(Banglar Kaman)
অতীতে যুদ্ধের এক অদ্ভুত রীতি ছিল। বিজয়ী দল পরাজিতদের কামান নিয়ে এসে নিজের জায়গার মাটিতে পুঁতে দিত— শত্রুপক্ষকে আজীবন নতজানু করে রাখার এ যেন এক নির্মম অথচ ব্যতিক্রমী ধারা! ভারতের সবচেয়ে বড় কামানটি আজও সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে রাজস্থানের জয়গড় দুর্গে, যার ব্যারেলের দৈর্ঘ্য প্রায় কুড়ি ফুট। বাংলার মাটিও বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সাক্ষী। সাম্রাজ্য বিস্তার, নবাবী আমল আর ব্রিটিশ-ফরাসিদের কামানের গর্জনে একসময় কেঁপে উঠত এদেশের আকাশ-বাতাস। আজ সেসব যুদ্ধদিনের ইতিহাস এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা বহু ঐতিহাসিক কামানের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন: নদীপথ ঘিরে রাঢ়ভূমির বিস্তৃত বাণিজ্য যোগাযোগ
মুর্শিদাবাদের নবাবী কামান
মুর্শিদাবাদ মানে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পলাশীর যুদ্ধ। পলাশীর প্রান্তরে নবাবের পরাজয় ঘটে। মুর্শিদাবাদ জেলায় তোপখানা গ্রামে আজও নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক কামান জাহানকোষা। নামের অর্থ যেমন ভয়ঙ্কর, ‘পৃথিবীকে ধ্বংসকারী’, তার অবয়বও তেমনই রাজকীয়। ১৬৩৭ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে বাঙালি কারিগর জনার্দন কর্মকার অষ্টধাতু দিয়ে এই দানবীয় কামানটি নির্মাণ করেছিলেন।

নবাবী আমলের আরেকটি ভয়ানক নিদর্শন হল বাচ্চেওয়ালি তোপ। হাজারদুয়ারি প্যালেসের উত্তর দিকে গেলেই এর দেখা মিলবে। এই কামানটিকে ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে এক অদ্ভুত কাহিনি। শোনা যায়, এর ভয়নাক আওয়াজে নাকি একসময় গর্ভবতী মহিলারা অকালেই সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন! ফার্সি শব্দ ‘বাচ্চেওয়ালি’র অর্থও তাই, ‘যিনি সন্তান জন্ম দেন’। একই জেলার বহরমপুরে সম্প্রতি মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয়েছে আরেকটি সাড়ে পাঁচ থেকে সাত ফুট লম্বা কামান। গবেষকদের মতে, এটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলের ব্যারাকের সামরিক নিদর্শন।
মল্লভূমের দলমাদল
বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের ছিন্নমস্তা মন্দিরের কাছে রাখা আছে মল্ল রাজবংশের অসাধারণ বীরত্বের প্রতীক দলমাদল (১৭৪২)। ‘দলমর্দন’ (শত্রুসেনা দলনকারী) শব্দ থেকে এর নামকরণ। জগন্নাথ কর্মকারের নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এই কামানটি নিয়ে বিষ্ণুপুরের মানুষের মনে আজও গভীর আবেগ জড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, বর্গি আক্রমণের সময় ঘোর সংকটকালে স্বয়ং মল্ল রাজবংশের আরাধ্য দেবতা মদনমোহন গভীর রাতে এই কামান দেগে মারাঠা লুঠেরাদের বিতাড়িত করেছিলেন।
ফরাসি দুর্গ ধ্বংস করে ও লুঠ করে বহু মূল্যবান সামগ্রী। সেই সময় স্বনামধন্য নন্দদুলাল জীউ মন্দিরেও এসে পড়েছিল ব্রিটিশ কামানের গোলা। সেইসব গোলা আজ চন্দননগর মিউজিয়ামে রাখা আছে।
ফরাসডাঙ্গার ফরাসি কামান
১৭৫৭ সালে ইংরেজরা ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর আক্রমণ করে। ফরাসি দুর্গ ধ্বংস করে ও লুঠ করে বহু মূল্যবান সামগ্রী। সেই সময় স্বনামধন্য নন্দদুলাল জীউ মন্দিরেও এসে পড়েছিল ব্রিটিশ কামানের গোলা। সেইসব গোলা আজ চন্দননগর মিউজিয়ামে রাখা আছে। ব্রিটিশ ও ফরাসিদের সেই রক্তক্ষয়ী দ্বৈরথের নীরব স্মারকগুলো আজও সংরক্ষিত রয়েছে চন্দননগরের ডুপ্লে মিউজিয়ামে।

কলকাতার বুকে ব্রিটিশ রণকৌশল ও যুদ্ধজয়ের স্মারক
কলকাতায় রাজভবনের উত্তর দিকের প্রধান ফটক পেরোলে ঐতিহাসিক এক চিনা কামান পাওয়া যাবে, যা একটি ড্রাগনের ওপর বসানো। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ নৌ ও সামরিক বাহিনী যুদ্ধজয়ের স্মারক। উত্তর কলকাতায় নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে জোড়াবাগানে জোড়া কামানগুলো রাস্তার পাশে একটি বেদি করে রাখা আছে। নালা থেকে ব্রিটিশ আমলের এই কামান উদ্ধার করা হয়।
কলকাতা টাউন হলে প্রবেশ পথের সিঁড়িতে একটি কামান ও গোলা প্রদর্শিত আছে, যা ১৮৯৭ সালে ক্রুপ কোম্পানি তৈরি করেছিল। বাংলার বুকে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর সাম্রাজ্য পতনের চিরন্তন সাক্ষী এই কামানগুলো আজ বড় নিঃসঙ্গ।
কলকাতায় স্ট্র্যান্ড রোডের পাশে ফেয়ারলি প্লেসে একটি কামান পোঁতা ছিল বহুকাল ধরে। প্রায় দশ ফুট লম্বা ব্যারেলটি। ঐতিহাসিকরা মনে করেন সিরাজউদ্দৌলা এই ধরনের কামান ব্যবহার করতেন। বর্তমানে কামানটি সংরক্ষিত নিউ সেক্রেটারিয়েট ভবনে। সিরাজের বাহিনীকে আটকাতে সাহেবরা শহরের তিনদিকে কামান বসিয়েছিল। সেই ব্রিটিশ আমলের সাত-আটটি কামান বেদির ওপর রবীন্দ্র সরোবর চত্বরে রাখা আছে।

কলকাতা টাউন হলে প্রবেশ পথের সিঁড়িতে একটি কামান ও গোলা প্রদর্শিত আছে, যা ১৮৯৭ সালে ক্রুপ কোম্পানি তৈরি করেছিল। বাংলার বুকে বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর সাম্রাজ্য পতনের চিরন্তন সাক্ষী এই কামানগুলো আজ বড় নিঃসঙ্গ। কালের প্রবাহে তাদের ইস্পাত-কঠিন দেহে আজ হয়তো মরচে ধরেছে, কিন্তু একটু কান পাতলেই তাদের গায়ে হাত দিয়ে অনুভব করা যায় ইতিহাসের সেই বারুদ-গন্ধী সময়।
তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, বিনয় ঘোষ, আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত