(Asafoetida In Cooking)
কী যে ছিল সেই আলুভাজা! তখন আমার কাছে, ৮-৯-১০ বছরের এক বালকের কাছে, সে ছিল ম্যাজিক। কবিতা লিখতে পারার ক্ষমতা বা প্রতিভা, কোনওটাই আমার নেই। তাই, এ ক্ষেত্রে কবি জয় গোস্বামীকে নমস্কার জানিয়েই বলি, ‘সে অতি নিকট কথা যাহা বর্ণনা করি, কিছু বলব ধীরেআস্তে, কিছু তড়িঘড়ি…’
আরও পড়ুন: হ্যাঁ, রোগীর পথ্যও সুস্বাদু হয়
স্কুল শেষ হত ১০টা ৪০ মিনিটে। মুরগির খাঁচার মতো রিকশা ভ্যানে চড়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেলা ১১টা গড়াত। কিন্তু তখনই স্নান করতে ইচ্ছে করত না। স্কুল ইউনিফর্ম ছেড়ে বাড়ির পোশাক গলিয়ে কোনও গল্পের বই কিংবা ইন্দ্রজাল কমিক্স অথবা অমর চিত্রকথা গেলা শুরু হত, ঠাকুরমার ঘরের খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে।
তখন একটু একটু খিদেও পেত। আবার, এমন খাবার খাওয়া চলবে না যে, লাঞ্চ করার ইচ্ছে বা ক্ষমতা মরে যাবে। অতএব, হালকা স্ন্যাকস। কখনও-সখনও কেক কিংবা সাবেক জলযোগের ভেজিটেবল প্যাটি। তবে বেশিরভাগ দিনই মুড়ি আর তার উপর অল্প একটু আলুভাজা ছড়ানো। ওটাই ছিল ক্লাস টু-থ্রি-ফোরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পরে আমার কমফোর্ট ফুড বা কমফোর্ট স্ন্যাকস আইটেম।

আলুভাজা অবশ্য বাড়ির তৈরি নয়। প্লাস্টিকের প্যাকেটবন্দি আলুভাজা। কিন্তু সেটা কলকাতার নয়। হালফিলের প্যাকেটবন্দি তো বটেই, সামাজিক অনুষ্ঠানবাড়ির ঝুরো আলুভাজাও যেমন নিষ্প্রাণ-নির্জীব-নীরস হয়, তেমনও নয়। সে আলুভাজা ছিল দিল্লির। কড়মড়ে, লাল, ঝাল মশলা মাখানো। ওই আলুভাজা খেতে খেতে তাকে আলুভাজা বলে দিব্যি ঠাহর করা যেত, মানে আলুভাজার ভিতরে আলুর রস থাকত এবং তাতে একটা মাংস মাংস, আমিষ আমিষ গন্ধ ছিল ভরপুর।
হ্যাঁ, আমিষ আমিষ গন্ধ। যে স্বাদের কথা মনে করে এই এখন, চার দশক পরেও, বিশ্বাস করুন, জিভে জল চলে আসছে। ওই আমিষ গন্ধই ছিল আমার কাছে আলুভাজাটার ইউএসপি। পরে, অনেক পরে বুঝেছি, জিভে জল আনা ওই আমিষ আমিষ গন্ধর রহস্য একটাই— হিং।
আমাদের শৈশব ও কৈশোরকালেই চানাচুরের ওই ব্র্যান্ডের নামডাক শুরু। তাদের ঝাল চানাচুর ও টক-মিষ্টি-ঝাল চানাচুর খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। আমার বরাবর টক-মিষ্টি-ঝাল চানাচুর না-পসন্দ। কিন্তু ওই ব্র্যান্ডের ঝাল চানাচুর আমার কাছে ছিল নেশার মতো
আমার বাবা তখন অফিসের কাজে মাসে অন্তত একবার দিল্লি যেতেন এবং কনট প্লেসের কাছাকাছি কোনও এক জায়গা থেকে আমার জন্য নিয়ে আসতেন ওই আলুভাজা। বাবার নিয়মিত দিল্লি যাওয়া বন্ধ হওয়ার পর আমার ওই আলুভাজা পাওয়া ও খাওয়াও বন্ধ হয়ে গেল। পরবর্তী সময়ে দিল্লিতে নিজে দু’-একদিনের জন্য গিয়ে কিংবা দিল্লি প্রবাসী অথবা দিল্লিতে বেশ কিছু দিনের জন্য বেড়াতে যাওয়া বন্ধু-বান্ধবীদের কাছে আলুভাজা চেয়ে আবদার করায় যা পেয়েছি, সেটা মামুলি আলুভাজা— ওই স্পেশাল আলুভাজা নয়।
আলুভাজার মশলায় হিং ব্যবহার করে তাতে আমিষ আমিষ বা মাংস মাংস গন্ধ এনে দেওয়ার আর্ট এখনকার কারিগরদের প্রায় কারও জানা নেই। রসনাবিলাসী অথবা ভোজনরসিক থেকে নিছক খাদ্যরসিক বা পেটুকে পরিণত হওয়া আমরা হিং বলতে এখন সাধারণত হিংয়ের কচুরি ছাড়া আর কিছু তেমন বুঝি না, জানিও না।

সুলেখিকা ও সুরাঁধুনি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘আদার রসে হিং বেশ কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে, তা দিয়ে রান্না করলে আমিষ আমিষ গন্ধ বেরোবে। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া পাঁঠা বা খাসির মাংস, রুই বা কাতলা মাছের কালিয়া রান্নায় আদার রসে ভেজানো হিং দিলে বোঝাই যাবে না যে, তাতে পেঁয়াজ-রসুন পড়েনি।’
ইন্দিরা আয়ুর্বেদ চর্চা করতে গিয়ে জেনেছেন এই তথ্য। কালীঘাট-সহ বিভিন্ন কালীক্ষেত্রে মা কালীর ভোগের আমিষ রান্নাও হয় পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া, সেখানে এখনও হিংকে এভাবে ব্যবহার করার প্রথা অব্যাহত। রান্নায় ম্যাজিক আনতে হিং-এর মতো মশলা থাকা সত্ত্বেও আমরা তার বহুল ব্যবহার বিস্মৃত হলাম কী বিস্ময়করভাবে! সম্ভবত তার সব চেয়ে বড় উদাহরণ একটি বিশেষ ব্র্যান্ডের চানাচুর।
শৈশবে ও কৈশোরে ‘নিরামিষ তেলেভাজা’ সাইনবোর্ড থাকা দোকান থেকে কেনা আলুর চপে মাংস মাংস গন্ধ পেয়ে অবাক হতাম। বলা হচ্ছে নিরামিষ তেলেভাজা, তা হলে কেন ওই আমিষ গন্ধ? তখন বুঝতে পারিনি।
আমাদের শৈশব ও কৈশোরকালেই চানাচুরের ওই ব্র্যান্ডের নামডাক শুরু। তাদের ঝাল চানাচুর ও টক-মিষ্টি-ঝাল চানাচুর খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। আমার বরাবর টক-মিষ্টি-ঝাল চানাচুর না-পসন্দ। কিন্তু ওই ব্র্যান্ডের ঝাল চানাচুর আমার কাছে ছিল নেশার মতো— দিল্লি থেকে বাবার আনা ঝাল আলুভাজার মতো অতটা না-হলেও বেশ খানিকটা। এবং সেই ঝাল চানাচুরেও তখন ছিল আমিষ আমিষ গন্ধ। একমাত্র কারণ ওই হিং এবং তা ব্যবহার করার বিদ্যে। এখন ওই ব্র্যান্ডের আরও রমরমা, কিন্তু তাদের ঝাল চানাচুরে সেই মাংস মাংস গন্ধটা নেই।

‘বাবুর্চি’ ছবিটা মনে আছে? তপন সিনহার যুগান্তকারী ছবি ‘গল্প হলেও সত্যি’র হিন্দি সংস্করণ। বলিউডে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ওই ছবিতে রাজেশ খান্না মুখ্য চরিত্রে অর্থাৎ বাবুর্চি রঘুর ভূমিকায়। শর্মাদের বাড়িতে গিয়ে প্রথম দিন দুপুরে রঘু রান্নাঘরে তেমন কিছু না পেয়ে রাঁধবেন কাঁচকলার দমপোক্ত আর ওলের কাবাব। বাড়ির বড় ছেলে রামনাথ আর তাঁর ভাই কাশীনাথ ওলের কাবাবকে মাটন কাবাব বলে ভুল করবেন রঘুর অসামান্য রান্নার গুণে।
রান্নাঘরে ঢুকে ওল পড়ে থাকতে দেখেই রঘুর মাথায় খেলে যাবে ওলের কাবাবের আইডিয়া। বাড়ির বড় গিন্নিকে তিনি জিজ্ঞেস করবেন, ‘বড়মা, ঘরে হিং আছে?’ হিং আছে, সেটা জানতে পেরে রঘু বলবেন, ‘তা হলে আর চিন্তার কী আছে? হিং দিয়ে ওলের এমন কাবাব বানাব না…।’ অর্থাৎ, ওলের কাবাব রান্নায় হিংয়ের সঠিক ও কৌশলী ব্যবহার তাকে এতটাই আমিষগন্ধী ও সুস্বাদু করে তুলল যে, মাটন কাবাব বলে ভুল করলেন প্রৌঢ়রা। হিংয়ের জন্যই পেঁয়াজ-রসুন বর্জিত ওই নিরামিষ আইটেমে ঢুকেছে মাংস মাংস গন্ধ।

শৈশবে ও কৈশোরে ‘নিরামিষ তেলেভাজা’ সাইনবোর্ড থাকা দোকান থেকে কেনা আলুর চপে মাংস মাংস গন্ধ পেয়ে অবাক হতাম। বলা হচ্ছে নিরামিষ তেলেভাজা, তা হলে কেন ওই আমিষ গন্ধ? তখন বুঝতে পারিনি। বহু বহু বছর পরে টালিগঞ্জের মালঞ্চ সিনেমা হলের কাছে তেলেভাজার একটি দোকানের মালিকের কথা শুনে সেই ধাঁধার সমাধান হয়।
দোকানের কর্ণধারকে জিজ্ঞেস করায় উনি স্মিত হেসে বললেন, ‘একটু হিং দেওয়া হয়েছে। না-হলে এই গন্ধটা আনা যেত না। এর জন্যই আমাদের ছোলার ডালটা সুপার-ডুপার হিট।’
এক সন্ধ্যায় বাড়ির ফরমায়েশ মতো সেই দোকানে গিয়ে বলেছি, ‘আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজি সব তিনটে করে দিন।’ ছ’ফুটের উপর লম্বা মালিক ভদ্রলোক তখন ফুলুরি আর বেগুনি ভাজছেন মাটির উনুনের আঁচে। আমার কথা শুনে কালো কড়াইয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে আবার ভাজায় মনোযোগ দিলেন তিনি। তারপরে তিনি কেটে কেটে বললেন, ‘এই দোকানে পেঁয়াজি আগে কখনও হয়নি, এখনও হচ্ছে না, ভবিষ্যতেও কোনও দিন হবে না। এটা পুরোপুরি নিরামিষ তেলেভাজার দোকান।’
মানে কী? তার আগে বেশ কয়েক বার ওই দোকান থেকে আলুর চপ এনে বাড়ির সবাই মিলে খেয়েছি এবং মুগ্ধ হয়েছি মুচমুচে ব্যাপারটা আর আমিষ আমিষ গন্ধের জন্যই। আমরা ভেবেছি, পেঁয়াজ না দেওয়া হলেও রসুনের জন্য ওই গন্ধ। কিন্তু ভদ্রলোক যা বললেন, তাতে পরিষ্কার যে, তাঁর দোকানের তেলেভাজায় পেঁয়াজ-রসুনের প্রবেশ নিষেধ। তা হলে? তা হলে ওই আমিষ আমিষ গন্ধের কী কারণ? একটাই কারণ। হিং।

গড়ফার-এর এক রেস্তোরাঁর কর্ণধার শ্যামশ্রী চাকী নানা ধরনের হিঙ্গি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত। গত দোল পূর্ণিমায় ভালবেসে পাঠানো তাঁর ইচড়ের হিঙ্গি চেটেপুটে খেয়েছিলাম। হিঙ্গি মানে, শ্যামশ্রীর কথায়, ‘নিখাদ নিরামিষ যে সব আইটেমে বেশি করে স্বাদ ও গন্ধ আনতে হিং-এর ব্যবহার করা হয়, সে সব আইটেম।’
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের মতো শ্যামশ্রী চাকীরও বক্তব্য, আদার সঙ্গে হিং মিশিয়ে নিরামিষ রান্নায় দিলে আসবে আমিষ আমিষ স্বাদ ও গন্ধ। তবে আদার রসে নয়, ‘আদা বেটে সেই আদা বাটার সঙ্গে হিং মিশিয়ে আমি কিছুক্ষণ রেখে দিই। তারপরে সে জিনিস নিরামিষ রান্নায় দিলে সেই আইটেম আমিষগন্ধী হতে বাধ্য। শুধু আমিষগন্ধী বলে নয়, নিরামিষ ওই পদের স্বাদ অন্য মাত্রায় তুলে দেবে হিং-এর ও রকম ব্যবহার,’ বলছেন শ্যামশ্রী।

কোলাঘাটের একটি রেস্তোরাঁয় জুলাই মাসে কড়াইশুঁটির কচুরির সঙ্গে এক ধরনের ছোলার ডাল পেয়ে তৃপ্তি পেয়েছি, বড় তৃপ্তি। আলু ও নারকোল কুচি মেশানো ছোলার ডাল। এই পর্যন্ত অভিনবত্ব কিছু নেই, নতুনত্বও নেই। কিন্তু অদ্ভুত একটা গন্ধ টানল, অদ্ভুত মনোহারিণী ও খিদে বাড়ানো গন্ধ।
দোকানের কর্ণধারকে জিজ্ঞেস করায় উনি স্মিত হেসে বললেন, ‘একটু হিং দেওয়া হয়েছে। না-হলে এই গন্ধটা আনা যেত না। এর জন্যই আমাদের ছোলার ডালটা সুপার-ডুপার হিট।’
হিং যে এরকম কত খাবারকে হিট করে দিতে পারে! আর সেই হিংকেই কি আমরা ভুলে গেলাম?
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত