(Nabarun Bhattacharya)
‘নবারুণ ভট্টাচার্য সদাজীবিত’ বললে ক্লিশে শোনায়। ‘নবারুণ ভট্টাচার্য সদামৃত বলেই সদাজীবিত’ বললে সে প্রস্তাবনা বিতর্কসাপেক্ষ মনে হতে পারে। ২০২৬ সালে মৃত্যুর এক ডজন বছর পেরিয়ে ওঁর ৭৮ পূর্ণ হল। নবারুণ ভট্টাচার্য সদাসর্বদা রয়েছেন, কারণ তিনি আদিতে মৃত এক কণ্ঠস্বর।
ওঁর প্রথম গল্প ‘ভাসান’ (১৯৬৮)-এর কথক এক মৃতদেহ। ‘হারবার্ট’ (১৯৯৪) উপন্যাসের প্রকৃত প্রতিরোধ মৃত্যু-পরবর্তী বিস্ফোরণে। ‘কাঙাল মালসাট’ (২০০৩)-এর বেগম জনসন ঔপনিবেশিক কলকাতার প্রেত। ‘ভোগী’ (১৯৯৩) উপন্যাসের শুরুতে আর শেষে মৃত্যু উজাগর। ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ (১৯৯৫) উপন্যাসে ফ্ল্যাট উঠে যাবার পর লুকোনো হাতিয়ারের খোঁজ যেন এক মরে যাওয়া পুরোনো সময়ের অন্বেষণ। ‘মসোলিয়ম’ (২০০৬) উপন্যাসের শিরোনাম জুড়ে মৃত্যু। লেনিনের মসোলিয়ম থেকে যেমন প্রায়শই প্রেতলেনিনের পুনরুত্থানের গুজব রটে, নবারুণের প্রতিরোধও তেমন এক প্রেত-প্রতিরোধ।
আরও পড়ুন: নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস বা আখ্যান
মৃত্যুতে শেষ হয় না ইতিহাস। পড়ে থাকে অবশেষ; বারবার ফিরে আসে ট্র্যাজেডি আর ফার্সের প্রেত হয়ে। হারুর বিছানার ভিতর বিনুদের লুকোনো ডায়নামাইট যেমন বহু দশক পর ফাটে তার সৎকারের সময়। পুলিশ, সরকার সবাই থ হয়ে যায়। বুঝতে পারে না কীভাবে ঘটল বিস্ফোরণ। নবারুণের সাহিত্য এ হেন ঝুঁকির সাহিত্য, অনিয়ন্ত্রণীয়, প্রেতস্থ মলোটভ ককটেলের ঘটমান সাহিত্য। সাহিত্য এখানে কেবল পাঠবস্তু নয়, বরং এক আপতিক, প্রতিবাদী ঘটনা। ‘৪+১’ (১৯৯৫) গল্পে রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে অবোধ্য হয়ে ওঠা প্রতিরোধের কেন্দ্রে এক অজানা মৃতদেহ আর চার শববাহক, যারা চোখে দেখতে পান না; কথা বলতে বা শুনতে পারেন না।
প্রতিরোধের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। হকার উচ্ছেদের পশ্চিমবঙ্গে মনে পড়বে আরেক প্রারম্ভিক পর্বের গল্প ‘স্টিমরোলার’ (১৯৭০), যেখানে স্টিমরোলারের চালক মরে গিয়ে প্রতিবাদ করছে রাজনৈতিক ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে। নবারুণ মনে করতেন, বার্লিন ওয়াল-পরবর্তী বিশ্বায়নের দুনিয়ায় তাঁর মতো মানুষ অচল, মৃত। কালমন, মোগলাই, ফোয়ারা, পাঁচুগোপাল, ফ্যাতাড়ু, চোক্তার, বেবি কে-র মতো মৃত, এমন সব ‘উদ্বৃত্ত’, অথচ ছোট-বড় প্রতিরোধী মানুষের কথা তিনি বলে গেছেন নিজের লেখায়।

‘বিশ্বায়ন’ নয়, ‘গোলকায়ন’ শব্দটি বেশি প্রিয় ছিল নবারুণের। গোলকায়নের ঝাঁ-চকচকে, ঝক্কাস শহরে অপাক্তেয় হয়ে গেল যে সব গৃহহীন মানুষ, পার্কের সেই পাগলপারা লোকেদের কথা লিখে গেছেন সারাজীবন। এরা কি আদৌ কোনওদিন বেঁচে ছিল? সামাজিকভাবে এরা সদামৃতের দলে, সমাজবিদেরা যাকে বলেন ‘social death.’, এরিকা বর্গস্ত্রম সামাজিক মৃত্যুর যে বৃহৎ সংজ্ঞা দিয়েছেন, তার শেষাংশের রাজনৈতিক তাৎপর্য বর্তমান আলোচনায় প্রাসঙ্গিক— ‘The idea of social death is used to refer to a wide variety of situations from experiences of illness and dying, to responses to grief, to how sub-sections of the population are treated differently.’
সমাজের নিচুতলার মানুষদের অন্যরকমভাবে দেখা হয়; এমন ভাব করা হয় যেন তারা বেঁচে নেই; যেন তাদের জীবনের কোনও মূল্য নেই। সামাজিক মৃত্যু পুঁজিবাদের নির্মম সত্য। ‘মরণদান’ (১৯৯০) গল্পের ব্যবসায়ী চরিত্র বলে— ‘গরিবদের নিয়ে ঝামেলা অনেক বেশি। শালারা বেঁচে আছে কি না তাই জানে না।’ জাতি এবং শ্রেণিবিভক্ত পুঁজিবাদী সমাজ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা যাদের অদৃশ্য করে রাখে, সে সকল তথাকথিত ‘নিম্নবর্গীয়’ মানুষের জীবনযাপনের মজলিশ লিখেছেন নবারুণ।
‘লুব্ধক’ (২০০৬) উপন্যাসে এসেছে প্রান্তিক হয়ে যাওয়া মানবোত্তর ‘প্রাণমণ্ডল’। রাস্তার কুকুরেরা এতই অপ্রিয় হয়ে গেছে যে, তাদের এক এক করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর কালো গাড়ি।
নবারুণ বলতেন, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গরিব মানুষ যখন বিড়ি ধরায়, তখন সে-ই রাজা। রাজার মেজাজে উড়ে যেতে পারে সে; যেমন ওড়ে ফ্যাতাড়ু— বড়লোকদের পার্টিতে মলনিক্ষেপ করে উৎসব করে। ‘আমার কোনও ভয় নেই তো’ (গল্পের শিরোনাম এই বচন) বলতে বলতে নিতান্ত মামুলি জীবনের শেষে বেঘোরে মরে যায় বীরেনের মতো অনেকে। কিন্তু এদের মধ্যে কেউ কেউ, যেমন ঐ স্টিমরোলার-চালক, সামাজিক মৃত্যু এবং মামুলি মরণের অর্থহীনতার উর্দ্ধে গিয়ে নিজের মৃত্যু নিজে নির্মাণ করতে পারে। জীবন না হলেও মৃত্যুর উড়ানে এরা স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। সদামৃত সদাজীবিতের পথে যাত্রা করে। নবারুণের মতো লেখক সদামৃত, এবং সে কারণেই তিনি সদাজীবিত।
নবারুণ কেবল প্রান্তিক মানুষের কথা লিখেছেন তাই নয়, মানুষের শোষণে প্রান্তিক হয়ে যাওয়া পরিবেশ তথা দূষিত পৃথিবীর ডিসটোপিয়া লিখেছেন শেষ পর্বের ‘খেলনানগর’ (২০০৪) উপন্যাসে। ‘লুব্ধক’ (২০০৬) উপন্যাসে এসেছে প্রান্তিক হয়ে যাওয়া মানবোত্তর ‘প্রাণমণ্ডল’। রাস্তার কুকুরেরা এতই অপ্রিয় হয়ে গেছে যে, তাদের এক এক করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর কালো গাড়ি। সমাজ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি কেবল মানুষকে শাসন করে? অন্যান্য প্রাণীও তার শাসনে থাকে বৈকি।

আমাদের মনে থাকবে, কিছুদিন আগে রাস্তার কুকুরদের নিয়ে কোর্টের রায়, এবং গৃহহীন কুকুরদের পক্ষে-বিপক্ষে শহুরে মানুষের তর্কবিতর্ক, আন্দোলন। ফ্ল্যাট-কমপ্লেক্স, ক্যাম্পাস কি সারমেয়মুক্ত হবে? এখনও আমরা স্পষ্ট করে জানি না তাদের ভবিষ্যৎ। তারা কি ডগ শেল্টারে জীবন পাবে নাকি পিঁজরাপোলে মৃত্যু? কেবল জীবনকে নয়, মৃত্যুকেও শাসন করে সমাজ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা। ‘লুব্ধক’-এর ছায়াকুকুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মহাকাশে প্রতিবাদ রেখে যায়। কুকুরহত্যার জন্যই যেন কলকাতা মহাজাগতিক নেমেসিসের কবলে পড়ে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়। উল্কাপিণ্ড ধেয়ে আসে শহরের দিকে, পৃথিবীর দিকে। এ অ্যাপোক্যালিপ্স এক পরিবেশবাদী শাস্তি, যা মানুষের প্রাপ্য। পরিবেশ দূষণের মূলে যে মানুষ তার মৃত্যু এক ধরনের ন্যায়বিচার।
মহাজাগতিক ন্যায় সামাজিক ন্যায়ের পরিপূরক। ‘লুব্ধক’ গ্রন্থের শুরুতে এহেন সাবধানবাণী নিজের বয়ানে লিখেছেন নবারুণ— ‘প্রাণমণ্ডলের অধিকার একা মানুষেরই নয়, সকলেরই৷ এই অধিকারের মধ্যেই নিহিত আছে প্রাণ ও মৃত্যুর নিয়ত ভারসাম্যের এক সমীকরণ, যাকে বিঘ্নিত করলে মানুষের লাভের চেয়ে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি৷’
মাকে শীতের বিকেলে ছাদে রোদ পোহাতে রেখে এসে ছেলে যখন নিজের দুনিয়ায় মগ্ন হয়ে ক্রিকেট দেখে, গাঢ় ঘুমের শেষে পরোক্ষে মেরে ফেলে নিজের মাকে, তখন কি তার নিজেরও মৃত্যু হয় না? আদতে মরেন মা, রূপকার্থে ছেলে।
জীবন-মৃত্যুর ভারসাম্য বিঘ্ন করলে মানুষের চলে যাওয়াই ভাল। এ হেন সামুহিক মৃত্যু যাকে বলে ‘species extinction’, তার ইশারা নানা লেখায় রেখে গেছেন নবারুণ। ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ (১৯৯৯) গল্পের পরিবেশবাদী, অবলুপ্তিময় শিরোনাম সামাজিক হয়ে উঠেছে। অসুস্থ, বৃদ্ধা মাকে ছাদে রেখে এসে বেমালুম ভুলে ঘুমিয়ে পড়া ছেলে শীতের ঠাণ্ডায় জমে মরে পাথর হয়ে যাওয়া মাকে দেখে এমন অভিঘাত অনুভব করে, যাতে নিউক্লিয়ার উইন্টারের শীত সামাজিক অনুভূতিহীনতার অসংবেদী শীতে রূপান্তরিত হয়।
এ সমাজে কেউ কাউকে দেখে না, যে যার সে তার। মাকে শীতের বিকেলে ছাদে রোদ পোহাতে রেখে এসে ছেলে যখন নিজের দুনিয়ায় মগ্ন হয়ে ক্রিকেট দেখে, গাঢ় ঘুমের শেষে পরোক্ষে মেরে ফেলে নিজের মাকে, তখন কি তার নিজেরও মৃত্যু হয় না? আদতে মরেন মা, রূপকার্থে ছেলে। আরও লং শটে দেখতে গেলে মরে আত্মকেন্দ্রিকতার উদযাপনকারী পুঁজিবাদী সমাজ।

নবারুণের মৃত্যুবয়ান একপাক্ষিক বা সরলায়িত নয়। মৃত্যুর মধ্যে যে কেবল প্রতিরোধ আছে তা নয়। মৃত্যু কখনও নতি স্বীকার করা, কখনও রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতাতন্ত্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, কখনও রোমাঞ্চকর, আবার কখনও নিতান্ত মামুলি। ‘মরণদান’ গল্পের শুরুতে কথক লেখেন— ‘কোনো কোনো লোকের জীবন এমন একঘেয়ে কাটে যে ওই একঘেয়েমি মানতে মানতে তারা কখন যে মরে গেল সেটা বুঝতেও পারে না। ভাবলে মনে হয় মরার পরেও একটা ধন্দ থাকে তাদের।’
১৯৯০-এর ‘মরণদান’ আর ১৯৯৭-এর ‘কোল্ড ফায়ার’ গল্প প্রশ্ন করে— মৃত্যু কি পুঁজিবাদের বাইরে বেরোতে পারে? মৃত্যুকে ঘিরে কতই না বাণিজ্য হয়! প্রথম গল্পের সাইকিয়াট্রিক পেশেন্ট এমন এক মৃত্যু-ব্যবসায়ীর কথা বলে যার কোম্পানির কাজ হল ক্লায়েন্টদের ‘ডেথ উইশ’ এবং ‘ডেথ ফ্যান্টাসি’ পূরণ করা। কে ঠিক কীভাবে মরতে পছন্দ করে? কার মাথায় কীরকম মৃত্যু ঘুরঘুর করে?
গরিবের মরণেচ্ছা মৃত্যুর পুঁজিবাদী আত্তীকরণের পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। কথক বলে, গরিবের কল্পনা আছে কিন্তু! ব্যবসাদার মানতে বাধ্য হন, গরিব হলেও মানুষ তো, কল্পনা আছে!
টাকার বিনিময়ে পছন্দের মৃত্যু কেনে উচ্চবিত্ত। এহেন বিজনেস মডেলে বাধ সাধে গরিব মানুষ। ব্যবসাদারের কাছে তারা সামাজিকভাবে মৃত, ‘ক্রুড’। বড়লোক যতই ছোটলোকের কল্পনাকে ‘সিলি’ বলুক না কেন, বেগারদের যে মরণেচ্ছা কলকাতা, মুম্বাই আর চেন্নাই— তিন শহর স্টাডি করে বার করে আনে কোম্পানির আর অ্যান্ড ডি উইং, তা লক্ষণীয়— ‘ধরুন কেউ চায় যে হাত পা মাথা বুক সব মাংস মাখন মদ ডিম মাছে ভর্তি হয়ে ফুলে উঠে ফেটে যাবে।’
গরিব মানুষ কেবল জীবিতাবস্থায় খেতে চায় তাই নয়; নিরন্ন মানুষের মৃত্যুকল্পনাতেও ক্ষুধা অন্তহীন। এ হেন মরণদান কোম্পানির পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। গরিবের মরণেচ্ছা মৃত্যুর পুঁজিবাদী আত্তীকরণের পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। কথক বলে, গরিবের কল্পনা আছে কিন্তু! ব্যবসাদার মানতে বাধ্য হন, গরিব হলেও মানুষ তো, কল্পনা আছে!

‘কোল্ড ফায়ার’ গল্পে শ্মশানের নোংরা পরিবেশ থেকে বড়লোককে বাঁচাবার জন্য ব্যক্তিগত সৎকারযন্ত্র বেচতে আসে সেলসম্যান। মিঃ সরকার কিনে নেন কোল্ড ফায়ার নামক সে দামি যন্ত্র। চাকরেরা বাড়িতে যন্তর বসানোর পর ভূতের ভয়ে পালায়। গল্পের শেষে কলকাতার প্রথম কোল্ড ফায়ার ক্রেতা চন্দ্রমাধব চ্যাটার্জি তাঁর নাতনির প্রথম জন্মদিনের এলাহি পার্টির পরের দিন সহসা মৃত্যুর পর কোল্ড ফায়ারে ঢুকে নিমেষে পুড়ে যান। নবারুণের সাব-অল্টার্নিস্ট কটাক্ষ তার মহামুহূর্তে পৌঁছয়। মৃত্যুকে যতই গিলতে চেষ্টা করুক পুঁজি, তাকে পুরোপুরি বাগে আনতে পারে না।
এ হেন মিতায়তন লেখায় নবারুণ ভট্টাচার্যর সাহিত্যের সামগ্রিক মূল্যায়ন করবার বৃথা চেষ্টা করলাম না। ওঁর লেখায় ফ্যান্টাসি বা ম্যাজিক রিয়ালিজমের উপস্থিতি, কারনিভালেস্ক মাত্রা, অশিষ্ট শব্দের প্রয়োগ, বিশ্ব-সাংবাদিকতার ব্যবহার, তন্ত্র থেকে গৌতম বুদ্ধ, বুল্গাকভ থেকে ত্রৈলোক্যনাথ, বিচিত্র প্রভাব-পরিমণ্ডল— এমন বিবিধ বিষয় নিয়ে বাংলা, ইংরেজিসহ নানা ভাষায় আলোচনা হয়েছে।
ইংরেজি তো বটেই, জার্মান এবং ইতালিয়ান ভাষাতেও অনুবাদ হয়েছে এবং হচ্ছে নবারুণের লেখা। ওঁর লেখা ক্রমশ আরও বৃহত্তর এবং আন্তর্জাতিক পাঠক-পৃথিবীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
নবারুণকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানিয়েছেন কিউ। ‘হারবার্ট’, ‘কাঙাল মালসাট’সহ ওঁর গল্প-উপন্যাসকে নাটক এবং সিনেমায় সম্প্রসারিত করেছেন সুমন মুখোপাধ্যায়। ইংরেজি তো বটেই, জার্মান এবং ইতালিয়ান ভাষাতেও অনুবাদ হয়েছে এবং হচ্ছে নবারুণের লেখা। ওঁর লেখা ক্রমশ আরও বৃহত্তর এবং আন্তর্জাতিক পাঠক-পৃথিবীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য ছিল নবারুণ ভট্টাচার্যর লেখায় মৃত্যুর রাজনীতির উপর সংক্ষেপে আলোকপাত, যার মধ্য দিয়ে ওঁর সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা প্রকট হয়। প্রধানত উপন্যাস আর ছোটগল্প নিয়ে কথা হল, কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্য একাধারে কবি, গদ্যকার, নাট্যকার, অনুবাদক, লিটল ম্যাগাজিনের (‘ভাষাবন্ধন’) কর্মী ও সম্পাদক। ওঁর গাজা নিয়ে লেখা কবিতা পড়বার সময় মনে হয় কবিতাগুলো যেন এখন লেখা; যেমন প্রতিবাদের ভাষ্যে কালজয়ী হয়েছে ওঁর প্রথমপর্বের কবিতা ‘এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’।

রাজনৈতিক হিংসার মৃত্যু-উপত্যকা নবারুণের দেশ না হলেও সারাজীবন নানা ধরনের মৃত্যুলিখন বা ‘thanatography’ করে গেছেন তিনি। মৃত্যুর মানে পাল্টে দিয়ে তাকে নেতির থেকে সক্রিয়তার পথে আনতে চেয়েছেন। আত্ম এবং প্রিয় অপরের মৃত্যু নিয়ে লেখা সহজ নয়, কিন্তু সেই প্রয়োগে ব্রতী হয়েছে নবারুণের সাহিত্য। একের পর এক কবিতায় প্যালেস্তাইনে শিশুহত্যার ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। মৃত্যু সেখানে অন্যায়ের অপর নাম। কবিতা সেখানে অদৃশ্য, বাস্তুহারা শিশু, নারীসহ নানা সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে শোক জানাতে চায়। একটি কবিতা উদ্ধার করা যাক—
গাজা- প্যালেস্টাইন
খুব দুষ্টু দুটো বাচ্চা
একজনের হাতে সুতোবাঁধা ঘুরপাক
একজনের বেসুরো জলতরঙ্গ
একটা ইয়োইয়ো, একটা ঝুমঝুমি
টিভিতে ঐ দুটো বাচ্চাকে
দেখাচ্ছিল খবরের চ্যানেল
স্টার মুভিজ করে দিলে তুমি
বাচ্চা দুটো তখন দুষ্টুমি করছিল না
দুজনেই শুয়েছিল
স্বপ্ন দেখছিল কি না
বলতে পারা যাবে না
কারণ
দুজনের মাথাই ছিল না
চারপাশের সমাজ যত অন্যায়ের পথে হাঁটবে, দারিদ্র্যের অপমান যত বাড়বে, গণহত্যা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবাদ, শ্রেণিশোষণ আর যুদ্ধ যত বাড়বে, তত আমরা নবারুণের সাহিত্যনীতি থেকে দূরে সরে যাব।
সামাজিক মৃত্যুর পুঁজিবাদী দুনিয়ায় যেসব প্রান্তিক মানুষের মরণে কেউ শোকপ্রকাশ করে না, নবারুণের কবিতা তাঁদের রাজনৈতিক স্মৃতির ইতিহাসে উপস্থিত করে তুলতে চায়। এখন নবারুণের ১৯৬৯-৭০-এর ডায়েরি (‘ডায়েরি ঊনসত্তর’) প্রকাশিত হয়েছে, যাতে বাংলা কবিতার পাশাপাশি পেয়েছি ওঁর কিছু ইংরেজি কবিতা।
সব মিলিয়ে নবারুণের লেখালেখির জগত সুবিশাল। পাঠক কেবল পপ কালচারের খিস্তিবহুল ফ্যতাড়ু নবারুণকে নয়, ধীরে ধীরে আত্মস্থ করুন বৈচিত্র্যপূর্ণ লেখক নবারুণকে, যাঁর সাহিত্য বহুমুখী। চারপাশের সমাজ যত অন্যায়ের পথে হাঁটবে, দারিদ্র্যের অপমান যত বাড়বে, গণহত্যা, সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবাদ, শ্রেণিশোষণ আর যুদ্ধ যত বাড়বে, তত আমরা নবারুণের সাহিত্যনীতি থেকে দূরে সরে যাব।
কেবল নবারুণ পড়লে হবে না। নবারুণ পড়ে ওঁর লেখার নীতি সমাজ, জীবন আর মৃত্যুর যাপনে আত্মস্থ করতে হবে। মানুষ তথা মনুষ্যোত্তর গ্রহ-নক্ষত্র, পশুপাখি এবং গাছপাথরে সুবৃহৎ প্রাণপৃথিবীর স্পন্দন খুঁজে পেয়েছিলেন নবারুণ। তাঁকে খুঁজে পেতে আমাদের একাধিক জীবন, একাধিক অস্তিত্ব, একাধিক অনস্তিত্বকে অন্তর থেকে যাপন করতে হবে। ঢুকে যেতে হবে অনেকানেক ‘মহাযানের আয়না’য়, যেখানে গরিবের ‘কড়াই’ উন্মুক্ত আকাশ হয়ে ফুটে থাকে বুর্জোয়া মননের নৈতিক অন্ধকারে। মৃত্যু কেবল পরাজয় নয়; মৃত্যুর পরেও হেঁটে যাওয়া যায়। মৃত্যু-পরবর্তী চিরায়ত জ্যোৎস্নায় নবারুণ ভট্টাচার্য শব্দের রাইফেল কাঁধে হাঁটছেন।
তথ্যসূত্র
নবারুণ ভট্টাচার্য। শ্রেষ্ঠ গল্প (দে’জ, ২০০৬), উপন্যাস সমগ্র (দে’জ, ২০১০), কবিতাসমগ্র (দে’জ, ২০২৫)
এরিকা বর্গস্ত্রম। ‘সোশ্যাল ডেথ’। কিউ-জে-এম, অ্যান ইন্টারন্যাশানাল জার্নাল অফ মেডিসিন, ২০১৭
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত