Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

ফার্স্ট ফ্লাইট – পর্ব ১

First Flight 1
Bookmark (0)
Please login to bookmark Close
(First Flight 1)

সেই সময় দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ডোমেস্টিক উড়ান বলতে ছিল একমাত্র ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স, কিন্তু বিদেশ পাড়ি দেবার জন্য এয়ার ইন্ডিয়া ছাড়াও ছিল অন্যান্য অনেক। যেমন জাপান এয়ারলাইন্স, এয়ার ফ্রান্স, কে এল এম, সুইস এয়ার, লুপ্তহান্সা, প্যান এম ইত্যাদি। চৌরঙ্গীর এক্সাইড মোড়ে এখন যেখানে হলদিরামের খাবারের দোকান, সেখানে ছিল লুপ্তহান্সার অফিস। 

আমার ছেলেবেলায় দৈনিক খবরের কাগজে এবং বিভিন্ন পত্রিকার পাতায় জাপান এয়ারলাইন্সের বিজ্ঞাপনে রীনাদির (অপর্ণা সেন) সুন্দর মিষ্টি হাসির মুখচ্ছবি ছাপা হতে দেখেছি। কিছু বড় বিজনেস ম্যাগনেটদের নিজস্ব অল্পসংখ্যক বিমান ছিল বটে, কিন্তু বেসরকারি বিমান যেভাবে আজকের ভারতের আকাশে একচেটিয়া দখল নিয়েছে, তখনকার দেশের মানুষ এমনটা হবে বলে দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি।


আরও পড়ুন: সীতারাম


নব্বই-এর শুরুর দিকে কোনও এক দুপুরে, লখনউ থেকে ট্রাঙ্ককলে ডঃ যতীন দে আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। গোটা উত্তরপ্রদেশ জুড়ে তখন ডঃ দে’র এলাহি সামাজিক কর্মকাণ্ড চলছে, আমাকে রাজ্য ঘুরে সেই সব কর্মকাণ্ডের ছবি তুলে দিতে হবে। তখন আমার নিজস্ব দুটো আশাই পেন্টেক্স ‘কে থাউজেন’ ক্যামেরা। তার একটাতে সব সময়ের জন্য লোড করা থাকত কোডাক টীমাক্স-ফোর হান্ড্রেড ‘এ এস এ’ (আধুনিক ISO), সঙ্গে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স। অন্যটায় ‘কোডাক কালার হান্ড্রেড ‘এ এস এ’ সঙ্গে এইট্টি ফাইভ লেন্স। 

ভেবে দেখলাম, লখনউ-এর কাজের জন্য আমার আরও একটা ক্যামেরার প্রয়োজন। সিআইটি রোডের আনন্দ পালিত-এ আমার এক বন্ধুর থেকে তাঁর শর্ট জুম চব্বিশ সত্তর লেন্স সহ ‘নিকন-এফ এম টু’ ক্যামেরা, সঙ্গে ম্যানফোটোর ট্রাইপডটা কয়েকদিনের জন্য ধার নিলাম। সেই নিকনে লোড করে নিলাম ‘কোডাক ক্রোম ৫০ এএসএ’ ফিল্ম। প্রোজেকশনে দেখা বা অফসেট প্রিন্ট করার ক্ষেত্রে ‘ক্রোম স্লাইড’ ছিল অত্যাবশ্যক। 

First Flight 1
ভেবে দেখলাম, লখনউ-এর কাজের জন্য আমার আরও একটা ক্যামেরার প্রয়োজ

ক্যামেরার ব্যাগে পর্যাপ্ত সংখ্যায় নানা স্পিডের ফিল্ম, প্রয়োজনীয় লেন্স আর চেঞ্জিং ব্যাগ গুছিয়ে নিতে গিয়ে মনে হল, আমি ছবি তুলতে কোনওদিনই ‘ফ্লাশ লাইট’ ব্যাবহার পছন্দ করি না, তবুও বিদেশ বিভূঁইয়ের কথা ভেবে হাতের পাঁচ, চার ব্যাটারির একটা ভিভিটার ‘ফ্লাশগান’ও ব্যাগে রাখলাম। 

আমার বিমান যাত্রার খবর আমার বাবার কানে পৌঁছুতেই তিনি হঠাৎই বেশ উত্তেজিত, তাঁর জীবনে কোনও দিনও প্লেনে চাপার সুযোগ হয়নি, অনেকের মতো তিনিও মাটিতে দাঁড়িয়ে মাথা তুলে বস্তুটাকে উড়ে যেতে দেখেছেন মাত্র। কিন্তু এতদিনে তাঁর বড় ছেলে প্রথম প্লেনে চেপে লখনউ যাবে, সেই চাপা উত্তেজনায় তিনি নতুন করে বই পড়া শুরু করলেন ‘জ্ঞানের আলো’, ‘অজানারে জানো’, ‘ছোটদের বিশ্বকোষ’। একেকটা বইয়ের পাতা উল্টে দেখতেন, আর দিনে রাতে বিমান সম্পর্কিত কিছু অজানা তথ্য বাড়ির সকলকে বিতরণ করতেন। বাবার আচরণ দেখে ঠিক বুঝে উঠতে পারতাম না, আমি প্লেনে চড়তে চলেছি না, প্লেন কিনতে চলেছি। 

টিকিট বলতে মনে পড়ে গেল এখনকার মতো মোবাইল বা এক পাতার প্রিন্ট আউট নয়, সেকালের প্লেনের টিকিট বই হত, যা আকারে রীতিমত ব্যাঙ্কের চেকবইয়ের মতো, বেশ কয়েক পাতার। 

রওনা হওয়ার আগের রাতে কিছুতেই ঘুম আসছে না, দু’চোখ বুজে বালিশে মাথা রেখে মনে করার চেষ্টা করছি, ক্যামেরার কোনও সরঞ্জাম ভুলে ফেলে যাচ্ছি কি না। কোনও মতে রাত কাটিয়ে পরদিন সকাল হতেই বাবা-মার আশীর্বাদ নিয়ে সোনারপুর লোকালে চেপে সোজা শিয়ালদা। এখানে একটা কথা বলে রাখি, আমাদের পরিবার অত্যন্ত ধর্মভীরু, ব্যতিক্রম আমি। কিন্তু যতদিন আমার বাবা মা জীবিত ছিলেন, বাড়ি থেকে বেড়ানোর সময় একমাত্র তাঁদের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিয়ে নিয়মিত বেরিয়েছি।

যাই হোক, প্রসঙ্গে ফিরি, সেই সময় বাস ড্রাইভারদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বাসে একটা আলাদা কেবিন থাকত। যাত্রীদের কেউ ভারী মালপত্র নিয়ে বাসে উঠতে চাইলে কন্ডাকটর কিছু বেশি পয়সা নিয়ে মালসমেত তাকে ড্রাইভার কেবিনে তুলে দিত। ‘বৈঠকখানা বাজার বা কোলে মার্কেট থেকে পাইকারি সব্জিওয়ালা কিংবা জগন্নাথ ঘাটের ফুল ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন দখলে থাকত ড্রাইভার কেবিন। 

First Flight 1
আমার বিমান যাত্রার খবর বাবার কানে পৌঁছুতেই তিনি হঠাৎই বেশ উত্তেজিত

ওই কেবিনে আরও একটা বাড়তি সুবিধা ছিল। সেখানে বসে চলন্ত বাসে নিশ্চিন্তে ধুমপান করা যেত। শিয়ালদা থেকে ফরটি ফাইভ বাস কন্ডাকটরের দয়ায় আমিও আমার ক্যামেরার ব্যাগ ট্রাইপড সমেত কেবিনে বসে এয়ারপোর্টের দিকে পাড়ি দিলাম।

বাস থেকে নেমে সামান্য হাঁটা পথ, কিন্তু ভারী ব্যাগপত্তর থাকায় রিক্সা করে পৌঁছে গেলাম এয়ারপোর্টের গেটে। প্লেনের টিকিট হাতে সেদিনই আমার প্রথম বিমানবন্দরে প্রবেশ। টিকিট বলতে মনে পড়ে গেল এখনকার মতো মোবাইল বা এক পাতার প্রিন্ট আউট নয়, সেকালের প্লেনের টিকিট বই হত, যা আকারে রীতিমত ব্যাঙ্কের চেকবইয়ের মতো, বেশ কয়েক পাতার। 

রেলের প্ল্যাটফর্ম টিকিটের মতো এয়ারপোর্ট পরিদর্শনের জন্য টিকিট ব্যবস্থা ছিল, আমরা দুই বন্ধু সেই টিকিট কেটে দোতলার অলিন্দের এক নিরিবিলি কোন বেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে দেশ বিদেশের নানা ধরনের মানুষের যাতায়াত দেখতাম।

কাউন্টারে টিকিট দেখিয়ে ফ্লাইটে ওঠার আগেই জানিয়ে দিলেম যে, আমি কোনওভাবেই শাকাহারী নই। আবার ইন্টারনাশানাল ফ্লাইটে বিদেশ যাত্রার ক্ষেত্রে খাদ্যাভাসের সঙ্গে এও জানাতে হত, যে আমি ধূমপায়ী। ফ্লাইটের পিছন দিকে, বর্তমানে যে অঞ্চলটা ‘জোন ওয়ান’ বলে এখন পরিচিত, সেখানে হাতলের গায়ে ছাইদানিসহ ধূমপায়ীদের জন্য সিট নির্ধারিত ছিল। আমি নিজে বেশ কয়েকবার আকাশপথে তামাক ফুঁকে বিদেশ যাত্রা করেছি। পরবর্তীতে বিমান যাত্রীদের ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও ককপিটে পাইলটদের ধূমপান করার অনুমতি একটা সময় পর্যন্ত জারি ছিল। আজ সেসব ইতিহাস। 

আমার সঙ্গে কলকাতা এয়ারপোর্টের পরিচয় ছাত্রজীবনে। সহপাঠী রবি (রবীন্দ্রনাথ আদক) আর আমি মাঝে মধ্যেই বাইকে চড়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছে যেতাম। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো তখনকার কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এত সিকিউরিটির কড়াকড়ি ছিল না। রেলের প্ল্যাটফর্ম টিকিটের মতো এয়ারপোর্ট পরিদর্শনের জন্য টিকিট ব্যবস্থা ছিল, আমরা দুই বন্ধু সেই টিকিট কেটে দোতলার অলিন্দের এক নিরিবিলি কোন বেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে দেশ বিদেশের নানা ধরনের মানুষের যাতায়াত দেখতাম। ঠোঙা ভরা বাদাম ভাজা পকেটে নিয়ে ঢুকে, খোলা ভাঙতেই ভিতর থেকে নানান সংখ্যা ও আকারের বাদাম বেড়িয়ে আসত। ভাগ্যক্রমে শেষের বাদামটা আমার ক্ষেত্রে সব সময় পচা বেড়িয়েছে, সেটা বিমানবন্দর বা সিনেমা হল নির্বিশেষে। 

First Flight 1
সেই সময় বাস ড্রাইভারদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি বাসে একটা আলাদা কেবিন থাকত

গ্যালারির এক কোণে জলযন্ত্র থেকে সর্বক্ষণ ঠান্ডা জল পাওয়া যেত। আত্মীয়স্বজনদের বিদায় জানিয়ে, ছোট করে কান্নাকাটি সামলে তারপর ঠান্ডা জলে মুখহাত ধুয়ে মুছে মানুষ বাড়িমুখো হত। বাড়ির বাইরের পানীয় জলের প্রতি তখনও আমাদের অবিশ্বাস বা সন্দেহ কোনওটাই জন্মায়নি। জল কিনে খাওয়ার বিষয়টা তখনও কলকাতাবাসীদের কাছে অকল্পনীয়। বিদেশ থেকে বাড়িতে আত্মীয়রা এলে তাদের জন্য, আমার মা কয়লার উনুনে জল ফুটিয়ে, মাটির কলসিতে জমা রাখতেন। 

রেলে যাতায়াতের পথে স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ালে, বাবা ছুটে গিয়ে আমাদের জন্য প্লাটফর্মের কল থেকে ফ্লাস্ক ভরে জল এনেছেন, আমরা সবাই সেই জল নিশ্চিন্তে পান করেছি। বিকেলে খেলার মাঠে জল পিপাসায় রাস্তার ধারে টেপাকলে বা টাইম কলের নিচে দুহাত পেতে তৃষ্ণা মিটিয়েছি। বর্ষাকালে পেটের ব্যামোর আগাম সতর্কতার জন্য আমাদের বাড়ির খাওয়ার জল ফুটিয়ে, তাতে নিয়ম করে ফটকিরি আর কর্পূর মিশিয়ে পেতলের কলসিতে রাখা হত।

জলের গাড়ির আগমন বার্তায় পাড়াশুদ্ধ সবাই দু’হাতে বালতি ঝুলিয়ে ছুটে গিয়ে লাইনে দাঁড়াত। স্কুলজীবনে দিনের পর দিন সেই লাইনে অন্যদের সাহায্যের আছিলায় নিজেকে ভিজিয়ে নিয়েছি, পাছে বাড়িতে স্নানের জল কিছুটা বেঁচে যায়।

কলকাতা শহরে লোডশেডিংয়ের দরুণ তখন প্রায় প্রতিদিন টাইমকলে জলের সমস্যা লেগে থাকত। জলের অভাব মেটাতে করপোরেশন অথবা কাশী বিশ্বনাথ সংস্থার জলের গাড়ি ছুটে বেড়াত পাড়ার মোড়ে মোড়ে। জলের গাড়ির আগমন বার্তায় পাড়াশুদ্ধ সবাই দু’হাতে বালতি ঝুলিয়ে ছুটে গিয়ে লাইনে দাঁড়াত। স্কুলজীবনে দিনের পর দিন সেই লাইনে অন্যদের সাহায্যের আছিলায় নিজেকে ভিজিয়ে নিয়েছি, পাছে বাড়িতে স্নানের জল কিছুটা বেঁচে যায়। সত্যি বলতে কি, সেই সময়কার দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় নানা বিড়ম্বনার মধ্যেও লুকিয়ে ছিল অনাবিল নির্ভেজাল আনন্দ। 

কলকাতার মাটি খুঁড়ে যখন জলের পাইপ বসানোর কাজ শুরু হল, তখন রাস্তা পারাপারের জন্য মাঝে মাঝে কাঠের তক্তা ফেলে রাখা থাকত। পাতাখোরের উৎপাত তখনও এই শহরে শুরু হয়নি। বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার মতো করে সেই তক্তার ওপর দিয়ে ছিল আমাদের দৈনন্দিন চলাচল। অফিস টাইমে বাস-ট্রামের ভিতরে যত না মানুষ আঁটত, তার প্রায় সমান সংখ্যক মানুষ বাস-ট্রামের বাইরে বাদুড় ঝোলা হয়ে যাতায়াত করেছে। 

First Flight 1
আমার সঙ্গে কলকাতা এয়ারপোর্টের পরিচয় ছাত্রজীবনে

আর একটা মজার বিষয় হল, তখনকার অত্যাধুনিক মহিলারা অনেকেই মাথার চুলের মধ্যে একটা গোলাকার কালো বল লুকিয়ে রেখে তার ওপর দিয়ে উঁচু করে চুল বাঁধতেন। এই ভিড়ের ঠেলায় মাঝে মধ্যে তাঁদের মাথার বল খুলে গড়াগড়ি খেত বাস রাস্তার ধারে। 

আমরা সবাই জানতাম, দিনের যে কোনও সময় হঠাৎ হঠাৎ লোডশেডিং হবে। পাড়ায় সর্বস্তরের মানুষের প্রয়োজনীয় সম্বল ছিল হাতপাখা আর কেরোসিনের লণ্ঠন। পরবর্তী সময়ে আর্থিকভাবে সচ্ছল বহু পরিবার তাদের বাড়িতে ইনভার্টারের স্বাধীন আলো-হাওয়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছিল। আমাদের পাড়াতে বেকার দাদারা নিজ উদ্যোগে সন্ধ্যা থেকে রাত দশটার মধ্যে লোডশেডিং হলে জেনারেটার চালিয়ে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সমস্যার সামাল দিত। বিনিময়ে বাড়ি পিছু আলো-পাখার সংখ্যানুযায়ী তাঁরা পয়সা নিতেন। 

সত্যদার কোচিং-এ যাতায়াতের পথে এই পুতুদির সঙ্গে লোটনদা নিয়মিত দেখা করত। কিন্তু সময়মতো একটা চাকরি জোটাতে না পারায়, নিঃশব্দে বুকে পাথর রেখে সেদিন সে পুতুদির পাতে মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল পরিবেশন করছিল।

বুধবার রাতে ‘চিত্রহার’, বেস্পতিবারে ‘চিত্রমালা’ অথবা ‘ইয়ে জো হ্যায় জিন্দেগি’র সময় লোডশেডিং হলে তখন আলো বন্ধ রেখে টিভির প্লাগ গুঁজে দেওয়া হত জেনারেটারের কানেকশনে। কারেন্ট আসামাত্র গোটা পাড়ায় আবালবৃদ্ধবনিতা সমস্বরে বিস্ময় প্রকাশ করে আওয়াজ তোলাটা ছিল কম্পালসারি। 

প্রতিবেশীর বিপদে আপদে প্রধান ভরসা ছিল পাড়ার চ্যাংড়া ছেলেরাই। পাড়ায় কেউ গত হলে কাঁধে খাট তুলে তারা পালা করে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে শ্মশানে পৌঁছে দিত। আবার তারাই প্রয়োজনে কোমরে গামছা বেঁধে অন্নপ্রাশন, বিয়ে, পৈতে, শ্রাদ্ধ এমনকি পুজোর ভোগ বিলি সামলাত। আমাদের পাড়ায় ভজা গুহ-র মেয়ে পুতুর (নামগুলো কাল্পনিক) বিয়ে। বিয়ের রাতে লাস্ট ব্যাচে পুতু কনের সাজে নতুন বরের পাশে কোলে গ্যাঁটছরা নিয়ে এক থালায় খেতে বসেছে। 

First Flight 1
কলকাতা শহরে লোডশেডিংয়ের দরুণ তখন প্রায় প্রতিদিন টাইমকলে জলের সমস্যা লেগে থাকত

সত্যদার কোচিং-এ যাতায়াতের পথে এই পুতুদির সঙ্গে লোটনদা নিয়মিত দেখা করত। কিন্তু সময়মতো একটা চাকরি জোটাতে না পারায়, নিঃশব্দে বুকে পাথর রেখে সেদিন সে পুতুদির পাতে মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল পরিবেশন করছিল। ঠিক সেই সময় ভজা গুহ নতুন জামাইয়ের সঙ্গে লোটনকে তার ‘নিজের ছেলের মতো’ বলে পরিচয় করিয়ে দিল। 

নতুন বর যখন ডাল দিয়ে ভাত মেখে সোহাগ ভরে পুতুদির মুখে তুলে ধরেছে, তখন সবার অলক্ষ্যে পুতুদির অসহায় চোখ লোটনদার দিকে। মনের মধ্যে ভালবাসার মানুষটাকে লুকিয়ে রেখে বাস্তবে অজানা একজনকে জীবনসঙ্গী করে নেওয়া যে কত কঠিন! সেদিন নুন-জল পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা এক সামান্য কিশোরের মনে আজও পুতুদির সেই অসহায় দৃষ্টি ধরা রয়েছে। 

বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় হঠাৎই পিছন থেকে কাঁধের ওপর হালকা ছোঁয়া, ঘুরে দেখি ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ। তিনিও ডঃ যতীন দে-র আমন্ত্রণে লখনউয়ের পথে। সেম ডেসটিনেশন।

কিছুদিন পরে লোটনদা বেসরকারি বাস কর্মচারী আর রিক্সা ইউনিয়নের নেতা হয়ে পার্টির সহকর্মীর সঙ্গে নিজের সংসার পাতে। জামাইষষ্ঠীর দিন ছেলে কোলে করে পুতুদি বরের স্কুটার চেপে পাড়ায় এন্ট্রি নিলেই লোটনদা সব কাজ ভুলে বিড়ি মুখে বাস গুমটির আড়াল থেকে অসহায় দৃষ্টিতে পুতুদিকে দেখত।

যাই হোক, ফের প্রসঙ্গে ফিরি। বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় হঠাৎই পিছন থেকে কাঁধের ওপর হালকা ছোঁয়া, ঘুরে দেখি ফাদার গাস্তঁ রোবের্জ। তিনিও ডঃ যতীন দে-র আমন্ত্রণে লখনউয়ের পথে। সেম ডেসটিনেশন। মনে বেশ বল পেলাম, হাজার হোক মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে, প্লেনে চড়ার নিয়মকানুন সবটাই অজানা, সেক্ষেত্রে ফাদারের সহযাত্রী হয়ে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান বলে মনে হল। 

First Flight 1
প্লেনে চড়ার নিয়মকানুন সবটাই অজানা, সেক্ষেত্রে ফাদারের সহযাত্রী হয়ে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান বলে মনে হল

সিনেমা সংক্রান্ত বিষয়ে আমার যা সামান্য পড়াশোনা, তার শুরুটা ‘চিত্রবাণী’তে। সেই সূত্রে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আমি ফাদার গাস্তঁ রোবের্জের সিনেমার ছাত্র। ইতোমধ্যে ফ্লাইট ছাড়তে কিছুটা বিলম্ব হবে ঘোষণা শুনে আমরা ফুড কাউন্টারে বোর্ডিং পাস দেখিয়ে পেস্ট্রি, কাটলেট আর কালো কফি নিয়ে মুখোমুখি বসলাম। 

চিত্রবাণীর বাইরে এই প্রথম ফাদারের সঙ্গে আমার আড্ডা। দুধে আলতা গায়ের রং, পরনে গুরু কলার দেওয়া সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সঙ্গে সাদা ঢোলা প্যান্ট। ফাদার ভীষণ মিষ্টভাষী ছিলেন, আর খুব ধীরে সুস্থে কথা বলতেন। ক্লাসে অন্য একভাবে তাঁকে চিনেছিলাম। কিন্তু তাঁর গাম্ভীর্যের আড়ালে যে বিপুল সূক্ষ্ম রসবোধ লুকিয়ে ছিল, সেটা সেদিনের অল্প সময়েই আবিষ্কার করে ফেলি।

সময় পেরিয়ে গেলেও ফ্লাইট ছাড়ার কোনও লক্ষণ নেই, এমন সময় আবার মাইকে ঘোষণা হল, এয়ারপোর্টে ঢোকার মুখে অশোকা হোটেল, সেখানে এয়ারলাইন্সের তরফে আমাদের লাঞ্চের ব্যবস্থা রয়েছে।

কলকাতা থেকে ফ্লাইট ছেড়ে প্রথমে যাবে পাটনা, তারপর লখনউ, সেখানে আমাদের নামিয়ে তারপর সেই উড়ান পৌঁছাবে আমেদাবাদে। সময় পেরিয়ে গেলেও ফ্লাইট ছাড়ার কোনও লক্ষণ নেই, এমন সময় আবার মাইকে ঘোষণা হল, এয়ারপোর্টে ঢোকার মুখে অশোকা হোটেল, সেখানে এয়ারলাইন্সের তরফে আমাদের লাঞ্চের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে অনেকটা সময় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, আবার কখন এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে সেটা সময় মতো জানিয়ে দেওয়া হবে। 

এই সুবাদে তিন তারা হোটেলের ভিতরটা দেখা এবং খাওয়া দুটোই হয়ে যাবে ভেবে আমার মধ্যবিত্ত যাপনে খুশির হাওয়া উঠল। বাইরে গাড়িতে বোর্ডিং পাস দেখিয়ে আমরা অশোকা হোটেলে পৌঁছে দেখি, সেখানে যাত্রীদের জন্য খাবারের এলাহী আয়োজন। কোণে বসে সম্পূর্ণ পরিবেশটা দেখা আমার স্বভাব, সেইমতো নিজেদের প্লেটে খাবার সাজিয়ে ঘরের কোণের টেবিলে আমরা বসলাম।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষি

Picture of প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী বাংলা সিনেমা জগতে একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হিসেবে বহু কালজয়ী এবং সমাদৃত ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি, ছবির নান্দনিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর বহু ছবিই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভূষিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। পরবর্তীকালে, তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় পদার্পণ করেন। পরিচালক হিসেবে মূলত পারিবারিক গল্প এবং মিষ্টি সম্পর্কের রসায়ন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন। পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমাটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের (EICA) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)-এর টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সুদীর্ঘ সময়। চলচ্চিত্রের কারিগরি বিষয়ে তাঁর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রে একজন অতিথি অধ্যাপক (Guest Lecturer) হিসেবে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন তিনি।
Picture of প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী

প্রেমেন্দু বিকাশ চাকী বাংলা সিনেমা জগতে একজন দক্ষ চিত্রগ্রাহক হিসেবে বহু কালজয়ী এবং সমাদৃত ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি, ছবির নান্দনিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর বহু ছবিই সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। ভূষিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। পরবর্তীকালে, তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় পদার্পণ করেন। পরিচালক হিসেবে মূলত পারিবারিক গল্প এবং মিষ্টি সম্পর্কের রসায়ন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন। পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্র জগতের সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্ণময় কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনেমাটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশনের (EICA) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (KIFF)-এর টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সুদীর্ঘ সময়। চলচ্চিত্রের কারিগরি বিষয়ে তাঁর ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার আলোকে সরকারি এবং বেসরকারি বিভিন্ন চলচ্চিত্র শিক্ষাকেন্দ্রে একজন অতিথি অধ্যাপক (Guest Lecturer) হিসেবে আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Subscribe To Newsletter

কথাসাহিত্য

অর্ঘ্য কমল পাত্র

সংস্কৃতি

আহার

অমৃতা ভট্টাচার্য
শমিতা হালদার

বিহার

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
প্রদীপ্ত চক্রবর্তী

কলমকারী

ফোটো স্টোরি

নির্মাল্য চ্যাটার্জি
দেবার্চন চ্যাটার্জি

উপন্যাস

[adning id="384325"]
[adning id="384325"]

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com