(Biswasbarir Durgapuja)
দুর্গাপুজোর ছুটিতে যদি শহরের চেনা পুজোমণ্ডপের বাইরে বেরিয়ে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতার খোঁজ করেন, তাহলে গাড়িতে তেল ভরে রওনা দিতে পারেন পূর্ব বর্ধমানের ছোট্ট জনপদ মানকরের দিকে। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিলোমিটার। বর্ধমান শহরকে বাইপাস করে গলসি, পারাজ ও বুদবুদের পর ডানদিকে ঘুরলেই মানকরের রাস্তা। আপনার গন্তব্য হল বিশ্বাস পরিবারের দুর্গাপুজো।
আরও পড়ুন: বাংলার মন্দিরের টেরাকোটার ফলকে মা কালীর বিবর্তন
কেন যাবেন? কারণ এখানে শুধু একটি পুরনো বাড়ির দুর্গাপুজো দেখা যাবে, তা নয়; এখানে দেখা যায় একসঙ্গে ইতিহাস, স্থাপত্য, লোকশিল্প এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের দীর্ঘ উত্তরাধিকার। বিশেষ করে দেবীর প্রতিমাটি শহরের পরিচিত ছাঁচ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মুখাবয়ব, গাত্রবর্ণ, অলংকার এবং সাজসজ্জায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলার দেশজ শিল্পরীতির প্রভাব। আর সেই প্রতিমার পটভূমিতে রয়েছে বিশাল দুর্গাদালান ও ‘সাতমহলা’ বাসভবন।

মানকরের এই ছোট গ্রামীণ জনপদটি উনিশ শতকের শুরুর দিকে প্রায় ১,৫০০টি পরিবারের আবাসস্থল ছিল। এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল তাঁতি পরিবার, যারা মানকরের একসময়ের বিখ্যাত তসর রেশম বা সিল্কের কাপড় তৈরি করত। এই কারিগররা ‘কুটুনি’ নামক এক বিশেষ ধরনের কাপড়ও বুনতেন; এটি ছিল অনেকটা ‘ডাবল জার্সি’ কাপড়ের মতো, যার এক পিঠে থাকত রেশম এবং অন্য পিঠে সুতো। এছাড়া মাছ ধরার সুতো তৈরির জন্যও তাঁদের খ্যাতি ছিল।
মানকরের অন্যতম বিখ্যাত একটি পরিবার ছিল ভক্তলাল গোস্বামীর পরিবার; তিনি ছিলেন বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচাঁদ রায়ের (১৭০২-১৭৪০) গুরু। তাঁর বিশেষ অবস্থানের কারণে পরিবারটি ওই অঞ্চলে করমুক্ত জমি লাভ করে এবং তাঁরা এলাকার প্রধান জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁদের উপস্থিতির সুবাদেই বহু বিদ্বান ব্যক্তি ও শিক্ষিত ব্রাহ্মণ মানকরে সমবেত হয়েছিলেন।

বিশ্বাস পরিবারের আদি নিবাস মুর্শিদাবাদে। পরিবারের এক পূর্বপুরুষ নবাব আলিবর্দি খানের অধীনে খাজাঞ্চি বা কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রক্ষা করার জন্য তিনি নবাবের কাছ থেকে পুরস্কৃত হন। অর্থ পুরস্কারের পাশাপাশি আলিবর্দি খান তাঁকে ‘বিশ্বাস’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকেই পরিবারটি তাদের আদি পদবি ‘গঙ্গোপাধ্যায়’-এর পরিবর্তে ‘বিশ্বাস’ পদবি ব্যবহার করতে শুরু করে।
বর্তমানে পরিবারের দশম প্রজন্ম এই দুর্গাপুজোর দায়িত্ব পালন করছে। পুজো হয় শাক্ত রীতি মেনে। রথযাত্রার সময় কাঠামো পূজা দিয়ে প্রস্তুতি শুরু হয়। পঞ্চমীতে দেবীর আবাহন এবং অস্ত্রসজ্জা; ষষ্ঠীতে হয় বোধন এবং প্রতিমাকে পরানো হয় ঐতিহ্যবাহী অলংকার।
পরবর্তীকালে পরিবারটি পূর্ব বর্ধমানের দিকনগর এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করে এবং তসর রেশম ও সিল্কের ব্যবসা শুরু করে। ব্যবসার সূত্রে দ্রুতই তাঁদের আর্থিক সমৃদ্ধি আসে। বিশেষ করে রামমোহন বিশ্বাসের সময়ে পরিবার যথেষ্ট বিত্তশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু রামমোহন ছিলেন নিঃসন্তান। এক সাধুর পরামর্শে তিনি দিকনগরের বাসভবন ছেড়ে মানকরে এসে বসতি স্থাপন করেন, এবং প্রায় ৩৫০ বছর আগে এখানেই দুর্গাপুজোর সূচনা করেন।
পরে রামমোহনের এক পুত্রসন্তান জন্মায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই সন্তান দেবীর আশীর্বাদেই পেয়েছেন। তাই সন্তানের নাম রাখেন ‘দুর্গাপতি’। সেই বিশ্বাসের স্মৃতি আজও পরিবারের দুর্গোৎসবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে।

পরবর্তী সময়ে পরিবারের বংশধর মহেশচন্দ্র বিশ্বাসের আমলে তাঁদের আরও সমৃদ্ধি হয়। পরিবারের সদস্যদের মতে, মহেশচন্দ্র কাশ্মীরের কোনও এক শাসকের দেওয়ান ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই নির্মিত হয় বিশাল দুর্গাদালান এবং ‘সাতমহলা’ বাসস্থান— সাতটি অংশবিশিষ্ট সুবৃহৎ বাসভবন। আজও সুসংরক্ষিত দুর্গাদালানটি মানকরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন।
তবে বিশ্বাসবাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সম্ভবত দুর্গাপ্রতিমা। দেবীর মুখাবয়ব দেখে মনে হয়, তা যেন বাংলার পটচিত্র থেকে উঠে এসেছে। শহুরে প্রতিমার তুলনায় এতে দেশীয় নান্দনিকতার ছাপ অনেক বেশি স্পষ্ট। প্রচলিত হলুদ গাত্রবর্ণের বদলে এখানে দেবীর গায়ের রং লাল। তাঁকে সাজানো হয় ‘ডাকের সাজে’— হলুদ ও সোনালি ফয়েলের সূক্ষ্ম কারুকাজে। বিশাল আকৃতির চোখ প্রতিমার মুখমণ্ডলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
সন্ধিপুজোর সময় বিশ্বাসবাড়ির পরিবেশ আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। অতীতে এই সময়ে কামান দাগার রীতি ছিল। সেই প্রথা এখন বন্ধ হলেও বন্দুকে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে সন্ধিপুজোর সূচনা করা হয়।
বর্তমানে পরিবারের দশম প্রজন্ম এই দুর্গাপুজোর দায়িত্ব পালন করছে। পুজো হয় শাক্ত রীতি মেনে। রথযাত্রার সময় কাঠামো পূজা দিয়ে প্রস্তুতি শুরু হয়। পঞ্চমীতে দেবীর আবাহন এবং অস্ত্রসজ্জা; ষষ্ঠীতে হয় বোধন এবং প্রতিমাকে পরানো হয় ঐতিহ্যবাহী অলংকার।

সপ্তমীর দিন রয়েছে আরও একটি বিশেষ রীতি। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা— বিশেষত যাঁরা উপবীত বা পৈতে ধারণের যোগ্য বয়সে পৌঁছেছেন— জার্মান সিলভারের তৈরি একটি ছোট পালকি বা ডুলিতে নবপত্রিকা নিয়ে যান নিকটবর্তী জলাশয়ে। সেখানেই সম্পন্ন হয় পবিত্র স্নান। পুজো শুরুর আগে পরিবারের মহিলারা গৃহদেবতা লক্ষ্মীর বিগ্রহ নিয়ে এসে দুর্গামণ্ডপে দেবীর পাশে স্থাপন করেন।
বিশ্বাসবাড়ির পুজোয় ভোগেরও রয়েছে নিজস্ব পারিবারিক নিয়ম। প্রতিদিন দেবীকে অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। তবে সেই ভোগ রান্নার দায়িত্ব কেবল পরিবারের ব্রাহ্মণ পুরুষদের। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী মহিলারা এই কাজে অংশ নেন না। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে পোলাও ও খিচুড়ির সঙ্গে পরিবেশন করা হয় নানা ধরনের ভাজা সব্জি।

পুজোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলির প্রথাও। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী— তিনদিনই দেবীর উদ্দেশ্যে একটি করে ছাগল বলি দেওয়া হয়। মানকর আবার ‘কদমা’ নামের বিশেষ মিষ্টির জন্যও পরিচিত। সেই স্থানীয় মিষ্টির সঙ্গে পুজোর যোগও রয়েছে— অষ্টমীর দিন দেবীকে নিবেদন করা হয় সাত থেকে আট কেজি ওজনের এক বিশাল কদমা।
জনপদটিতে ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি পুরনো মন্দির এবং ‘রং মহল’ নামে একটি ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ। রয়েছে সুবিশাল কবিরাজ বাড়িও, যেখানে মৃণাল সেন তাঁর বিখ্যাত বাইশে শ্রাবণ চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্যের শুটিং করেছিলেন।
সন্ধিপুজোর সময় বিশ্বাসবাড়ির পরিবেশ আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। অতীতে এই সময়ে কামান দাগার রীতি ছিল। সেই প্রথা এখন বন্ধ হলেও বন্দুকে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে সন্ধিপুজোর সূচনা করা হয়। একই সময়ে ঠাকুরদালানের চারকোণে চারজন পুরুষ জ্বলন্ত মশাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন। মশালের আলোয় প্রাচীন দুর্গাদালান তখন যেন ফিরে যায় অন্য এক সময়ের আবহে।
নবমী বিশ্বাসবাড়ির পুজোর অন্যতম বড় দিন। এই দিন গোটা গ্রামের মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং বাড়িতে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। অতিথির সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি। নবমীর পুজো শেষ হলে পরিবারের সদস্যরা নিকটবর্তী পঞ্চানন মন্দিরে যান, যেখানে আরও একটি ছাগল বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে।
দশমীর দিন নবপত্রিকা ও রুপোর ঘট বাড়ির সংলগ্ন জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটের জল এবং নবপত্রিকা সেখানে বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর প্রথা মেনে দুর্গাপ্রতিমাকে বাড়ির উঠানে নামিয়ে আনা হয়। বিসর্জনের আগে পরিবারের নারীরা দেবীকে বিদায় জানান। শতাব্দীপ্রাচীন এই পুজোর আবেগঘন সমাপ্তি ঘটে সেই চিরপরিচিত বাঙালি রীতিতেই।

তবে মানকর মানেই শুধু বিশ্বাসবাড়ি নয়। জনপদটিতে ছড়িয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি পুরনো মন্দির এবং ‘রং মহল’ নামে একটি ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ। রয়েছে সুবিশাল কবিরাজ বাড়িও, যেখানে মৃণাল সেন তাঁর বিখ্যাত বাইশে শ্রাবণ চলচ্চিত্রের কিছু দৃশ্যের শুটিং করেছিলেন। সেই বাড়ির দুর্গাপুজোও বেশ প্রাচীন।
সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোর সময়ে মানকর ঘুরে দেখার মতো একটি সুন্দর জায়গা। এখানে পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরনো বাড়ির স্থাপত্য, স্থানীয় লোকশিল্প, পরিবারের নিজস্ব রীতি-বিশ্বাস এবং গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণ। কলকাতার ব্যস্ত পুজোর পরিবেশ থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ পেরোলেই এখানে বাংলার এক অন্যরকম ছবি দেখা যায়। এখানে দুর্গাপুজো শুধু একটি পরিবারের উৎসব নয়, গোটা গ্রামের মানুষের মিলিত উৎসব এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত