(Ujjhomanush 7)
একটা বাচ্চা মেয়ের মুখ বড় মনে পড়ে। ইনফ্যাক্ট হন্ট্ করে। পার্ক সার্কাসের চার নম্বর ব্রিজ থেকে অফিস ফেরতা এক দিন সবে মা ফ্লাইওভারে পৌঁছেছি, গাড়ির গতি কমাতে হল, কী যেন হয়েছে সামনে, একটা ভিড়। মিনিট কিছু পর পুলিশ ছাড়িয়ে দিল জট, আমার গাড়িও এগোল সামনে আর তখনই চোখে পড়ল সেই চোখ। সেই মেয়েটির। বিকেল, সন্ধ্যায় তখনও গা এলায়নি, দান ছাড়বে ছাড়বে করছে, এক খণ্ড মায়াভরা রোদ এসে বাসা বেঁধেছে মেয়েটির গালে-চুলে। তবে চোখের অংশে সে রোদ এক বিন্দুও অগ্রসর হয়নি। চোখের প্রান্ত, সে মেয়ের ছিল স্তব্ধ, স্তম্ভিত। আর দৃষ্টি ছিল আকাশে। তার দৃষ্টি মেনে আমি যেই না তুলেছি মুখ, অমনি…
আরও পড়ুন: উহ্যমানুষ (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬)
অমনি আমি কোন যে এক ঘোরে, কোন যে সে ঘেরে আটকা পড়লাম, এখনও যে বেরোতে পারিনি। দেখি, ফ্লাইওভারের উপরের অংশে, একটি লোক সাংঘাতিকভাবে দাঁড়িয়ে। কীভাবে যে সে পা হড়কে না পড়ে দাঁড়িয়ে ছিল, এখনও বুঝতে পারিনি। নিচে দাঁড়ানো পুলিশকে সে ভয় দেখাচ্ছিল বারেবারে একেবারে তলায়, রাস্তায় লাফিয়ে পড়ার। বহু ছোটবেলায় চোখের সামনে বড় মামার ট্রেনে ছিন্নভিন্ন দেহের কিছুটা দেখে ফেলেছিলাম, কিন্তু ফ্লাইওভারের উপর থেকে লাফিয়ে পড়ার সে ক্ষণ, মরে গেলেও দেখব না বলে চোখ নামিয়েছিলাম। দেখলাম মেয়েটাও অসহায় হয়ে উপরে তাকিয়ে। পেছনে দাঁড়িয়ে একটা স্কুটি। যাতে করে ওই বাবা-মেয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল মা ফ্লাইওভার।

পরের দিন কাগজে দেখেছিলাম, ছোট করে ছাপা খবরটি। ওরা বাবা-মেয়ে। সেই উপর থেকে লাফ মারার হুমকি দেওয়া লোকটিও অক্ষত। পুলিশ অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে তাকে নামাতে পেরেছিল, ভাগ্যিস, তারপর থানায় নিয়ে গিয়েছিল বাবা-মেয়েকে। খবরে দেখেছিলাম, লোকটির স্ত্রী বিচ্ছেদ চেয়েছিল বোধহয়, আর উপার্জনও তেমন ছিল না লোকটির, তাই হঠাৎ এক সেতু পেরনোর মাঝেই, স্বেচ্ছা সেই ছন্দপতনের প্রয়াস।
যে কন্যাসন্তানকে নিয়ে লোকটি হয়তো সে দিন বাড়ি ফিরছিল, কোন অতলান্ত ঘেরে পড়ে যে সে, ঠিক তাকেই জলে ফেলে দিতে উদ্যত হয়েছিল, কখনও জানব না। উহ্য থেকে যাবে তা। এমনকী তাদের কী হল অতঃপর, স্ত্রী ফিরলেন কি না, এই সব কিছুও জানব না কখনও, তা-ও সব উহ্য হয়েই রয়ে যাবে। তারপর, যথারীতি এক সময় আইপিএল আসবে, এসেছেও, আসবে কত পালাবদল, মালাবদলের নিমন্ত্রণও… আর উহ্যঘরে পলিমাটি জমবে।

তারও পর, এই যেমন ঠিক এ মুহূর্তেও, ঝিকিয়ে উঠবে সহসা, সেই মেয়েটির মুখ। ভয়, লজ্জা, অসহায়তামিশ্রিত চোখদুটো। কী দেখছিল সে? বাবার অমন এক বাঁধভাঙা পদক্ষেপ? নিশ্চয়ই সে ভাবছিল না, সে নিজে কোন খাদের কিনারার সম্মুখীন? কে জানে হয়তো, মায়ের অনুপস্থিতিতে সে-ই বাবাকে, অন্য কোনও পাড়ে মাকেও হয়তো, আগলে রাখছিল কোনও মতে? শুধু সে দিন ব্রিজে, তাকে আগলে রাখার মতো খেয়াল, বা সাহস, আমাদের কারও হয়নি। আমি এই এখন এ সব লিখছি, আর মাঝেমাঝে রাতে ওই ঘটনা ভেবে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসি, ব্যস এই অবধিই। ওই প্রায়-মর্মান্তিক ঘটনা আমার ঘুম কেড়ে নেওয়া অবধিই সীমাবদ্ধ। বাকিটা?
বাকিটা আমাদের শেখানো হয়নি, বা অধিকাংশই শিখে নিইনি। উহ্যের খাতায় এ-ভাবেই আমরা এন্ট্রি করি আরও কিছু নাম। আর আমাদের অনেকেরই মোটামুটি বুদ্ধি আছে বলে, সে কাজ করে যে লজ্জা জোটে, তাকেও খুব নিপুণভাবে নিজের মধ্যেই উহ্য করে রেখে দিতে পারি।

আসলে, নিথর হতে বেশ পারি আমরা। আহা বড় সংবেদনশীল মনখানি আমার, আমাদের, ভাবি আমরা। তাই না? সে দিনও তেমন হয়েছিল, যে দিন অফিসে এক তীব্র ভাঙনধরা মহিলা এসেছিলেন, সঙ্গে পুত্র ও হাতে সেদিনকার কাগজ নিয়ে। কাগজে একটি ছবি, গঙ্গাসাগর মেলার। মেলায় লোক সমাগমের। ছবিটিতে একটি লাল গোল করা। ভদ্রমহিলা খুব কাতরভাবে জানতে চেয়েছিলেন, এই দাগ দেওয়া মানুষটি এখন কোথায়। কেউ খুব একটা খেয়ালও ততক্ষণে করেনি, যে তিনি লাল গোল করে আসলে কী দেখাচ্ছিলেন। দেখে বোঝা গেল, ওই ভিড়ের মধ্যে একজন পুরুষের মুখ দাগিয়েছেন তিনি, ও অল্প স্বরে বড় কাতরভাবে জিজ্ঞেস করছেন, লোকটি কোথায়।
অনেক খুঁজেও না পাওয়ার পর, হঠাৎ করে পরশ পাথরের ঠিকানা লেখা চিরকুট হাতে এসে পড়লে বোধহয় এমনই মনে হয়? ঠিক জানি না।
বাকিরা বুঝেই পাচ্ছে না কী উত্তর দেবে, কারণ প্রতিবার গঙ্গাসাগর মেলার আগে অনেক স্টোরি হয় কাগজে, তাতে ব্যবহৃত হয় ফাইল ছবি, অর্থৎ পুরনো কোনও গঙ্গাসাগরের ছবি, প্রতীকী। তেমনই সে বারও হয়েছিল। ফলে, ও ছবি ঠিক কবেকার, কেই বা মাথায় রাখে। কিন্তু ওই ভদ্রমহিলা তো কিছুতেই বুঝতে চাইছেন না। স্বাভাবিক, কারণ, ওই দাগ দেওয়া মানুষটি, তাঁর স্বামী। ট্রেনের কোনও এক যাত্রায়, যিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন, বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন পরিবারের থেকে। ভদ্রমহিলা সেদিনকার ওই কাগজটিকে, ওই ছবিটিকে শেষ খড়কুটো করে ধরেছিলেন। প্রায় মিশে যাওয়া আশায় ফের কীভাবে যেন সে দিনের ওই ছবি প্রবল রূপে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল। অনেক খুঁজেও না পাওয়ার পর, হঠাৎ করে পরশ পাথরের ঠিকানা লেখা চিরকুট হাতে এসে পড়লে বোধহয় এমনই মনে হয়? ঠিক জানি না।
তাঁকে সেদিন বোঝানো যায়নি, সত্য। যে, এ ছবি ঠিক আগের দিনের নয়, এ হয়তো আগের বছরের বা তারও আগের। তিনি পুত্রের হাত ধরে, ওই কাগজ হাতে, অনন্ত অবিশ্বাস চোখর তলায় লেপে, সে দিন বেরিয়ে গেলেন অফিস থেকে। আর আসেননি। আসার কথাও নয়। কয়েক জন এক্সপেক্ট করেছিল তিনি ফিরবেন, কিন্তু তাঁকে চিনতে ভুল হয়েছিল।

মিল দেখুন, কেমন ওই দুই চোখে। ফ্লাইওভারে থমকে যাওয়া ওই মেয়ের চোখ আর অফিস থেকে আরও ভাঙনের দিকে অবিশ্বাস নিয়ে ফিরে চলা ভদ্রমহিলার সেই চোখ। উহ্য দুই মানুষ, এখন কোথায়, কী অবস্থায়, এখনও কি তাঁদের খুঁজে মরতে হচ্ছে তটের রেখা…স্বাভাবিকভাবেই জানি না। জেনে ফেললে যে আমার, আমাদের উহ্য তালিকা থেকে আরও কিছু নামের এন্ট্রি বাদ পড়ে যাবে। আমরা এই বেশ ভাল থাকব, পাড়ার মোড়ে গণধোলাই হচ্ছে জেনেও, জানলা বন্ধ করে একবারও নামব না। পাতে গরম আলুপোস্ত আর রিমোট হাতে বৈভব সূর্যবংশী, আমাদের অতীব সংবেদনশীল মনকে ঢের শান্তি দেবে যে।
আসল উহ্যমানুষ, ওই মেয়ে ও স্বামীর খোঁজে থাকা স্ত্রী না এই আমি-আমরা, জানলে একটু জানাবেন তো প্লিজ…
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত