(Bengali Intellectuality)
কলকাতার এক বিকেল কল্পনা করুন। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথে বইয়ের স্তূপ, ধুলো আর পুরোনো কাগজের গন্ধ, মিশে আছে বাতাসে। কোথাও এক দোকানের সামনে ঝুলছে হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে ছাপা রবীন্দ্র রচনাবলী, একটু দূরে মার্ক্সের দাস ক্যাপিটালের ছেঁড়া মলাট, আর তার পাশেই কোনও পরীক্ষার্থীর জন্য তৈরি ‘অবজেক্টিভ জেনারেল নলেজ’। সেই বইয়ের পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন যুবক, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ, হাতে সিগারেট, চোখে এমন এক ধরনের চিন্তার ভঙ্গি যেন তাঁরা সদ্য মানবসভ্যতার সবচেয়ে জটিল প্রশ্নের সমাধান করে ফেলেছেন। কথাবার্তা চলছে গভীর গলায়। কেউ বলছেন ‘সমস্যাটা আসলে স্ট্রাকচারাল’, আরেকজন বলছেন ‘না না, এটা পুরোপুরি এপিস্টেমোলজিক্যাল’। আশেপাশে দাঁড়ানো কেউই পুরোটা বুঝছেন না, কিন্তু সবাই বুঝছেন এখানে কেউকেটারা একত্রিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ভাঙনের জয়গান কি শুনতে পাওয়া যাচ্ছে?
এই দৃশ্য বহু দশক ধরে কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনে অতি পরিচিত বিষয় ছিল। এই দৃশ্যের কেন্দ্রে যে চরিত্রটি বারবার ফিরে আসে, তার নাম— আঁতেল। শব্দটির মধ্যে এক অদ্ভুত মিশ্রণ আছে— একটু ঠাট্টা, একটু ঈর্ষা, একটু বিরক্তি, আবার একটু গোপন শ্রদ্ধাও। বাঙালি যখন কাউকে আঁতেল বলে, তখন সে তাঁকে পুরোপুরি অপমান করছে না; বরং একটু হেসে বলছে— লোকটা বুদ্ধি দেখাতে ভালবাসে, কিন্তু বুদ্ধিটা যে একেবারেই নেই তাও নয়। এই দ্ব্যর্থক সম্মানই আঁতেলের প্রকৃত সামাজিক অবস্থান।

আঁতলামি বাঙালির সংস্কৃতিতে নতুন কিছু নয়। এর শিকড় অনেক গভীরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের সময় থেকেই বাঙালি সমাজে একধরনের বৌদ্ধিক উন্মাদনা জন্মেছিল। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি বই পড়ছে, তর্ক করছে, সমাজ সংস্কার নিয়ে ভাবছে, ইউরোপীয় দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। সেই সময়ের বাঙালি ভদ্রলোকের কাছে বুদ্ধি ছিল এক ধরনের সামাজিক পুঁজি। টাকা না থাকলেও চলবে, কিন্তু বিদ্যার জোর থাকতে হবে। ফলে যে যত বেশি বই পড়তে পারত, যে যত বেশি দার্শনিকের নাম জানত, যে যত বেশি জটিল ভাষায় কথা বলতে পারত; সে তত বেশি সম্মান পেত।
এই পরিবেশেই জন্ম নেয় সেকালের আঁতেল। তাঁর পোশাক সাধারণত ধুতি-পাঞ্জাবি, চোখে গোল চশমা, আর মুখে এক ধরনের স্থায়ী চিন্তার রেখা। তিনি হাঁটছেন ধীরে ধীরে, যেন পৃথিবীর সমস্ত দার্শনিক সমস্যার ভার তাঁর কাঁধে। আড্ডায় বসে তিনি হঠাৎ বললেন, ‘দেখুন, হেগেলের ডায়ালেকটিক না বুঝলে আধুনিক ইতিহাস বোঝা সম্ভব নয়’। উপস্থিত দশজনের মধ্যে আটজন হেগেলের নাম শুনেছেন, কিন্তু ডায়ালেকটিক কী, তা জানেন না। তবু সবাই মাথা নাড়লেন। কারণ এই মাথা নাড়াটাই সামাজিক রীতি। কেউ প্রশ্ন করলে আলোচনার গাম্ভীর্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

তবে সেকালের আঁতলামির মধ্যে একটি বিষয় ছিল— পরিশ্রম। অনেক আঁতেল সত্যিই পড়াশোনা করতেন। তাঁদের বাড়িতে বইয়ের আলমারি থাকত, সেই আলমারির বই সত্যিই পড়া হত। তাঁরা রাত জেগে কবিতা লিখতেন, তর্ক করতেন, অনুবাদ করতেন, ছোট পত্রিকা বের করতেন। তাঁদের ভঙ্গি হয়তো একটু বাড়াবাড়ি ছিল, কিন্তু ভিতরে একটি প্রকৃত বৌদ্ধিক শ্রমও ছিল। এই কারণেই সেকালের আঁতলামি কখনও কখনও সত্যিই নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছে।
কফি হাউস সেই আঁতলামির এক নাট্যমঞ্চ ছিল। সেখানে বসে বহু তর্ক হয়েছে— রাজনীতি, সাহিত্য, বিপ্লব, প্রেম, সিনেমা সবকিছু নিয়ে। কেউ উত্তেজিত হয়ে টেবিলে হাত মেরে বলছেন, ‘আপনার যুক্তিটা পুরো ভুল’। অন্য কেউ শান্ত গলায় উত্তর দিচ্ছেন, ‘আপনি বিষয়টা একটু সরলীকরণ করছেন’। সেই আড্ডার মধ্যে নাটক ছিল, অহংকার ছিল, আবার সত্যিকারের কৌতূহলও ছিল। কফি হাউসের ধোঁয়াটে বাতাসে অনেক বড় বড় স্বপ্নও ভেসে বেড়াত। কেউ ভাবতেন তিনি নতুন কবিতা লিখবেন, কেউ ভাবতেন বিপ্লব করবেন, কেউ ভাবতেন মানবসভ্যতার নতুন দর্শন তৈরি করবেন।
আজকের আঁতেলদের একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মতামত তৈরি করা। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে কোনও ঘটনা ঘটল, কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশ্লেষণ হাজির। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আমেরিকার নির্বাচন, চিনের অর্থনীতি, ইউরোপের রাজনীতি সব বিষয়েই দৃঢ় মতামত।
কিন্তু সময় বদলায়। আঁতলামিও বদলায়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আঁতলামি একটি সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়েছে। আজকের আঁতেলের প্রধান মঞ্চ আর কফিহাউস নয়। সোশ্যাল মিডিয়া। আগে আড্ডায় বসে তর্ক হত, এখন ফেসবুক পোস্টে হয়। আগে কেউ একটি বিষয় নিয়ে লিখতে বসার আগে কয়েকটি বই পড়তেন, এখন একটি ভিডিও দেখেই মতামত তৈরি হয়ে যায়।
আজকের আঁতেলদের একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মতামত তৈরি করা। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে কোনও ঘটনা ঘটল, কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশ্লেষণ হাজির। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, আমেরিকার নির্বাচন, চিনের অর্থনীতি, ইউরোপের রাজনীতি সব বিষয়েই দৃঢ় মতামত। এবং সেই মতামত সাধারণত শুরু হয় একটি বিশেষ বাক্য দিয়ে—‘সবাই ভুল বুঝছে, আসল ব্যাপারটা হল…’

এই বাক্যটি আধুনিক আঁতলামির মন্ত্রের মতো। এর পরে যা বলা হয়, তা প্রায়ই আগের দিন কোনও ব্লগে পড়া বা ইউটিউবে শোনা একটি ধারণার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু বাক্যের ভঙ্গি এমন দৃঢ় থাকে যে, শুনলে মনে হয় বক্তা বহু বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন।
আধুনিক আঁতলামির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উদ্ধৃতির প্রতি অদ্ভুত আকর্ষণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়, নীৎশে, কামু, ফুকো, গ্রামশি এই নামগুলি যেন তাবিজের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ প্রেম নিয়ে কথা বলছেন, হঠাৎ সেখানে নীৎশের একটি উদ্ধৃতি এসে পড়ল। কেউ রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন, সেখানে ফুকোর একটি বাক্য জুড়ে দেওয়া হল। উদ্ধৃতিগুলির অনেক সময় প্রসঙ্গের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক থাকে না, কিন্তু তাতে সমস্যা নেই। কারণ উদ্ধৃতির মূল উদ্দেশ্য তথ্য দেওয়া নয়; বরং বক্তার বৌদ্ধিক মর্যাদা বাড়ানো।
আঁতলামিকে পুরোপুরি বাতিল করা যায় না। কারণ এর মধ্যেই রয়েছে প্রশ্ন করার অভ্যাস, তর্ক করার সংস্কৃতি, আলোচনা করার আনন্দ। সমস্যা তখনই হয়, যখন আঁতলামি চিন্তার বদলে ভঙ্গি হয়ে যায়, যখন পড়াশোনার বদলে উদ্ধৃতি, যুক্তির বদলে ভঙ্গি, অনুসন্ধানের বদলে ঘোষণা মুখ্য হয়ে ওঠে।
রাজনীতি বাঙালির আঁতলামির একটি বড় ক্ষেত্র। এখানে প্রায়ই দেখা যায় একটি অদ্ভুত প্রবণতা— বাস্তব রাজনীতির জটিল ঘটনাকে কয়েকটি তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করে ফেলা। কেউ বলছেন সব সমস্যার মূল পুঁজিবাদ, কেউ বলছেন সব সমস্যার মূল সাম্রাজ্যবাদ, কেউ বলছেন সব সমস্যার মূল সংস্কৃতির অবক্ষয়। এই তত্ত্বগুলির মধ্যে সত্যি থাকলেও সমস্যা হল, বাস্তব সমাজের জটিলতা সেখানে হারিয়ে যায়। রাজনীতি তখন বাস্তব বিশ্লেষণ নয়, বরং তাত্ত্বিক নাটক হয়ে ওঠে।
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। একটি সিনেমা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েও অনেকে ইউরোপীয় পরিচালকদের নাম টেনে আনেন। কেউ যদি সরলভাবে বলেন ছবিটি ভাল লেগেছে, তাহলে তাঁকে খুব সাধারণ মনে করা হয়। কিন্তু কেউ যদি বলেন ছবিটির ভিজ্যুয়াল ভাষা তাকে তারকোভস্কির কথা মনে করিয়ে দেয়, তাহলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে আড্ডার কেন্দ্রে চলে আসেন। অনেক সময় এই তুলনাগুলি সত্যি, কিন্তু অনেক সময় সেগুলি শুধুই সাংস্কৃতিক ভঙ্গি।

আঁতলামির পিছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও আছে। বাঙালি সমাজ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। ফলে বুদ্ধি প্রদর্শন এখানে এক ধরনের সামাজিক পুঁজি। যে ব্যক্তি জটিল ভাষায় কথা বলতে পারেন, যিনি দার্শনিকদের নাম জানেন, তিনি সহজেই একটি বৌদ্ধিক মর্যাদা অর্জন করতে পারেন। আঁতলামি তাই অনেক সময় সামাজিক স্বীকৃতির একটি শর্টকাট।
তবু আঁতলামিকে পুরোপুরি বাতিল করা যায় না। কারণ এর মধ্যেই রয়েছে প্রশ্ন করার অভ্যাস, তর্ক করার সংস্কৃতি, আলোচনা করার আনন্দ। সমস্যা তখনই হয়, যখন আঁতলামি চিন্তার বদলে ভঙ্গি হয়ে যায়, যখন পড়াশোনার বদলে উদ্ধৃতি, যুক্তির বদলে ভঙ্গি, অনুসন্ধানের বদলে ঘোষণা মুখ্য হয়ে ওঠে। তখন আঁতলামি আর সংস্কৃতি থাকে না; সেটি হয়ে যায় কেবল সামাজিক অভিনয়।
তাঁদের কথায় মাঝে মাঝে একটু বেশি নাটকীয়তা থাকে, একটু বেশি উদ্ধৃতি থাকে, কিন্তু তবুও সেই আলোচনার মধ্যে এক ধরনের প্রাণ আছে।
কিন্তু, সত্যি কথা বলতে কী, এই অভিনয়টিও বাঙালি খুব নিষ্ঠার সঙ্গে করে। পৃথিবীর অনেক জাতির অনেক গুণ আছে। কেউ শিল্পে এগিয়ে, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউ ব্যবসায়। বাঙালির বিশেষত্ব সম্ভবত অন্য জায়গায়। বাঙালি অসাধারণ দক্ষতায় তর্ক করতে পারে, বিশ্লেষণ করতে পারে, মতামত তৈরি করতে পারে।
এই তর্কের মধ্যেই জন্ম নেয় আঁতলামি। আর সেই আঁতলামির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বাঙালি সমাজের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য— একদিকে প্রকৃত বৌদ্ধিক কৌতূহল, অন্যদিকে নাটকীয় আত্মপ্রদর্শন। এই দুইয়ের মাঝখানেই কোথাও বাঙালির প্রকৃত বৌদ্ধিক সংস্কৃতি লুকিয়ে আছে।

সম্ভবত এই কারণেই এখনও কলেজ স্ট্রিটে বিকেল নামলে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গভীর গলায় আলোচনা করছেন। পৃথিবীর সমস্যাগুলি এখনও তাঁদের কাছে ব্যাখ্যার অপেক্ষায়। তাঁদের কথায় মাঝে মাঝে একটু বেশি নাটকীয়তা থাকে, একটু বেশি উদ্ধৃতি থাকে, কিন্তু তবুও সেই আলোচনার মধ্যে এক ধরনের প্রাণ আছে।
সেই প্রাণের মধ্যেই বাঙালির চিরন্তন আঁতলামি বেঁচে থাকে— সেকাল থেকে একাল, একাল থেকে আগামীকাল।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত