(Universal Learning)
একটা মায়ের জীবন শেষ হয়, একটা বাবার জীবন, ঠাকুমা, দাদুর জীবন। পড়ে থাকে ছাই আর ফেলে দেওয়া জুতো। ফেলে দেওয়া কাগজ, বেড কভার আর ফার্নিচার। থেকে যায় গন্ধ, সন্ধের। এক জীবনের শুরু-রা শেষ হয়ে যায়। বিশাল জগতে আমন্ত্রণ পায় এই জীবন, যখন একজন বাবা বা মা ছেলের হাতে কার্ল সাগান-এর ‘কসমস’ তুলে দেয়। সে ভাবেই না এই ইনফাইনাইট জগতে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর রক্তের তৈরি এই শরীরে তার আপনজনরা একদিন চলে যাবে, ফেলে রেখে, তুলে রেখে আর মহাকাশে লীন হয়ে যাওয়া কল্পনাতে।
আরও পড়ন: আমার স্কেলে লেবড়ে থাকা আমি আর আইনস্টাইন
সত্যি একলা হয়ে যাওয়া হয়ে যায়, পথের পাঁচালীর শেষ দৃশ্যতে সত্যজিৎ বলছেন সর্বজয়াকে কাঁদতে, তিনি কাঁদছেন, অপু সামনে চেয়ে আছে। হরিহর একবার সর্বজয়ার দিকে তাকিয়ে আবার সামনে চাইছেন। গরুর গাড়ি চলছে। কী মহারুদ্র, কী মহাসংকটে বাকি জীবন কাটাতে হবে সমগ্রতায় তিন জীবনের বিস্ময়। কারুর অবসাদে, কারুর স্মৃতিতে, কারুর ভরসায় অথবা সবকিছু নিয়েই। আকাশের দিকে তাকালে ক্ষুদ্রতা, আর পাশের সন্তান, স্ত্রী, স্বামীর দিকে তাকালে ভরসা।
সেই সর্বজয়া শুধুমাত্র সন্তানের ভরসায় জীবন কাটিয়ে যান অপরাজিত-তে। তারপর অপু এই মহাবিশ্বে একা। দৈন্যর, হিংসার, যৌনতার, ভালবাসার, কপটতার অলিন্দে সে একা। অন্ধকারে আকাশের দিকে তাকালে আমার মাথায় হাজার হাজার গ্যালাক্সি ঘোরে, নিজেকে যে ক্ষুদ্রতায় বেঁধে ফেলে চারপাশে নিজের অস্তিত্বকে প্রমাণ করার কাজে লেগে থাকি, সেখানেও জীবনের পরম পাওয়া।

ইনফাইনাইট থেকে ফাইনাইট একটা স্পেস খুঁজে পাওয়া। এক তারা থেকে আরেক তারায় এক লক্ষ বছর পরে সংকেত যায়, হয়তো আরও কয়েক লক্ষ বছর লাগে, তবুও তো আমরা জাগি, এই বিশ্বের তলায়, আমি আমার মতো। আমাদের মধ্যেও তো কেউ অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, আইআইটি, স্ট্যান্ডফোর্ড, সেখান থেকে মানুষের জন্য কাজ, এই যে মেধা সেটা আলাদা করে প্রতিভাত হচ্ছে কই? নাকি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটা রাস্তা।
কোটি কোটি ধুলোকণার মধ্যে আমার একটা আলো আছে, তার চমক আছে। সেখানে একটাই উদ্দেশ্য কাজ করে। বাড়ি, গাড়ি, কিছু তোষামোদ করা মানুষ, শহর, ক্ষমতায়ন অথবা নিজেকে কতটা চকমকে করে তোলা যায়। মাথার জোর কাজে না লাগলে গায়ের জোরের কাছে গিয়ে টুপ করে বসে পড়ছে সেইসব আলোগুলো। তাদের কেউ তো এবার দেখবে, বলবে, মানবে। এর বাইরে কিছু ব্যতিক্রমী প্রকৃত গুণী এই বিশ্বের থেকে মিলিয়ে যাওয়ার পরে কেউ কেউ চিনির দানার মতো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে কিছু প্রজন্ম অবধি।
শরৎকালের শেষ রাত্রে যাঁরা পুব আকাশে চাঁদের ৪-৫ ফুট দূরে শুকতারা উঠতে দেখেছেন, তাঁরা জেনেছেন সেই পুব আকাশের রূপ। কিন্তু সেই সৌন্দর্য উন্মোচন করতে হয়েছে, অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বিশাল আকাশের একটা দিকে দুটো জ্যোতিষ্কের দু’রকম আলো।
সারাজীবন যেটুকু দেখেছি মেনেছি, একজায়গায় গিয়ে মনের ভেতর থেকে আবেগ তাড়িত হয়েছি। মোটা বেঁটে রোগা, লম্বা কালো ফর্সা যাই হোক না কেন মুখের মধ্যে দেখেছি ভাল ছাত্রের প্রতিবিম্ব, সে ভাল ছাত্র, তার তো কণায় কণায় প্রতিবাদ, যুক্তি, ঋজু শিরদাঁড়ার অহংকার থাকা উচিত, ঝলসে ওঠা উচিত তাদের মুখ, পাঁচ লাইন লেখায় বেরিয়ে আসবে তীক্ষ্ণতা, একটা শক্ত ফিজিক্সের যুক্তিতে হার মানবে তাবৎ অযৌক্তিক তর্ক। কাউকে তোয়াক্কা করবে না এই ছাত্ররা।
কিন্তু হঠাৎ আসলে এরা বসে পড়ছে ক্ষমতার কোল ধরে, মন্ত্রিত্ব পাচ্ছেন। বিগত কয়েক দশক অর্থমন্ত্রীদের তালিকা দেখলেই বুঝতে পারবেন। কারা এই মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন, কী তাঁদের ইতিহাস, আর কী তাঁরা করেছেন। বেশিরভাগ মানুষ এই মহাকাশসম ক্ষমতার বিচ্ছুরণের আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ মাসেল পাওয়ার অথবা ব্যাঁকা ক্ষমতার ব্যাখ্যায় বলীয়ানদের তাঁবেদারি শেষ কথা বলছে। আকাশে জলে মাটিতে কিছুদিন অস্তিত্ব টেকানোর লড়াইয়ে একলা চলায় আর ভরসা নেই কারও। কোনওভাবে এই অন্তরীক্ষে একটু জায়গা পেতে মরিয়া। আসলে আমরা হারছি।

কারণ মহাশূন্যতা নিয়ে কেউ চোখ বুজে ভাবছি না। ভাবছি বাড়ি, পাশের বাড়ি, প্রেমিকা, বন্ধুর প্রেমিকা, রাস্তায় চলে যাওয়া দামি সেডান, আর গ্রিসের সমুদ্র সৈকত। আমি যা, যেটুকু, সেটুকুর অহংকার মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কার কাছে মাথা নুইয়ে বেঁচে থাকছি, সেটা আর বিষয় বলে বিবেচ্য হচ্ছে না। তাই মহাকাশে তারা দেখেও তার বিশালতা বুঝতে পারি না।
শরৎকালের শেষ রাত্রে যাঁরা পুব আকাশে চাঁদের ৪-৫ ফুট দূরে শুকতারা উঠতে দেখেছেন, তাঁরা জেনেছেন সেই পুব আকাশের রূপ। কিন্তু সেই সৌন্দর্য উন্মোচন করতে হয়েছে, অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বিশাল আকাশের একটা দিকে দুটো জ্যোতিষ্কের দু’রকম আলো। কিন্তু কাছ থেকে শুক্র গ্রহ অন্যরকম, চারদিকে গ্যাসের মেঘ ঘন হয়ে আছে। অহরহ সেখানে মেঘ ডাকছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে কিন্তু বৃষ্টি নামবে না কখনও। মেঘের আড়ালে গ্রহটা কেমন দেখা যাবে না। নীল আর্মস্ট্রং যেভাবে চাঁদকে দেখেছিলেন, সেটা ভাল না খারাপ বলা যায় না। এইটুকু বলা যায়, চাঁদ থেকে পৃথিবীকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাই জীবনের ভাল-কে দূরে রেখে শান্ত মনে একটা বন্দনা প্রয়োজন পড়ে।

তাই যে জীবন দূরে সরে যায়, অনেক অনেক দূরে, তার সৌন্দর্য বাড়ে। রহস্যময় হয়ে কত অজানা আরও অজানা হয়ে যায়। একবার অবিনশ্বর হয়ে সেই কালের কালো মহাকাশে ভেসে বেড়ানোর অনুভূত কল্পনার মতো। একা, কিন্তু কোটি কোটি ছায়াপথ, ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র, প্রায় আমাদের ১০ কোটি পৃথিবী উপস্থিত সেই মহাকাশে। সেখানে একা অনন্ত লক্ষ বছর পরেও মহাশূন্যে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। কত নতুন থিওরি কত নতুনভাবে একে চেনা, তার থই পাওয়া যায় না।
প্রলয়ের কালে সেই অসীম মহাবিশ্ব আবার সংকুচিত হয়ে আসবে, একদম চুপসে যাবে, কিন্তু পরিবর্তিত হবে মহাশক্তিতে। টেনে নেবে যাবতীয় কিছু যা তার আয়ত্বের মধ্যে পাবে।
কয়েক লক্ষ বছর পরেও এই মহাজাগতিক, বিস্ময় জাগানো মহাবিশ্বের রহস্য অজানাই থাকবে। নানান জ্যোতিষ্ক ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে আর তাপ কমছে তাদের, রূপান্তরিত হচ্ছে, প্রাণের সম্ভাবনাও হয়তো দেখা দেবে। প্রলয়ের কালে সেই অসীম মহাবিশ্ব আবার সংকুচিত হয়ে আসবে, একদম চুপসে যাবে, কিন্তু পরিবর্তিত হবে মহাশক্তিতে। টেনে নেবে যাবতীয় কিছু যা তার আয়ত্বের মধ্যে পাবে। কেন জানি না মনে হয়, প্রত্যেকটা প্রাণ মহাকালে ঘুমিয়ে থাকে, একটা ছোট্ট সুতোর মতো সময়ে সে জন্ম নেয় আর আমি আমি করে আবার মহাকালের গর্ভে লীন হয়ে যায়। মহাসমুদ্র, মহাকাশের জ্যোতিষ্ক তাকে ডাকে আয় আয় বলে।
তখনও লক্ষ লক্ষ বাসনা, কামনা দৌড়চ্ছে, মহাবিশ্ব কি চিনে রাখছে, আসল কিছু মুখ যাদের মহাশূন্যে ভেসে থাকার প্রয়োজনীয়তা আছে। কিন্তু মানুষের প্রজন্মের সেই ক্ষমতা আছে, মন সবকিছু দূরে রেখে মেপে নেয়, তারপর তার ভালমন্দ বুঝতে পারে, একটা জ্বলজ্বল করা মানুষ তাই প্রজন্মের কাছে ধ্রুবতারার মতো টিকে থাকে। মনের আকাশে তারা ওঠে, জ্বলজ্বল করে আলো দেয়। বাকিরা মহাশূন্যে ঘুরে বেড়ায়। তারাও ভেবেছিল তাদের আলো আছে। কিন্তু সেই আলো তারা নিজেরাও দেখেনি, কারণ অন্যের শক্তি ধার করে বেশিক্ষণ পথ দেখা যায় না।

তবুও নম্র নেত্রে, কম্পিত বক্ষে টিকে থাকতে যেন পারি। বাকি সব মিথ্যে। তারপর স্বপ্নের মতো দিন কেটে গেলে, প্রিয় মানুষের দল ছেড়ে গেলে তারাও একদিন সর্বজয়ার মতো কাঁদতে কাঁদতে চলে যাবে। ইনফাইনাইট গ্যালাক্সি-তে। নতুন ধুলোবালি কণা, কিছু চিকচিকে অভ্র আবার এসে কিছুদিন কাটিয়ে যাবে। আর সেই চলে যাওয়া প্রাণ ইউনিভার্সে মিশে যাবে, প্রবল কালো, অকল্পনীয় স্পেস আজন্ম কালের গর্তে প্রবেশ করবে আর নিঃসীম শূন্যে বহুজ্যমিতিক মাত্রায় পূর্ণতা পাবে। এই ভবিতব্য হওয়ার জন্য ওই অকিঞ্চিৎকর কিছুদিন পৃথিবীতে। সেখানে নিজের ক্যারিশমায় কেন যে বেঁচে থাকা যায় না, তা ইউনিভার্স জানে!
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত