(Sagarmay Ghosh)
নাহ্, সাগরময় ঘোষ, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক ‘দেশ’ পত্রিকার দোর্দণ্ডপ্রতাপ সম্পাদক অনেকেই বলতেন, তিনি নাকি বাংলা সাহিত্যের ‘রাজা-নির্মাতা’— ‘কিং মেকার’, তাঁকে সামনাসামনি দেখা তো দূরের কথা, কাছাকাছি যাওয়ারও কোনও আকর্ষণবোধ করিনি। অথচ তাঁর নির্মাণে ‘সম্পাদকের বৈঠক’, ‘হীরের নাকছাবি’— সবই তো পাঠ্য তালিকায়, সেই কবেই। কী চমৎকার গদ্য, তেমন বিষয়, অনেক সময়ই পড়তে পড়তে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়।
বিশিষ্ট সমাজকর্মী, গ্রাম পুনর্গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা, অক্লান্ত কর্মী, রবীন্দ্রভাবাদৰ্শ অনুসারী কালীমোহন ঘোষের পুত্র সাগরময় ঘোষ। এই কালীমোহন ঘোষই সদ্যগঠিত নতুন রাষ্ট্র ইজরায়েলে গেছিলেন, তাদের দেশে, সেই ইহুদিভূমিতে কেমন করে চাষবাস হচ্ছে অন্য ধরনের— নবতর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে মরুভূমির বুকে। কালীমোহনের সঙ্গে ছিলেন আরও কেউ কেউ।
আরও পড়ুন: দেওয়াল লিখন— লিখনের দেওয়াল
সে যাক গে, কালীমোহনপুত্র সাগরময়ের ভারী চেহারা, চুল ব্যাক ব্রাশ, খাদির রঙিন পাঞ্জাবি আর ধুতি, শীতে তার ওপর জহর কোট, খাদিরই। ‘দেশ’ পত্রিকার দফতরে কোনও এক হালকা নীল কাচওলা ঘরে তিনি বসতেন ফাইলপত্তর নিয়ে। সর্বদাই প্রায় কিছু না কিছু পড়ছেন, চোখে লাইব্রেরি ফ্রেমের চশমা, ফ্রেমের রং কালো, পায়ে চটি। সাগরময় ঘোষের অবয়ব বর্ণনার এই আলো-ছায়া সুভো ঠাকুরের চোখে দেখা। সুভগেন্দ্রনাথ ঠাকুর— সুভো ঠাকুরের মুখেই শোনা। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথ। সেই হেমেন্দ্রনাথের নাতি সুভগেন্দ্রনাথ— নিজের নাম ছোট করে নিয়েছিলেন নিজেই— সুভো ঠাকুর। যিনি নিজেকে বলতেন সেজো-র বংশ। তাঁর বাবা ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পিতৃদেব ক্ষিতীন্দ্রনাথের লেখা বই— ‘মুদীর দোকান’, ‘কলকাতার চলাফেরা’।
সুভো ঠাকুর আর্ট ও অ্যান্টিক সংগ্রাহক, জীবনরসিক, কবি, পেইন্টার, সেই সূত্রে ক্যালকাটা গ্রুপের সদস্য। ব্যক্তি সুভো ঠাকুর ও তাঁর লেখা একেবারেই পছন্দ করতেন না সাগরবাবু বা সাগরময় ঘোষ। সুভো ঠাকুর সারাজীবন সাগরময় ঘোষকে ‘সাগর ঘোষ’ বলেছেন। আটের দশকে তাঁর আত্মকথামূলক লেখা ‘বিস্মৃতিচারণা’ নাকি সাগরবাবু শারদীয় ‘দেশ’ পত্রিকায় ছাপতে চাননি। তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর অন্যতম মালিক অভীক সরকারের কঠিন ভূমিকায় ‘বিস্মৃতিচারণা’ শারদীয় ‘দেশ’-এ প্রকাশিত হয়।

সুভো ঠাকুরের মুখে শুনেছি, যাঁকে সারাজীবন ‘সুভোদা’ বলে এসেছি, এই দীর্ঘ লেখাটির সঙ্গে রথীন মিত্র-র স্কেচ ছাপা হওয়ার ব্যাপারে তাঁর পছন্দকে অস্বীকার করে বিশিষ্ট কলকাতা আঁকিয়ে ব্রজগোপাল, যিনি তখন স্টেটসম্যানেও কলকাতা আঁকেন, তাঁকে দিয়ে সুভোদার লেখার সঙ্গে পাতাজোড়া ছবি আঁকানোর পরিকল্পনা করেছিলেন সম্পাদক সাগরময় ঘোষ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাগরবাবুর ব্রজগোপাল নির্বাচন অভীক সরকারের মনোনয়নে দূরে সরে যায়।
‘বিস্মৃতিচারণা’র সঙ্গে আঁকেন আরেক কলকাতাবিশারদ শিল্পী রথীন মিত্র। রথীন মিত্রও ছিলেন ক্যালকাটা গ্রুপে— সুভো ঠাকুর, পরিতোষ সেন, গোপাল ঘোষ, রথীন মৈত্র, রথীন মিত্র, প্রদোষ দাশগুপ্ত প্রমুখ। বিশিষ্ট কাঠ খোদাই শিল্পী হরেন দাস, গোবর্ধন আশরাও ছিলেন কি? ছিলেন আর একজন অতি বিখ্যাত ভাস্কর। যাঁকে জমি দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার— তিনি চিন্তামণি কর।
দেশ পত্রিকার দফতরে একসময় সাগরবাবুর ঘরের বাইরে বসতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কবি সুনীল বসু, আনন্দ বাগচী, বিমল কর— এমনই শুনেছি। পরবর্তী সময়ে আসেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, আবুল বাশার, হর্ষ দত্ত ইত্যাদি প্রভৃতিরা।
তাঁর সেই অতি খ্যাত শিল্প-নিলয় ধ্বংসের মুখে বহুদূর। সুভোদার অন্য অনেক লেখা যেমন, তেমনই ‘বিস্মৃতিচারণা’রও ডিকটেশন নিয়েছিলাম। ‘বিস্মৃতিচারণা’ প্রকাশিত হওয়ার পর দেশ পত্রিকায় ‘তাড়া তাড়া’ চিঠিতে সুভো ঠাকুরকে আক্রমণ। সম্ভবত ‘অন্ধ-শান্তিনিকেতন’ লবি এই সব চিঠি লিখতে শুরু করে। আর তা প্রকাশিতও হতে থাকে ‘দেশ’-এর সাধারণ সংখ্যায়।
দেশ পত্রিকার দফতরে একসময় সাগরবাবুর ঘরের বাইরে বসতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কবি সুনীল বসু, আনন্দ বাগচী, বিমল কর— এমনই শুনেছি। পরবর্তী সময়ে আসেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, আবুল বাশার, হর্ষ দত্ত ইত্যাদি প্রভৃতিরা। পাঁচের দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ধ্রুপদী উপন্যাস ‘ঈশ্বরীতলার রুপো-কথা’ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ অফিস পিয়ন মারফত শ্যামলদার প্রতাপাদিত্য রোডের ভাড়াবাসায় পাঠিয়ে দেন। পরে সেই উপন্যাস ‘নবকল্লোল’ পত্রিকার শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘নবকল্লোল’ সম্পাদক সাহিত্যিক মধুসূদন মজুমদারের আগ্রহে।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ নামে ধারাবাহিক প্রকাশিত হয় ‘দেশ’ পত্রিকায় ছয়ের দশকে। সূচিপত্রে এই লেখাটি উপন্যাস— এই শিরোনামে ছাপা হত না। বিশেষ রচনা এই নামে লেখা থাকত সূচিতে। ‘কুবেরের বিষয় আশয়’, ‘গণেশের বিষয় আশয়’— এই নামে ছাপা হয়েছিল একটি আধা-লিটল ম্যাগাজিনে। জনৈক বাসুদেববাবু ছিলেন সেই সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক।
শ্যামলদার কাছেই শুনেছি, মাত্র দুই সংখ্যা ছাপা হবে আর ‘কুবেরের বিষয় আশয়’, এমন নোটিশে ‘কুবের’ ছাপা বন্ধ করে দেন সাগরময় ঘোষ। ফলে ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ একটি অসম্পূর্ণ অবয়ব নিয়েই শেষ হয়। সাগরময়বাবু নাকি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিজের ঘরে ডেকে বলেছিলেন— এবার শেষ কর শ্যামল। তারপর তো যাহা হইবার, তাহাই হইল। ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ বন্ধ হইল। পরে তা প্রথম সংস্করণে বই হিসাবে প্রকাশিত হয় ‘আনন্দ পাবলিশার্স’ থেকে।
সাপ্তাহিক ‘অমৃত’ সম্পাদনা করতে এসে শ্যামল ‘বৈকুণ্ঠপাঠক’ নামে লেখা সাহিত্যের কলামে ‘রমা’, ‘বিমলা’, ‘সুনীলা’ ইত্যাদি নাম নির্মাণ করে লিখেছিলেন সাগরময় ঘোষ বিষয়ে— সাগরবাবুর ‘সভাসদদের’ বিষয়ে লিখতে গিয়ে।
অসামান্য এই আখ্যানের অসাধারণ মলাট নির্মাণ করেছিলেন সুবোধ দাশগুপ্ত। অথচ, শ্যামল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রত্যন্ত দেশ— ছয়ের দশকে তো তা ‘অতি-প্রত্যন্তই’ ছিল, সেখানে বাংলা ভাষার শিল্পী-কথাকারদের জন্য যে জমি-বাড়ি মালিকানার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন, সেখানে সাগরময় ঘোষ, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী, সম্ভবত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সুবোধ দাশগুপ্ত ভবিষ্যতে বাড়ি করবেন বলে জমি নেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেন।
সাগরময় ঘোষ চম্পাহাটি বা চাম্পাহাটি গিয়ে শ্যামলের— শ্যামল কথিত ‘শ্যামল বাঙালের’ কাটানো দীঘির ঘাটলায় বসে থেকেছেন গ্রীষ্মদিনে স্নান সেরে। তখন চারপাশে উতলা বাতাস। এই সাগরবাবু-শ্যামল-সুনীলদের ‘সাগরদার’ সঙ্গেই শ্যামলের নানা বাদানুবাদ— সাগরময় ঘোষকে প্রকারান্তরে— সোজাসুজি এবং পরোক্ষে কথায় কথায় আক্রমণ করা— সাপ্তাহিক ‘অমৃত’ সম্পাদনা করতে এসে শ্যামল ‘বৈকুণ্ঠপাঠক’ নামে লেখা সাহিত্যের কলামে ‘রমা’, ‘বিমলা’, ‘সুনীলা’ ইত্যাদি নাম নির্মাণ করে লিখেছিলেন সাগরময় ঘোষ বিষয়ে— সাগরবাবুর ‘সভাসদদের’ বিষয়ে লিখতে গিয়ে।

যদিও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাগরময় ঘোষের ঝামেলা তৈরি হয় পরে। পাঁচের দশকের একটু ‘হাটকে’ কথাকার সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সাগরময় ঘোষের ‘দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা পর্বের শেষ লগ্নে একটি আমন্ত্রণপত্র পেয়েছিলেন, গল্প লেখার, ‘দেশ’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তখন অশোক দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘আজকাল’-এ নানাভাবে যুক্ত। পুজোয় উপন্যাস লেখেন। অন্য অন্য লেখা সারা বছর। ‘আজকাল’-এর চিঠিপত্র-র পাতা দেখেন। তিনি সাগরময় ঘোষের এই আমন্ত্রণে সাড়া দেননি-লেখেননি।
যদিও এর বেশ কয়েক বছর আগে বার্ষিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় তিনি লিখেছিলেন ‘এখন আমার কোনও অসুখ নেই’; সেটা সম্ভবত ছয়ের দশকের শেষ লগ্নে। এই আখ্যানের সঙ্গে ছবি এঁকেছিলেন মদন সরকার নাকি সমীর সরকার? নাকি এঁরা কেউই নন। এই লেখাটি পরে বই হিসাবে প্রসূন বসুর ‘নবপত্র’ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়। মলাট এঁকেছিলেন যোগেন চৌধুরী।
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় নাকি ডেলিগেশন টিমের কোনও একজনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আচ্ছা অমুক, আমরা তো কেউ গদ্য লিখি, কেউ বা কবিতা, কেউ ছবি আঁকেন। তারপর সামান্য বিরতি দিয়ে সাগরময় ঘোষের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, তাহলে উনি এখানে কেন? তিনি কি লেখক বা শিল্পী?
সন্দীপনদা— সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সাগরময় ঘোষের এই চিঠিটা কলেজস্ট্রিট কফি হাউসে এসে বহুজনকে দেখান। যাঁদের/যাদের তিনি সেই আমন্ত্রণপত্র দেখিয়েছিলেন, তাঁদের/তাদের মধ্যে কিন্নর রায় অন্যতম। আসলে ‘প্রতিষ্ঠান’ তো একজনকে ‘কাবাব’ করার পর নুন, লেবু ছড়িয়ে ‘পপুলার ডিশ’ হিসেবে পরিবেশন করতে চায়। তখনও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ক্যানসার ধরা পড়েনি।
তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র— এঁদের সঙ্গে সাগরময় ঘোষের সম্পর্ক খুবই খারাপ হয়ে যায় ক্রমান্বয়ে। শুনেছি একটি ভারতীয় সাংবাদিক প্রতিনিধি দলে সাগরময় ঘোষ ও তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় একসঙ্গে আমন্ত্রিত হন। দেশটির নাম সোভিয়েত ইউনিয়ন। অখণ্ড না ভাঙা। সেটা ছয়ের দশক সম্ভবত। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায় নাকি ইউনিয়ন ডেলিগেশন টিমের কোনও একজনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, আচ্ছা অমুক, আমরা তো সবাই কেউ গদ্য লিখি— গল্প, উপন্যাস, কেউ বা কবিতা, কেউ ছবি আঁকেন। তারপর সামান্য বিরতি দিয়ে সাগরময় ঘোষের দিকে আঙুল তুলে বলেছিলেন, তাহলে উনি এখানে কেন? তিনি কি লেখক বা শিল্পী?

সাগরবাবু এই অপমান মেনে নিতে পারেননি। তারপরই ‘দেশ’-সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের লেখা বন্ধ হয়ে যায়। বিমল মিত্র ও প্রেমেন্দ্র মিত্রর সঙ্গে তাঁর ঝগড়া-মতবিরোধ ও এই দুই বিশিষ্ট জনের লেখা ‘দেশ’-সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় বন্ধ হয়ে যাওয়া, মানে বন্ধ করে দেওয়া, তার কারণাবলী প্রেমেনদা— প্রেমেন্দ্র মিত্রর হরিশ চ্যাটার্জীর বাড়িতে ও বিমল মিত্রর চেতলার বড় অট্টালিকায় বসে আমার শোনা।
তখন কালীঘাটে বড় মাসিমার বাড়ি ১৬/১ ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে থাকি, সেখান থেকে প্রেমেনদা, আশুদা—আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, মহাশ্বেতাদি— মহাশ্বেতা দেবী, সুভাষদা— সুভাষ মুখোপাধ্যায়, চিনুদা— চিন্মোহন সেহানবিশ, পরিতোষ সেন— সবাই খুব কাছে, তাঁদের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ঠিকানা অনুসারে। তবে আশুদা ও প্রেমেনদার বাড়ি ঘন ঘন যেতাম। মহাশ্বেতাদি, সুভাষদার বাড়িও, হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে। প্রেমেন্দ্র মিত্র তখন প্রায় অন্ধ, ব্লাইন্ড ফোল্ড লেখেন। গ্লোব দেখতে পারছেন না ভাল করে, ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ দেখতে পারছেন না, পড়তে পারছেন না বলে ঘনাদাকে নীলনদের উৎস সন্ধানে পারছেন না নিয়ে যেতে। ঘনাদাও ‘মৌ-কা-সা-বি-স’-এই তো সেই প্রেমেন্দ্র মিত্রই আমাকে শুনিয়েছিলেন ‘বনাম সাগরময়’।
একদিন কথায় কথায় বিমল মিত্র বলেছিলেন তাঁর সাগর-সংঘর্ষের কথা। এই বিরোধ-মনান্তরের জন্যই তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়কে ‘শতাব্দীর মৃত্যু’, ‘মঞ্জরী অপেরা’ লিখতে হয়েছিল ‘নবকল্লোল’-এ। আর বিমল মিত্র তাঁর বহু থান ইট লিখেছেন ‘নবকল্লোল’, সাপ্তাহিক ‘অমৃত’তে।
বিমলদার নিজের চেতলার সেই প্রাসাদসম বাড়িতে বসে শুনেছিলাম তাঁর সঙ্গে সাগরবাবু— সাগরময় ঘোষের বিরোধ। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরও তীব্র হয়েছিল ‘বাংলার বাতায়ন’ নামে ‘যুগান্তর’ আয়োজিত এক একটি জেলা ধরে ধরে ছোট গল্প প্রতিযোগিতার সময়ে। আমি ছিলাম ‘বাংলার বাতায়ন’-এর প্রাথমিকভাবে গল্প নির্বাচনের বিচারকদের একজন, আর বিমল মিত্র ছিলেন একটি জেলার প্রধান বিচারক।
তখন তিনি চোখে ভাল দেখেন না। ভারতীয় জ্যোতিষবিদ্যা অনুযায়ী নিজের মৃত্যু দিবস কবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন করবেন করছেন। তিনি নিজে জ্যোতিষ চর্চা করতেন, বিশ্বাসও করতেন। চেতলার বার্লি কলের প্রায় উল্টোদিকে তাঁর আলিশান বাড়ি। সেখানে অনেকের সঙ্গে আড্ডায় আসতেন তারাজ্যোতি মুখোপাধ্যায়। তারাজ্যোতিবাবু গল্প লিখতেন, মূলত ‘নবকল্লোল’-এ, উপন্যাসও। তিনি হেমন্তদা— হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ছোট ভাই।

একদিন কথায় কথায় বিমল মিত্র বলেছিলেন তাঁর সাগর-সংঘর্ষের কথা। এই বিরোধ-মনান্তরের জন্যই তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়কে ‘শতাব্দীর মৃত্যু’, ‘মঞ্জরী অপেরা’ লিখতে হয়েছিল ‘নবকল্লোল’-এ। আর বিমল মিত্র তাঁর বহু থান ইট লিখেছেন ‘নবকল্লোল’, সাপ্তাহিক ‘অমৃত’তে, কিন্তু একসময় ‘দেশ’ পত্রিকায় তিনি লিখেছেন ‘সাহেব বিবি গোলাম’। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বরাবরই ‘আনন্দবাজার গ্ৰুপ’-এর বাইরের লেখক। তিনি মূলত ‘নবকল্লোল’, ‘উল্টোরথ’, ‘প্রসাদ’, ‘ঘরোয়া’, ‘দৈনিক বসুমতী’ এবং ‘যুগান্তর’-এর লেখক। ‘শুকতারা’ ও পরে ‘কিশোরভারতী’-তে তাঁর ছোটদের জন্য অজস্র লেখা— উপন্যাস-গল্প প্রকাশিত হয়েছে।
সেই আশুদা— আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে সাগরময় ঘোষ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখতে বলেন, গল্প। তাঁরা হাঁটতে যেতেন দক্ষিণ কলকাতার লেক-এ। সেখানেই প্রথম লেখার কথা হয় তাঁদের। সাগরময় ঘোষের আমন্ত্রণে ‘দেশ’ পত্রিকার সাধারণ সংখ্যায় লিখেছিলেন আশুদা— আশুতোষ মুখোপাধ্যায়।
মতিদা অবশ্য অতীনদা, সিরাজদার তুলনায় অনেকটা বেশি আনন্দ-স্নেহ পেয়েছেন। ‘দেশ’ শারদীয় সংখ্যায় তাঁর উপন্যাস বেরিয়েছে কি? কিন্তু ‘আনন্দমেলা’ ও ‘আনন্দবাজার পত্রিকার’ পুজো সংখ্যায় মতিদার উপন্যাস বেরিয়েছে।
অমিয়ভূষণ মজুমদারের একটি মাত্র গল্প ‘ম্যাকডাফ সাহেব’ অনেক অনুরোধ করে বলে বলে, যাকে বলা যেতে পারে আদায় করে নিয়েছিলেন সাগরময় ঘোষ, হ্যাঁ, সেই একবারই। অমিয়ভূষণ মজুমদার বরাবরই ছিলেন ‘দেশ-আনন্দবাজার’ বৃত্তের বাইরের লেখক। ব্যক্তি আলাপ-চারিতায় তিনি বারবার বলেছেন সে কথা। শুনেছি, কোচবিহারে তাঁর বাড়িতে লোক পাঠিয়ে ‘দেশ’ পত্রিকার জন্য লেখাটি সংগ্রহ করে আনা হয়েছিল।
পাঁচের দশকের কোনও কোনও কবি ও গদ্যলেখক মহা-আনুকূল্য, সাহিত্যপ্রশ্রয় পেয়েছেন সম্পাদক সাগরময় ঘোষের কাছে। এই বৃত্তের বাইরে প্রায় সবসময়ই ছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, মতিদা— মতি নন্দী, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ— সিরাজদা বা এরকম আরও কেউ কেউ। গল্পকার শান্তিরঞ্জন বন্দোপাধ্যায়, জোৎস্নাময় ঘোষরাও এর বাইরে ছিলেন। অতীন বন্দোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ অথবা মতি নন্দীদের দিয়ে কোনও ধারাবাহিক উপন্যাস লেখানো হয়নি ‘দেশ’-এ।
আরও পড়ুন: অরূপ-দর্শী গৌরকিশোর
মতিদা অবশ্য অতীনদা, সিরাজদার তুলনায় অনেকটা বেশি আনন্দ-স্নেহ পেয়েছেন। ‘দেশ’ শারদীয় সংখ্যায় তাঁর উপন্যাস বেরিয়েছে কি? কিন্তু ‘আনন্দমেলা’ ও ‘আনন্দবাজার পত্রিকার’ পুজো সংখ্যায় মতিদার উপন্যাস বেরিয়েছে। ‘আনন্দমেলা’-র শারদ সংখ্যায় তাঁর ‘স্ট্রাইকার’, ‘স্টপার’, ‘কোনি’, ‘কলাবতী’ সিরিজের লেখাগুলি মনে পড়ে। এই কিন্নর রায় অতি সামান্য এক অক্ষরকর্মী। মহান বাংলা ভাষার অতি দীন অক্ষরকর্মী। সে তার নিজ শ্লাঘা আর জেদে অটুট থেকে ‘দেশ’, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র দফতরে যাননি। ফলে সাগরময় ঘোষ ঠিক কেমন জন, এ ব্যাপারে তাঁর কোনও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই, হয়ওনি।
সাগরময় ঘোষের অকালপ্রয়াত পুত্র বাবুইয়ের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে দে’জ পাবলিশিংয়ে। বাবুইবাবু আসতেন দে’জ পাবলিশিংয়ের কর্ণধার সুধাংশুশেখর দে-র কাছে, প্রায়ই। একটু ভারীর দিকে গড়ন। তাঁর সাফারি স্যুট পরা চেহারাটি মনে আছে। খুব লম্বা নন, গায়ের রং ময়লার দিকেই। সিগারেট খেতেন ঘন ঘন। তো সে যাই হোক, সাগরবাবু— সাগরদা বা সাগরময় ঘোষের সঙ্গে সামনাসামনি মুখোমুখি দেখা ও কথা না হলেও, তিনি তাঁর সম্পাদনায় খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত একটি বাংলা ছোট গল্প সংকলনে আমার একটি গল্প প্রার্থনা করে চিঠি পাঠিয়ে নিয়েছিলেন। আর সেই পূর্ব প্রকাশিত গল্প, অবশ্যই ছাপা গল্প দেওয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছিল আমন্ত্রণলিপিতে, সেই গল্প ছাপা হওয়ার জন্য সান্মানিক ও সম্মান দক্ষিণা নগদে পেয়েছিলাম, মনে আছে।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সাগরময় ঘোষকে বলতেন, ‘বাংলা সাহিত্যের হিন্দুস্থান লিভার’। আর এক সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার এআই ক্লাবে সাগরময় ঘোষকে দেখে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন…।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, যখন তাঁর দক্ষিণ কলকাতার প্রতাপাদিত্য রোডের বাড়িতে দেশ-আনন্দবাজার পত্রিকার অফিস পিয়ন— সাইকেল পিয়ন দিয়ে সাগরময় ঘোষ ‘ঈশ্বরীতলার রূপো-কথা’ পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দেন, তখন সেই পাণ্ডুলিপি সমরেশ বসু নিয়ে গিয়ে ‘নবকল্লোল’-এর মালিক-সম্পাদক-লেখক মধুসূদন মজুমদারের হাতে জমা দেন। শ্যামলদা তখন পা ভেঙে বাড়িতে। সমরেশ বসু এসেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখতে, তাঁর প্রতাপাদিত্য রোডের ভাড়াবাড়িতে। ‘ঈশ্বরীতলার রুপোকথা’ শারদীয় ‘নবকল্লোল’-এ প্রকাশিত হয়।
সাগরময় ঘোষের প্রয়াণের পর একটি স্মরণসভা হয়। প্রকাশিত হয় একটি অসাধারণ বই, ছবিসহ। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সাগরময় ঘোষকে বলতেন, ‘বাংলা সাহিত্যের হিন্দুস্থান লিভার’। আর এক সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার এআই ক্লাবে সাগরময় ঘোষকে দেখে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন…। কী কী বলেছিলেন সে কথা আপাতত থাক।
একজন সম্পাদক, যিনি সারাজীবন পশ্চিমবাংলার সবচেয়ে বৃহৎ সাহিত্য-সংবাদ প্রতিষ্ঠানে প্রথমে সাপ্তাহিক, পরে পাক্ষিক পত্রিকার সম্পাদনা কর্মটি করেছেন, তাঁকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে বহুবিধ অরা-কথা-কল্পনা-কাহিনি, হয়তোবা অতিকথনের ঢেউও। সেই তরঙ্গমালা, ফেনা সরিয়ে মানুষটিকে আবিষ্কার করতে গেলে নিছক কিছু কথালোকের হাড়-হাড্ডি উঠে আসবে। অথচ সেই সব জমানো অস্থি-কঙ্কাল-মালা, ঘেরাটোপ সরালে প্রাণ ও অপ্রাণের যে নিবিড় খেলা, সেই ক্রীড়াভূমিতে খ্যাতি-অখ্যাতির দোলমঞ্চ, রাসমণ্ডল, ঈদগাহর নিজস্ব পরিক্রমায় একজন একক মানুষ হয়েই তো ছবির স্থবিরতা, বহমানতায় থাকেন সাগরময় ঘোষ; রবীন্দ্র ভাবনা, রবি লিখন ও রবীন্দ্রগানের অনুসঙ্গে তিনিও গ্রিক মিথকথার সিসিফাসই।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত