নিপ্পণ দেশে কয়েকটি দিন – ১ম পর্ব

Japan Travel 1
Japan Travel 1

নিপ্পণ দেশে কয়েকটি দিন – ১ম পর্ব

(Japan Travel 1)

শীতের শেষে বসন্তের মায়াবী পৃথিবী যখন আকাশে বাতাসে একটু একটু করে স্নিগ্ধ আভা ছড়াচ্ছে, তখনই জাপান বেড়াতে যাওয়ার পাকা খবর এল। ভিসা প্রস্তুত, চেনা ট্রাভেল এজেন্সি আশ্বাস দিয়েছেন দেশটার মূল আকর্ষণের জায়গাগুলো নিয়ে যাবেন। যাওয়ার ইচ্ছে আশৈশব।

জাপানি রূপকথা, ফুজিয়ামা পাহাড়ের গল্প পড়ে আমার কাছে জাপান মানে রূপকথা, ফুজি পাহাড়, আর কিমোনো পরা জাপ সুন্দরীরা। তারা সরু সরু আঙুল দিয়ে টি-পট থেকে চা ঢালে। তরুণ বয়সে জাপানকে মনে হত হিরোসিমা-নাগাসাকির দেশ, ধ্বংসস্তূপ থেকে নবকলেবর ধারণ করা উন্নত দেশ। 


আরও পড়ুন: আধুনিক চিনের প্রথম নারী জ্যোতির্বিদ ঝেনি ওয়াং


গত শতকে নেতাজির স্বপ্নের শরিক হওয়া, বৌদ্ধধর্ম বহন করা দেশ, আর এখন এই শতকে তো সর্বার্থে টেকনোলজির দেশ। যাওয়ার আনন্দে বেশ কয়েক রাত বিনিদ্রই ছিলাম। তারপর চলতি বছরের ২১শে মার্চ মাত্র দশ দিনের ভ্রমণসূচি বুকে ধরে বেরিয়ে পড়লাম দমদম এয়ারপোর্টের পথে।

রাত বারোটা দশের ফ্লাইট। অতএব মসৃণ মাঠে বল গড়ানোর মতো দিনটা দমদম এয়ারপোর্টেই ২১ পেরিয়ে ২২শে মার্চ হয়ে গেল। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স সাড়ে চার ঘণ্টায় নিয়ে এল কুয়ালালামপুর। তারপর আরও সাড়ে ছয় ঘণ্টার উড়ান শেষে টোকিওর বিশাল নারিতা ইন্টারন্যাশানাল এয়ারপোর্ট। 

Japan Travel 1
সন্ধের টোকিও টাওয়ার

প্লেন থেকেই দেখলাম অজস্র বাড়িঘর নিয়ে খুব ঘনবসতির দেশ। মাঝে মাঝে সবুজ কৃষি খেত, নদী, দূরের স্কাইস্ক্র্যাপার। জাপানে খুব কম লোক কৃষিনির্ভর। তাই খেতখামার কম। মূল পৃথিবীর মানচিত্রে জাপানের অবস্থান এশিয়া মহাদেশের পূর্ব উপকূলে। উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জেগে থাকা একটি দ্বীপরাষ্ট্র। প্রায় ১৪ হাজারেরও বেশি দ্বীপ এখানে। তাই একে বলা হয় ‘আরচিপেলাগো’। 

তখন স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা। ইমিগ্রেশনের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে। আমাদের দলের এক সহযাত্রী তাঁর সঙ্গিনীকে বলছেন, ‘আমরা এখন সম্পূর্ণভাবে পৃথিবীর উত্তর আর কিছুটা পূর্ব গোলার্ধে। চারদিকে সমুদ্রজলে ঘেরা। পশ্চিমে জাপান সাগর, উত্তর-পূর্বে আর দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণ-পশ্চিমে পূর্ব চিনসাগর। কোথায় এসেছি ভাবো, এদেশের পশ্চিমে রাশিয়া, উত্তরদিকে কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া, আর দক্ষিণ-পশ্চিমে চিন ও তাইওয়ান।’

টোকিও খুব প্রাচীন জায়গা নয়। শুরুতে সেই ১৪৫৭ খ্রিস্টাব্দে এটি ছিল জেলেদের ছোট্ট গ্রাম, আর একটি দুর্গ, যার নাম ছিল এডো। তারপর সামন্ত বা শোগুন তোকুগাওয়ার অধীনে থেকে এলাকাটির সমৃদ্ধি হয়। ১৮৬৮ সালে নাম বদলে হল টো-কিও, যার অর্থ পুবের রাজধানী।

সত্যিই জল ঘেরা এক দেশে এসে পৌঁছেছি। এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দেখি টোকিও শহর জুড়ে অন্ধকার নেমেছে। রাস্তার আলো তেমন উজ্জ্বল নয়। অকারণ শক্তির অপচয় এরা নাকি করে না। আমাদের বাঙালি ট্যুর ম্যানেজার সাগ্নিকের সঙ্গে যোগ দিল জাপানি দোভাষী তরুণ কোজি অটা। 

এবার বাসে ঘণ্টাখানেকের পথ। টোকিও খুব প্রাচীন জায়গা নয়। শুরুতে সেই ১৪৫৭ খ্রিস্টাব্দে এটি ছিল জেলেদের ছোট্ট গ্রাম, আর একটি দুর্গ, যার নাম ছিল এডো। তারপর সামন্ত বা শোগুন তোকুগাওয়ার অধীনে থেকে এলাকাটির সমৃদ্ধি হয়। ১৮৬৮ সালে নাম বদলে হল টো-কিও, যার অর্থ পুবের রাজধানী। বেশিরভাগ ট্যুর কোম্পানিগুলো হোনসু দ্বীপের সোনালি পথ ধরেই ঘোরায়, জাপানের অন্য প্রধান দ্বীপগুলোর নিসর্গ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি অনেক আলাদা। 

Japan Travel 1
নাকামুশা অর্কেড

বাসে বসে জাপানের ইতিহাস ভাবতে ভাবতে এলাম ৭০ কিলোমিটার দূরে হ্যানিডা। তার আগে স্থানীয় আধা-জাপানি আধা-ভারতীয় দোকানে খাওয়া হল বিস্তর রাতের খাবার। দুপুরের ফ্লাইটে কন্টিনেন্টাল খাবার একেবারেই ভাল ছিল না। জাপানি গরম আঠালো ভাত, মাখন আর দই মাখানো আলু গাজর সেদ্ধ, কিছুটা মশলাদার চিকেন, স্প্রিং অনিয়ন আর বাঁধাকপি, নুডলস সেদ্ধ আর সঙ্গে কড়া ঝাঁঝের সস, আরেকটি তরল সস, নাম মনে নেই, আর একটি মাফিন। মন্দ লাগল না। 

পরিষ্কার এবং প্রশস্ত নির্জন রাস্তা ধরে বাসে আসতে আসতে ভাবছিলাম, কতটুকুই বা দেখব এই দেশের? জাপানের এতগুলো দ্বীপের মধ্যে প্রধান দ্বীপ চারটি। একেবারে উত্তরে বেজায় ঠান্ডা হোক্কাইডো, সেখানে বারো মাস স্কি খেলা চলে। মধ্যভাগে হোনসু, তার পশ্চিমে ছোট্ট দ্বীপ শিকোকু আর একেবারে দক্ষিণে কিয়োশু, এখানে আছে হট স্প্রিং। এদের মধ্যে হোনসু আকারে সবচেয়ে বড়, অনেক লোকের বাস। বেশিরভাগ ট্যুরিস্ট হোনসু দেখেই ফিরে যান।

পরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম ভাঙল। কাচের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো বিছানায় পড়েছে। জাপানি ভাষায় নিপ্পন মানে সূর্যের উৎস, জাপান তাই সূর্যোদয়ের দেশ। ব্রেকফাস্ট সেরে শহর দেখতে বেরোলাম। আসার আগে জাপান নিয়ে কিঞ্চিৎ চর্চা করে নিয়েছিলাম। পুবের দেশ জাপানের ইতিহাস দু’হাজার বছরের পুরনো। 

রাতের খাওয়া সারতে আটটা বেজে গেল। আমরা আজ এসেছি হোনসু দ্বীপের টোকিওতে। এখানে আমাদের সাময়িক আস্তানা জাপানের টোকিও মেট্রোপলিসের একটি বিশেষ ওয়ার্ড ওটা-সিটিতে, চার তারকা বিশিষ্ট হোটেলে, নাম টোকিও ভিলা ফন্তেন গ্র্যান্ড হ্যানেডা।

রিসেপশনে চাবি নিতে গিয়ে একপ্রস্থ অপ্রস্তুত হওয়ার পালা। এরা ইংরেজি বলে না, আমিও জাপানি ভাষা বুঝি না। ঘরটি চমৎকার। তার চেয়েও আকর্ষণীয় ওয়াশরুম। কমোডের গায়ে এক গাদা ফাংশানাল বাটন, নিচে খুদে ইংরেজি অক্ষরে লেখা তাদের ব্যবহারের কারণ। সারা দিনের ক্লান্তি বয়ে বেড়িয়ে নতুন দেশে রাতে ভালই ঘুম হল।

Japan Travel 1
বিশালাকার অ্যাশ ট্রে

পরদিন সকাল সাড়ে পাঁচটায় ঘুম ভাঙল। কাচের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো বিছানায় পড়েছে। জাপানি ভাষায় নিপ্পন মানে সূর্যের উৎস, জাপান তাই সূর্যোদয়ের দেশ। ব্রেকফাস্ট সেরে শহর দেখতে বেরোলাম। আসার আগে জাপান নিয়ে কিঞ্চিৎ চর্চা করে নিয়েছিলাম। পুবের দেশ জাপানের ইতিহাস দু’হাজার বছরের পুরনো। 

কত ঐতিহ্য তার গায়ে লেগে, আছে পৌরাণিক কাহিনি, আদি সম্রাট নাকি ছিলেন সূর্যের বংশজাত। বুদ্ধদেবের সময় থেকে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত প্রায় হাজার বছর ইয়ামাতো বংশ জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে রাজত্ব করেছে। তারা চিনের সঙ্গে দূত বিনিময় করত। কোরিয়ায় অভিযান চালিয়েছে তৃতীয় শতকে। ওই সময় চিনালিপি জাপানে আসে।

জাপানের ধরন নাকি এমনই। সপ্তাহে দু’দিন বৃষ্টি নাকি হবেই। শহরবাসীর বেশিরভাগই মাথায় দিয়েছে ঘেরওয়ালা স্বচ্ছ লম্বাটে ছাতা। তুলনায় রেনকোট পরিহিত কাউকেই দেখলাম না। 

৫৫২ খ্রিস্টাব্দে বৌদ্ধধর্ম জাপানে প্রবেশ করে। প্রাচীন লোকজ শিন্টো (Shinto) মতবাদ তখন জাপানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ‘শিন্টো’ শব্দটির অর্থ ‘ঈশ্বরের পথ’। এর মূল ভিত্তি প্রকৃতির পুজো, এবং বিভিন্ন আত্মার (kami) উপাসনা। সেই আত্মা প্রতিনিধিত্ব করে প্রকৃতির বিভিন্ন জিনিস যেমন পাহাড়, নদী, গাছ অথবা মানুষ। শিন্টোবাদ পূর্বপুরুষ জন্মভূমি আর সম্রাটের অর্চনা-বন্দনার কথা বলে। ষষ্ঠ শতকে এই মতবাদ বহুল প্রচার লাভ করে, আধুনিক কালে তেমন এর চল নেই। জাপানে বহু লোক একইসঙ্গে শিন্টো এবং বৌদ্ধধর্ম চর্চা করে। 

ট্যুরিস্ট বাসের সামনে দাঁড়াতেই জাপানি গাইড কোজি হাসিমুখে বললে ‘ও-হা-য়ো’।

মানে কী মিস্টার কোজি? মানে গুড মর্নিং। কোজি মৃদু হাসে। চারপাশে কনকনে ঠান্ডা, তার সঙ্গে তুমুল হাওয়া। আকাশের মুখ গোমড়া। বৃষ্টিও হচ্ছে ঝিরঝিরিয়ে। জাপানের ধরন নাকি এমনই। সপ্তাহে দু’দিন বৃষ্টি নাকি হবেই। শহরবাসীর বেশিরভাগই মাথায় দিয়েছে ঘেরওয়ালা স্বচ্ছ লম্বাটে ছাতা। তুলনায় রেনকোট পরিহিত কাউকেই দেখলাম না। 

কিছুটা পথ বাসে যাওয়ার পর ট্রেনে চড়ে গেলাম স্কাই টাওয়ার স্টেশনে, ২০১২ সালে গড়ে ওঠা এক উঁচু মিনার, টোকিও স্কাইট্রি দেখতে। এটি মূলত অবসার্ভেশন টাওয়ার। রেডিও-টিভি সম্প্রচার এবং ভিউ দেখার ফ্রি-স্ট্যান্ডিং টাওয়ার হিসেবে পৃথিবীতে পয়লা নম্বর। জাপানের গর্ব। কিন্তু বসবাসের উপযোগী আকাশচুম্বী ভবনের তালিকায় এটি বুর্জ খলিফা ও মার্দেকা ১১৮-এর পেছনে, এর উচ্চতা ৬৩৪ মিটার। এক সহযাত্রী বলে উঠলেন, ‘আমরা টোকিও টাওয়ার দেখব না?’ কোজি আশ্বস্ত করে, তাও দেখব, তবে আগে তফাত বুঝে নাও।

কোজি হাহা করে হাসে, তাও হবে মাই ডিয়ার লেডিস। টোকিও টাওয়ার পথেই পড়বে, বাস থেকে দেখে নিও। শহরের মাঝখানে, এর নিচে আছে সুন্দর শিবা পার্ক। কিন্তু স্কাইট্রি অন্যরকম। লিফটে চড়ে ৩৫০ মিটার উঁচুতে আগে চলো, তারপরে বোলো। 

টোকিও স্কাইট্রি অনেক উঁচু, ৬৩৪ মিটার, ২০৮০ ফুট। আর প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের অনুকরণে পুরনো টোকিও টাওয়ার ১৯৫৮ সালে তৈরি। উচ্চতা মাত্র ৩৩৩ মিটার, ১০৯২ ফুট। জেদি ট্যুরিস্টদের মধ্যে এক মহিলা ডাক্তার বায়না ধরলেন, তাও দেখব। সঙ্গে আমিও গলা মেলালাম। চিরকালের হাঁ-করা ভিখিরি পর্যটক, পথের মধ্যে যা পড়ে, সবই মহার্ঘ মনে হয়। পুরনো হলেও দাম দেব না কেন?

কোজি হাহা করে হাসে, তাও হবে মাই ডিয়ার লেডিস। টোকিও টাওয়ার পথেই পড়বে, বাস থেকে দেখে নিও। শহরের মাঝখানে, এর নিচে আছে সুন্দর শিবা পার্ক। কিন্তু স্কাইট্রি অন্যরকম। লিফটে চড়ে ৩৫০ মিটার উঁচুতে আগে চলো, তারপরে বোলো। 

Japan Travel 1
অ্যারো ব্রিজ

টোকিও স্কাইট্রির ভেতরে আর এর একদম নিচে রয়েছে টোকিও সোলামাচি শপিং মল। প্রচুর দোকান, রেস্তোরাঁ, বিনোদনের চমৎকার সব আকর্ষণে ভর্তি। ওসব না দেখে সোজা লিফটে চড়ে এলাম ৩৫০ মিটার উঁচুতে কাচ-ঘেরা ঘরে। জানালা দিয়ে দেখলাম নিচে শহরের কংক্রিটীয় জঙ্গল। দূরে সুমিদা আর আওয়ারা নদী, নদীর ওপরের ব্রিজ ‘আরো’। আরও দূরে টোকিও বে, প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যার সংযোগ। 

এই জায়গার বাহারি নাম ‘তোম্বো ডেক’। এরপর কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে নিচে এলাম ৩৪০ নম্বর ফ্লোরে। বেশ শক্তপোক্ত কাঁচের মেঝের ওপর হেঁটে চললাম। গাইডের নির্দেশে পায়ের দিকে তাকাতেই দেখলাম স্বচ্ছ কাচের মধ্য দিয়ে একদম সোজা নিচের মাটি দেখা যায়, বেশ রোমাঞ্চকর লাগছিল। 

রাস্তার পাশে বিখ্যাত থান্ডার গেট বা ক্যামিন্যারিমন গেট। তার মাথায় ঝুলছে লম্বা লাল কাগজে মোড়া লন্ঠন। দু’পাশে দুই দেবতার মূর্তি, বাতাসের দেবতা ফুজিন আর বজ্রের দেবতা রাইজেন। প্রতিদিন প্রচুর জাপানি সেন-সো-জি-তে পুণ্যের আশায় আসে।

আরও উপরে ৪৫০ মিটার উচ্চতায় আরেকটি ডেক ছিল, কিন্তু বিশেষ কারণে আমাদের যাওয়ার অনুমতি ছিল না। তবে স্যুভেনিয়র শপ, বাচ্চাদের খেলার জায়গা, আরও কিছু টুকিটাকি দ্রষ্টব্য দেখা হল। পুরো এলাকার নাম স্কাইট্রি সিটি। এখান থেকেই ট্রেনে চড়ে এলাম পরের গন্তব্য জনবহুল রাস্তার পাশে আশাকুশা অঞ্চলে প্রাচীনতম ‘আশাকুশা কান্নন টেম্পল’ বা সেন-সো-জি মন্দিরে। 

৬২৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বৌদ্ধ মন্দির। কান্নন হল অবলোকিতেশ্বর বোধিসত্ত্ব। চিন-জাপানে তিনি নারী রূপে পূজিত হন, জাপানিদের কাছে তিনি দেবী কান্নন। সপ্তম শতকে তৈরি মন্দিরটি অবশ্য আগুনে পুড়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে বিমান আক্রমণে এলাকা এবং মন্দির দুই ধ্বংস হয়েছে। তারপর লক্ষ লক্ষ মানুষের চেষ্টায় আবার মন্দির তৈরি হয়। 

রাস্তার পাশে বিখ্যাত থান্ডার গেট বা ক্যামিন্যারিমন গেট। তার মাথায় ঝুলছে লম্বা লাল কাগজে মোড়া লন্ঠন। দু’পাশে দুই দেবতার মূর্তি, বাতাসের দেবতা ফুজিন আর বজ্রের দেবতা রাইজেন। প্রতিদিন প্রচুর জাপানি সেন-সো-জি-তে পুণ্যের আশায় আসে।

মন্দিরের এই বাইরের তোরণ পেরোলেই প্রায় ৩০০ মিটার পথের দু’পাশে অনেক রকমের জিনিসের সাজানো দোকান। জায়গাটির নাম নাকামিসে শপিং আর্কেড। বেশ জনবহুল, ভারতীয় মন্দিরের প্রবেশপথের দু’পাশে সাজানো দোকানপাটের সারির মতোই প্রাণচঞ্চল রূপ। 

জাপানিদের বিশ্বাস, দুই ইঞ্চি আকারের আসল সোনার কান্নন মূর্তিটি নদীর ধারে খুঁজে পেয়েছিল দুই জেলে ভাই। এখন সেটি সংরক্ষিত, পরিবর্তে সোনার প্রলেপে ঢাকা বিশাল মূর্তিটি এখন দর্শনীয়। চকিতেই মনে পড়ল টোকিও শহরের ইতিহাস।

প্রতিটি দোকানের মাথায় টাঙানো তাদের ভালবাসার চেরি ফুলের ডাল। এখন চেরি ফোটার সময়। মার্চের এই সময় চেরি ব্লসম বা জাপানিদের প্রিয় সাকুরা উৎসবের দিন। কত যে কিমানো পরা সুন্দরী তরুণী মাথায় ফুল লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দোকানে জিনিসের দাম ভালই। একটি খুব সাধারণ ছাতার দাম ২০০০ ইয়েন, আমাদের টাকায় প্রায় ১২০০ টাকা। 

এরপর সামনে পড়ল ভেতরের তোরণ, হোজোমন গেট, সেখানেও রয়েছে চার রাজকীয় দেবতাদের মূর্তি। মন্দিরটি একটি পাঁচতলাবিশিষ্ট প্যাগোডার মতো। মন্দির চত্ত্বরে অজস্র ফুলভারে নত চেরি গাছ। মন্দির প্রাঙ্গণে রাখা ধূপের এক বিশাল ছাইদান। অন্য দর্শনার্থীদের দেখাদেখি আমরাও ধূপ, মোমবাতি জ্বালালাম।

Japan Travel 1
আশাকুশা মন্দির

মন্দিরের ভেতরে আধা আলো আধা অন্ধকারে বেদীর উপর বিরাজ করছেন করুণাময় অবলোকিতেশ্বর, সামনে সারি সারি বাতি জ্বলছে, চারপাশে আরও দেবতাদের মূর্তি আর বুদ্ধমূর্তি। জাপানিদের বিশ্বাস, দুই ইঞ্চি আকারের আসল সোনার কান্নন মূর্তিটি নদীর ধারে খুঁজে পেয়েছিল দুই জেলে ভাই। এখন সেটি সংরক্ষিত, পরিবর্তে সোনার প্রলেপে ঢাকা বিশাল মূর্তিটি এখন দর্শনীয়। চকিতেই মনে পড়ল টোকিও শহরের ইতিহাস। এটা তো ১৪৫৭ সাল নাগাদ একটা জেলেদের ছোট্ট গ্রাম ছিল।

অদূরেই সেনগাকুজি মন্দির। আসলে এটি সমাধি মন্দির, যেখানে ৪৭ জন সামুরাই আততায়ীর হাত থেকে তাদের প্রভুকে রক্ষা করতে পারেনি বলে ‘হারাকিরি’ করে মৃত্যুবরণ করেছিল। জাপানি সামুরাইরা ছিল বীর রক্ষাকর্তা। দেড়শো বছর আগেও তাদের দেখতে পাওয়া যেত। মধ্যযুগের সাহিত্যের পাতায় এদের কাহিনি আছে। 

প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হলে বা লড়াইতে হেরে গেলে বহু নিয়ম পালন করে আত্মহত্যা বা হারাকিরি করত। সেনগাকুজি মন্দিরের দিকে তাকিয়ে এই সব কথা ভাবতে ভাবতে মনটা ভারি হয়ে আসে।

পোশাক ছিল যুগে যুগে ভিন্ন। কখনও মুণ্ডিত মস্তক, কখনও দীর্ঘ চুল, কখনও মেয়েদের মতো বেণী বাঁধা। আত্মরক্ষার জন্য সঙ্গে রাখত তরোয়াল আর ছোট ছোরা। ভয়ানক আত্মসম্মানী ছিল। প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হলে বা লড়াইতে হেরে গেলে বহু নিয়ম পালন করে আত্মহত্যা বা হারাকিরি করত। সেনগাকুজি মন্দিরের দিকে তাকিয়ে এই সব কথা ভাবতে ভাবতে মনটা ভারি হয়ে আসে।

(ক্রমশ)

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of কৃষ্ণা রায়

কৃষ্ণা রায়

মানব-শারীরতত্ত্বের অধ্যাপিকা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রাক্তন অতিরিক্ত শিক্ষা অধিকর্তা ও বেথুন কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষা। বাংলা সাহিত্য-জগতেও পরিচিত নাম, বিশেষত জীবনী সাহিত্য ও প্রবন্ধ সাহিত্যে। বাংলা ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও সমাজকর্মীদের জীবনী, জীবনোপন্যাস, ভ্রমণ-উপন্যাস, পুষ্টি বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এই মুহূর্তে ছাব্বিশটি। গত কয়েক বছর ধরে গবেষণা করে চলেছেন দেশবিদেশের উপেক্ষিত নারী বিজ্ঞানীদের জীবন নিয়ে। মানব-শারীরবিদ্যা বিষয়ে তাঁর গবেষণাপত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের জার্নালে প্রকাশিত। জন-বিজ্ঞানের আলোচনায় আমন্ত্রিত বক্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
ঠিক করলাম, ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দুই রাত তিনদিনের ছোট্ট ছুটি কাটিয়ে আসব এই দুই পাহাড়ি গ্রামে। সেখানে মেঘপিয়নেরা চিঠি বিলি করে মেঘের ভেলায় চেপে। সেখানে ঘুম ভাঙে পাহাড়ের পাখিদের ডাকে। আরেকটা বাড়তি পাওয়া হল ঝকঝকে দিনে এই দুই জায়গা থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় বেশ ভাল। লিখছেন অমর কুমার নায়ক...
Please login to bookmark Close
আতাকামায় আমাদের গাইডের নাম ভ্যালেন্তিনো। অতিসপ্রতিভ হলেও একটু সবজান্তা জেন-জি। গাইডগিরিতে বেশ ফাঁকফোকর ছিল। তার মুখেই শুনলাম, আতাকামার ইন্ডিজিনাস অধিবাসী বা ভূমিপুত্রদের নাম লিকান আনতাই (Likan Antai)। তারা ইনকাও হতে পারে বা অন্য কোনও আদিবাসী, তবে মূলত যাযাবর এবং কৃষক ছিল। লিখছেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়...
Please login to bookmark Close
সান্তিয়াগো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে ক্লোকরুমে প্রধান ব্যাগ ও ব্যাগেজভর্তি ঢাউস বাক্স-প্যাঁটরা গচ্ছিত রেখে আগে থেকে গোছানো যৎসামান্য জিনিস নিয়ে আরেকটি ছোট্ট বিমানে কালামায় ল্যান্ড করলাম। মাত্র দেড় ঘণ্টার আকাশপথ। সেখান থেকে বাসে ‘সান পেড্রো ডি আতাকামা’। প্লেনের একফালি জানলা দিয়েই প্রথম আন্দিজ ঘেরা আতাকামা মরুভূমি দৃষ্টিগোচর হল। লিখছেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com