(Ong Bong Chong 9)
চির। সংস্কৃত শব্দ। পূর্বপদ হিসেবে ব্যবহার করে আম-বাঙালি দুটি সমাসবদ্ধ পদ প্রায়ই তৈরি করেন। চিরকাল আর চিরদিন। তেমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে বাঙালির বৈরাগ্যের উদয় হয়। তারা বলে, ‘চিরকাল সমান যায় না।’ এককালে প্রেমে পড়লে বাঙালি বলত, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার।’ আজকাল তেমন প্রেমে কে বা পড়ে? সকলেই জানে ওষুধের মতো প্রেমের ডেট আছে। এক সময়ের পর অচল, ফুরোবে। তবে ‘চিরকাল সমান যায় না’ এই সত্য কথাটা এখনও সবাই খুবই বলে, বলবে।
রবীন্দ্রনাথের অবশ্য চির দিয়ে শব্দ তৈরিতে অশেষ দক্ষতা ছিল। চিরকাল আর চিরদিন এই দুই শব্দে তিনি আটকে থাকতেন না। তাঁর লেখায় চির পূর্বপদটি নানা পরপদের সামনে বসে বিচিত্র সব ভাব প্রকাশ করেছে।
আরও পড়ুন: অংবংচং ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮
প্রযুক্তির কল্যাণে চাইলেই বাঙালি তার উপরে চোখ বোলাতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের লেখাপত্রের অনেকটাই এখন ওসিআর (Optical character recognition) করা হয়ে গেছে। সার্চ ইঞ্জিনে কিওয়ার্ড দিলে সেই শব্দ রবীন্দ্রনাথের লেখায় কোথায় কোথায় আছে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তারপর সেই তালিকার দিকে চোখ বুলিয়ে নানা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। যখন এই প্রযুক্তি ছিল না, তখন এই তথ্য সংকলনই ছিল গুরুত্বপূর্ণ কাজ। রবীন্দ্র রচনাবলীর পাতায় পাতায় গিয়ে দেখতে হত, রবীন্দ্রনাথ কোথায় কী কী অর্থে কোনও একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এখন এই প্রাথমিক কাজটি প্রযুক্তি করছে। আরও কিছুদিন পরে হয়তো, কিংবা এখনই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথের শব্দ প্রয়োগ নিয়ে কৃত্রিম উপায়ে, কৃত্রিম বুদ্ধির সাহায্যে বেশ সুগম্ভীর প্রবন্ধ লেখা যায়। সত্যি গবেষণার বিষয়-আশয় চিরকাল এক থাকে না। চিরকাল গবেষকদের দিনরাত্রি সমান যায় না।

রবীন্দ্রস্নেহধন্য হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় একক নিষ্ঠায় যে অভিধান সংকলন করেছিলেন, সেই ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ খুললে দেখা যাবে চির শব্দ প্রসঙ্গে রবীন্দ্র রচনা থেকে হরিচরণ বেশ কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছেন। হরিচরণের অভিধান সাহিত্য থেকে নানা উদাহরণে পরিপূর্ণ। জ্ঞানেন্দ্রমোহন যেভাবে তাঁর অভিধান সংকলন করেছিলেন, হরিচরণ সেভাবে তাঁর অভিধান সংকলন করেননি। জ্ঞানেন্দ্রমোহন হাত পেতেছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের আনুকূল্যে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছিল। বিজ্ঞাপনের নাম “গ্রাম্য” শব্দ সংগ্রহ। সম্পাদক জানালেন:
‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান সর্ব্বাঙ্গসুন্দর করিতে হইলে সাহিত্যে ব্যবহৃত শব্দ ব্যতীত বঙ্গের প্রত্যেক জেলায় প্রচলিত গ্রাম্য শব্দ সংগ্রহ অপরিহার্য্য। কিন্তু ইহা দুই-এক জনের চেষ্টাসাধ্য নহে। এইরূপ শব্দ-সংগ্রহের পথপ্রদর্শক “Bihar Peasant Life” গ্রন্থ প্রণেতা স্বনামখ্যাত স্যার জর্জ গ্রীয়ার্সন সাহেব এই সঙ্কলন-কার্য্যে বিহারের প্রত্যেক জেলা হইতেই সাহায্য পাইয়াছিলেন। বঙ্গদেশের প্রত্যেক জেলায় সাহিত্যানুরাগী অনুসন্ধিৎসু, এবং অভিজ্ঞ অধিবাসীর নিকট এসম্বন্ধে আমরা সাহায্য প্রার্থনা করি, সংযুক্ত সূচীর অন্তর্গত ও অন্যান্য যে যে বিষয়ে যিনি জ্ঞাত আছেন বা জ্ঞাত হইবেন তাহা এলাহাবাদের ইন্ডিয়ান্ প্রেসে “বাঙ্গালা ভাষার অভিধান” প্রণেতা শ্রীযুক্ত জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহাশয়ের নিকট পাঠাইয়া দিলে আমরা বাধিত হইব। — প্রবাসীর সম্পাদক।’ (প্রবাসী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৫)

অভিধানে সাহিত্যে ব্যবহৃত শব্দই কেবল থাকবে না, সাধারণের ব্যবহৃত নানারকম মুখের কথাও থাকবে। সেই সব শব্দের জন্য সাময়িকপত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। আজকাল কাজের জন্য অনেক সময় টাকা তোলা হয়, সাধারণের কাছ থেকে। এর গালভরা নাম আছে, ক্রাউড ফান্ডিং। এখানে টাকা নয়, শব্দ তোলা হচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ চির পদটি বসানোর সময় প্রয়োগের গতিক অনুসারে কখনও বিলগ্ন, কখনও সংলগ্ন, কখনও বা হাইফেনবদ্ধ করে বসিয়েছিলেন।
হরিচরণের পদ্ধতি আলাদা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, হরিচরণ যখন অভিধানের কাজ করতেন তখন তাঁর ঘরে সর্বত্র বই ছড়িয়ে থাকত। বই থেকে তিনি শব্দ ব্যবহারের ইতিহাস অনুসন্ধান করতেন। প্রযুক্তির সহায়তা পেলে কাজটি সহজতর হত। প্রযুক্তির অভাব সেকালের চিন্তকেরা শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে ঢেকে দিতেন। হরিচরণও তাই করেছিলেন। একালে হয়তো প্রযুক্তি এসেছে, কিন্তু শ্রম আর নিষ্ঠাতে নানা ঘাটতি।

হরিচরণের অভিধানে ‘চির’-র উদাহরণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ থেকে বেশ কয়েকটি প্রয়োগ চোখে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ চির পদটি বসানোর সময় প্রয়োগের গতিক অনুসারে কখনও বিলগ্ন, কখনও সংলগ্ন, কখনও বা হাইফেনবদ্ধ করে বসিয়েছিলেন। হরিচরণের অভিধানে বিলগ্ন ও সংলগ্ন চির পদটির প্রয়োগ রবীন্দ্র-সাহিত্য থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন ‘চির বন্ধু চির নির্ভর চির শান্তি’ রবীন্দ্র প্রয়োগে চোখে পড়ে। এ চির পদের বিলগ্ন প্রয়োগ। চির পদের সংলগ্ন উদাহরণ চিরনিশি, চিরমঙ্গল, চিরসঙ্গী। রবীন্দ্ররচনায় চির বন্ধুর প্রতিশব্দ চিরসখা, চিরসঙ্গীকেও হয়তো বলা চলে। চিরসখা বড় কঠিন শব্দ, পাওয়া যায় কি?
মহাভারতে কৃষ্ণ কি অর্জুনের চিরসখা? না কৃষ্ণ দ্রৌপদীর চিরসখা? যখনই দ্রৌপদী বিপদে পড়েছেন, সখা কৃষ্ণ এসে উপস্থিত। প্রকাশ্য রাজসভায় তিনি লাঞ্ছিতা। কটুবাক্যে তাঁকে আঘাত করা হচ্ছে। বস্ত্র হরণের প্রয়াস করছে দুঃশাসন। এসে দাঁড়ালেন কৃষ্ণ। বনবাসে আছেন পঞ্চপাণ্ডব। দুর্যোধন দুর্বাসাকে পাঠিয়েছেন। ভয়ংকর দুর্বাসা সশিষ্য এসেছেন। যুধিষ্ঠির আহারে নিমন্ত্রণ করেছেন। কিন্তু খাবার কোথায়? দ্রৌপদী বিপদে পড়লেন।

ঋষির অভিশাপ অনিবার্য। আবার সেই কৃষ্ণ। সখা কৃষ্ণ। দ্রৌপদীর পাত্রে এককণা অন্ন। তাই ভক্ষণ করলেন। তৃপ্তি হল। সেই তৃপ্তি সঞ্চারিত হল দুর্বাসা ও তাঁর শিষ্যদের মধ্যে। তাঁদের পেট ভরে গেল। এবার আর কী খাবেন? লজ্জায় না খেয়ে লুকিয়ে পালিয়ে গেলেন। দ্রৌপদী সখা কৃষ্ণের আনুকূল্যে বিপদ থেকে মুক্তি পেলেন। এখন কে বা কার চিরসখা। বন্ধু বলে কিছু হয় না। বস্ত্রহীন দরিদ্রকে কে বাঁচাবে? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের নাম ‘দুঃশাসনীয়’। বস্ত্রের অভাবে গ্রামবাসীরা দিবালোকে বাইরে আসতে পারেন না। সে এক দিন! অপশাসন পিছু ছাড়ে না। জনসাধারণকে রাজনীতি নানাভাবে বিবস্ত্র করে।
নতুন প্রযুক্তি সহায়ে রবীন্দ্রনাথের চির যুক্ত শব্দের দিকে তাকালে মন ভরে যায়। রবীন্দ্রনাথ চিরপন্থী কবি ছিলেন। তাঁর চির-পূর্ব শব্দের তালিকায় কয়েকটি প্রয়োগ অনবদ্য।
নতুন প্রযুক্তি সহায়ে রবীন্দ্রনাথের চির যুক্ত শব্দের দিকে তাকালে মন ভরে যায়। রবীন্দ্রনাথ চিরপন্থী কবি ছিলেন। তাঁর চির-পূর্ব শব্দের তালিকায় কয়েকটি প্রয়োগ অনবদ্য। ‘চির-পুরানো’, ‘চির-একাকিনী’, ‘চির-নূতন’, ‘চির-প্রবাহী’, ‘চির-ব্যাকুলতা’ আরও কত। এই সব শব্দের দিকে তাকালে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথের দিন গিয়েছে। সময়ের যে তলে তিনি প্রবেশ করতে পারতেন, আমরা সেই তলে প্রবেশ করতে পারি না। আমাদের ব্যাকুলতা চির নয়। আমরা সুবিধে ও সুযোগ মতো ব্যাকুল হই। প্রকৃতি আমাদের দু-হাত ভরে দিয়েছিল। আমরা প্রাকৃতিক সম্পদকে লোভে-লালসায় ফুরিয়ে ফেলেছি প্রায়। আমাদের জন্য আর কোনও নদীই চির-প্রবাহী থাকবে না।

পৃথিবী যা হতে পারত., ‘চির-বাসস্থান’ তা আমাদের সভ্যতার লোভে ধ্বংসের মুখে এগিয়ে চলেছে, বুঝতে পারছি না। সত্যি চিরকাল সমান যায় না।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত