(Mumbai Dabbawala)
বাইরের খাবারদাবার রসনায় মুখরোচক হলেও ঘরের প্রিয়জনের হাতে নিজস্ব পাকশালায় প্রস্তুত খাবারের স্বাদ ও তৃপ্তিই আলাদা। তাই ঘরে যা রান্না হয়, অতিরিক্ত তেল-ঝাল-মশলা ছাড়া পরিছন্ন ও পছন্দমতো খানাপিনা, তাই-ই চেটেপুটে খেয়ে নেওয়া। সেখানে না আছে ভেজাল, না আছে সস্তায় মুনাফা লোটার ধুরন্ধর ব্যবসায়িক প্রয়াস।
মুম্বাইয়ের গতিময় জীবনে শতাব্দীপ্রাচীন একটি পরিষেবা হল ‘ডাব্বাওয়ালা’। আদপে ‘ডাব্বা’ হল একটি ফরাসি শব্দ, যা হিন্দিতেও ব্যবহৃত হয়। ডাব্বা হল টিন, জার্মান সিলভার, অ্যালমুনিয়ম বা স্টিলের পাত্র– যাতে খাবার ভরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। ভাত, রুটি/পরোটা, আচার, ডাল, সবজি, মিষ্টি, আবার কখনও ডিম, মাংস ইত্যাদিসহ এই টিফিনবাক্সগুলিকে বলা হয় ‘ডাব্বা’।
আরও পড়ুন: আজাদি ও দেশভাগের ক্ষত
প্রতিদিন সকালে মুম্বাই শহর জেগে ওঠার আগেই শহরতলিতে ধোপদুরস্থ সাদা পোশাক ও সাদা মরাঠি টুপি পরিহিত প্রায় হাজারখানেক ডাব্বাওয়ালাদের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়ে যায়। মুম্বাই ও শহরতলির অফিস কর্মচারীদের বাড়ি বা কোঅপারেটিভ সোসাইটি তথা ফ্ল্যাট থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে তাঁদের কর্মস্থলে পৌঁছে দেন। সে কর্পোরেট অফিসই হোক, আদালত, থানা, দোকান বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হোক।
আবার একটু বেলার দিকে মুম্বাইয়ের এই ডাব্বাওয়ালারা প্রত্যেক পরিষেবা নেওয়া গ্রাহকের ঘরে টিফিনবাক্স ফেরত দিয়ে যান। ডাব্বাওয়ালারা প্রায় নির্ভুল ও নির্দিষ্ট সময়ে, গৃহস্থের ঘর থেকে লাঞ্চবক্সে ভরা বাড়ির খাবার সংগ্রহ করে স্থানীয় দূরত্ব হলে নিজস্ব সাইকেল, বা দূরত্ব বেশি হলে কখনও লোকাল ট্রেনে চেপে নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে নির্দিষ্ট উপভোক্তাদের দরবারে তাদের খাবার রেখে আসেন ও কিছু পরে খালি লাঞ্চবক্স ফেরত নিয়ে যান।

১৮৯০ সালে, মহাদেও হাভাচি বাচ্চে নামে জনৈক এক পার্সি ভদ্রলোকের মস্তিস্কপ্রসূত এই ভাবনাটি প্রথম রূপ পায়। তিনি প্রথম ‘লাঞ্চ ডেলিভারি সার্ভিস’ উদ্যোগ শুরু করেন মাত্র ১০০ জন শ্রমজীবী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে। এই বিলিব্যবস্থা প্রকল্পটি গ্রাহকদের মনঃপুত হয় এবং ক্রমশ চাহিদা বাড়তে থাকে।
অবিলম্বে এই নতুন নিয়মিত সেবাটি সফল হয়ে ওঠে। ক্রমশ ভোজন সরবরাহকারী ব্যবস্থাপনার পরিধি বাড়তে থাকে। এর আরও অনেক পরে ১৯৩০ সালে, পরোক্ষভাবে এই জনসেবক ডাব্বাওয়ালাদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একত্র করার চেষ্টা করা হয়। ১৯৫৬ সালে ‘বোম্বাই টিফিনবক্স সাপ্লায়ার্স ট্রাস্ট’ নামে নিত্যব্যবহার্য ভোজনপেটিকা বিতরণ সংস্থা গড়ে ওঠে। এবং ১৯৬৮ সালে, নতুনভাবে ‘মুম্বই টিফিনবক্স সাপ্লায়ার অ্যাসোসিয়েশন’ বা MTBSA-এর অধীনে প্রতিটি ডাব্বাওয়ালা একটি সমবায় সংস্থার সম-অংশীদার হিসাবে নিযুক্ত হন। ভারতের আর্থিক ব্যবস্থায় এই ‘মুম্বাইকর ডাব্বাওয়ালা’ নামক গৃহীত কর্মসূচী ব্যবসাজগতকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে।
ডাব্বাওয়ালাদের জন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সাইকেল, কাঠের প্যাঁটরা, সাদা সুতির পাজামা-কুর্তি, সাদা মরাঠি টুপি বিতরণ করা হয়। প্রতি মাসের ইউনিটের উপার্জন ভাগ করা হয়। উর্দি না-পরা ও অনুপস্থিতির জন্য জরিমানা নেওয়া হয়।
মুম্বইয়ের গতিময় জীবনের দৈনিক জীবনরেখা বলা যায় এই ডাব্বাওয়ালা সংস্কৃতিকে। একটা বড়সড় কাঠের ঠেলায় ডাব্বা ভরে জনমানব ভর্তি লোকাল ট্রেনে বা সাইকেলে যাতায়াত করেন। মুম্বইয়ের রাস্তায় অহরহ ট্রাফিক জ্যাম এড়াতে এঁরা সাধারণত সাইকেল বা ট্রেনে অথবা পায়ে হেঁটেই যাতাযাত করেন। এখানে একটা ভাল ব্যাপার দেখা যায়, রাস্তায় বেশি যানজট থাকলেও গাড়ির চালকরা ডাব্বাওয়ালাদের সম্মানের সঙ্গে রাস্তা ছেড়ে দেন। দূরত্ব মোতাবেক গ্রাহক পরিষেবার ভাড়া নির্ধারিত হয়। মাসিক ভাড়া সংক্ষিপ্ত দূরত্ব হলে, ৫০০-৬০০ টাকা। কিন্তু দূরত্ব বেশি হলে এই ভাড়া ১৪০০-১৫০০ টাকা হয়ে যায়।
তবে গ্রাহকদের কাছে নিয়মিত যথাযোগ্য পরিষেবা হিসাবে সাশ্রয়ী বলা যেতে পারে। ডাব্বাওয়ালাদের চাকরির নিরাপত্তা থাকেই। কারণ এটি একটি সমবায়ভিত্তিক সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এবং প্রতিজনই স্বনিযুক্ত। ক্লান্তিকর কাজ হলেও এতে জড়িত থাকে মহৎ সেবা ও দায়িত্বের পরাকাষ্ঠা। ডাব্বাওয়ালাদের মাসিক বেতন সাধারণত ৮,০০০ – ১২,০০০ টাকা। আবার সক্রিয় সদস্যরা মাসে ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা আয় করেন।

ডাব্বাওয়ালাদের জন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সাইকেল, কাঠের প্যাঁটরা, সাদা সুতির পাজামা-কুর্তি, সাদা মরাঠি টুপি বিতরণ করা হয়। প্রতি মাসের ইউনিটের উপার্জন ভাগ করা হয়। উর্দি না-পরা ও অনুপস্থিতির জন্য জরিমানা নেওয়া হয়।
ডাব্বাওয়ালাদের আসল কর্মযজ্ঞ শুরু হয় সকালে চার্চগেট স্টেশন অঞ্চলে। এরা এখানে জড়ো হন, টিফিনকৌটা ঠিকমতো সাজিয়ে তা বিলি করা হয় অঞ্চলভেদে নির্ধারিত ডাব্বাওয়ালাদের কাছে। প্রতিটি লাঞ্চবক্সে পৃথক সংকেত ও সংখ্যা, সুতো বা গাঢ় রঙের কালি দিয়ে সূচিত করা থাকে। সংগ্রহস্থলের সংক্ষিপ্ত সূচক, গন্তব্য স্টেশনের নম্বর, ভবন, প্রাপকের রংভিত্তিক সংকেতলিপি চিহ্নিতকরণ করা থাকে। যা একজন ডাব্বাওয়ালাকে বুঝতে সাহায্য করে, বাক্সটি কোন অঞ্চলের কোন বাড়ি থেকে এসেছে এবং সেটি কোন এলাকার, কোন ভবনের, কোন তলায় কাকে পৌঁছতে হবে।
এই পেশায় যিনি মুখ্য ব্যক্তি বা দলনেতা, তাঁকে মরাঠিতে ‘মুকাদম’ বলা হয়, যাঁরা কাজের তদারকি ও মজুরি দেওয়ার দায়িত্বে থাকেন। আর বিতরণকারী কর্মীদের বলা হয় ‘গদ্দি’।
সেই মতো তাঁরা নির্দিষ্ট স্টেশনগুলিতে নেমে পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে নির্ধারিত গ্রহকের কাছে পৌঁছে দেন। সমস্ত ডাব্বা নির্দিষ্ট জায়গায় বন্টন শেষে তাঁরা নিজেদের মধ্যাহ্ন আহার শেষ করে স্বল্প সময় বিরতির পর আবার খালি কৌটোগুলি সংগ্রহ করে প্রতিটি গৃহস্থ বাড়িতে ফেরত দিয়ে আসেন। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি বিপরীতক্রমে চলতে থাকে।
আরও একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মীই স্বল্পশিক্ষিত। আজও এই প্রথায় হালের কোনও অ্যাপ বা জিপিএস সিস্টেম নেই। সেসব ছাড়াই এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসা একটি বহুল প্রচারিত ব্যবস্থা। যা স্বাভাবিকভাবে কর্মীদের মধ্যে প্রবর্তিত।

এই পেশায় যিনি মুখ্য ব্যক্তি বা দলনেতা, তাঁকে মরাঠিতে ‘মুকাদম’ বলা হয়, যাঁরা কাজের তদারকি ও মজুরি দেওয়ার দায়িত্বে থাকেন। আর বিতরণকারী কর্মীদের বলা হয় ‘গদ্দি’। এখন অনেক মহিলাও এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন পুরুষ কর্মীদের মতোই। ইদানীং মুম্বইয়ের অনান্য খাদ্যসরবাহকারীরাও এই ডাব্বাওয়ালাদের কাজে লাগান, তাদের ক্লাউড কিচেনে রান্না করা খাবার বা ফাস্টফুড ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। অনেক মহিলারাও তাঁদের বাড়তি রোজগারের জন্য হোম ডেলিভারি আইটেম এই ডাব্বাওয়ালা মারফৎ সরবরাহ করেন ক্রেতাদের কাছে।
তবে অনলাইন আধুনিক ফুড ডেলিভারি অ্যাপসের রমরমায় ইদানীং এই ডাব্বাওয়ালা ব্যবসায় কিছুটা হলেও ভাঁটা পড়ছে এবং কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তবে নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রাখতে, এবং আয় বাড়াতে ডাব্বাওয়ালারা ডিজিটাল পরিষেবার নতুন প্রযুক্তিগত উদ্যোগের সাহায্য নিচ্ছেন।
বলা বাহুল্য, কোনও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ছাড়াই কেবলমাত্র সততা, পরম্পরা ও শৃঙ্খলাকে ভিত্তি করেই অখণ্ড পরিশ্রমে আজও এই টিফিন সরবরাহ বন্দোবস্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে টিকে রয়েছে। মুম্বাইয়ের জীবনদর্শন এই ডাব্বাওয়ালা জীবিকা।
মুম্বাইয়ের অহংকার এই ডাব্বাওয়ালা প্রথা। এখন ‘Share My Dabba’ নামে নতুন একটি প্রকল্প বেশ চালু। অফিসে চাকুরিজীবী অনেকের দুপুরের টিফিনবক্সে প্রতিদিন কিছু ভাল খাবার অপচয় হয়। দুপুরের খাবার শেষ হওয়ার পর অনেক সময় কোনও গ্রাহকের ডাব্বায় অবশিষ্ট খাবার, যা এঁটো হয়নি, বেঁচে থাকে। তিনি কী করেন, সেটি সেই ডাব্বার ওপর লাল রঙের ‘শেয়ার’ স্টিকার লাগিয়ে দেন।

ডাব্বাওয়ালারা যখন খালি টিফিনবাক্সগুলি সংগ্রহ করেন, তারা তখন লাল স্টিকার লাগানো ডাব্বাগুলি আলাদা করে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাছে নিয়ে যান। সংগৃহীত খাবারগুলি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ক্ষুধাতুর পথশিশুদের বিনামূল্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়। ডাব্বাওয়ালাদের নিখুঁত ডেলিভারি চেইনকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই প্রতিদিন কয়েকশো পথশিশুর মুখে আহার তুলে দেওয়া হয়।
আজও ‘ডাব্বাওয়ালা’ প্রথা মুম্বাই সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে রয়েছে। বলা বাহুল্য, কোনও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ছাড়াই কেবলমাত্র সততা, পরম্পরা ও শৃঙ্খলাকে ভিত্তি করেই অখণ্ড পরিশ্রমে আজও এই টিফিন সরবরাহ বন্দোবস্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে টিকে রয়েছে। মুম্বাইয়ের জীবনদর্শন এই ডাব্বাওয়ালা জীবিকা।
“গর্মি মে আয়ু…বারিশ মে আয়ু…সব্ কে ভুখ্ মিটায়ু
ম্যায় ডাব্বেওয়ালা…”
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত