সিরিয়ার পথে (এলি কোহেন – এক গুপ্তচরের কাহিনি)

Eli Cohen 21
Eli Cohen 21

সিরিয়ার পথে (এলি কোহেন – এক গুপ্তচরের কাহিনি)

(Eli Cohen 21)

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি কেটে জাহাজ চলেছে বেইরুট পানে। এলি কোহেন চলেছেন তাঁর অন্তিম অভিযানে। জালমান, জেলিঙ্গারের মতো মোসাদ এজেন্টরা যেমন এই যাত্রাপর্বে এসেছে, তেমনই এসেছে রহস্যময় মজিদ শেখ অল-অর্দ। সিরিয়া এলিকে হাতছানি দিচ্ছে, তার রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তে সামিল করার জন্য।

শুরু হল এলি কোহেন একবিংশ পর্ব।


পড়ুন এলি কোহেনের আগের পর্ব – (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯) (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০)


‘কামেল আমিন থাবেত?’

ডাক শুনে এলি কোহেন ঘুরে তাকালেন। তাহলে কি জেলিঙ্গারের বর্ণিত সেই লোক এল, যে তাঁকে মালসমেত সিরিয়া সীমান্ত পার করে দেবে?

১৯৬২ সালের ৫ই জানুয়ারি। ভূমধ্যসাগরের জলরাশি কেটে যাত্রীবাহী জাহাজ এস্তোরিয়া ইতালির জেনোয়া থেকে চলেছে বেইরুট পানে। জাহাজের যাত্রীরা মূলত লেবানীয় নয়তো সিরীয়। লেবানীয়রা তো বেইরুটই যাবে। সিরীয়দের যাত্রা বেইরুটে শেষ হবে না। তারা বেইরুটে নেমে সড়কপথে যাবে দামাস্কাস।

ঠিক এই পথ ধরেই তো এলি কোহেনেরও সিরিয়া যাওয়ার কথা। সেই পথের দিশারীই কি এল?

Eli Cohen 21
ভূমধ্যসাগরের যাত্রীবাহী জাহাজ

সায়ানাইড পিলও রয়েছে

কাহিনির ঘটনাক্রম বোঝার জন্য দিন চারেক পিছনো যাক।

মোসাদের এলির আর্জেন্টিনা পর্ব সফল। কামেল আমিন থাবেত নামে যে এক রইস প্রবাসী সিরীয় আছে, তা বুয়েন্স এয়ার্স জেনে গিয়েছে। ফলে কেউ কামেলের অতীত নিয়ে ঘাঁটতে গেলে বুয়েন্স এয়ার্স পর্বই ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।

এবার আসল অভিযান। মোসাদ খুবই সাবধানে পা ফেলছে। কোনও মতেই ইজরায়েল থেকে কামেল আমিন থাবেত সিরিয়ায় আসছে, তা হওয়া চলবে না। বরং ইউরোপ থেকে লেবানন হয়ে সিরিয়ায় ঢুকলে কেউ সন্দেহ করবে না। ভাববে, ব্যবসায়ী মানুষ আর্জেন্টিনা থেকে ইউরোপে গিয়েছিল। এবার ইউরোপ থেকে দেশে ফিরছে।

জালমান জানালেন, মিউনিখ বিমানবন্দরে জেলিঙ্গার নামে আরেক মোসাদ এজেন্ট এলির জন্য অপেক্ষা করবেন। এলিকে সিরিয়া থেকে বার্তা পাঠানোর জন্য কোড বই-সহ যে ট্রান্সমিটার লাগবে, তা জেলিঙ্গারই এলিকে দেবেন, সঙ্গে দেবেন কামেল আমিন থাবেতের পরিচয় শক্তপোক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর সিরিয়ায় প্রবেশের ভিসা।

আদতে বুয়েনস এয়ার্স থেকে এলি ফিরেছেন ইজরায়েলে নিজের বাড়িতে। মাসখানেক বাড়িতে বিশ্রাম নিয়ে শুরু হয়েছে কোহেনের দামাস্কাস অভিযান।

তাই এলির প্রথম গন্তব্য মিউনিখ। তেল আভিভের লোড বিমানবন্দরে (বর্তমান ইজরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর নামানুসারে এটি ডেভিড বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর) পৌঁছে এলি দেখলেন জালমান তাঁর জন্য অপেক্ষমান। জালমান জানালেন, মিউনিখ বিমানবন্দরে জেলিঙ্গার নামে আরেক মোসাদ এজেন্ট এলির জন্য অপেক্ষা করবেন। এলিকে সিরিয়া থেকে বার্তা পাঠানোর জন্য কোড বই-সহ যে ট্রান্সমিটার লাগবে, তা জেলিঙ্গারই এলিকে দেবেন, সঙ্গে দেবেন কামেল আমিন থাবেতের পরিচয় শক্তপোক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আর সিরিয়ায় প্রবেশের ভিসা। জেলিঙ্গারই এলিকে বলে দেবেন কোন পথ ধরে তাঁর দামাস্কাস যাত্রা হবে।

এলি চুপচাপ সব শুনলেন।

‘আর কিছু?’

Eli Cohen 21
দামাস্কাস অভিযান

‘আর একটা জিনিস। দামাস্কাসে সিরিয়া রেডিওর একজন তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তোমাকে ওকে খুঁজতে হবে না। ওই তোমাকে খুঁজে নেবে। তোমার মতোই সিরিয়ায় ঢুকেছে। তবে বেশি বিশ্বাস করার দরকার নেই।’

‘আর কিছু?’

এবার জালমানের স্বরে আর সেই কাঠিন্যটা রইল না।

‘গুড লাক, এলি। সিরিয়াতে নিজেকে কখনও একা ভেবো না। আমরা সবসময় তোমার সঙ্গেই থাকব।’

‘ইজঝাক বলেছে বুঝি এসব কথা?’

‘নাহ। এগুলো নিতান্তই আমার কথা।’

পায়ের কাছে রাখা একটা মাঝারি মাপের সুটকেস দেখিয়ে বলল, ‘পরে সুটকেসটা খুলে ভাল করে দেখে নিও। আপাতত যা বলছি তা মন দিয়ে শোনো। তোমার কাজের জন্য যা যা দরকার, তার সবই রয়েছে এতে। অদৃশ্য কালিতে সংকেত লেখা কাগজ রয়েছে। অতি ছোট ট্রান্সমিটার রয়েছে।

কথামতোই মিউনিখ বিমানবন্দরে জেলিঙ্গার অপেক্ষা করছিল। দু’চার কথার পর দু’জনে বিমানবন্দরের কাছেই একটা কাফেতে বসল।

হাভানা সিগারে সুখটান দিতে দিতে জেলিঙ্গার কাজের কথায় এল। পায়ের কাছে রাখা একটা মাঝারি মাপের সুটকেস দেখিয়ে বলল, ‘পরে সুটকেসটা খুলে ভাল করে দেখে নিও। আপাতত যা বলছি তা মন দিয়ে শোনো। তোমার কাজের জন্য যা যা দরকার, তার সবই রয়েছে এতে। অদৃশ্য কালিতে সংকেত লেখা কাগজ রয়েছে। অতি ছোট ট্রান্সমিটার রয়েছে। ইলেকট্রিক শেভার রয়েছে, যার তারটা তোমার ট্রান্সমিটার রেডিওর অ্যান্টেনা হিসাবে কাজ করবে। ইয়ার্ডলে সাবানের মধ্যে রয়েছে ডিনামাইট। মানে চরগিরি করতে যা যা লাগতে পারে, তার সবই রয়েছে ওই সুটকেসে।’

Eli Cohen 21
মিউনিখ বিমানবন্দর

এরপর গলার স্বর কয়েক ধাপ নামিয়ে জেলিঙ্গার যোগ করল, ‘ওহ হ্যাঁ। আর একটা কথা। সায়ানাইড পিলও রয়েছে।’

কথাটা বলেই জেলিঙ্গার তাকাল এলির দিকে। তার প্রতিক্রিয়া কী হয়, তা দেখার জন্য।

ভাবলেশহীন মুখে এলির জবাব এল, ‘জানি। যখন সব রাস্তা বন্ধ হবে তখনকার জন্য।’

জেলিঙ্গার কি একটু লজ্জা পেল? নিজে পোড় খাওয়া এজেন্ট হয়ে প্রথম একজন অভিযানে যাচ্ছে, তাকে দুম করে মরার কথা বলে ফেলল?

মিনিটখানেক জেলিঙ্গার চুপ। ঘন ঘন সিগারে টান পড়া দেখেই মালুম হচ্ছে এই পোড়খাওয়া মোসাদ এজেন্ট এলির জন্য নিরাপদ রাস্তা খুঁজছে।

সাততাড়াতাড়ি সে তাই বলল, ‘ছাড়ো ওসব কথা। আপাতত আমাদের চিন্তা কীভাবে তোমাকে সিরিয়া সীমান্ত পার করানো হবে, তাই নিয়ে। শুধু তুমি গেলেই তো হবে না, তোমার এই যখের ধন সুটকেসটিও পার করাতে হবে। আজকাল সিরিয়া সীমান্তে যথেষ্ট কড়াকড়ি। তাই লেবানন হয়ে যাওয়াই ভাল।’

মিনিটখানেক জেলিঙ্গার চুপ। ঘন ঘন সিগারে টান পড়া দেখেই মালুম হচ্ছে এই পোড়খাওয়া মোসাদ এজেন্ট এলির জন্য নিরাপদ রাস্তা খুঁজছে।

মিনিটখানেক বাদে জেলিঙ্গার মুখ খুলল।

‘এক কাজ কর। এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইটে কাল রোম যাও। সেখান থেকে ট্রেনে জেনোয়া যাও। জানুয়ারির পাঁচ তারিখে যাত্রীবাহী জাহাজ অ্যাস্তোরিয়া জেনোয়া থেকে ছেড়ে বেইরুটের দিকে যাত্রা করবে। তুমি টিকিট কেটে জাহাজে চড়ে বসবে। জাহাজেই এক সিরীয় আরবের সঙ্গে তোমার দেখা হবে। তোমার মতোই ব্যবসার কাজে দেশে দেশে ঘোরে। ওই তোমাকে সিরীয় সীমান্ত পার করাবে। চিন্তা করো না। আগেও ও সীমান্ত পার করিয়েছে।’

এলি বললেন, ‘তাহলে তো অত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আজ তো সবে পয়লা জানুয়ারি। চার-চারটে দিন হাতে রয়েছে।’

জেলিঙ্গার ঈষৎ বিরক্তই হল। এলি একটু বেশি গা-ছাড়া ভাব দেখাচ্ছে না? বিরক্তি চেপে বলল, ‘শোনো ইউরোপে হু হু করে দিন কেটে যায়। তোমার সামনে এখন মেলা কাজ। তোমার যাত্রাপথ সামান্য বদল করলাম। তুমি বরং ফ্লাইটে জুরিখ চলে যাও। আমি বলে রাখছি। ইতালি আর সিরিয়ার ভিসা পেয়ে যাবে ওখানে। তারপর ওখান থেকে রোম যেও। রোম পরবর্তী যাত্রাপথ আগের মতোই রইল। কোনও বদল নেই।’

অ্যাস্তোরিয়ার বেশিরভাগ যাত্রীই মধ্যবিত্ত। ফলে কামেল আমিন থাবেতের মতো ধনী ব্যবসায়ীকে যাত্রী হিসেবে পেয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেন যারপরনাই খুশি। বারকতক কামেলের কেবিনেও ঢুঁ মেরে গেলেন যাত্রীর কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না দেখতে।

এলি চুপচাপ শুনছিলেন। জেলিঙ্গার ফের গড়গড় করে বলতে শুরু করল।

‘আর্জেন্টিনা পাসপোর্ট নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ওটা যেমন আছে, আপাতত তেমনিই থাক। জুরিখে পৌঁছে আরেকটা কাজ করবে। সুইস ব্যাঙ্কে তোমার নামে একটা অ্যাকাউন্ট আছে। অন্য কোনও পরিচয়ে আরও একটা অ্যাকাউন্ট খুলো। টাকা পয়সা নিয়ে ভাবতে হবে না। ওই অ্যাকাউন্টে টাকা পড়ে যাবে। মিনিমাম ব্যালেন্স থাকা না থাকা নিয়েও চিন্তা করতে হবে না। তুমি তোমার প্রয়োজনমতো খরচ করতে পারো অ্যাকাউন্ট দুটো থেকে। নাও, এখন উঠে পড়ো। জুরিখের ফ্লাইট ধরো।’

Eli Cohen 21
জাহাজ অ্যাস্তোরিয়া

জেলিঙ্গারকে বিদায় জানিয়ে কাফে থেকে সুটকেসটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন এলি। মিউনিখ থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় জুরিখগামী ফ্লাইট ছাড়ে। সেরকমই একটা ফ্লাইটে সওয়ারি হয়ে জুরিখ চললেন এলি।

আপনার সঙ্গে আমার জমবে মশাই

অ্যাস্তোরিয়ার বেশিরভাগ যাত্রীই মধ্যবিত্ত। ফলে কামেল আমিন থাবেতের মতো ধনী ব্যবসায়ীকে যাত্রী হিসেবে পেয়ে জাহাজের ক্যাপ্টেন যারপরনাই খুশি। বারকতক কামেলের কেবিনেও ঢুঁ মেরে গেলেন যাত্রীর কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না দেখতে।

ঊর্মিমালার মাথায় চড়ে নাচছে শতসহস্র চন্দ্রমা। দূরে জেনোয়ার আলোগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। সব ভুলে প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এলি। কতক্ষণ তাকিয়েছিলেন খেয়াল নেই। হুঁশ ফিরল পাশ থেকে তাঁর নাম শুনে।

সন্ধ্যেবেলায় এলি এলেন জাহাজের মেন ডেকে। জ্যোৎস্না রাত। পরিষ্কার আকাশ। ঊর্মিমালার মাথায় চড়ে নাচছে শতসহস্র চন্দ্রমা। দূরে জেনোয়ার আলোগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। সব ভুলে প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এলি। কতক্ষণ তাকিয়েছিলেন খেয়াল নেই। হুঁশ ফিরল পাশ থেকে তাঁর নাম শুনে।

‘কামেল আমিন থাবেত?’

এক দীর্ঘদেহী তাঁরই পাশে কখন এসে দাঁড়িয়েছেন, সেটা এলি খেয়াল করেননি। এই কি তাহলে জেলিঙ্গারের বলা সেই সিরীয় আরব?

এলি সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন।

আরব শুধু বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন।’

Eli Cohen 21
সিরীয় সেনা

বিনাবাক্যব্যয়ে আরবের পিছু নিলেন এলি। আরবের ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে হাজির হলেন।

এবার আরব মুখ খুলল, ‘আমি মজিদ শেখ অল-অর্দ।’

‘আমি কামেল আমিন থাবেত। আমার ব্যাপারে সবই নির্ঘাৎ জানেন।’

মজিদ ততক্ষণে একটা সিগারেটের প্যাক এগিয়ে দিয়েছে এলির দিকে।

‘মিশরীয় সিগারেট। চলে?’

‘দেখুন, সত্যি কথাটা হল কেউ কারওর সম্বন্ধে সবটা জানতে পারে না। আমাকে বলা হয়েছে, আপনাকে সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়ার জন্য। সে আমি করিয়ে দেব। কেন করব জানেন?

এলি প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরাল।

‘মাঝে মধ্যে চলে।’

মজিদ সিগারেটে লম্বা একটা টান দিল।

‘দেখুন, সত্যি কথাটা হল কেউ কারওর সম্বন্ধে সবটা জানতে পারে না। আমাকে বলা হয়েছে, আপনাকে সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়ার জন্য। সে আমি করিয়ে দেব। কেন করব জানেন? সীমান্তে যেগুলো পাহারা দিচ্ছে বা সেনার যেসব মাথাগুলো এখন দামাস্কাসে বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছে, ওগুলোর একটাকেও দু’চক্ষে দেখতে পারি না।’

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে গেল মজিদ। তারপর এলির দিকে ফিরে বলল, ‘আপনার কি সেনা পছন্দ?’

এলি মুচকি হাসল, ‘আমরা যাওয়া অবধি টেঁকে কী না দেখুন। হয়তো আমরা যাওয়ার আগেই সেনারা হাওয়া হয়ে গেল।’

মজিদ সজোরে টেবিলে চাপড় মেরে বলল, ‘আপনার সঙ্গে আমার জমবে মশাই। আমি কি ছাই শুধু ক’টা ডলারের জন্য এই সীমান্ত পারাপার করাই নাকি? হ্যাঁ, ডলার ওরা দেয় বটে আর সেটা কাজেকম্মেও লাগে। কিন্তু সেটাই একমাত্র কারণ না। আমি আসলে মানুষটা নিজের মর্জিতে চলি। যেটা আমার ঠিক মনে হয়, তাই করি।’

এলি বুঝলেন মজিদ মজলিশি আড্ডাবাজ মানুষ।

তার জীবনের অনেক কাহিনিই বলল মজিদ। আড্ডায় আড্ডায় রাত অনেকটাই কেটে গেল।

এলি উঠে পড়লেন।

মজিদ শুধু বলল, ‘জাহাজে আর দেখা না করাই ভাল। বেইরুটে নেমে দেখা তো হবেই।’

সিরীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে লাগল। শেষমেশ ১৯৬১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর বাথ পার্টি সমর্থিত লেফটানেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম অল-নাহলাহির নেতৃত্বে এক সেনা অভ্যুত্থানে মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামেল নাসেরের সিরিয়াতে আজ্ঞাবহ আব্দুল হামিদ অল সারাজ সরকারের পতন হয়।

অস্থির সিরিয়া

কিন্তু যে সিরীয় সেনা নিয়ে মজিদের এত উষ্মা, ১৯৬২ সালের গোড়ায় তার হালটা একটু জেনে নেওয়া যাক। তাহলেই এলি যখন দামাস্কাসে পা রাখছেন, তখন সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী, সেটা বোঝা সহজ হবে। আসলে সিরিয়ায় তখন চলছে চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা। ১৯৫৮ সাল থেকে তিন বছর মিশরের সঙ্গে গাঁটছড়া ছিল সিরিয়ার। কিন্তু প্রথমে দু’দেশের সেনার মধ্যে হৃদ্যতা থাকলেও পরে দেখা গেল সিরীয় সেনার মাথায় বসছে একের পর এক মিশরীয় কমান্ডার।

ফলে সিরীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে লাগল। শেষমেশ ১৯৬১ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর বাথ পার্টি সমর্থিত লেফটানেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম অল-নাহলাহির নেতৃত্বে এক সেনা অভ্যুত্থানে মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামেল নাসেরের সিরিয়াতে আজ্ঞাবহ আব্দুল হামিদ অল সারাজ সরকারের পতন হয়। সিরিয়া ফের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু রাজনৈতিক ডামাডোল তাতে কমল না। শুরু হল ক্ষমতার টানাপোড়েন।

Eli Cohen 21
তেল আভিভের বিমানবন্দর

লেফটানেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম অল-নাহলাহি নিজে তখনই ক্ষমতায় বসতে ভরসা পেলেন না। সম্ভবত নাসেরপন্থী অফিসার গোষ্ঠীর পাল্টা অভ্যুত্থানের শঙ্কাতেই এই কাজ করলেন তিনি। তবে একেবারে ক্ষমতা ছাড়তেও রাজি ছিলেন না আব্দুল করিম। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একের পর এক সেনা মনোনীত সরকার গঠন করলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই চালও সফল হল না। ডিসেম্বরের মধ্যে সেনা মদতপুষ্ট মামুন অল-কুজবারি আর ইজ্জত অল-নুসের সরকার পড়ে গেল।

বাধ্য হয়ে ভোটের রাস্তা ধরল সেনা। ১৯৬১ সালের ১লা ও ২রা ডিসেম্বর সিরিয়াতে সংসদীয় নির্বাচন হল। দেখা গেল, ১৭২ আসন বিশিষ্ট সংসদে দুই রক্ষণশীল দল পিপলস পার্টি আর ন্যাশনাল পার্টি যথাক্রমে ৩৩ ও ২১টা আসন পেয়েছে। বাথ পার্টির ঝুলিতে ২০টা আসন। বাকি ৮৪টি আসন নির্দলের। সর্ববৃহৎ দল হিসাবে পিপলস পার্টির নাজিম অল কুদসি হলেন প্রেসিডেন্ট আর মারুফ অল-দাওয়ালিবি হলেন প্রধানমন্ত্রী।

এলি যখন সিরিয়াতে ঢুকছেন, তখন সিরিয়াতে কুদসি জমানা শুরু হয়েছে। মিশর-সিরিয়া গাঁটছড়া জমানায় মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামেল নাসের সিরিয়াতে একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য বাথ পার্টি শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।

উল্লেখ্য, দাওয়ালিবি ১৯৫১ সালে ১২ ঘণ্টার জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এক সেনা অভ্যুত্থানে তার সরকারের পতন হয় এবং তিনি সাময়িক সময়ের জন্য বন্দিও হন। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় দাওয়ালিবির দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্বেও। এই প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ছিল মাত্র মাস তিনেকের এবং এরও পতন ঘটে এক সেনা অভ্যুত্থানে। ১৯৬১ অভ্যুত্থানের নায়ক লেফটানেন্ট কর্নেল আব্দুল করিম অল-নাহলাহি ফের ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন ১৯৬২ সালের ২৮শে মার্চ।

প্রেসিডেন্ট কুদসি ও প্রধানমন্ত্রী দাওয়ালিবি বন্দি হন। ১লা এপ্রিল পাল্টা অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট কুদসি ও প্রধানমন্ত্রী দাওয়ালিবি মুক্তি পান। কুদসি তার কুর্সি ফিরে পেলেও দাওয়ালিবিকে পদত্যাগ করতে হয়। ১৯৬৩ সালে যখন বাথ পার্টি ক্ষমতা দখল করে, তখন ফের কুদসি আর দাওয়ালিবি অন্তরীণ হন। পরে দাওয়ালিবি প্রথমে লেবানন ও পরে সৌদি আরবে নির্বাসনে চলে যান।

Eli Cohen 21
এলি কোহেন

অর্থাৎ এলি যখন সিরিয়াতে ঢুকছেন, তখন সিরিয়াতে কুদসি জমানা শুরু হয়েছে। মিশর-সিরিয়া গাঁটছড়া জমানায় মিশরীয় প্রেসিডেন্ট গামেল নাসের সিরিয়াতে একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য বাথ পার্টি শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই ছক অনুসারে বাথ পার্টির অনেক শীর্ষ নেতাকেই উচ্চ পদে বসিয়ে বাইরের দূতাবাসে পাঠিয়ে দেওয়া হয় যাতে দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার ধারে কাছে না থাকতে পারে।

বাকিদের অবশ্য অত ভাল ভাগ্য নয়। পুলিশি অত্যাচারের ভয়ে তারা হয় আত্মগোপন করে, নয়তো দেশ ছেড়ে পালায়। ফলে ৩ বছরের দু’দেশের গাঁটছড়া জমানা বাথ পার্টির কাছে হয়ে দাঁড়ায় এক দুঃস্বপ্ন। সেই জমানা শেষ হলে ফের বাথ পার্টির নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ক্ষমতা দখলের মতো অবস্থায় ছিল না তারা।

সিরিয়ার জনগণ কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্রের স্বাদ তেমন ভাবে পায়নি। বরং বারবার সেনা অভ্যুত্থান দেশটিকে চূড়ান্ত অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে মজিদ শেখ অল-অর্দের মতো লক্ষ লক্ষ সিরিয়বাসীর কাছে সেনার কর্তাদের খুব একটা ইজ্জতও নেই।

আর্জেন্টিনা থাকতেই এলি সিরিয়ার সেনা ও প্রশাসনের উঁচু মহলে ঢোকার জন্য বাথ পার্টিকে তাঁর পাখির চোখ করেন। এটাই সিরিয়ায় এলির সাফল্যের তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ অবধি বাথ পার্টি নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করে। সেই সময় পাশে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই এলি বিশ্বস্ততা অর্জন করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে বাথ পার্টি ক্ষমতায় চলে এলে এলির সামনে তথ্যের ভাণ্ডার খুলে যায়, যার সুফল আজও ইজরায়েল পেয়ে চলেছে।

এখানে বলে রাখা ভাল, সিরিয়ার জনগণ কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্রের স্বাদ তেমন ভাবে পায়নি। বরং বারবার সেনা অভ্যুত্থান দেশটিকে চূড়ান্ত অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ফলে মজিদ শেখ অল-অর্দের মতো লক্ষ লক্ষ সিরিয়বাসীর কাছে সেনার কর্তাদের খুব একটা ইজ্জতও নেই।

বেইরুট এগিয়ে আসছে। এলি মনে মনে তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিযানের জন্য তৈরি হলেন।

তথ্যসূত্র
(১) ড্যানিয়েল গর্ডিস-ইজরায়েল- আ কনসাইজ হিস্টরি অফ আ নেশন রিবর্ন
(২) জ্যাক্সন হ্যালে-এলি কোহেন- দ্য স্পাই হু নিয়ারলি বিকেম আ সিরিয়ান মিনিস্টার-
(৩) এলি কোহেন- আ লাইফ অফ এসপিওনাজ অ্যান্ড স্যাক্রিফাইস
(৪) এলি বেন-হানান- আওয়ার ম্যান ইন দামাস্কাস-এলি কোহেন
(৫) পিটার ম্যান্সফিল্ড, নিকোলাস পেলহাম- আ হিস্টরি অফ দ্য মিডল ইস্ট
(৬) মাইকেল বার- যোহার, নিসিম মিশাল-মোসাদ

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়

কিংশুক বন্দ্যোপাধ্যায়

মূলত শিল্প বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাংবাদিকতায় ব্যপ্ত বিগত তিন দশক। তবে সুযোগ পেলে ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে পড়া বা অন্য ধরনের লেখাতে প্রাণের আরাম খোঁজার চেষ্টাও চলে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
ভারতীয় শিল্পকলা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন সনৎ কর। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যাপক সনৎ কর ছাপচিত্রর ক্ষেত্রে একাধিক নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। আন্তর্জাতিক প্রিন্ট-মেকিং পুরস্কার, শিরোমণি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার, বিশ্বভারতীর গগন-অবনী পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মানে সম্মানিত হন। ২০১১ সাল নাগাদ সনৎ করের সঙ্গে আমার পরিচয় শান্তিনিকেতনে ওঁর রতনপল্লীর বাড়িতে। লিখছেন অরিজিৎ মৈত্র...
Please login to bookmark Close
১৯৭৫, মে মাসের ১৯ তারিখ, ওহায়ও-র ক্লিভল্যান্ড-এ একটি গ্রসারি দোকানের সামনে হ্যারল্ড ফ্র্যাঙ্ক্‌স খুন হলেন। তাঁকে হত্যা করল কেউ বা কারা। শোনা গিয়েছিল, হ্যারল্ডকে দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ প্রথমে মারে, তারপর তাঁর উপর অ্যাসিড ছুঁড়ে মারা হয়, তারও পর একজন হ্যারল্ডকে গুলি করে। পড়ুন উহ্যমানুষ দ্বাদশ পর্ব। লিখছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য...
Please login to bookmark Close
নবগঠিত প্রতিষ্ঠানের জন্য লোকলস্কর ও দফতর প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতি ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব সীমানার বাইরে অবস্থিত ‘জি ব্লক হাটমেন্ট’-এ ঠাঁই মিলল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এইসব একতলা ব্যারাকগুলো তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৭-এর পর নতুন নতুন মন্ত্রক আর প্রতিষ্ঠানের কাজ শুরুর সময় সাময়িকভাবে অনেকেরই ঠিকানা হয় জি ব্লক হাটমেন্ট। পড়ুন প্ল্যানিং কমিশন প্রবর্তন থেকে বিসর্জন পর্ব ৪। লিখছেন অমিতাভ রায়...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com