(Belkulai Dasbari Durgapuja)
২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রক্তবীজ সিনেমাটি যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে এই চলচ্চিত্রে ভারতের রাষ্ট্রপতির চরিত্রে ভিক্টর ব্যানার্জি এবং তাঁর দিদির ভূমিকায় অনুসূয়া মজুমদার অভিনয় করেছিলেন। ছবিতে দু’জনকে যে বিশাল অট্টালিকায় বসে গল্প করতে দেখা যায়, সেটি কোনও সিনেমার সেট নয়। সেই বাড়িটি ছিল হাওড়া জেলার পাঁচলা ব্লকের বেলকুলাই গ্রামের দাস পরিবারের কয়েক প্রজন্মের বাসস্থান।
আরও পড়ুন: মানকরের বিশ্বাসবাড়ি: লোকশিল্পের ছোঁয়ায় শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গোৎসব
এনএইচ সিক্স হাইওয়ের পাঁচলা বাসস্টপ থেকে দাস বাড়ি প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। জায়গাটি যেন তরুণ মজুমদারের কোনও সিনেমার সেট থেকে উঠে আসা দৃশ্য। দু’ধারে সবুজ বনানীর মধ্যে সরু সরু রাস্তা, ছোট ছোট বাড়ি আর বড় বড় পুকুর ঘেরা গ্রাম্য পরিবেশে যেতে যেতে বাড়িটির সামনে এসে পড়লে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে দেখতেই ইচ্ছে করে। বলে রাখা ভাল যে, জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘দেবী চৌধুরানী’-র কিছু অংশের শুটিংও এই বাড়িতেই হয়েছিল।

এই বাড়িটি যেমন সুবিশাল, তেমন সুন্দর। খিলান দেওয়া জানালা, সুন্দর স্তম্ভ, লম্বা বারান্দা, বড় উঠোন এবং পাঁচটি খিলান ও কারুকাজ করা স্তম্ভে সাজানো ঠাকুরদালান প্রথম দেখাতেই নজর কাড়ে। সব মিলিয়ে বাড়িটিতে পুরনো বাংলার জমিদারবাড়ির এক আমেজ এখনও টিকে আছে। কলকাতা থেকে মাত্র ৩৩ কিলোমিটার দূরে হলেও দুর্গাপুজোর সময় এখানে কিছুক্ষণ কাটালে মনে হয়, শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে অনেক দূরে অন্য এক জগতে চলে এসেছি।

দাসবাড়ির আসল আকর্ষণ সিনেমা নয়, বরং তার জীবন্ত ঐতিহ্য। বেলকুলাই গ্রামের আর কোনও ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে এত ঘটা করে দুর্গাপুজো হয় না। ফলে দাস পরিবারের পুজোটি ধীরে ধীরে গোটা গ্রামের পুজোয় পরিণত হয়েছে। গ্রামের মানুষজন শুধু দর্শক নন, তাঁরা এই উৎসবের সক্রিয় অংশীদার। পুজোর ক’দিন বাড়িটি কার্যত পরিণত হয় এক বৃহৎ পারিবারিক মিলনক্ষেত্রে। আর দাস পরিবারের অতিথিপরায়ণতাও এই অভিজ্ঞতাকে আরও বিশেষ করে তোলে।

পরিবারের সদস্য সৌরভ দাসের কাছ থেকে জানা যায়, তাঁদের দুর্গাপুজো বৈষ্ণব রীতি মেনে অনুষ্ঠিত হয়। তাই পুজোর সময় কোনও প্রাণী বা ফল-সবজিও বলি দেওয়া হয় না। এর পরিবর্তে, একটি মাটির পাত্রের ভেতর ‘গোটা মাসকলাই’ রেখে প্রতীকী ‘বলি’ দেওয়া হয়।
দাস পরিবারের কুলদেবতা নারায়ণ (শালগ্রাম শিলা রূপে) এবং বিশ্বেশ্বর শিব। বাড়ির বাইরে পৃথক দুটি মন্দিরে এখনও তাঁদের নিত্যপুজো হয়। একসময় পরিবারের বৈষ্ণব ঐতিহ্যের কারণে দুর্গাপুজোর পরিবর্তে মূলত দোল ও জন্মাষ্টমীর মতো কৃষ্ণকেন্দ্রিক উৎসব পালিত হত।
১৯৩৪ সালে এই বাড়ির প্রবীণ সদস্যা কাদম্বিনী দেবীর এক নাতবৌ আশালতা, দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান। তারপরেই এই বিশাল বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু হয়। কাদম্বিনীর ইচ্ছানুসারে তাঁর দুই পুত্র, চন্দ্র কুমার ও অধর চন্দ্র, এই বাড়ির ঠাকুরদালানে দুর্গাপুজো শুরু করেন। এই বাড়ির প্রতিমার মুখমণ্ডল শান্ত ও সৌম্য। অন্যান্য অনেক ঐতিহ্যবাহী বাড়ির মতো এখানে অসুরকে সবুজ রঙের পরিবর্তে বাদামি রঙে চিত্রিত করা হয়।

আগে মহালয়ার দিন ‘বোধন’ অনুষ্ঠিত হলেও, বর্তমানে ষষ্ঠীর দিন বাড়ির কাছে একটি বেল গাছের নিচে হোগলা পাতা দিয়ে তৈরি আচ্ছাদনের ভিতরে এই অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করা হয়। গাছটিকে ঘিরে একটি পাকা বেদি রয়েছে, যা ১৯৪৩ সালে অধর চন্দ্রের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। বোধনের সময় পরিবারের কুলদেবতা নারায়ণকেও এই নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসা হয়।
পুজোর সময় ঠাকুরদালানে ধানভর্তি একটি রুপোর কুনকে বসানো হয়। এটি হল বাঙালি হিন্দু গৃহস্থালিতে দেবী লক্ষ্মীর প্রতীকী রূপ, যাকে ‘ধান্যলক্ষ্মী’ হিসেবে পুজো করা হয়। এর ওপরের অংশে সিঁদুর মাখানো থাকে এবং কুনকেটি রেশমি কাপড় দিয়ে মোড়ানো থাকে।

এই প্রতীকী ধান্যলক্ষ্মীকে ঠাকুরদালানে দুর্গা প্রতিমার পাশে স্থাপন করা হয়। এই রীতির পর, পুরোহিত সাতজন বিবাহিত নারীর সহায়তায় নারায়ণের শালগ্রাম শিলাটিকে ঠাকুরদালানে নিয়ে আসেন। এরপর সেই দলটি দুর্গা প্রতিমাকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে এবং সবশেষে ধান্যলক্ষ্মীর পাশে কুলদেবতাকে স্থাপন করে।
সপ্তমীর দিন শুরু হয় নবপত্রিকা স্নানের পর্ব। পরিবারের যে সদস্যর নামে পুজোর সংকল্প করা হয়, তিনিই নবপত্রিকাকে স্নান করতে নিয়ে যান। কাছের পুকুরে নবপত্রিকাকে স্নান করানোর পর ঠাকুরদালানের সামনের উঠানে ১০৮টি জলাশয়ের জল দিয়ে আরও একবার স্নান করানো হয়। দেবীর ভোগেও রয়েছে বনেদি বাড়ির নিজস্ব স্বাদ— লুচি এবং নানা ধরনের মিষ্টি ও ফল। এর মধ্যে বাড়িতে তৈরি নারকেলের নাড়ুর বিশেষ কদর রয়েছে।

সন্ধিপুজোর সময় ঠাকুরদালানে জ্বলে ওঠে ১০৮টি পিতলের প্রদীপ। কলাপাতার উপর এই প্রদীপ জ্বালানোর অনুষ্ঠানে গ্রামের বহু মহিলা অংশগ্রহণ করেন। তখন পুরনো বাড়ির স্থাপত্য, প্রদীপের আলো এবং উৎসবের আবহ মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য দৃশ্য। সাম্প্রতিক কালে বাড়ির মেয়েরা ঢাক ও কাঁসর ঘণ্টার তালে তালে ঠাকুর দালানে গোল হয়ে পা মেলান। সে এক বেশ দেখার মতো দৃশ্য। সৌরভ দাসের সহাস্য উক্তি, “এটা নতুন শুরু হয়েছে।”
নবমীর দিন কুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হয়। পুজোর সময় পরিবারের অনেক সদস্যই বেলকুলাইতে আসেন। যদিও সেই জাঁকজমক আর আগের মতো নেই, তবে পুজোর কয়েকটা দিন সকলে একসঙ্গে আনন্দে কাটান। সৌরভ জানিয়েছিলেন, “আগে দুর্গাপুজোর সময় বাড়ির উঠানে যাত্রা ও পুতুলনাচ হত। তরুণরা নাটক মঞ্চস্থ করত। কিন্তু এখন সেসব আর নেই।” স্থানীয়দের জন্য আয়োজিত যৌথ ভোজের ব্যবস্থাও বন্ধ হয়ে গেছে।
কলকাতার এত কাছে থেকেও বেলকুলাই যেন অন্য এক সময়ের দরজা খুলে দেয়। সিনেমার পর্দায় যে বাড়িকে ক্ষণিকের জন্য দেখা যায়, বাস্তবে তার জীবন অনেক দীর্ঘ— এবং অনেক বেশি জীবন্ত।
দশমীর দিন বাড়ির কাছাকাছি কোনও জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দাসবাড়ির দুর্গোৎসব। কিন্তু উৎসব শেষ হলেও থেকে যায় সেই পুরনো বাড়ির গল্প— স্থাপত্যের গায়ে, ঠাকুরদালানের খিলানে, পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানে এবং গ্রামের মানুষের স্মৃতিতে।
কলকাতার এত কাছে থেকেও বেলকুলাই যেন অন্য এক সময়ের দরজা খুলে দেয়। সিনেমার পর্দায় যে বাড়িকে ক্ষণিকের জন্য দেখা যায়, বাস্তবে তার জীবন অনেক দীর্ঘ— এবং অনেক বেশি জীবন্ত।

কীভাবে যাবেন
এনএইচ ৬-এর ধূলাগড় টোল প্লাজা থেকে পাঁচলা মোড় প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রবীন্দ্র সদন থেকে বাগনান, দীঘা, উলুবেড়িয়া, গাদিয়াড়া ও মেচেদাগামী বাসগুলি পাঁচলায় থামে। এছাড়া, এসপ্ল্যানেড বাস টার্মিনাস থেকেও পাঁচলাগামী প্রচুর বাস পাওয়া যায়। পাঁচলা থেকে টোটো, অটো করে দাস বাড়ি যেতে মিনিট কুড়ি লাগে।

আপনি যদি গাড়ি চালিয়ে যেতে চান, তবে দ্বিতীয় হুগলি সেতু পার হয়ে, কোনা এক্সপ্রেসওয়ে এবং ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে সাঁতরাগাছি, আলমপুর, ধূলাগড় ও রানিহাটি হয়ে পাঁচলা মোড়ে পৌঁছান। সেখান থেকে বামদিকে বাউড়িয়া স্টেশন যাওয়ার রাস্তা ধরে বাসুদেবপুর কেএনপিসি স্কুল পেরিয়ে কেঠোপুল পৌঁছতে হবে। সেখান থেকে বাঁদিকে সোজা রাস্তা ধরে চলে গেলেই দাস বাড়ি পড়বে। বাড়ির আগেই গৃহদেবতার মন্দির দুটি চোখে পড়বে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
