(Jolke Chol 24)
কৌশিকী এবার শুম্ভ ও নিশুম্ভ বধের জন্য যুদ্ধ করতে গেলে রক্তবীজ দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে শুরু করল। দেবী খড়্গ দিয়ে রক্তবীজের মুণ্ডছেদন করলেও তার রক্ত ভূমিতলে পড়া মাত্র সেই রক্ত থেকে সহস্র রক্তবীজের সৃষ্টি হতে লাগল। মহাসুরকে দমন করা দুঃসাধ্য বুঝে কৌশিকী, প্রলয়কারী দেবী কালিকাকে আহ্বান করলেন। কালিকা আসা মাত্র তিনি আদেশ করলেন, কালী তোমার জিহ্বা বিস্তার করো, আমি রক্তবীজের দেহ বিদারণ করা মাত্র তুমি মহাসুরের রক্ত পান করে নাও। তাহলে রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়বে না। আর নতুন রক্তবীজ সৃষ্টি হইবে না। এইভাবে সকল রক্তবীজের বিনাশ হল। এখন উকুন হল সেই রক্তবীজের বংশ। নোংরা চুল থাকলে সেখানেই তারা বেড়ে ওঠে।
আরও পড়ুন: জলকে চল: পর্ব – (১) (২) (৩) (৪) (৫) (৬) (৭) (৮) (৯) (১০) (১১), (১২) (১৩), (১৪) ,(১৫), (১৬), (১৭), (১৮), (১৯), (২০), (২১), (২২), (২৩)
– মা, তুমি সেই একই কথা বলে যাবে, সেই ছাত্রটার মতো?
– কোন ছাত্রের মতো?
– ওই যে গরুর রচনা পড়ে গেছিল আর এসেছিল নদীর রচনা। সে লিখেছিল আমাদের গ্রামে নদী আছে, নদীতে জল আছে। নদীর ধারে আমরা ঘুরতে যাই, আর ওখানে গরু চড়ে বেড়ায়। তারপর গরুর সম্পর্কে যা জানে সব লিখে দিল।
– তোকে এ গল্প কে শোনালো?
– দিদুন।

মোহনা হেসে উঠল। তোর দিদুন টিচার হিসেবে সাংঘাতিক কড়া ছিল। কিন্তু পড়া না করলে কখনও বকত না। বলত, আমি একদম পড়াতে পারি না। ভাবছি আর কাল থেকে তোমাদের ক্লাস নেব না। বড়দিকে বলব অন্য কোনও টিচারকে এই ক্লাসে দিতে। যেই সেন্টু দিত আমরা সবাই পড়ে যেতে শুরু করতাম। আসলে ছাত্রীরা দিদুনকে খুব ভালোবাসত। যত ফেল করা মেয়েরা দিদুনের প্রিয় ছাত্রী, তাদের পাশ করাবার ব্রত নিয়েছিল মা।
– দিদুন খুব ভাল। তোমার মতো কথায় কথায় চেঁচায় না। রাই বলল।
– যা দিদুনের কাছে, চুল না বেঁধে কেমন ছাড় পাস দেখি।
– দিদুন বলেছে ছোটবেলায় তোমার মাথায় জবা, আমলা, কেশুট্টে পাতা আর কী সব বেটে লাগিয়ে দিত। তোমার প্রচুর বড় চুল ছিল।
মোহনা রাইয়ের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ভাবছিল, কাদের ছোটবেলাটা ইন্টারেস্টিং? তার না রাইয়ের? না কি তার মায়ের? সে যদি রাইয়ের মতো জীবন পেত, খুশি হত কি?
– হ্যাঁ। তা দিত। শ্যাম্পু লাগাতে দিত না। রিঠা গরম জলে ফুটিয়ে তার মাড় বের করে চুলে ঘষে দিত। চোখ জ্বলে যেত, অবশ্য চুলে দারুণ জৌলুশ হত, মনে হত চুল পুরো মাখন।
– হ্যাঁ, শুনেছি। রিঠা কি এখনও পাওয়া যায়?
– তা জানি না। তবে যায় নিশ্চয়ই। তুই লাগাবি? তাহলে খোঁজ করব।
– পাগল নাকি?
– আচ্ছা বেশ, চিরুনিটা দে, চুলটা আঁচড়ে দিই।
– উফ, তুমি বরং মোবাইলে যা করছিলে করো। আমি পড়তে বসি।
মোহনা রাইয়ের গালে একটা চুমু দিয়ে বলল- পড়ে নে।
– হুম, বলে রাই পড়ার ঘরের দিকে গেল।
মোহনা রাইয়ের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ভাবছিল, কাদের ছোটবেলাটা ইন্টারেস্টিং? তার না রাইয়ের? না কি তার মায়ের? সে যদি রাইয়ের মতো জীবন পেত, খুশি হত কি? প্রতিটি বাচ্চার কৈশোর, বেড়ে ওঠার ধরন আলাদা, তবু এক জায়গায় এখনও মিল। মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক। এখানে সব বাচ্চা এক স্রোতে ভাসে। বাকিটা যে যার মতো অভিমুখ খুঁজে নেয়।
হৈ হৈ করে ক্লাবের সামনে থেকে দু’জন করে পাঁচটা ভ্যান নিয়ে বেরোল। শিপ্রা এক নজরে দেখে নিল সকলের মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস আছে কি না! নাহ! ছেলেগুলো খুব দায়িত্ব নিয়েই এসব সামলাচ্ছে।
– মাসিমা, সব কমপ্লিট। এবার খালি ভ্যানে তুলব আর দিয়ে আসব।
– মনে রাখিস নতুন একটা পরিবার যোগ হয়েছে। মিত্তিরদের পাশের ফ্ল্যাটে। সেকেন্ড ফ্লোর।
– এরা নতুন এসেছে মনে হচ্ছে।
– হ্যাঁ। এসেই বিপদে পড়ে গেল।
– সে আর কী করা যাবে! হাম হ্যায় না!
হেসে ফেলল শিপ্রা বাপ্পার কথা শুনে। সেও একই রকম হেসে উত্তর দিল
– বিলকুল বেটা, হাম হ্যয় না!

বাপ্পা চিৎকার করে ডাকল- ওই কতদূর এগোলি তোরা?
ওদিক থেকে সাড়া এল- রেডি বাপ্পা দা। তোলা হয়ে গেছে। মাসিমাকে বলে দাও বেরোচ্ছি আমরা।
– শুন লিয়া মাসিমা? হাম যা রাহা হু।
– হয়েছে হয়েছে, খুব হিন্দি বলা হয়েছে। এবার আয়। বেলা বয়ে গেল যে।
হৈ হৈ করে ক্লাবের সামনে থেকে দু’জন করে পাঁচটা ভ্যান নিয়ে বেরোল। শিপ্রা এক নজরে দেখে নিল সকলের মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস আছে কি না! নাহ! ছেলেগুলো খুব দায়িত্ব নিয়েই এসব সামলাচ্ছে। কে বলে এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়ে আত্মকেন্দ্রিক? এরা সব পারে। হেসে সে তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল।
দিনরাত সেখানে একদল ছেলে তাস পেটায়, আর হেন কোনও পুজো নেই যা করে না, শিব রাত্রি, গণেশ থেকে শনি পুজো সবই হচ্ছে, আর বাড়তি পাওনা সারাদিন মাইকে তীব্র আওয়াজ করে গান। প্রতিবাদ করার উপায় নেই।
কমিউনিটি কিচেনের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শিপ্রার সকাল কাটে এদের সঙ্গেই। বাড়ির কাজ মণি সামলায় বলে সে খানিকটা নিশ্চিন্ত। প্রথম যেদিন তার মনে হল এই কাজটা শুরু করবে, সেদিন একটা সংশয় ছিল। কোথায় বসে কাজটা হবে, কারা ডেলিভারি দেবে, কোন কোন পরিবারের তাদের সাহায্য দরকার, সবটা নিয়েই ভাবনা ছিল। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করা যায়, সেটা বুঝতে পারছিল না।
বারান্দা দিয়ে ক্লাবটা দেখা যায়। দিনরাত সেখানে একদল ছেলে তাস পেটায়, আর হেন কোনও পুজো নেই যা করে না, শিব রাত্রি, গণেশ থেকে শনি পুজো সবই হচ্ছে, আর বাড়তি পাওনা সারাদিন মাইকে তীব্র আওয়াজ করে গান। প্রতিবাদ করার উপায় নেই।
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ভাল যোগাযোগ এদের। তবে এই ছেলেগুলোই আবার ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প করে, রাতবিরেতে কেউ অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটে, এ দৃশ্যও দেখা শিপ্রার। মোহনা বিদেশে থাকার সময় ঋতমের যখন রাত একটার সময় বুকে ব্যথা শুরু হল, সে প্রথমেই বাপ্পাকে ফোন করেছিল। বলতে নেই ঠাকুরের কৃপায় সে যাত্রায় ঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারায় ঋতম রক্ষা পেয়েছিল। ক্লাবের ছেলেগুলো না থাকলে সেটা সম্ভব হত না। এমনকি যে ক’দিন ঋতম হাসপাতালে ভর্তি ছিল, তারাই সামলেছে।
বাপ্পা রায়পাড়া অ্যাথেলেটিক ক্লাবের সেক্রেটারি। পাড়ার কাউন্সিলার হলেন প্রেসিডেন্ট। তাঁকে কালেভদ্রে পাড়ায় দেখা গেলেও বাপ্পার সঙ্গে শিপ্রার ভালই দেখাসাক্ষাৎ-গল্প হয়। পেশায় প্রমোটার সে। আশেপাশের প্রায় সব বাড়ি ভেঙে এখন নতুন ফ্ল্যাট। আর সেগুলোর একছত্র কারবারি বাপ্পা। দিনরাত বাইক হাঁকিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দেখা হলে বাইক থামিয়ে হেসে বলে– কী মাসিমা সব ঠিক আছে তো?
সেও দাঁড়িয়ে উত্তর দিয়ে বলে, আমরা ঠিক আছি। তোরা সব ভাল তো!
– বিন্দাস। কোনও কাজে এলে জানাবে, বলে বাপ্পা বাইকে স্টার্ট দেয়।
এই ক্লাবের অনেক ছেলেই তার চোখের সামনে বড় হল। দীর্ঘদিন এখানেই স্কুলে পড়ানোয় তাকে সবাই মোটামুটি শ্রদ্ধা ভক্তি করে। অন্তত সে তাই মনে করে।
বছরের অন্য দিনগুলোতে সন্ধের পর থেকে ক্লাবে ভিড় থাকলেও এখন ততটা নেই। শম্ভু, বিট্টু, আর দু-একটা ছেলে নিজের মতো ক্যারাম খেলছিল। তাকে অসময়ে ক্লাব ঘরে দেখে ওরা বিস্মিত হয়েছিল।
কমিউনিটি কিচেনের ভাবনাটা মাথায় আসার পর ক্লাবের দিকে তাকিয়ে প্রথমেই বাপ্পার নামটা মনে এসেছিল। যদিও একটা দ্বিধা ছিল তার, অন্য সব কাজের মতো তো নয়, এমনকি সময়টাও আলাদা। এইসময় এরকম একটা কাজে তাদের পরিবার আদৌ সমর্থন করবে না। তবু…
বছরের অন্য দিনগুলোতে সন্ধের পর থেকে ক্লাবে ভিড় থাকলেও এখন ততটা নেই। শম্ভু, বিট্টু, আর দু-একটা ছেলে নিজের মতো ক্যারাম খেলছিল। তাকে অসময়ে ক্লাব ঘরে দেখে ওরা বিস্মিত হয়েছিল।
– কী হল মাসিমা? মেসোমশাই ঠিক আছেন তো?
– হ্যাঁ বাবা। তিনি ঠিক আছেন। আমি একটা অন্য দরকারে এসেছিলাম। বাপ্পা আসেনি?
– বাপ্পাদা তো এখন আসে না। কিছু দরকার হলে তখন আসে।
– ও আচ্ছা, আমি তাহলে ফোন করে নেব। বলে বেরিয়ে আসছিল সে।
– আরে মাসিমা, আপনি কেন ভাবছেন? দাঁড়ান, আমি ফোন করছি, এক কাজ করুন, আপনি বাড়ি যান, আমি বাপ্পাদাকে বাড়ি যেতে বলে দিচ্ছি।
– না, আসলে আমার তোমাদের সকলের সঙ্গেই কথা ছিল। বাপ্পা থাকলে সুবিধা হত।
আজ সকালে দেখলাম অরুণোদয় ফ্ল্যাটের থার্ড ফ্লোরের বউমাটাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল স্বাস্থ্যভবনের গাড়ি এসে। বাচ্চাটা তাকিয়ে ছিল বারান্দা দিয়ে। ভদ্রলোক বাইরে থাকেন।
বিট্টু ততক্ষণে মোবাইলে বাপ্পাকে ধরে তার আসার খবর দিয়ে দিয়েছে। সে একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল,
– বসুন। বাপ্পাদা আসছে। মিনিট তিনেকের মধ্যেই বাপ্পা হাজির হয়েছিল।
– কী হল মাসিমা? জরুরি তলব? কোনও সমস্যা?
– আসলে সমস্যাটা সত্যি গুরুতর।
– কেন, মেসোমশাইয়ের কিছু হয়েছে?

– না না। বাড়ির সমস্যা নয়। এটা এই পাড়ার সমস্যা।
– তুমি কি চিরকাল ক্লাস নেবার মতো করেই বলবে নাকি খোলসা করবে?
– আজ সকালে দেখলাম অরুণোদয় ফ্ল্যাটের থার্ড ফ্লোরের বউমাটাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল স্বাস্থ্যভবনের গাড়ি এসে। বাচ্চাটা তাকিয়ে ছিল বারান্দা দিয়ে। ভদ্রলোক বাইরে থাকেন।
– ও, ঘোষদা!
– হবে হয়তো। অত জানি না। আমার মনে হল বাচ্চাটা কী খাবে? মা তো হাসপাতালে। আর কোনও কাজের লোক এই অবস্থায় আসবে না। তখনই ভাবছিলাম, এই পাড়ার অনেকেই এখন হয়তো অসুস্থ, কিংবা হতে পারেন। তাদের পক্ষে রান্না করে খাওয়া এখন সম্ভব নয়। আমরা যদি এই সময় তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি, তবে খুব ভাল হবে।
রান্না আমি করব, বাসন, গ্যাসও না হয় আমিই আনব, কিংবা আমি বাড়িতেও করে দিতে পারি, কিন্তু পৌঁছে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা চাই। সেটার জন্য তোদের দরকার।
– তুমি এই বয়সে তাদের বাড়ি গিয়ে রান্না করে দিয়ে আসতে চাইছ? শম্ভু অবাক চোখে জানতে চাইল।
– না, তা চাইছি না। কিন্তু ভাবছি যদি এমন করা যেত, এমন বাড়িগুলো চিহ্নিত করে তাদের জন্য খাবার বানিয়ে পৌঁছে দেওয়া যায়। শিপ্রা বলল।
– সেটা কী করে হবে? এখন কে রান্না করবে? আর কেনই বা করবে?
– কে করবে, সেটা পরে ভাবা যাবে। কিন্তু কেন-র উত্তর বলছি। তোরা যে এত পুজো করিস ঘটা করে, তখন লোকজনকে খিচুড়ি খাওয়াস। সেটা কী কেন খাওয়াবি ভাবিস? মানছি সরকার ক্লাবের উন্নয়নে টাকা দিয়েছে। তোরা সেখান থেকে এগুলো করছিস। কিন্তু ক্লাব মানে তো শুধু কতগুলো চেয়ার টেবিল ক্যারামবোর্ড নয়, তার সঙ্গে তোরাও যুক্ত। তোরা যদি এখন মানুষের এই দুঃসময়ে পাশে থাকিস, দেখবি যাদের পুজো করছিস, তারাও তোদের দেখবেন।
তুমি কী করতে বলছ?
– আমি বলছি, যদি একটা কমিউনিটি কিচেন চালু করা যায় এই ক্লাবে, তাহলে খুব ভাল হয়।
– সে তো প্রচুর ঝামেলার মাসিমা। টাকা পয়সার কথা যদি না-ও ভাবি, রান্না, বাসন, গ্যাস, বাড়ি বাড়ি সেগুলো পৌঁছে দেওয়া এসব কে করবে, এ তো জেনেশুনে বিপদে পড়া।
– রান্না আমি করব, বাসন, গ্যাসও না হয় আমিই আনব, কিংবা আমি বাড়িতেও করে দিতে পারি, কিন্তু পৌঁছে দেওয়ার একটা ব্যবস্থা চাই। সেটার জন্য তোদের দরকার।
শম্ভু শুনছিল এতক্ষণ। সে বলে উঠল, সে নয় আমি পৌঁছে দেব। কিন্তু জানবে কী করে কাদের দরকার?
– এটা ঠিক। তাহলে কী করা যায়?
বিট্টু ক্যারাম খেলতে খেলতে বলল- এটা কোনও সমস্যাই না। পুলিশের লোকগুলো যেমন চোঙা নিয়ে নানা নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে, তেমনি আমরাও বলব, তবে কেষ্টদাকে না জানালে…।
শিপ্রা বলল, তোর এই হিন্দি মেশানো কথা বলাটা ছাড় বাপ্পা। আর শোন, ছেলেপুলে বড় হলে মায়েরা তাদের ওপরেই দায়িত্ব দেয়, কিন্তু তোরা যখন পারবি না, তখন বিকল্প ভাবতেই হবে।
– আরে চাপের কেন হবে? তোরা বলবি কেষ্টকে এসে প্রথম দিন উদ্বোধন করে দিয়ে যেতে। অনুপ্রেরণায় যোগ করে দিলেই সব সমস্যা মিটে যাবে। তোরা কেষ্টর সঙ্গে কথা বলে ভেবে আমাকে জানা। যতদিন না তোরা রাজি হচ্ছিস আমি শুরু করি। তোদের মেসোমশাইকে না হয় বলব পৌঁছে দিতে। কিন্তু কাদের লাগবে সেটা কীভাবে জানব, এটা ভাবতে হবে।
– তোমার কি দিমাগ খারাপ হয়েছে? মেসোমশাই এমনিতেই অসুস্থ, এখন এই গণ্ডগোলের সময় তাকে বাইরে পাঠাবে?
শিপ্রা বলল, তোর এই হিন্দি মেশানো কথা বলাটা ছাড় বাপ্পা। আর শোন, ছেলেপুলে বড় হলে মায়েরা তাদের ওপরেই দায়িত্ব দেয়, কিন্তু তোরা যখন পারবি না, তখন বিকল্প ভাবতেই হবে।

– তুমি করবেই? বাপ্পা জিজ্ঞেস করল।
– হ্যাঁ। ভেবে যখন নিয়েছি করবই।
তাহলে কাল বাদ দিয়ে মঙ্গলবার থেকে শুরু হোক। ওদিন হনুমানজির বার। এই ক্লাবেই হোক। কাল সব ব্যবস্থা করে নিচ্ছি, আর কেষ্টদাকেও বলে দিচ্ছি।
সত্যি বজরঙ্গবলির বারে শুরু হল কমিউনিটি কিচেন। প্রথমদিকে পাড়ার লোক অনেকেই জানাতে চায়নি তাদের পরিবারে আক্রান্তের কথা, ভেবেছিল জানলে তাদের একঘরে করে দেবে বাকিরা, ক্রমশ ছেলেগুলোর চেষ্টায় আর লাগাতার প্রচারে একজন দুজন করে খাবার চেয়ে ফোন করতে লাগল। প্রথম ঢেউয়ে সংখ্যাটা প্রতিদিন পঞ্চাশ ছাড়াচ্ছিল, কিন্তু সেকেন্ড ফেজে সেটাই গিয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় দেড়শোয়। আগে তারা খাবারের জন্য টাকা নিত না, পরে নাম মাত্র মূল্য হলেও নিতে শুরু করেছিল।
শিপ্রা বলে- চলে যাওয়ার হলে সেদিনই যেত। তুই তখন কোথায়? এখন বরং ভাল আছে। এত চিন্তা আমাদের জন্য না করে নিজের খেয়াল রাখ।
শিপ্রাই বলেছিল- এই টাকাটা নিলে আর একটু ভাল খাবার দেওয়া যাবে। একটার বদলে দুটো ডিম, বড় মাছের পেটি, চিকেন, পনির, সবজি… প্রোটিন খাবার দরকার। তাছাড়াও যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের পান-বিড়ির পয়সাটা উঠে যাবে এই থেকে।
শিপ্রা এখন আর নিজে রান্না করে না। ক্লাবের ছেলেরাই সব করে। সে খালি বসে তদারকি করে।
মোহনা অবশ্য জানার পর রেগে গিয়েছিল।
– তোমার সবটাতেই বাড়াবাড়ি। একটা কিছু হয়ে গেলে কে সামলাবে?
শিপ্রা বলেছিল- যেই মুহূর্তে জন্মেছি, সঙ্গে সঙ্গে আমার ললাটলিখন হয়ে গেছে। যা ঘটার তাই ঘটবে। কিন্তু তা বলে প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়াব না, এমন ভাবনা মনে আনাও পাপ। তাছাড়া আমি তো রোজই ফেসবুকে দেখি তুই নিজেও আজ এই ক্যাম্প, কাল সেই টিকাকরণ, পরশু দরিদ্র নারায়ণ সেবা করে বেড়াচ্ছিস। তখন তোর ভয় লাগে না? আমার তো এসব দেখে তোর জন্য চিন্তা হয়। তুই পাত্তাই দিস না।
– আমার বয়স আর তোমার বয়স এক মা? তাছাড়া বাবার হার্টের অসুখ। কিছু হলে বাঁচানো যাবে?
শিপ্রা বলে- চলে যাওয়ার হলে সেদিনই যেত। তুই তখন কোথায়? এখন বরং ভাল আছে। এত চিন্তা আমাদের জন্য না করে নিজের খেয়াল রাখ।
মোহনা জানে মা একবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে তার থেকে তাকে সরানো যাবে না। অবশ্য এতে একটা প্রচ্ছন্ন অহংকারও লুকিয়ে। এই মানুষটা সবার থেকে আলাদা, তার মা।
এই ছেলেগুলোর থেকে সে নিয়মিত শিক্ষা অর্জন করছিল। নতুন করে আবিষ্কার করছিল, প্রত্যেকের মধ্যেই সেই সর্বশক্তিমান শক্তি আছে। প্রয়োজন শুধু আগুনটাকে ঠিক মতো জ্বালানোর ব্যবস্থা করার।
সে বলে- যা ভাল বোঝো করো। তবে সাবধানে সব সতর্কতা নিয়ে।
শিপ্রা মুখে মাস্ক, চুলে শাওয়ার ক্যাপ লাগিয়ে পাশে স্যানিটাইজারের বোতল রেখে ছবি তুলিয়ে পাঠিয়ে দিত মেয়েকে। একই সঙ্গে রান্নার জায়গা, খাবার ভরা ফয়েল ও টিফিন বক্স, ভ্যানের সঙ্গে যাওয়া ছেলেদের হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্কসমেত ছবিও পাঠিয়ে দিতে ভোলে না।

এই ছেলেগুলোর থেকে সে নিয়মিত শিক্ষা অর্জন করছিল। নতুন করে আবিষ্কার করছিল, প্রত্যেকের মধ্যেই সেই সর্বশক্তিমান শক্তি আছে। প্রয়োজন শুধু আগুনটাকে ঠিক মতো জ্বালানোর ব্যবস্থা করার। এরা কেউ পড়াশোনা জেনে পণ্ডিত হয়নি। কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনের শিক্ষা যা এরা প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই থেকে অর্জন করেছে, তা অত্যন্ত মূল্যবান। হয়তো ধরে বেঁধে শিক্ষা দিলে প্রথাগত পড়াশোনা শিখত, মানুষ হত কি? এই একটা ভয়ংকর পৃথিবীতে মানুষের নানা রূপ তার চোখে পড়ল। চেনা মানুষের বদলে যাওয়া মুখ দেখে যত না অবাক হল, তার থেকে অনেক বেশি আশ্চর্য হল অচেনা মানুষ যাদের সঙ্গে কোনও যোগসূত্র ছিল না, হঠাৎ তারাই কখন এত কাছের হয়ে গেল ভেবে।
– জীবনের প্রতিটি বাঁক নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় ভরা। সে কখনও এক ধারায় বয় না। সবসময় অনিশ্চিত। কাল কী হবে এটাও জানা নেই। শুধু কাল কেন, খানিকক্ষণ বাদেই পৃথিবী নামক এই গ্রহে আদৌ তুমি থাকবে কি না, বা আমি থাকব কি না তারও কোনও গ্যারান্টি নেই, তাই বিন্দাস বাঁচো, যা নিজে ভাল মনে করবে তাই করো- শম্ভুর মুখে এই কথা শুনে চমকে উঠেছিল সে।
শিপ্রা হাসল- ঠাকুর বলতে কেষ্ট হয়তো রামকৃষ্ণর কথা বলেছে। বিবেকানন্দ তো তাঁরই শিষ্য। তাই হয়তো ভেবেছে এটা গুরুরই কথা।
শম্ভু পেশায় ট্যাক্সিচালক। বাবা রেলে হকারি করত। পা স্লিপ করে কাটা পড়েছিল, তাও একযুগ আগে। তখন থেকেই মাকে নিয়ে তার একার লড়াই শুরু। মা রাঁধুনির কাজ করত যে বাড়িতে, সেই বাড়ির দাদু ওকে গাড়ি চালানো শেখার টাকা দিয়েছিল। প্রথমে ম্যাটাডোর চালাত। তার পর সরকারের দেওয়া প্রকল্পের টাকায় লোন নিয়ে এই ট্যাক্সি।
শম্ভু বলে, মাসিমা আমি ঈশ্বর দেখিনি। সে আছে কি না জানি না। তবে ওই দাদু আমার কাছে ভগবান। তুমি বলতে পারো যে টাকা দিয়েছে বলে আমি এ কথা বলছি। আমি অনেক ভেবে দেখেছি, তিনি টাকা না দিলেও বন্ধুদের থেকে গাড়ি চালানো শিখে নিতে পারতাম। আমাদের পাড়ায় প্রায় সবাই ট্যাক্সি চালায়। গাড়ি চালানো আমি বন্ধুদের থেকেই শিখেছি। কিন্তু আমি খারাপ কাজে টাকাটা লাগাব না, এই ভরসাটা করেছিলেন বলেই তিনি আমার চোখে ভগবান।
– মানুষের মধ্যেই ভগবান। ঘটা করে যে বিবেকানন্দের জন্মদিন করিস ক্লাবে, তিনিও তো তাই বলেছিলেন। জীবে প্রেম করে যেই জন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।
– এটা বিবেকানন্দ বলেছিলেন?

– হ্যাঁ।
– আরে বাস্ তাহলে ওদিন অনুষ্ঠানে এসে কেষ্টদা যে বলল এটা ঠাকুর বলেছিল, সেটা ভুল?
শিপ্রা হাসল- ঠাকুর বলতে কেষ্ট হয়তো রামকৃষ্ণর কথা বলেছে। বিবেকানন্দ তো তাঁরই শিষ্য। তাই হয়তো ভেবেছে এটা গুরুরই কথা।
– মাসিমা একটা কথা বলব? এই কেষ্টদা লোকটা কিস্যু জানে না। আগে বাসে খালাসি ছিল। তারপর রাজনীতিতে এল। প্রথমে ইউনিয়নের সেক্রেটারি, তারপর কাউন্সিলর। আগে বস্তিতে থাকত। বাপ দিনরাত মদ খেত, বউ পেটাত, মা বাসন মেজে সংসার চালাত। আর এখন বিশাল বাড়ি, গাড়ি। মনে হয় কত শিক্ষিত। আসলে পেটে বোমা বেঁধে দিলেও একটা ঠিক লাইন বলতে পারবে না। মুখ্যু মানুষ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের দিন বলল, তিনি নাকি ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগান লিখেছিলেন। ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন।
আমি অত মূর্খ নই। বাবা ট্রেনে বই বিক্রি করত। আমি সেগুলো পড়তাম। বাবাই পড়াত। এটা বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা। আমি বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়িও গেছি।
– তুই জানিস বন্দেমাতরম কার লেখা?
– জানি। আমি অত মূর্খ নই। বাবা ট্রেনে বই বিক্রি করত। আমি সেগুলো পড়তাম। বাবাই পড়াত। এটা বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা। আমি বঙ্কিমচন্দ্রের বাড়িও গেছি। বাবা বলত- ওঁর ভিটে দর্শন মানে জন্ম সার্থক, যদিও আমার ভাল লাগেনি। কিন্তু ওই দেখে এলাম।
শিপ্রা অবাক হয় শম্ভুর কথা শোনে। যত মেশে এদের সঙ্গে, ততই অবাক হয়। এদের সঙ্গে থেকে সে যেন এক অন্য পৃথিবী দর্শন করছে, যেখানে সব ছাপিয়েও আজও মনুষ্যত্বটাই বড়। বাকি সব পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা।
সেই যে শুরু করেছিল, এখন সেই কমিউনিটি কিচেনটাই গরিব মানুষের জন্য খুলে রাখা হয়েছে। মাথায় দাঁড়িয়ে তারা এখন খাবারটা বিলি করে। যারা কোভিডের সময় সাহায্য পেয়েছিলেন, তারাও অর্থ দিয়ে সাহায্য করে এটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এটাই তো চেয়েছিল শিপ্রা। একটা পাড়া যেন এক পরিবার। এরকম অজস্র কমিউন থাকলে পৃথিবীতে অভুক্ত মানুষের সংখ্যা কমে যাবে ধীরে ধীরে। অবশ্য এখন আর দুবার রান্না করে না। শুধু সকালটাই। যারা রাতেও খেতে চায়, তারা নিয়ে যায় নিজেদের কৌটোয়।
– মাসিমা দু-রাউন্ড হয়ে গেল। ভ্যান নিয়ে ফিরে এসেছে বিট্টুরা। তার ডাকে পুরনো দিনের থেকে বর্তমানে ফিরে এল শিপ্রা। সে বলল- যা খানিকক্ষণ হাওয়ায় বোস।
– আজ হেভভি ঘুমসানি গরম। মনে হচ্ছে প্রচুর বৃষ্টি নামবে।
শিপ্রা হাসল। নচিকেতার গানটা শুনিস। চোর নিয়ে। আমি এখন চললাম। বলে উঠে দাঁড়িয়ে রাস্তায় নেমে বলল- কাল সাতটায় আসব।
– গরম পড়ে গেছে। এই গরমেই কাঁঠাল পাকে।
– তোমার বাড়ির গাছ থেকে গতবার চুরি করেছিলাম। এবার তুমি দিও।
– এবারও চুরিই করিস। ফল চুরি করার মধ্যে একটা মজা আছে।
– আরে বাস্। তুমি টিচার হয়ে একথা বলছ?
শিপ্রা হাসল। নচিকেতার গানটা শুনিস। চোর নিয়ে। আমি এখন চললাম। বলে উঠে দাঁড়িয়ে রাস্তায় নেমে বলল- কাল সাতটায় আসব।
ক্লাব থেকে রাস্তায় নামার মুখে সে শুনতে পেল, বিট্টু বেসুরো গলায় গাইছে- প্রতিদিন চুরি যায় মূল্যবোধের সোনা, আমাদের স্বপ্ন আমাদের চেতনা, কিছুটা মূল্য পেয়ে ভাবি বুঝি শোধ-বোধ, ন্যায় নীতি ত্যাগ করে মানুষ আপোস করে, চুরি গেছে আমাদের সব প্রতিরোধ…।
(ক্রমশ)
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত