(Ujjhomanush 10)
’৮৭ বোধ হয়, আমার প্রথম মাঠে গিয়ে খেলা দেখা। আমার ৮ তখন। বাবা শিখিয়ে দিয়েছিল বা আত্মায় গুলে দিয়েছিল মোহনবাগান, কিন্তু আমি যে দিন অপূর্ব রোদে নোয়ামুণ্ডির সেই মাঠে খড়ি দিয়ে কাটা টাচলাইনের পাশে গিয়ে বসলাম, বাস থেকে চোখ ঝলসানো আভা ছড়ানো লাল-হলুদ পরে নামছে ইস্টবেঙ্গল। তদ্দিনে আমি জানি, সন্ধেবেলার রেডিয়োয় নিয়ম মেনে বেজে ওঠে কলকাতা ক, আর বাংলা থেকে কত দূরে সারান্ডা জঙ্গলের মাঝে একটি ছোট টাউনে বসে বাবা শোনে, চিমা আর বিকাশ পাঁজির গোলে লিগে সালকিয়া ফ্রেন্ডসকে হারিয়ে ইস্টবেঙ্গল ৫ পয়েন্টের লিড নিয়ে ফেলল। মানে মোহনবাগান পিছিয়ে ৫ পয়েন্টে।
আরও পড়ুন: এক মা, মেয়ে ও না শুকোনো যে ঘা
বাবা চমৎকার গাইত, সাগর সেন পছন্দ ছিল, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় তো বটেই, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, জগন্ময় মিত্র, পিন্টু ভট্টাচার্য… আর তবলা বাজাত, কিন্তু লেফ্টি ছিল, মানে সবার বাঁয়া, বাবার ডান হাতে। তো সে যাক, সর্বক্ষণই, কাজের ফাঁকে, অকাজের ফাঁকেও গুনগুন করত। শুধু ওই স্থানীয় সংবাদে ইস্টবেঙ্গল এগিয়ে গেলেই, বাকি সময়টা কেমন থম মেরে থাকত।

যে দিনের কথা দিয়ে শুরু করলাম, সে দিন বাবার ফেরার কথা। কলকাতা গিয়েছিল, সে দিন ফিরবে, তখনও জানি না, আমার জন্যে একটি হাওয়াইয়ান গিটার নিয়ে ফিরবে। তা, বাবার অফিসের সব কাকুরা আমায় বিকেলে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল আর টাটা ফুটবল অ্যাকাডেমির প্রদর্শনী ম্যাচ দেখাতে। ওই অঞ্চলে, বাস থেকে কৃশানু, চিমা, সুদীপ চ্যাটার্জি, প্রশান্ত ব্যানার্জি, ভাস্কর গাঙ্গুলি, পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় নামছেন, সাংঘাতিক বললেও কিছু বলা হয় না।
মনে আছে, একবার বলটা ছিটকে চলে এসেছিল আমার কাছে, কী গরম, বাপ রে! আর প্রশান্ত এসে ভ্যাবাচ্যাকা আমার কাছে থেকে বলটা চেয়েছিলেন, দে বাবু দে বাবু, বলে। আর মনে আছে, টিএফএ ৭-১ গোলে হেরেছিল। ওদের গোলকিপার, না বুঝতে পেরে, সবটা খেই হারিয়ে ফেলে মুখে-পিঠে গোলা সব শট খেয়েছিলেন, নইলে ১৫ গোল হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু ছিল না।

সবাই হইহই করে সে দিন ফিরে এসেছিল অনবদ্য ম্যাজিক দেখে, কিন্তু আমি মুখে কালশিটে পড়ে যাওয়া ওই মানুষটাকে দেখেছিলাম, এখনও মনে আছে। সাত গোল খেয়েছে, না বুঝতে পেরে প্রায় সমপরিমাণ হয়ে ওঠা গোল আটকেছে, তারপর একা বুট খুলে কাদা সরিয়ে ব্যাগে পুরছে, কাল থেকে আবার ব্যাক টু প্র্যাক্টিস। দূর থেকে আমি একবার তাকিয়েছিলাম তাঁর দিকে। মনে নেই কেন, কিন্তু তাকিয়েছিলাম। চোখ নামিয়ে নিয়েছিলাম, যখন খেয়াল হল যে তিনিও আমার দিকে তাকিয়েছেন। সে চোখ নামিয়ে নেওয়াও যে কেন, তাও বুঝিনি। আমার কি লজ্জা লেগেছিল, তাঁর জন্য? ওই যে অমন অপদস্থ হলেন তিনি।
সারা বিশ্ব তাঁকে যে চোখে দেখল, তার চেয়ে ভিন্ন কোনও রূপসজ্জায় নিজেকে এঁকে কি সে সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন? এ সব কিছুই জানার উপায় নেই।
কিন্তু কে আমার অন্দরে ঢুকিয়ে দিয়েছিল এ ভাবনা, যে তিনি আসলে অপদস্থ হয়েছেন। গোল খেলেই কি তবে চূড়ান্ত অপদস্থ হওয়া হয়? অন্য কোনওভাবেই কি এ পর্ব ডিসাইফার করা যায় না? তাঁর সঙ্গে কথা বলার তো সুযোগ হয়নি, হলেও প্রবল লাজুক বলে আমি বলতাম থোড়ি, কিন্তু কথা হলে জানতে চাইতাম এখন, কী মনে হয়েছিল তাঁর? অপদস্থ নাকি এক তুলকালাম নায়ক? যে সাত গোল খায় কিন্তু আরও অজস্র আটকে দেয়, যেনতেনপ্রকারেণ। কোন রূপে তিনি নিজেকে দেখেছিলেন?

সারা বিশ্ব তাঁকে যে চোখে দেখল, তার চেয়ে ভিন্ন কোনও রূপসজ্জায় নিজেকে এঁকে কি সে সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন? এ সব কিছুই জানার উপায় নেই কিন্তু কোথাও যেন আমার স্থির বিশ্বাস, ক্ষতবিক্ষত হয়ে অসীম সে উহ্যগহ্বরে ফেরার মুহূর্তে তীব্র ‘পরাজিতরা’ও বুঝে নেয়, বোঝাপড়া করে নেয় আগামী পদক্ষেপের সঙ্গে। আগামীর সম্ভাব্য পদস্খলনের সঙ্গে। আগামীর কোনও অপেক্ষারত বীরগাথার সঙ্গেও হয়তো বা।
এই এত কিছু মনে থাকলেও, দেখুন কেমন, ওই গোলরক্ষকের নামটা আবছা হয়ে গিয়েছে আমার। মানে মনে আছে কিন্তু নিশ্চিত নই। কেন এমন বিস্মরণে পড়লেন তিনি? সাত গোল খেয়েছিলেন বলে? কিন্তু আরও কম করে সাত যে আটকেছিলেন, তাও তো মনে আছে, তা হলেও কেন নামটা উহ্য হয়ে রয়ে গেল? ওই গোলরক্ষক এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে কীভাবে ন্যাভিগেট করতেন আবেগের সে মানচিত্র, জানতে বড় কৌতূহল হয়। কীভাবে ক্রমে বিস্মরণকে ডিল করেন যোদ্ধারা, তাও যে নাগালে পাওয়ার বড় শখ জাগে।

ঠিক সেভাবেই কি, যেভাবে কাজলদার কাকা অবনী কাঞ্জিলাল শেষমেশ বুঝেছিলেন? কাজলদাকে দেখেছিলাম, বেড়ে ওঠার বেলায়, উইং দিয়ে অসম্ভব ভাল দৌড়ত, কী দুরন্ত স্পিড, আহা, তেমনই গোলার মতো শট পায়ে আর স্ট্যামিনা, ওরে বাপ। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা কাজলদা নিজেও জানত, সে ভাল খেলে কিন্তু অনেক আগে থেকেই এও জানত, যে ফুটবল চালিয়ে যাওয়া হবে না। চাকরি করতে হবে, আয় চাই শীঘ্র। শুধু অবনী জ্যেঠু মানতে চাইতেন না।
অবনী জ্যেঠু শত চেষ্টায়ও কাজলদাকে যখন বড় দলে খেলাতে পারলেন না, নিঃশব্দে এ শহর ছেড়েছুঁড়ে চলে গিয়েছিলেন, এক পুরনো বন্ধুর বাড়িতে, সম্ভবত কুলটি। সেখানে এক দিন একটা ছোট মাঠের ধারে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, হার্ট অ্যাটাক যদ্দুর মনে পড়ে।
তাঁর ঘোর বিশ্বাস ছিল, যে ভাইপো এই খেলেই, খেলা ঘোরাবে। ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভাইপোকে বড় দলের খেলোয়াড় করাবেন বলে হিল্লি-দিল্লি করে বেড়াতেন। ঠায় বসে থাকতেন রোদ-জল উপেক্ষা করে ভাইপোর খেলার দিনে। শুনেছিলাম, এক দিন ভোর থেকে অমল দত্তের বাড়ির সামনেও গ্যাঁট হয়ে বসেছিলেন কাজলদাকে নিয়ে আর একটা বল নিয়ে, কী একটা টেকনিক নিয়ে পরামর্শ করার ছিল। অমল দত্ত শুনেছি, অবনী জ্যেঠুকে আর কাজলদাকে সময় দিয়েছিলেন।

কিন্তু তারপর এক দিন সত্যিই পরিবারের কথা ভেবে কাজলদাকে একটি আবাসনে সিকিউরিটির কাজ নিতে হল, সে আবাসনের বাচ্চারা যখন খেলত, মাঝেমাঝে দশ-বারো মিনিটের জন্যে উইং দিয়ে দৌড়ে নিত কাজলদা। আর অবনী জ্যেঠু শত চেষ্টায়ও কাজলদাকে যখন বড় দলে খেলাতে পারলেন না, নিঃশব্দে এ শহর ছেড়েছুঁড়ে চলে গিয়েছিলেন, এক পুরনো বন্ধুর বাড়িতে, সম্ভবত কুলটি। সেখানে এক দিন একটা ছোট মাঠের ধারে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, হার্ট অ্যাটাক যদ্দুর মনে পড়ে। জানি না, সে মাঠে বাচ্চারা ফুটবল খেলে বেড়াত কি না, বা এখনও খেলে কি না, বা আদৌ সে মাঠ এখনও মাঠ হয়েই আছে কি না।
জানি না, বাবার সেই রেডিয়োতে আজও কোনও কলকাতা ক বাজে কি না, আর সেখানে অবনী জ্যেঠু বা সেই গোলরক্ষকদের খবর আজও এক চিলতে সময় পায় কি না। বিশ্বকাপের দশমী হয়ে এল তো, মণ্ডপ ফাঁকা করে যখন শুধু একলা প্রদীপ জ্বলে থাকবে কোনও ক্রমে, অবনী জ্যেঠুদের সে আলোয় অবয়ব স্পষ্ট হবে কোথাও না কোথাও, আমার দৃঢ় বিশ্বাস।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত