(Light Speed)
আলোর গতি যে মেপে ফেলা সম্ভব, এটাই অনেক কাল মানুষ বিশ্বাস করত না। বহুদিন ধরে মানুষ ভেবে এসেছিল, আলো অসীম গতিতে ছুটতে পারে, মানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আলোর পৌঁছে যেতে কোনও সময়ই লাগে না। তবে আলোর গতি যে অসীম নয়, তার একটি নির্দিষ্ট মান আছে, এবং সেটা মেপে ফেলা সম্ভব; প্রায় দুঃসাধ্য সেই কাজটাই করেছিলেন ডেনমার্কের এক জ্যোতির্বিদ ওলে রোয়েমার, আজ থেকে সাড়ে ৩০০ বছর আগে। তাঁর হিসেবে অল্প কিছু ভুল থাকলেও পরে, সেই ভুল অন্যদের হাত ধরে সংশোধিত হয়।
আরও পরে, বিশ শতকের গোড়ায় আলবার্ট আইনস্টাইন নামে এক তরুণ জানালেন যে, আলোর ওই প্রচণ্ড গতিকে (শূন্যস্থানের মধ্যে দিয়ে সেকেন্ডে আলো দৌড়োয় ৩ লক্ষ কিলোমিটার!) ছাপিয়ে যেতে পারে না অন্য কোনওকিছুই। এমনকি অন্য কিছু যদি আলোর পাশাপাশি সমান গতিতেও চলতে পারে কখনও (যা বাস্তবে ঘটা অসম্ভব), তখনও আলোর গতি থাকবে ওই একই, সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটারই। বর্তমানে এটি এক প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, মহাবিশ্বে এই গতির চেয়ে আর কোনও কিছুরই গতি বেশি নয়।
আরও পড়ুন: নতুন এক কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্ম
আলোর এই অকল্পনীয় গতি আজ স্কুলস্তরের একটি বাচ্চাও জানে। আমাদের পৃথিবীতে মানুষ আজ পর্যন্ত সর্বোচ্চ গতিবিশিষ্ট যে যান তৈরি করতে পেরেছে, সেটার গতি আলোর মাত্র ০.০০৩৭ শতাংশ, অর্থাৎ এক শতাংশেও পৌঁছায়নি। কিন্তু এই আলোচনা দ্রুতগামী যানের গতি নিয়ে নয়। বিজ্ঞানীদের মনে অনেক ধরনেরই উদ্ভট বা অস্বাভাবিক সব প্রশ্ন মাঝেমধ্যেই উদয় হয়। আমাদের মনেও যে হয় না তা নয়, তবে আমরা সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে উদগ্রীব হই না অতটা, যতটা ওঁরা হন। তা, তেমনই একবার বিজ্ঞানীদের কারও কারও মনে হল, আচ্ছা, আলোর এই গতি যদি বাস্তবে আরও কম হত, তাহলে কী ঘটত?

আজকাল এআই (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স) বা কম্পিউটার গ্রাফিক্সের রমরমার যুগে এরকম প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার খাটুনিটা আগের চেয়ে অনেক কমে গিয়েছে। ‘চ্যাটজিপিটি’ বা ‘জেমিনি’ জাতীয় এআই-নির্ভর অ্যাপকে জিজ্ঞেস করলে সে গড়গড় করে একাধিক পয়েন্ট তালিকার মতো সাজিয়ে জানাবে কী কী ঘটতে পারে। তবে এই লেখায় আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য না নিয়ে বলব বাস্তব কিছু ঘটনার কথা, বিজ্ঞানীরা যেখানে নিজেরাই খুঁজে পেতে চেয়েছেন এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর।
অনেক কাল আগে, ১৯৩৯ সালে, বিখ্যাত পদার্থবিদ এবং লেখক জর্জ গ্যামো ছোটদের উপযোগী ভাষায় লিখেছিলেন ‘মিস্টার টম্পকিনস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’। সেই বইয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, মিস্টার টম্পকিনস একটি শহরের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর গতি আলোর গতির তুলনায় খুব কম নয়, কারণ সেখানে আলোর গতিই বেশ কম, আর তাঁর গতি আলোর মোটামুটি কাছাকাছি থাকায়, মানুষটির সামনে নানা ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে চলেছে।

মিস্টার টম্পকিনসের মতোই, বাস্তবের এক ব্যক্তি, জুরিখের এক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর (ইনি আবার পদার্থবিদ্যার অধ্যাপকও) গার্ড কুর্টমায়ার এবং তাঁর সহকারীরা মিলে এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ২০১২ সালে বানিয়ে ফেলেন একটা মোবাইল গেম। গেমটির নাম ‘আ স্লোয়ার স্পিড অফ লাইট’। সেখানে কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরির মধ্যে দিয়ে বুঝে নেওয়া সম্ভব, আলোর গতি কম হলে কী হতে পারত।
এবার আলোর গতি কমে যাওয়া মানে এই ধরনের ঘটনাগুলোই আমরা দেখতে পারব; তবে তখন ওই ব্যক্তির গতি আর খুব বেশি না হলেও চলবে।
প্রথমেই বলা দরকার, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের বিশেষ তত্ত্বের (অর্থাৎ ‘স্পেশাল থিওরি অব রিলেটিভিটি’) কিছু সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যে বস্তু যত বেশি গতিতে চলতে থাকে, তার ভর তত বেশি হারে বাড়তে থাকে। আবার, বস্তুর বদলে কোনও ব্যক্তিকে ভাবলে তাঁর কাছে ‘সময়’ নামক ধারণাটিও একটু আলাদা হয়। তাঁর ঘড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও লোকের ঘড়ির তুলনায় সময় আস্তে আস্তে অতিবাহিত হতে থাকবে। এছাড়াও, গতিশীল ওই মানুষটির চোখে বস্তুর দৈর্ঘ্যও বেড়ে যাবে, মানে তিনি থেমে থাকা অবস্থায় কোনও বস্তুর দৈর্ঘ্য যা দেখতেন, চলমান অবস্থায় তার চেয়ে তাকে কিছুটা বড় দেখবেন।

তবে আসল কথা হল, আলোর গতি যেহেতু বস্তুর গতির চেয়ে অনেক অনেক বেশি; তাই এই ধরনের ঘটনা সত্যি সত্যি ঘটলেও খালি চোখে দেখা বা পরিচিত কোনও যন্ত্র দিয়ে মাপা সম্ভব হবে না। এবার আলোর গতি কমে যাওয়া মানে এই ধরনের ঘটনাগুলোই আমরা দেখতে পারব; তবে তখন ওই ব্যক্তির গতি আর খুব বেশি না হলেও চলবে। বাস্তবে যেমন গতিতে মানুষ চলাফেরা করে, সেরকম গতি হলেই চলবে। গার্ড সাহেবদের বানানো ওই গেমেও কোনও গতিশীল মানুষ তাঁর সামনে এগিয়ে আসা আলোর বিভিন্ন ধর্ম বা বৈশিষ্ট্যকে বদলাতে দেখেন অনেক স্পষ্টভাবে, এবং বস্তুর দৈর্ঘ্যও তাঁর কাছে কম বলে মনে হতে থাকে।
এবার প্রশ্ন, কোনও মানুষ আলোর সঙ্গে তুলনীয় গতিতে চলতে শুরু করলে, তিনি তাঁর সামনে এগিয়ে আসা আলোর (ধরা যাক, রাস্তার স্ট্রিটলাইট) ঠিক কী কী পরিবর্তন দেখবেন? তিনি দেখবেন, তাঁর পাশ দিয়ে পিছনের দিকে চলমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যাচ্ছে। ওই আলোর রঙও বদলে যাবে। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য নীলের চেয়ে বেশি। তাই উনি হয়তো লাল আলোকে দেখবেন রং বদলে নীল বা আকাশি হয়ে যেতে। এই ঘটনার নাম ‘ডপলার এফেক্ট’, বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান ডপলারের নামে এর পরিচিতি। আলোর মতো এই ঘটনা শব্দতরঙ্গের বেলাতেও ঘটে।

আলোর কাছাকাছি গতিতে চলমান হলে, সময়ও অনেকটাই ‘স্লো’ হয়ে যাবে। তখন মানুষটির কাছে দিন, মাস বা বছর কাটবে বেশ ধীরগতিতে। তাই তিনি মনে করবেন, তাঁর বয়স খুব আস্তে আস্তে বাড়ছে। এইভাবে স্বাভাবিকের তুলনায় কম গতিতে বয়স বাড়বার ব্যাপারটা যে বাস্তবেও ঘটে, পরীক্ষা করে তা-ও প্রমাণ করা গিয়েছে।
জলের বেসিনের কল খুলে দিলে একটানা জল পড়ে বটে, কিন্তু ওই জল যেমন আসলে ছোট ছোট অজস্র জলকণার মিলিত স্রোত, আলোও তেমনই।
তবে চলমান ব্যক্তির চোখে চারপাশের বস্তুর দৈর্ঘ্য কমে যাওয়ার কথা। একে বলে ‘লেন্থ কনট্রাকশন’ বা দৈর্ঘ্য সংকোচন। এই ঘটনাটা কোনও ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে বুঝতে পারা ওই ব্যক্তির পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না। কারণ ‘রানটাইম এফেক্ট’-এর প্রভাব। কেন সেটা বোঝা সম্ভব হবে না, তা একটা উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে।
ধরা যাক, আমার কাছে একটা সাইকেল এগিয়ে আসছে। এখন ওই সাইকেলের সামনের চাকা এবং পিছনের চাকা থেকে আসা আলো আমার চোখে আসবে। তবে এই দুটো আলোর যাত্রাপথে থাকবে একটু তফাৎ, কারণ পিছনের চাকার আলোকে সামান্য বেশি পথ আসতে হবে। সাইকেলের দুটো চাকার মধ্যে যা দূরত্ব, সেইটুকু বেশি। খুব সূক্ষ্মভাবে ভাবলে বোঝা যাবে, সাইকেলের সামনের চাকাকে আমরা পিছনের চাকার চেয়ে খুব সামান্য সময় হলেও আগে দেখি, এবং পিছনের চাকাকে খুব অল্প সময় পরে দেখি। ব্যাপারটাকে ভাবা যেতে পারে, যেন পিছনের চাকার একটু অতীতের চেহারা দেখছি। আর এই কারণেই সাইকেলটি আমাদের চোখে ওর প্রকৃত দৈর্ঘ্যের চেয়ে খুব সামান্য হলেও বেশি বলে মনে হয়। আলোর গতি যখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই কমে যায়, তখন গতিশীল কোনও ব্যক্তিকে স্থির থাকা মানুষ অনেকটাই লম্বা হিসেবে দেখবেন।

এগুলো ছাড়া আরও একটা কাণ্ড ঘটবে আলোর কাছাকাছি গতিতে চলার সময়— ওই মানুষটির কাছে সামনে থাকা অন্য কোনও বস্তুর উজ্জ্বলতা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা অন্যরকম হবে। এর কারণ আলো (বা ওই ধরনের যে কোনও বিকিরণ) আসলে এক অতি ক্ষুদ্র কণার স্রোত। সেই কণার নাম ফোটন। জলের বেসিনের কল খুলে দিলে একটানা জল পড়ে বটে, কিন্তু ওই জল যেমন আসলে ছোট ছোট অজস্র জলকণার মিলিত স্রোত, আলোও তেমনই। আলোর কাছাকাছি গতিতে চলমান মানুষটির কাছেও তাঁর সামনে এগিয়ে আসতে থাকা বস্তুর উজ্জ্বলতা স্বাভাবিকের চেয়ে (মানে মানুষটি থেমে থাকলে যেমন দেখতেন) বেশিই দেখাবে। এই ঘটনার নাম ‘সার্চলাইট এফেক্ট’।
স্বয়ং আইনস্টাইন ছোট থেকেই আলোর গতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেছিলেন। মনে মনে ভাবতেন, যদি আলোর গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে ওর পিঠেই চেপে বসা যায় তাহলে কী ঘটবে। তিনি এই ভিডিও গেমটি খেলার সুযোগ পেলে ঠিক কী মনে করতেন? জানতে কৌতূহল হয় ভীষণ!
তথ্যসূত্র
১. Livescience – Ashley P. Taylor – What would happen if the speed of light were much lower?
২. Iflscience – James Felton – Mind-Bending Game Explores What Would Happen If The Speed Of Light Was Far Slower
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত