Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

শিল্প ও শিল্পী-প্রাণ হরেন ঘোষ – ২য় পর্ব

Haren Ghosh
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(Haren Ghosh)

এর আগে পর্যন্ত নিজের দেশ সম্পর্কে উদয়শঙ্করের কোনও ধারণাই ছিল না। কিন্তু মুম্বাইয়ে পৌঁছনোর পর পরাধীন অবস্থার সামগ্রিক চিত্র দেখে তাঁর নতুন ধারণা তৈরি হল। গায়ে চাপিয়ে নিলেন খদ্দরের পোশাক। তখন থেকেই ভারতীয় নৃত্যশিল্পভাবনার উদয় হয়েছিল তাঁর মনে। আর ঠিক এই চিন্তাধারার স্ফুরণটাই উদয়শঙ্করের মধ্যে গভীরভাবে লক্ষ করেছিলেন হরেন ঘোষ, সঙ্গে আঁচ পেয়েছিলেন তাঁর প্রতিভার। এটাই তো হরেনবাবুর কাছে কাঙ্ক্ষিত। তার ফলে উদয়শঙ্কর-প্রতিভা মেলে ধরার কাজে নেমে পড়েছিলেন পুরোদমে।

ড্যান্স রিসাইট্যাল-এর পর উদয়শঙ্করের বড় নাচের অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন নিউ অ্যাম্পায়ার মঞ্চে। দিনটা ছিল ২ আগস্ট, ১৯৩০। পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে পরিবেশিত হল উদয়শঙ্করের অপরূপ একক-নৃত্য! এ ছাড়াও, সেদিনের অনুষ্ঠানে ছিল আলি-ভগ্নিযুগল ও কর্নেল এ. সি. চট্টোপাধ্যায়ের দুই মেয়ে ঊষা (অনসূয়া) ও প্রিয়ার (প্রিয়ংবদা) নাচ, কৃষ্ণচন্দ্র দে-র গান, তিমিরবরণের সরোদ-বাদন এবং আরও কিছু। কলকাতা আলোড়িত হয়ে গেল উদয়শঙ্করের নৃত্য পরিবেশন দেখে। এরপর থেকেই তিমিরবরণ, তাঁর সহশিল্পীদের নিয়ে উদয়শঙ্করের নৃত্যদলে সঙ্গীত রচনা ও পরিবেশনের কাজে যুক্ত হলেন এবং পাড়ি দিলেন বহু জায়গায়।


আরও পড়ুন: শিল্প ও শিল্পী-প্রাণ হরেন ঘোষ – ১ম পর্ব


সে দিন থেকেই ভারতীয় নৃত্যশিল্পে এক নবযুগের সূচনা হয়েছিল বলা যায়, যার প্রধান কারিগর হরেন্দ্রলাল ঘোষ। তাঁর ব্যবস্থাপনায় এর পর দিল্লি এলাহাবাদ, বেনারস, লখনৌ, মুম্বই, চেন্নাই, আমেদাবাদ ইত্যাদি ভারতের বড় বড় শহরে তো বটেই— ইংল্যান্ড ও আমেরিকাতেও নৃত্য পরিবেশন করলেন উদয়শঙ্কর ও সম্প্রদায়। পরাধীন দেশের একজন মানুষ হয়ে কত দূর অবধি নিজের ক্ষমতাকে বিস্তৃত করেছিলেন হরেন ঘোষ, এ তারই নিদর্শন।

শুধু উদয়শঙ্করই নন, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা নানা ধরনের নৃত্যশৈলী ও শিল্পীকে সামনে এনেছিলেন তিনি। বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত সেরাইকেলা অঞ্চলের ‘ছৌ’ নাচ ছিল সেখানকার নিজস্ব শিল্প। প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ, আত্মশক্তিকে অবলম্বন করে, মুখোশ পরে অসম্ভব শারীরিক বিন্যাসে এই বিশেষ ধরনের নাচ পরিবেশন করেন। সেরাইকেলা উৎসস্থল হলেও, ছোটনাগপুর মালভূমির বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এই নাচ চলে, যা আমরা পুরুলিয়াতে দেখি।

Haren Ghosh
নিজের দেশ সম্পর্কে উদয়শঙ্করের কোনও ধারণাই ছিল না

ওই সব অঞ্চলের পিছিয়ে থাকা মানুষজনের একাংশ নিজেদের জীবনযাত্রা, সমস্যা, প্রতিবাদ ইত্যাদিকে বিভিন্ন দেবদেবীর আখ্যান, পৌরাণিক কাহিনি প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে নাচে প্রকাশ করেন। কিন্তু, ওই নির্দিষ্ট অঞ্চল ছাড়া, সেই সময় সেভাবে ‘ছৌ’-এর কথা জানতেন না মানুষ। হরেন ঘোষই প্রথম এই নাচের দল নিয়ে দেশবিদেশ ভ্রমণ করে, ‘ছৌ’ শিল্পকে দিয়েছিলেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এরকম আরও অনেক নৃত্যকলা ও শিল্পীকে যথাযথভাবে আলোকিত করেছেন এই প্রমোদ-পরিচালক।

এক ঝলকে হরেন্দ্রলালের নৃত্যশিল্প-পৃষ্ঠপোষকতার দিকে তাকানো যেতে পারে—

১৯৩০-৩২— এ দেশে উদয়শঙ্করের উদয় ও ভারত ভ্রমণের আয়োজন।

১৯৩৩— উদয়শঙ্কর ও সম্প্রদায়ের ইংল্যান্ড ও আমেরিকা অভিযান।

১৯৩৪— প্রখ্যাত দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যশিল্পী বালা সরস্বতীর কলকাতায় প্রথম নৃত্যানুষ্ঠান।

১৯৩৫-৩৬-৩৭— উদয়শঙ্করের বিদেশসফর।

১৯৩৭— নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী সাধনা বোসের ‘হিন্দু ড্যান্সার্স অ্যান্ড মিউজিসিয়ান্স’ দলের ভারত ভ্রমণ।

১৯৩৭— ভারতের বিভিন্ন জায়গায় এনাক্ষী রমা রাও-এর নৃত্যানুষ্ঠান।

১৯৩৭— ‘কথাকলি’ নৃত্যের শিল্পী কনকলতা ও শঙ্করণ নাম্বুদ্রি-র ভারত সফর।

এছাড়া, ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, সেই সময়ে ব্রিটিশ বাহিনীতে থাকা ভারতীয় সৈনিকদের নিয়েও নৃত্যদল তৈরি করেছিলেন হরেন ঘোষ এবং সেই দল নিয়ে ভারত ভ্রমণ তো বটেই, এমনকি একটি দলকে ইরাক, ইরানেও পাঠিয়েছিলেন তিনি।

১৯৩৯-৪০— সারা ভারতজুড়ে মণিপুরি নৃত্যশৈলীর প্রদর্শন।

১৯৪১— সেরাইকেলার ‘ছৌ’ নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে ভারত ভ্রমণ ও পরে ইউরোপ-আমেরিকা সফর।

১৯৪৫— উদয়শঙ্করের শিষ্য জোহরা ও কামেশ্বরের তৈরি ‘জোহরেশ’ নৃত্য সম্প্রদায়ের সফর।

১৯৪৫— নৃত্যশিল্পী গোপীনাথ ও সম্প্রদায়ের আধুনিক ‘কথাকলি’ নৃত্যশৈলীর ভারত সফর।

১৯৪৬— ‘ভরতনাট্যম’ শিল্পী শান্তা রাও-এর ভারত ভ্রমণ।

এছাড়া, ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে, যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, সেই সময়ে ব্রিটিশ বাহিনীতে থাকা ভারতীয় সৈনিকদের নিয়েও নৃত্যদল তৈরি করেছিলেন হরেন ঘোষ এবং সেই দল নিয়ে ভারত ভ্রমণ তো বটেই, এমনকি একটি দলকে ইরাক, ইরানেও পাঠিয়েছিলেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ ভীষণ স্নেহ করতেন হরেন্দ্রলালকে। ১৯৩০-এর দশকে যখন ‘বিশ্বভারতী’ আর্থিক সংকটের মুখোমুখি, তখন অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে কবিগুরুর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন হরেন ঘোষ। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজন করেছিলেন এক সপ্তাহব্যাপী একটি করে অনুষ্ঠানের। যার নাম ছিল ‘ঠাকুর-সপ্তাহ’। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৭-এর মধ্যে প্রত্যেক বছর বিভিন্ন সময়ে মুম্বাই, গুজরাট, দক্ষিণ ভারত, বিহার প্রভৃতি জায়গায় হরেন ঘোষের ব্যবস্থাপনায় ভ্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও শান্তিনিকেতনের কলাকুশলীর দল। ওই সব জায়গায় এক-একটি সপ্তাহে কবি ভাষণ দেন বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক বিষয়ে, এবং আশ্রমের শিল্পীদল পরিবেশন করেন গান-নাচ-নাটক-নৃত্যনাট্য। প্রত্যেক জায়গার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সংবর্ধিত করেন কবিকে, এবং যথেষ্ট অর্থ সংগ্রহ হয় অনুষ্ঠানগুলি থেকে। সমগ্র আয়োজন একা সামলেছিলেন হরেন ঘোষ।

Haren Ghosh
বালা সরস্বতী

‘ঠাকুর-সপ্তাহ’ পালনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ বেরিয়েছিল ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য়। ১৯৩৩ সালের ২১ নভেম্বরের প্রতিবেদনে লেখা হচ্ছে, ‘…বোম্বাইয়ে কবিগুরুর কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে শ্রীযুক্ত হরেন ঘোষ (কলিকাতা) নানারূপ ব্যবস্থা করিয়াছেন।’ প্রতিবেদন আরও জানাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের মুম্বাই যাওয়া, সেখানে সংবর্ধনা, অনুষ্ঠান আয়োজন, এমনকি এই সফরের ‘ছায়াচিত্র উঠাইবার জন্য শ্রীযুক্ত ঘোষ সমুদয় ব্যবস্থা করিয়াছেন’। 

২৭ ফেব্রুয়ারির (১৯৩৬) প্রতিবেদনে রয়েছে, রবীন্দ্রনাথ পশ্চিম ভারত সফরে দলবল নিয়ে যাবেন, সেই কারণে ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্যের মহড়া চলছে শান্তিনিকেতনে। সফর করা হবে পাটনা, এলাহাবাদ, লখনৌ, দিল্লি, আমেদাবাদ, মুম্বই, নাগপুর এবং হরেন ঘোষ ‘এই সফরের তত্ত্বাবধান করিবেন।’ সফরের মধ্যে পাটনার ‘এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেস’-এ উপস্থাপিত ‘চিত্রাঙ্গদা’ থেকে বিশ্বভারতীর ৩২০০ টাকা অর্থলাভ হয় এবং পাটনাবাসীরা কবিগুরুকে সংবর্ধনাস্বরূপ মানপত্রের সঙ্গে ১০০১ টাকা প্রদান করেন (আনন্দবাজার পত্রিকা ২২ মার্চ, ১৯৩৬)। এভাবে কয়েক বছর ধরে সাফল্যের সঙ্গে ‘ঠাকুর-সপ্তাহ’ পালনের ব্যাপারে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন হরেন ঘোষ।

তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘হোক আমার লোকসান, তবু লোকে একজন খাঁটি আর্টিস্টকে দেখে আনন্দ পাবে তো।’ তাঁর পড়াশোনা, শিল্পজ্ঞান ও মেধা এতটাই গভীর ছিল, নিজের ঢাক পিটিয়ে কেউ তাঁর কাছে খুব একটা সুবিধে করতে পারতেন না।

পরবর্তীকালে যাঁদের আমরা ইম্প্রেসারিও হিসেবে দেখেছি, তাঁদের সঙ্গে হরেন ঘোষের কোনও তুলনাই হয় না। কারণ, বাকিরা প্রায় সবাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে জনপ্রিয় শিল্পীদের জড়ো করে এক একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে দিয়ে, এক ঝুঁকিহীন পথে হেঁটেছেন। নতুন নতুন শিল্প বা শিল্পীর সন্ধানে তাঁদের ততটা দেখা যায়নি। কিন্তু হরেন ঘোষ তা ছিলেন না। তাঁর পরিচয় একজন ইম্প্রেসারিও হলেও, তিনি আসলে ছিলেন নব নব শিল্পী ও শিল্পের আবিষ্কারক।

১৯৩০-৪০ দশকের চরম টালমাটাল সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি একের পর এক সৃষ্টিধর্মী ভারতীয় শিল্প ও প্রতিভাবান শিল্পীর পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘হোক আমার লোকসান, তবু লোকে একজন খাঁটি আর্টিস্টকে দেখে আনন্দ পাবে তো।’ তাঁর পড়াশোনা, শিল্পজ্ঞান ও মেধা এতটাই গভীর ছিল, নিজের ঢাক পিটিয়ে কেউ তাঁর কাছে খুব একটা সুবিধে করতে পারতেন না। যতক্ষণ না হরেনবাবু পেতেন যথার্থ প্রতিভার আঁচ, তিনি আগ্রহই দেখাতেন না তার প্রতি। সব কাজের মধ্যে তিনি ভারতীয় নৃত্যশিল্পকে যে জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, তার জন্যে এই শিল্পজগৎ চিরকাল হরেন ঘোষের কাছে ঋণী থাকবে।

Haren Ghosh
উদয়শঙ্কর ও তাঁর ডান্স ট্রুপ

তীব্র দেশপ্রেমিক-সত্তা নিয়ে সারাজীবন কাজ করে গেছেন তিনি। নানারকম আয়োজনের মধ্যে দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার মানুষের সামনে ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতিকে তুলে ধরে, তাঁদের মুগ্ধ করেছেন। পরাধীন দেশের একজন হয়ে, নিজের কর্মপদ্ধতির মধ্যে দিয়েই তিনি দেশের কাজ করে গেছেন। তাঁর আরও কিছু করার পরিকল্পনা ছিল। যেমন, একটি সবাক ছবি তৈরি, জাতীয় নাট্যশালা গড়ে তোলা, বা তাঁর শেষ আবিষ্কার নৃত্যশিল্পী শান্তা রাওকে নিয়ে বিদেশসফর ইত্যাদি। কিন্তু অত্যন্ত মর্মান্তিক কারণে, তা আর করে উঠতে পারেননি। কী সেই কারণ? শেষে আসবে সেই কথা।

ইম্প্রেসারিও-র কাজের পাশাপাশি, বিভিন্ন নামকরা পত্রপত্রিকায় হরেন ঘোষ লিখেছিলেন বেশ কিছু মূল্যবান লেখা, যা থেকে তাঁর শিল্পগত উপলব্ধির গভীরতা এবং জ্ঞানের পরিধিটা পরিষ্কার হয়। আদর্শ ইম্প্রেসারিও কেমন হওয়া দরকার, তা নিয়ে মাসিক বসুমতীতে (কার্তিক ১৩৫০) তিনি লিখেছিলেন ‘অধিকারীর অধিকার বা ইম্প্রেসারিও’। তাঁর অভিনব অভিজ্ঞতার কথা আছে ‘ইম্প্রেসারিও জীবনে নতুন অভিজ্ঞতা’ লেখায় (শারদীয়া রূপ-মঞ্চ, ১৩৫২)। এরকমই তাঁর লেখা রয়েছে ‘মণিপুরী নাচ’, ‘মণিপুরী লাই-হারোবা নৃত্যের ইতিকথা’, ‘আধুনিক ভারতীয় নৃত্য’, ‘ভারতীয় নৃত্যে বালা সরস্বতী’ ইত্যাদি আরও।

তাঁর বক্তব্য, যা-ই করা হোক, তা যদি বাণিজ্যিকভাবে সফল না হয়, তবে তা হবে নিরর্থক। বাংলা ছাড়াও ইংরেজিতেও লিখেছিলেন বেশ কিছু লেখা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘The Travel Diary of An Impresario’ (Hindustan Standard, Puja Number 1940)

‘চিত্রপঞ্জী’ পত্রিকার বৈশাখ ১৩৪০ সংখ্যায় হরেন ঘোষ লিখেছিলেন ‘দু-তিন রীলের ছবি’ নামে একটি ছোট লেখা। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, নির্বাক যুগে বিদেশি ছবির জগতে বড় সিনেমার আগে যে ধরনের কমেডি-ধর্মী ছোট ছবি (২/৩ রীলের) দেখানো হয়, যা যথেষ্ট জনপ্রিয়তাও পায় সেইসব দেশে, সেই ধরনের ঠিকঠাক মানের ছবি এখানে কেন তৈরি করা যাচ্ছে না? তা কীভাবে ও কত কম খরচে করা যায়, সে ব্যাপারে জানিয়েছিলেন তাঁর সুচিন্তিত মতামত। তাঁর বক্তব্য, যা-ই করা হোক, তা যদি বাণিজ্যিকভাবে সফল না হয়, তবে তা হবে নিরর্থক। বাংলা ছাড়াও ইংরেজিতেও লিখেছিলেন বেশ কিছু লেখা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ‘The Travel Diary of An Impresario’ (Hindustan Standard, Puja Number 1940)।

এরকম একজন অসাধারণ শিল্প-প্রাণ ব্যক্তিত্বের জীবন, এক চরম অনভিপ্রেত ও নৃশংস ঘটনায় আকস্মিকভাবে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা জানি, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর ভয়াবহতা চলেছিল কয়েক মাস ধরে। তারপর কিছুদিন বন্ধ হয়ে, আবার ১৯৪৭ সালের মে মাস থেকে কলকাতা বিধ্বস্ত হল ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে। ৩ জুন ‘দেশভাগ’ ঘোষিত হওয়ার পর, সংঘর্ষ চরম আকার নিল। হরেন ঘোষের অফিস যে ধর্মতলার ‘ওয়াচেল মোল্লা’ বিল্ডিংয়ে, তা ছিল অন্যতম গণ্ডগোলপ্রবণ এলাকা। বাড়ির লোকের শত নিষেধ সত্ত্বেও রোজ অফিসে যেতেন তিনি। শিল্প-পাগল মন কি ঘরে বসে থাকতে পারে? হরেনবাবুর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সবাই তাঁর ভাইয়ের মতো। তিনি শিল্পী, সকল দলাদলি ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে। কিন্তু সে দিন হয়তো তাঁর এই বিশ্বাস ভেঙে গিয়েছিল।

Haren Ghosh
অফিসে কর্মরত অবস্থায় সংঘর্ষকারীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হলেন তিনি

১৯৪৭-এর ৯ জুলাই নিজের অফিসে কর্মরত অবস্থায় সংঘর্ষকারীদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হলেন তিনি। খবরের কাগজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুচি কুচি করে কাটা হরেন ঘোষের দেহ সুটকেশবন্দি অবস্থায় নাকি পাওয়া গিয়েছিল রডন স্কোয়ারে।

‘শিল্পী হরেন ঘোষ’ নামে একটি স্মরণধর্মী নিবন্ধে বিমলেন্দু ঘোষ লিখেছিলেন, হরেনবাবুর ভাই ধীরেন্দ্রলাল ঘোষ, তাঁর দাদার এই রকম মৃত্যু সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁকে বলেছিলেন, ‘… সবই রহস্য। মনে হয় গভীর একটা ষড়যন্ত্র পেছনে আছে।’ বেশ ধাক্কা লাগানোর মতো মন্তব্য! তা হলে কি হরেন ঘোষ নিছক সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের শিকার ছিলেন না? তার পিছনে ছিল অন্য কিছু? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা সে দিনই হয়নি, আজ তো আর প্রশ্নই নেই।

শুধু একটাই কথা, যিনি ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক নজিরবিহীন অবদান রাখলেন, সেই মহান শিল্পপ্রেমীর কি এ-রকম মর্মান্তিক পরিণতি প্রাপ্য ছিল?  আজ আমরা কতটুকু তাঁকে মনে রেখেছি?

শুধু একটাই কথা, যিনি ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক নজিরবিহীন অবদান রাখলেন, সেই মহান শিল্পপ্রেমীর কি এ-রকম মর্মান্তিক পরিণতি প্রাপ্য ছিল? জাতি হিসেবে এ আমাদের চরম লজ্জা! এর বেশি আর কীই বা বলার থাকে? মাত্র ৫৮ বছর বয়সে, হরেন ঘোষের এভাবে চলে যাওয়া, শিল্প-সংস্কৃতি দুনিয়ার যে কতটা ক্ষতি করে গিয়েছিল, তার পরিমাপ করা কারোর পক্ষে কোনওদিনই সম্ভব নয়। আজ আমরা কতটুকু তাঁকে মনে রেখেছি?

তথ্যঋণ
১) ‘রূপমঞ্চ’ (হরেন ঘোষ স্মৃতি-সংখ্যা, শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৫৪)
২) ‘অধিকারীর অধিকার ও অন্যান্য’/ হরেন ঘোষ (সংকলন ও সম্পাদনা: দেবীপ্রসাদ ঘোষ, খড়ি প্রকাশনী, ১৪ আগস্ট ২০১৯)
৩) ‘হেমেন্দ্রকুমার রায় প্রবন্ধ সংকলন’/ দেবীপ্রসাদ ঘোষ সঙ্কলিত (আগামী, জানুয়ারি ১৯৯০)
৪) ‘যখন নায়ক ছিলাম’/ ধীরাজ ভট্টাচার্য (নিউ এজ পাবলিশার্স)
৫) ‘সোনার দাগ’/ গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ (যোগমায়া প্রকাশনী, ডিসেম্বর ১৯৮২)
৬) ‘বাংলা ভাষায় চলচ্চিত্র চর্চা ১৯২৩-৩৩’/ সম্পাদনা: দেবীপ্রসাদ ঘোষ (সিনে ক্লাব অফ ক্যালকাটা, ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৯০)
৭) ‘নট-নাট্য চলচ্চিত্রকথা’/ পশুপতি চট্টোপাধ্যায় (দে’জ পাবলিশিং, সেপ্টেম্বর ২০০৮)
৮) ‘রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ আনন্দবাজার পত্রিকা’ (তৃতীয় খণ্ড) / সম্পাদনা: চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় (আনন্দ পাবলিশার্স, এপ্রিল ২০১১)
৯) ‘সাতাত্তর বছরের বাংলা ছবি ১৯১৯-১৯৯৫’ / সংকলন-গ্রন্থনা-সম্পাদনা: তপন রায় (বাপী প্রকাশনী, অগাস্ট ১৯৯৬)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Picture of অভীক চট্টোপাধ্যায়

অভীক চট্টোপাধ্যায়

জন্ম ১৯৬৫-তে কলকাতায়। বেড়ে ওঠা চন্দননগরে। স্কুল জীবন সেখানেই। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে স্নাতক। ছোটো থেকেই খেলাধূলার প্রতি আগ্রহ। গান শেখাও খুব ছোটো থেকেই। তালিম নিয়েছেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও। দীর্ঘদিন মার্কেটিং পেশায় যুক্ত থাকার পর, গত বারো বছর ধরে পুরোপুরি লেখালেখি, সম্পাদনার কাজে যুক্ত। পুরনো বাংলা গান, সিনেমা, খেলা ইত্যাদি বিষয়ে অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময়-সহ বহু পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তমকুমারের "হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর", হেমন্ত মুখোপাধ‍্যায়ের "আনন্দধারা", রবি ঘোষের "আপনমনে", মতি নন্দীর "খেলা সংগ্রহ"। লিখেছেন "সংগীতময় সুভাষচন্দ্র" বইটি। সাত বছর কাজ করেছেন "মাতৃশক্তি" ও "জাগ্রত বিবেক" পত্রিকায়। বর্তমানে নিজস্ব লেখালিখি ও সম্পাদনা নিয়ে ব্যস্ত।
Picture of অভীক চট্টোপাধ্যায়

অভীক চট্টোপাধ্যায়

জন্ম ১৯৬৫-তে কলকাতায়। বেড়ে ওঠা চন্দননগরে। স্কুল জীবন সেখানেই। কলকাতার সিটি কলেজ থেকে স্নাতক। ছোটো থেকেই খেলাধূলার প্রতি আগ্রহ। গান শেখাও খুব ছোটো থেকেই। তালিম নিয়েছেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও। দীর্ঘদিন মার্কেটিং পেশায় যুক্ত থাকার পর, গত বারো বছর ধরে পুরোপুরি লেখালেখি, সম্পাদনার কাজে যুক্ত। পুরনো বাংলা গান, সিনেমা, খেলা ইত্যাদি বিষয়ে অজস্র প্রবন্ধ লিখেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা, এই সময়-সহ বহু পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উত্তমকুমারের "হারিয়ে যাওয়া দিনগুলি মোর", হেমন্ত মুখোপাধ‍্যায়ের "আনন্দধারা", রবি ঘোষের "আপনমনে", মতি নন্দীর "খেলা সংগ্রহ"। লিখেছেন "সংগীতময় সুভাষচন্দ্র" বইটি। সাত বছর কাজ করেছেন "মাতৃশক্তি" ও "জাগ্রত বিবেক" পত্রিকায়। বর্তমানে নিজস্ব লেখালিখি ও সম্পাদনা নিয়ে ব্যস্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
অমর মিত্র
বিতস্তা ঘোষাল

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
ইন্দ্রনাথ রুদ্র
অমৃতা ভট্টাচার্য

বিহার

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

উপন্যাস

বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com