(Purabi Mukhopadhyay)
২৫ বৈশাখের আগের দিন অর্থাৎ ২৪ বৈশাখ তাঁর জন্ম। নবজাতকের মা তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন তাঁর কন্যাসন্তানের নামকরণের জন্য। কবি চিঠির উত্তরে লেখেন, ‘আমার জন্মদিনের আগের দিন তোমার কন্যার জন্ম, তাই ওর নাম রাখলাম- পূরবী।’
রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বর্ণযুগের অন্যতম শিল্পী ছিলেন পূরবী মুখোপাধ্যায়। দৃপ্ত কণ্ঠস্বর আর স্পষ্ট উচ্চারণের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের গানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানও কম নয়। পূরবীদির কাছেই শুনেছি, তাঁর সঙ্গীতজীবনের প্রথম দিকে তিনি গান শিখেছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে।
আরও পড়ুন: স্মৃতির আকাশ থেকে (১), (২), (৩), (৪), (৫), (৬), (৭), (৮), (৯), (১০), (১১), (১২), (১৩), (১৪), (১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩), (২৪), (২৫), (২৬), (২৭), (২৮), (২৯), (৩০), (৩১), (৩২), (৩৩), (৩৪), (৩৫), (৩৬), (৩৭), (৩৮), (৩৯)
সন্তোষ সেনগুপ্ত পরিচালিত এবং গ্রামাফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যর অনেকগুলিতেই পূরবী মুখোপাধ্যায় গান করেছিলেন। দেবকীকুমার বসু পরিচালিত রবীন্দ্রনাটক ‘চিরকুমার সভা’ ছায়াছবিতে পূরবীদি অনেকগুলি গান গেয়েছিলেন।
ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশতজন্মবর্ষের সময়। প্রায় প্রতি সপ্তাহে যেতাম ওঁর পার্ক সার্কাসের গোবরা রোডের বাড়িতে। সেই সময় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির বিচিত্রা ভবনে ৭দিন ব্যাপী রবীন্দ্রকাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করেছিলাম তপন সিংহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, ছড়াকার-সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী, নাট্যব্যক্তিত্ব দেবতোষ ঘোষ এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপচার্য করুণাসিন্ধু দাশ প্রমুখ। উৎসবের শেষ দিনে আয়োজিত হয়েছিল একটি বিশেষ অনুষ্ঠান, যেখানে ছায়াছবিতে ব্যবহৃত রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশিত হয়।

সেদিন কোনও সাম্মানিক না নিয়েই, ওই অনুষ্ঠানে একাধিক গান গেয়েছিলেন পূরবীদি! এমনকি আমার গানের সময় নিজে হারমোনিয়াম বাজিয়ে সঙ্গত করেছিলেন! বনপলাশীর পদাবলী ছবিতে ব্যবহৃত, ‘আমার এ পথ তোমার পথের থেকে অনেক দূরে গেছে বেঁকে’ গাইবার সময় লক্ষ করেছিলাম পূরবীদিও গলা মেলাচ্ছেন! বেশ অপ্রস্তুত লাগছিল, অত বড় একজন শিল্পী আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান করছিলেন দেখে! অন্যদিকে আবার মনে হচ্ছিল এমন সৌভাগ্য জীবনে খুব কমই আসে।
পূরবীদি যখন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে গাইতে এসেছিলেন, সেদিন নিজের গান গেয়ে উঠে যাননি। বরং, অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত বসে থেকেছেন, এবং প্রয়োজনমতো অনেক শিল্পীর সঙ্গে হারমোনিয়াম বাজিয়েছিলেন। এই ধরণের সৌজন্য বর্তমানে বিরল! অবাক হতাম যখন দেখতাম ওঁর মতো বর্ষীয়ান শিল্পী মাকে ফোন করে দূরদর্শনে অনুষ্ঠানের কথা বলতেন। আমার মামিও অনেকদিন পূরবীদির কাছে গান শিখেছিল। অনেকগুলো সূত্রেই পূরবীদির সঙ্গে পরিচয় তৈরি হয়েছিল।

একদিন ওঁর গোবরা রোডের বাড়ি গিয়েছিলাম নিছক গল্প করতে। সেদিন অনেক গল্প করেন ওঁর সঙ্গীতশিক্ষার দুই শিক্ষক দেবব্রত বিশ্বাস আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে। তখন আমি তপন সিংহকে নিয়ে একটা তথ্যচিত্রের কাজ করছিলাম। সেখানে আমার প্রয়োজন ছিল মহিলা কণ্ঠস্বরে, ‘যতবার আলো জ্বালাতে চাই, নিভে যায় বারে বারে’ গানটির। ওই গান তথ্যচিত্রের একটি বিশেষ দৃশ্যতে ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম। একটু ভয়ে ভয়ে ওঁর কাছে প্রস্তাব দিতেই উনি রাজি হয়ে গিয়েছিলেন।
পরের দিনই একটা ক্যাসেটে পুরো গান রেকর্ড করে আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘পুরো গানটাই গেয়ে দিয়েছি, তোমার যতটা প্রয়োজন, ততটাই ব্যবহার কোরো।’ পারিশ্রমিক বা সম্মানিকের কথা বলতে আমায় বলেছিলেন, ‘তোমরা আমার ছেলের মতো, তোমাদের কাছ থেকে আমি টাকা নেব!’ এমন আন্তরিকতা, স্নেহ-ভালবাসা আর ভদ্রতাবোধ আজকের দিনে বিরল এবং আশা করাটাও বোধহয় ঠিক নয়। বর্তমানে সবকিছুই বদলে গিয়েছে!

পরের বছর ওঁর সঙ্গীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক অনুষ্ঠানের জন্য একটু সহযোগিতা করতে বলেছিলেন। সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলাম। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতজন্মবর্ষে আমার সংকলন এবং বিন্যাসে আমারই সংগ্রহ করা কিছু বস্তু নিয়ে, ‘বন্দনা’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতার সায়েন্স সিটির প্রেক্ষাগৃহে। বইটির জন্য ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন শঙ্খদা (শঙ্খ ঘোষ)। বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে সৌমিত্রকাকুর সঙ্গে ছিলেন পূরবীদিও। বইটি ওঁর খুব ভাল লেগেছিল।
ওই সময়ই একদিন চলে গেলেন সুচিত্রা মিত্র, সাংবাদিকের দায়িত্ব সারতে দৌড়োলাম পূরবীদির বাড়ি। সুচিত্রা মিত্র সম্পর্কে ওঁর স্মৃতিচারণ রেকর্ড করলাম। ওঁর সময়ের শিল্পীদের বিষয়ে ওঁর অনেক কিছুই বলার ছিল, বলার ছিল রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের বর্তমান গায়কির বিষয়ে। তাঁর সঙ্গে ওঁর নিজের সঙ্গীত জীবনের কথা, গান শেখানোর মতো বিষয় তো ছিলই কিন্তু আজকে আপসোস হয়, সময় বের করে কেন সেইসব অমূল্য কথাগুলো রেকর্ড করে রাখিনি!
পূরবীদির গাওয়া কিছু গান আজও যেন কানে বাজে। যেমন, ‘চিরকুমার সভা’ ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে পরিবেশিত, ‘মম যৌবন নিকুঞ্জে গাহে পাখি, সখি জাগো’, ‘প্রাণে গান নাই, মিছে তাই ফিরিনু যে’, ‘আমারে যদি জাগালে আজি নাথ’, ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’। অখণ্ড অবসর নিয়ে পূরবীদি কোথায় চলে গিয়েছেন জানা নেই, কিন্তু অগণিত রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমীদের মনের এক নিভৃত কোণে তিনি রয়ে গিয়েছেন আজও।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত