(FIFA World Cup)
জীবনে প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল এল ’৮৬-তে। তার আগে আসেনি, কারণ আসার সম্ভাবনা প্রায় ছিল না। প্রথমত, পাড়ার মাঠে বল পেটালেও আন্তর্জাতিক ফুটবল বোঝার বয়স হয়নি; দ্বিতীয়ত, আমাদের এখানে টিভি ছিল অপ্রতুল। তাছাড়া টিভিতে পুরো বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচারও সেভাবে শুরু হয়নি। আমার দশ বছর বয়সে আসা বিশ্বকাপ ফুটবলকে সাপটে জড়িয়ে ধরলাম। হাফপ্যান্ট পরা সেই সময়ে অন্য কিছুকে জাপটে ধরার স্বপ্ন-কল্পনা সেভাবে পক্ষবিস্তার করতে শুরু করেনি। আর তাই মনে হয়, শুধুই বিশ্বকাপকে জড়িয়ে ধরতে সুবিধা হয়েছিল।
ক্লাস ফাইভের হাফ-ইয়ারলির সেই সময়ে বিশ্বকাপ এসে পড়াশোনাকে মাঠের বাইরে জাস্ট উড়িয়ে দিল। গোল্লায় গেল পড়াশোনা, সবুজ মাঠের ভিতরে গড়ানো গোল্লায় মনপ্রাণ সমর্পণ করলাম। অবশ্য সবুজ বলছি বটে, আসলে তখন আর টিভির পর্দায় রং কোথায়, সবই সাদা-কালো! কিন্তু ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট জীবনও যে এমন রঙিন মৌতাত নিয়ে হাজির হতে পারে, সে সম্পর্কে কোনও পূর্ব ধারণা ছিল না। তাই ক্রিকেটের পরিভাষায় যাকে বলে পুরো ‘ক্লিন বোল্ড’ হয়ে গেলাম।
আরও পড়ুন: সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়
ইলেকট্রিক না-থাকা ‘বারো ঘর এক উঠোন’ বাড়িতে, বাড়িরই এক ছাদে গরমের জ্বালাতে শুয়ে অন্যান্য বছরের মতো সে বছরও তখন সমবেত রাত্রিযাপন পর্ব চলছে। কিন্তু টাঙানোর অসুবিধাতে মশারি না-থাকা সেই ছাদে শোওয়া টকের জ্বালায় তেঁতুলতলায় বাসের সমান। মশার উপদ্রবে রাতে ঘুমের থেকে বেশি জেগে কাটাতে হয়। অবশ্য সেটাই কাজে লেগে গেল। রাত জেগে বিশ্বকাপ দেখা শরীরে কোনও আলাদা অসুবিধা তৈরি করতে পারল না।
হইহই করে পাড়ার দলবদ্ধ যত ছোঁড়া রাতদুপুরে জুটতে শুরু করলাম দু’মিনিট হেঁটে বিল্টুকাকাদের বাড়িতে। পুরনো দিনের বড় ঘর। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে দশাসই। কমসে কম ৪০০ স্কোয়ার ফুট। ঘরের উত্তর প্রান্তে মাঝবরাবর ছিল টিভিটা। আগেকার বক্স টিভি, পোর্টেবল নয়। দক্ষিণ-পূর্বে একটা সিঙ্গল খাটে শুতেন বিল্টুকাকার শান্ত অথচ গম্ভীর জ্যেঠু। দক্ষিণ-পশ্চিমে তার থেকে বড় একটা তক্তপোশে বিল্টুকাকার শয়নশয্যা।

কিন্তু বিশ্বকাপের রাতে আমরা যখন সবাই মেক্সিকোতে থাকতাম, তখন গোটা পঞ্চাশেক ছেলে-ছোকরা মিলে দখল করে নিতাম সেই বড় ঘর। এমনকি বিল্টুকাকার বিছানাও বেদখল হয়ে যেত। কেবল বয়স্ক মানুষের প্রতি করুণা প্রদর্শন করেই বোধ হয় সিঙ্গেল খাটটাকে পরিত্রাণ দেওয়া হত। এবং কী আশ্চর্য! শত চিৎকার-চেঁচামেচি-উত্তেজনাতেও বিল্টুকাকার জ্যেঠু কিন্তু ঘুমিয়ে থাকতেন।
সর্দারপাড়া থেকে খেলা দেখতে আসত গণেশদা। খেলার থেকে স্টেডিয়ামের দৃশ্যাবলি গণেশদাকে বেশি আকৃষ্ট করত। আরও অনেককেও করত নিশ্চয়ই! একরাতে খেলার মাঝে ক্যামেরা যখন মাঠ থেকে ঘুরে গেল স্টেডিয়ামে, সেই সময় কোনও এক মেয়েকে সিগারেট ফুঁকতে দেখে গণেশদার সে কী উত্তেজনা! ‘এই দ্যাখ দ্যাখ, মেয়েটা কেমন সিগারেট খাচ্ছে!’ আর এক রাতে স্টেডিয়ামে ঘন হয়ে বসে থাকা খোলামেলা যুগলকে দেখে গণেশদার দিকে তাকিয়ে দেখি, গণেশদার মুখ চেপে ধরে আছে জেপি।
কী রোমহর্ষক সেই দর্শন, বোধহয় অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন একমাত্র তার তুলনীয় হতে পারে। কী অলৌকিক সেই ফুটবল-স্কিল! তিনি খেলছেন পা দিয়ে, আর আমাদের মনে হচ্ছে তিনি খেলার মাঠে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্প।
বিশ্বকাপ গড়াচ্ছে, আমাদের রাত জাগা, বোহেমিয়ান লাইফস্টাইল আরও গতি পেয়ে গেছে। গ্রীষ্মরাতের স্বপ্নে ঝরে পড়তে শুরু করেছে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা। আম-কাঁঠালের মরশুম গড়িয়ে ডাঁসা জামরুল এসে পড়েছে। দুটো খেলার মাঝের সময়ে নবারুণ সংঘের উল্টোদিকে মিতাডাঙার কুঁড়েগুলোর লাগোয়া জামরুল গাছটা হয়ে উঠল আমাদের খেলার মাঠ। সে মাঠেও দাপাদাপি-হুড়োহুড়ি-ফাউল প্লে-পেনাল্টি কম হত না। অবশ্য যারা আরও বড় খেলুড়ে ছিল সেই বাবুল-ইন্দ্র-পল্টু গেছুড়ে-স্কিলের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে রাতের অন্ধকারে তরতর করে চড়ে বসত বৃষ্টিভেজা নারকেল গাছে। আর গাছের উপর থেকে ছুঁড়তে থাকা ডাব-নারকেলে ভরে উঠত নারকেলতলা। তারপর সেগুলোকে নিয়ে কার দাঁত কত শক্ত তার পরীক্ষা চালাত ছেলে-ছোকরার দল।
জীবনে সেই প্রথম ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সঙ্গে পরিচয়। ইউরোপের দেশ হওয়ায় ইংল্যান্ড-ইতালি-স্পেন-ফ্রান্স-জার্মানির (তখন অবশ্য পশ্চিম জার্মানি) নাম জানা ছিল। কিন্তু লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে প্রথম জানলাম-চিনলাম-বুঝলাম ফুটবলের হাত ধরে। তার আগে অবশ্য পেলের নাম শুনেছিলাম। কিন্তু সেই পেলের ব্রাজিলকে ফুটবল ময়দানে এই প্রথম দেখলাম।

দেখলাম মারাদোনাকে। কী রোমহর্ষক সেই দর্শন, বোধহয় অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শন একমাত্র তার তুলনীয় হতে পারে। কী অলৌকিক সেই ফুটবল-স্কিল! তিনি খেলছেন পা দিয়ে, আর আমাদের মনে হচ্ছে তিনি খেলার মাঠে ফুটিয়ে তুলছেন শিল্প। শিল্প কাকে বলে মারাদোনার হাত (পা) ধরে সেই প্রথম চিনতে শিখলাম। জীবনে এরপর আর নতুন করে আমাকে শিল্প শিখতে হয়নি। হ্যাটস্ অফ টু মারাদোনা। আপনি আমাকে শিল্প শিখিয়েছেন।
প্রাথমিক পর্বে অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো দৌড়াতে শুরু করেছিল ডেনমার্ক। কোথায় হ্যামলেটীয় দোলাচল! তার বদলে দু’বারের বিশ্বকাপজয়ী উরুগুয়েকে ৬-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে এলেকজায়ারের ডেনমার্কের সদর্প ঘোষণা— ‘উই আর রেড, উই আর হোয়াইট/ উই আর ড্যানিশ ডিনামাইট’ খবরের কাগজে পড়ি আর শিহরিত হই। গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচে ডেনমার্ক সহজেই হারিয়ে দিল পশ্চিম জার্মানিকে। কিন্তু যে স্পেন বিশ্বকাপ শুরুই করেছিল ব্রাজিলের কাছে হার স্বীকার করে, তাদের হাতেই কি না প্রি-কোয়ার্টারে মাত হয়ে গেল ‘ড্যানিশ ডিনামাইট’! ভাবা যায়, স্পেনের পক্ষে স্কোর দাঁড়াল ৫-১! বুত্রাগুয়েনো হ্যাটট্রিকসহ একাই চার গোল করে ছিঁড়ে খেলেন ডেনমার্ককে।
কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। ঝলসে উঠল আর্জেন্টিনীয় দলনায়ক দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার মাথা (পরবর্তীতে তাঁর স্বীকারোক্তিতে জানা যাবে সেই ‘মাথা’ আসলে ছিল ‘হ্যান্ড অফ গড’) এবং বাম পা।
ফ্রান্সের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করতে না পেরে খলনায়ক হয়ে গেলেন জিকো। সক্রেটিস-কারেকার অনবদ্য ফুটবলও বাঁচাতে পারল না ব্রাজিলকে। ব্রাজিলের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নব্বই শতাংশ ফুটবলপ্রেমী টিভি দর্শকের বিশ্বকাপ ফুটবলও শেষ হয়ে গেল। অনেকে আবার নতুন করে বুক বাঁধল আর্জেন্টিনাকে নিয়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। ঝলসে উঠল আর্জেন্টিনীয় দলনায়ক দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার মাথা (পরবর্তীতে তাঁর স্বীকারোক্তিতে জানা যাবে সেই ‘মাথা’ আসলে ছিল ‘হ্যান্ড অফ গড’) এবং বাম পা।
মাঝমাঠ থেকে বল ধরে টার্ন নিয়ে গতি এবং স্কিলের সাহায্যে চার-পাঁচজন বিপক্ষ খেলোয়াড়কে নাস্তানাবুদ করে শেষ পর্যন্ত গোলকিপারকেও ড্রিবল করে, তাঁর গোলে বল ঠেলে দেওয়া দেখে আনন্দে আত্মহারা আমরা চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। আনন্দাশ্রু ফেলতে ফেলতে বুঝলাম, শুধু জাদুকরই জাদু বিস্তার করেন না, ফুটবলেও ইন্দ্রজাল রচনা করে কেউ হয়ে উঠতে পারেন ফুটবল-ঐন্দ্রজালিক। আর সেদিন থেকেই চিরতরে ঘোষিত হয়ে গেল পেলে ফুটবল সম্রাট হতে পারেন, কিন্তু ফুটবলের রাজপুত্র মারাদোনা।

প্রায় একক কৃতিত্বে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন করে মারাদোনা হয়ে উঠলেন ফুটবলপ্রেমী সকল মানুষের নয়নের মণি। আন্তর্জাতিক ফুটবল এবং মারাদোনা যেন সমার্থক হয়ে উঠলেন। এরপর থেকে, বাঙালি ফুটবল দর্শক, মারাদোনাকে ‘পুলিশম্যান মার্কিং’ করে পৌঁছে গেল ইউরোপের বিভিন্ন কুলীন ফুটবল লিগে এবং পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে। বাঙালির ফুটবল-দর্শন প্রকৃত অর্থে আন্তর্জাতিক করে দিয়ে গেলেন ‘৮৬-র মারাদোনা।
এরপর জীবনে একাদিক্রমে ফুটবল বিশ্বকাপ এসেছে, ফুটবল বিশ্বকাপ গেছে। ক্যামেরুনের রজার মিল্লা, ব্রাজিলের চ্যাম্পিয়ন হওয়া, স্পেনের তিকিতাকা, ফুটবলের ঈশ্বর বা জাদুকর লিওনেল ‘মায়েস্ত্রো’ মেসির নয়নাভিরাম স্কিল হর্ষের কারণ হয়েছে। বিশ্বকাপ থেকে মারাদোনার লজ্জাজনক বিদায়, জিদানের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, জার্মানির কাছে ব্রাজিলের বিধ্বস্ত হওয়া বিষাদ বয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু জীবনের সেই প্রথম বিশ্বকাপ প্রথম প্রেমের মতোই এ জীবনে চিরকালীন হয়ে রয়ে গেছে এবং আমৃত্যু চিরকালীন হয়েই থেকে যাবে।
দশ বছরের কোনও শৈশব এ বছরের বিশ্বকাপে আমেরিকা-কানাডা-মেক্সিকোর মাঠে সেই ছিয়াশির জাদু খুঁজে পাবে কি না! ঠিক ভরসা হয় না। আসলে সময়টাই এখন অনেক বদলে গেছে।
জানি না, দশ বছরের কোনও শৈশব এ বছরের বিশ্বকাপে আমেরিকা-কানাডা-মেক্সিকোর মাঠে সেই ছিয়াশির জাদু খুঁজে পাবে কি না! ঠিক ভরসা হয় না। আসলে সময়টাই এখন অনেক বদলে গেছে। পরিণত মনের মানুষ তো দূরের কথা, শৈশবও আজ আর কোনও কিছুতে বিস্ময়চকিত হয় না। তাই ফুটবল আজ যেখানেই পৌঁছাক, তা যদি গ্রহান্তরের স্কিল নিয়েও হাজির হয়, চল্লিশ বছর পরে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছনো আজকের কিশোরকে আর নস্টালজিক করবে না বলেই মনে হয়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত