুসলমানদের জন্য ৬টি সংরক্ষিত আসন (বোম্বে, মাদ্রাজ, যুক্তপ্রদেশ এবং বিহার ও উড়িষ্যা থেকে একটি করে এবং বাংলা থেকে দুটি)। এছাড়াও ব্রিটিশ বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদের জন্য ২টি আসন রাখা ছিল— এরা বাংলা ও বোম্বে ‘চেম্বারস অব কমার্স’ কর্তৃক নির্বাচিত।

খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, মুসলমানদের জন্য আলাদা নির্বাচনী এলাকা ও তার জন্য নির্দিষ্ট নির্বাচকমণ্ডলী ছিল। ভারতবর্ষে এই প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকা তৈরি করা হয়। ব্রিটিশ ভারতে ধর্মের ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকা এবং ‘পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী’ চালু করা হয়েছিল। এর পিছনে একটি ছোট্ট ইতিহাস রয়েছে, ১৯০৬ সালে সেই সময়ের মুসলিম রাজনীতির অন্যতম প্রধান নেতা আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম নেতার একটি প্রতিনিধি দল লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পৃথক মুসলিম নির্বাচন ব্যবস্থা দাবি করে। আগা খান হলেন শিয়া ইসমাইলি সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা।
যখন ১৯০৯ সালের ভারত সরকারের আইন অনুযায়ী মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনী এলাকা দেওয়া হয়েছিল, তখনও কিন্তু মহম্মদ আলি জিন্নাহ কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিলেন এবং আগা খানের ডেপুটেশনের সঙ্গে যুক্তও ছিলেন না।
মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যে, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য এক অমূলক চিন্তা।
ব্রিটিশ সরকার আগা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎকে বিশেষ গুরুত্ব দিল— ১৯০৯ সালের ভারত সরকারের আইন অনুযায়ী মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী এলাকা বা ‘পৃথক প্রতিনিধিত্ব’ দেওয়া হল। এই ব্যবস্থায় কিছু নির্বাচনী এলাকা কেবল মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হত এবং সেখানে অন্য কোনও ধর্মের মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার পেতেন না। এর ফলে মুসলিম সম্প্রদায় রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অধিকার সুরক্ষিত করার সুযোগ পেলেও, সামগ্রিক অর্থে এটি ভারতীয় সমাজে গভীর সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করে এবং ধর্মের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন ধারণা প্রতিষ্ঠা করা যে, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য এক অমূলক চিন্তা। হিন্দু ও মুসলমানদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বার্থ যে স্বতন্ত্র, তা জনমানসে প্রতিষ্ঠা করার সহজ উপায় ছিল মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনী এলাকা বা ‘পৃথক প্রতিনিধিত্ব’ বজায় রাখা।

মর্লি-মিন্টো সংস্কার অনুযায়ী নির্বাচনে ভোটার হিসেবে যোগ্যতা অর্জনের জন্য ব্যক্তিকে সম্পত্তির বা জমির মালিকানা, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ অথবা আয়কর বা পৌরকর দেওয়ার প্রমাণপত্র রাখতে হত। ফলে এই ব্যবস্থাতে মূলত ধনী, পশ্চিমা-শিক্ষিত ভারতীয়দেরই ভোট দেওয়ার অধিকার থাকত। নারীদের ভোট দানের অধিকার ছিল খুবই সংকুচিত। আজকের সর্বজনীন ভোটাধিকারের তুলনায় তখনকার ভোটাধিকার ছিল সীমিত সংখ্যক মানুষের— ১৯০৯ সালে জনসংখ্যার ৩ শতাংশেরও কম মানুষ ভোট দিতে পারতেন।
৩. ‘পৃথক প্রতিনিধিত্ব’ নীতির বিস্তার
১৯০৯ সালের আইনসভা ১৯১৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল; এরপর ১৯১৫ সালের ‘গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট’ ব্রিটিশদের ভারত শাসন সংক্রান্ত পূর্ববর্তী সমস্ত আইনকে বাতিল করে এবং তার জায়গায় একটি সুসংবদ্ধ আইন তৈরি করে।
১৯২০ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ ভারতে কেন্দ্রীয় আইনসভা এবং প্রাদেশিক আইনসভাগুলোর সদস্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯১৯ সালে তৎকালীন ভারত বিষয়ক মন্ত্রী এডউইন মন্টেগু এবং গভর্নর জেনারেল লর্ড চেমসফোর্ড-এর প্রস্তাবিত সংস্কার ১৯১৫ সালের আইনটিতে আরও সংশোধনী আনে। এই আইনেও মুসলমানদের জন্য আসন সংরক্ষণ এবং তাদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর পুরানো নীতি বজায় ছিল। পাশাপাশি, এই প্রথমবারের জন্য শিখ, ইউরোপীয় এবং অ্যাংলোইন্ডিয়ানদের জন্যও আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
১৯২০ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটিশ ভারতে কেন্দ্রীয় আইনসভা এবং প্রাদেশিক আইনসভাগুলোর সদস্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দিল্লিতে অবস্থিত নতুন কেন্দ্রীয় আইনসভাতে ১০৪টি নির্বাচিত আসন ছিল; এর মধ্যে ৬৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হত এবং ৩৮টি আসন ইউরোপীয়দের জন্য সংরক্ষিত ছিল। পাশাপাশি প্রাদেশিক আইনসভার ৬৩৭টি আসনের জন্যও, এই সময়ে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

তখন জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং রাওলাট অ্যাক্টের প্রতিবাদে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে সমস্ত প্রকার সহযোগিতা বন্ধ করা। তাই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯২০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে এবং দেশবাসীকেও তা বর্জন করতে বলে। এই নির্বাচনী বয়কট অবশ্য সামগ্রিকভাবে খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি। কংগ্রেস বয়কট করলেও লিবারেল ফেডারেশন, জাস্টিস পার্টি এবং মুসলিম লীগের একাংশ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল।
৪. ‘ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড’— তফশিলি জাতিকে সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা
১৯৩২ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকের পরে ‘ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড’ ঘোষণা করেন। ক্রমাগত পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর যে ভাবনা ১৯০৯ সালে শুরু হয়েছিল, ধাপে ধাপে সেই ভাবনারই বিস্তার ঘটে ‘ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড’ ঘোষণাতে। এবারে অবদমিত শ্রেণিকে (তফশিলি জাতি) সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের জন্যও পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী তৈরি হয়। এছাড়া আগের মতোই মুসলমান, শিখ, ভারতীয় খ্রিস্টান, অ্যাংলোইন্ডিয়ান এবং ইউরোপীয়দের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যবস্থা চলতে থাকে।
১৯৩৫ সালের ‘ভারত শাসন আইন’ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভারতে প্রবর্তিত সর্বশেষ বড় নির্বাচনী সংস্কার। এই সময়ে প্রাদেশিক আইনসভাগুলোতে প্রথমবার ব্যাপকভাবে প্রত্যক্ষ নির্বাচন শুরু করা হয়।
এই ঘোষণার ফলে ভারতীয় রাজনীতিতে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়— ‘ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড’-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু সমাজকে বিভক্ত করা৷ দলিতদের হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ফন্দি বুঝতে পেরে গান্ধী এই চুক্তির বিরোধিতা করেন এবং ইয়েরওয়াদা জেলে আমৃত্যু অনশন শুরু করেন। পরবর্তীতে গান্ধী ও বি. আর. আম্বেদকরের মধ্যে ঐতিহাসিক পুনা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী বাতিল করে সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলীর ভিতরেই আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সেই ব্যবস্থা স্বাধীন ভারতেও চলে আসছে।
১৯৩৫ সালের ‘ভারত শাসন আইন’ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভারতে প্রবর্তিত সর্বশেষ বড় নির্বাচনী সংস্কার। এই সময়ে প্রাদেশিক আইনসভাগুলোতে প্রথমবার ব্যাপকভাবে প্রত্যক্ষ নির্বাচন শুরু করা হয়। এর ফলে ভোটার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়; যদিও ভোটাধিকার তখনও সর্বজনীন ছিল না; বরং তা সম্পত্তি-মালিকানা, প্রদেয় কর এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

বণিক সমিতি এবং ইউরোপীয় ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন বরাদ্দ থাকত। বিশাল ভূসম্পত্তির অধিকারী জমিদারদের জন্য আলাদা নির্বাচকমণ্ডলী ছিল। শ্রমিক ইউনিয়ন বা ট্রেড ইউনিয়নগুলোর প্রতিনিধিদের জন্য পৃথক আসনের ব্যবস্থা ছিল। উচ্চশিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে কলকাতা, ঢাকা, ও বোম্বের মতো বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের জন্য আলাদা নির্বাচকমণ্ডলী ও আসন সংরক্ষিত থাকত। এসব ক্ষেত্রে প্রাথমিক নির্বাচন হত, সেই নির্বাচিত সদস্যরা ভোট দিয়ে নির্বাচনী ক্ষেত্রের প্রার্থীকে নির্বাচন করতেন।
মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ ভোটাধিকার পায়, প্রায় ৩ কোটি মানুষ ভোটদানের অধিকার লাভ করেন।
৫. বাংলায় সংসদীয় রাজনীতি
পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী নীতি কংগ্রেসের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। এই জটিল ও বিপজ্জনক সময়ে বাংলা তথা ভারতের রাজনীতিতে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার কাজটা সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল। এই বিষয়ে চিত্তরঞ্জন দাশ ও তাঁর অনুগামীরা কংগ্রেসের ভিতর থেকেই স্বরাজ্য দল বলে আলাদা একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯২৫ সালে তাঁর অকাল মৃত্যু হিন্দু-মুসলমান ঐক্য নিয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনকে পিছিয়ে দেয়।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস ৫৪টি আসনে জেতে। কৃষক প্রজা পার্টি ৩৬টি আসন ও মুসলিম লীগ ৪০টি আসন লাভ করে।
১৯২৯ সালে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মুসলমান নেতারা মিলে ‘নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত করেন, আবুল কাশেম ফজলুল হক ছিলেন সহ-সভাপতি। ১৯৩০ দশকের মন্দার প্রেক্ষাপটে পূর্ববঙ্গের প্রায় সব জেলায় প্রজা সমিতি গঠিত হয়। ফজলুল হক প্রজা রাজনীতির মধ্যে উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পান এবং ‘নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি’ থেকে বেরিয়ে এসে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ‘কৃষক প্রজা পার্টি’-র কর্মসূচিতে জমিদারি প্রথা বিলোপ, খাজনার হার হ্রাস, কৃষক সম্প্রদায়ের ঋণ মকুব, বিনা বেতনে প্রাথমিক শিক্ষা চালু ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই পটভূমিকাতে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’-র নেতা ফজলুল হক ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচিত সদস্য হলেন; তিনি ছয় বছর যুক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস ৫৪টি আসনে জেতে। কৃষক প্রজা পার্টি ৩৬টি আসন ও মুসলিম লীগ ৪০টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগ-এর সঙ্গে সমঝোতায় গিয়ে ফজলুল হক ১১ জন সদস্য বিশিষ্ট যুক্ত মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন; মন্ত্রীদের মধ্যে তিনজন ‘কৃষক প্রজা পার্টি’-র, তিন জন মুসলিম লীগ-এর, তিনজন বর্ণ হিন্দুর এবং দুই জন তফশিলি সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন। নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’-র ক্ষমতা বিস্তারলাভ করেছিল।

১৯৪১ সালের মধ্যে এই মিলিজুলি সরকারে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে এবং ফজলুল হক মুসলিম লীগ-এর থেকে আলাদা হয়ে যান। ওই সময় তিনি হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে এক মিলিজুলি মন্ত্রিসভা তৈরি করেন। কিন্তু এর স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ১৫ মাস। প্রথমে মুসলিম লীগ ও পরে হিন্দু মহাসভার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রিসভা গঠনের বিতর্কিত পদক্ষেপ তাঁকে মুসলিম এবং হিন্দু উভয় গোষ্ঠীর কট্টরপন্থীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে তোলে।
তিরিশের দশকে বাংলায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল জটিল। একদিকে আছে কংগ্রেসের মূল মধ্যপন্থী ধারা, যারা জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে অবিভক্ত বাংলায় আন্দোলন পরিচালনা করতে চেষ্টা করেছেন। তাঁরা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হকের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি। এদিকে কলকাতা ও অন্যান্য জেলায় তৈরি হয়েছে মুসলিম লীগ-এর সংগঠন। মুসলিম লীগ ফজলুল হকের ‘কৃষক প্রজা পার্টি’-র সঙ্গে জোট সরকারে ছিল, ফলে তার ক্ষমতা ও প্রভাব পশ্চিমবঙ্গেও বৃদ্ধি পেয়েছিল৷ ওই সময় থেকে বাংলায় বিচ্ছিন্নতাবাদী মুসলিম রাজনীতির সূচনা হয়।
আজকে দাঁড়িয়ে মনে হয়, জাতীয় কংগ্রেস যদি সেই সময় ফজলুল হক-এর ‘কৃষক প্রজা পার্টি’-র সঙ্গে জোট গঠন করত, তবে সেই সময়ে বাংলায় অসাম্প্রদায়িক সরকার গঠিত হওয়ার সুযোগ ছিল।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস সবচাইতে বেশি আসন জিতলেও তাদের জাতীয় নীতি অনুসারে একক ক্ষমতায় না আসার কারণে ‘কৃষক প্রজা পার্টি’-র সঙ্গে জোট তৈরি করে বাংলাতে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করল না। ফলে মুসলিম লীগ-এর সঙ্গে সমঝোতায় গিয়ে ফজলুল হক যুক্ত মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। ক্ষমতায় থাকার ফলে মুসলিম লীগ সরকারি প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের সংগঠন অবিভক্ত বাংলাতে আরও বাড়িয়ে নেয়। এর ফলে তাদের দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রচারের সুযোগ বেড়ে যায়।
আজকে দাঁড়িয়ে মনে হয়, জাতীয় কংগ্রেস যদি সেই সময় ফজলুল হক-এর ‘কৃষক প্রজা পার্টি’-র সঙ্গে জোট গঠন করত, তবে সেই সময়ে বাংলায় অসাম্প্রদায়িক সরকার গঠিত হওয়ার সুযোগ ছিল।
৬. বিট্রিশ ভারতে বাংলায় শেষ নির্বাচন— ১৯৪৬
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে, ফ্যাসিবাদী শক্তি পরাজিত হয়েছে, বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের জয় হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকের শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে সারা দেশে প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন হয়৷ আগেই আলোচনা করা হয়েছে, ব্রিটিশ ভারতে নির্বাচনী এলাকাগুলি ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত ছিল। ১৯৪৬ সালের বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও স্বার্থভিত্তিক নির্বাচনী এলাকা থেকে মোট ২৫০ জন সদস্য নির্বাচিত হন। ১১৩টি আসন পেয়ে মুসলিম লীগ বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই আইনসভার আসন বিন্যাস ছিল—
মুসলিম লীগ: ১১৩; জাতীয় কংগ্রেস: ৮৬; ইউরোপীয়: ২৫, নির্দল তফশিলি জাতি: ৬; কমিউনিস্ট পার্টি: ৩; কৃষক প্রজা (মুসলিম): ৩; নির্দল মুসলিম: ৩; হিন্দু মহাসভা: ১; নির্দল হিন্দু: ১; অন্যান্য (২ জন ভারতীয় খ্রিস্টানসহ): ৮।
দেশ স্বাধীন হল, আবার দেশ ভাগও হল। ব্যাপক সংখ্যক মানুষ দেশত্যাগী হলেন— ধর্মের ভিত্তিতে মানুষ বাস্তুহারা হলেন।
১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ-এর নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। নুরুল আমিন ও তাফাজ্জল আলি বিধানসভার স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই বিধানসভার বিশিষ্ট বিধায়কদের মধ্যে ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নেলি সেনগুপ্ত ও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। নির্বাচনী ফলাফলের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল জ্যোতি বসুসহ তিনজন কমিউনিস্ট প্রার্থী, কয়েকজন শ্রমিক ও কৃষক প্রতিনিধি এবং বীণা দাশ (ভৌমিক) সহ কয়েকজন বিপ্লবী কংগ্রেস কর্মীর বিধানসভায় নির্বাচিত হওয়া।
৭. শেষের কথা
দেশ স্বাধীন হল, আবার দেশ ভাগও হল। ব্যাপক সংখ্যক মানুষ দেশত্যাগী হলেন— ধর্মের ভিত্তিতে মানুষ বাস্তুহারা হলেন। সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য প্রবর্তিত ‘পৃথক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থাটি ছিল ব্রিটিশের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ কৌশলের অন্যতম মূল উপাদান।
স্বাধীন ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৫১-৫২ সালে। এই প্রথম দেশের সব মানুষ ভোট দিতে পারলেন। ধর্মীয় ভিত্তিতে তৈরি ব্রিটিশ আমলের ‘পৃথক প্রতিনিধিত্ব’ ব্যবস্থা বাতিল করা হল। ভারতের নতুন সংবিধান অনুসারে কেবল তফশিলি জাতি এবং তফশিলি উপজাতিদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়।
তথ্যসূত্র
Chakshu Roy, ‘History Headline – 1920: The start of India’s election journey’. The Indian Express, (31 March 2024).
Ramachandra Guha, ‘Democracy’s Biggest Gamble,’ World Policy Journal, (Spring 2002).
V.S. Rama Devi and S.K. Mendiratta (Contributor), How India Votes: History of Elections During the British Rule, 4th Reprint (New Delhi Butterworths, 2023)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত