(International Tiger Day)
‘হালুম…’ এই ডাকেই আমাদের শৈশবের পরিচয় বাঘের সঙ্গে। হলুদ ডোরাকাটা দাগের বিশাল এই প্রাণী যে জঙ্গলের সেরা, তা আলাদা করে আর ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝাতে হয় না। বাঘের রাজকীয় ভাবই তাকে বাঘ করে তোলে, মানুষের মনে এক অনন্য স্থানের অধিকারীও। সমগ্র বিশ্ব জুড়েই বাঘ আধিপত্যবিস্তারকারী এক প্রাণী। ভারতবর্ষ ছাড়াও বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াতেও সে জাতীয় পশু।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্লাইসটোসিন যুগ অর্থাৎ ২০ লক্ষ বছর আগে বা পুরাপ্রস্তর যুগে বাঘের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে জীবাশ্মের মধ্যে, দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের কার্নুল গুহা থেকে। এই উপমহাদেশের সিন্ধু সভ্যতার সিলমোহরেও বাঘের অস্ত্বিত্বের প্রমাণ মিলেছে। রাজামহারাজাদের সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্যের প্রতীক ছিল বাঘ। এই প্রসঙ্গে চোল রাজাদের প্রতীক বাঘের কথা অবশ্য স্মরণযোগ্য। ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে বিশ্বের ৭০ শতাংশ বাঘের বাসস্থান। ২০১০ সালের সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ব্যাঘ্র অধিবেশনে ২৯শে জুলাই ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’ উদযাপনের সূচনা হয়।
আরও পড়ুন: সুন্দরবনে সমবায় ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গ্রাম…
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মতোই ভারতবর্ষেও বাঘ নিয়ে উন্মাদনা বেশ শীর্ষস্থানে অবস্থান করে। ব্যবসায়িক পণ্যে বাঘের ছবি ব্যবহার বা বাঘকে চিহ্ন বানানোর মধ্যে দিয়ে নিজেদের সেরা প্রতিপন্ন করার চেষ্টা এই দেশে নতুন কিছু নয়। সরকারি পর্যায়ে, উনিশ শতকে বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ের লোগোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে ছিল বাঘের অবস্থান। গোলাকৃতির এই লোগোর মাঝের অংশে যে ত্রিভুজাকৃতির অংশ ছিল, তার উপরের দিকে একটি বাঘের ছবি ও নিচের অংশে একটি সাপের ছবি দেখা যায়।

অতীত দিনের গ্রামোফোন রেকর্ড ডিস্কের মাঝখানের ছবিগুলি ছিল এক-একটি কোম্পানির পরিচিতি। ভারতবর্ষে প্রস্তুত ‘কলোম্বিয়া’ কোম্পানির রেকর্ড ডিস্কের মাঝখানের পরিচয়লিপিতে কলোম্বিয়া লেখার ঠিক নিচের অংশে তিনটি বৃত্ত ছিল, যার মধ্যে মাঝের বড় বৃত্তটিতে একটি গোঁফওয়ালা বাঘের ছবি দেওয়া হত, এটিই এই কোম্পানির লোগো হিসাবে পরিচিত।
উনিশ শতক থেকে একুশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় বাংলার ঘরে ঘরে সেলাইয়ের কাজের প্রচলন ছিল ব্যাপকভাবে। এদেশে জাপানে প্রস্তুত কর্কেট কটন সুতোর মধ্যে ‘টাইগার ব্র্যান্ড’ সুতোর বাজার চাহিদা ছিল সবথেকে বেশি। এটির মোড়কের বিজ্ঞাপনেই দেখা যেত রাজকীয় ভঙ্গিমায় একটি বাঘ হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে বসে আছে। এই মোড়ক দেখে সহজে বোঝা যায়, এটির মূল পরিচিতি বহন করত বাঘের ছবিই।

বাংলার বাণিজ্যিক ইতিহাসের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে বেঙ্গল এনামেল নামের স্বদেশি প্রতিষ্ঠান। বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলার ঘরে ঘরে এই বেঙ্গল এনামেলের প্রচলন ছিল। এর প্রধান চিহ্ন ছিল ‘বাঘ’। তখন এনামেল প্লেটেই একটি বিজ্ঞাপনের লেখাতে দেখা যায়— ‘আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বেঙ্গল এনামেল যুদ্ধ জাল হতে ছাড়া পেয়ে জনসেবায় ফিরে এল। মাল মশলা সস্তা হবার সঙ্গে সঙ্গে ‘বাঘ মার্কা’ এনামেল বাসনও সুলভ হবে বাজারে খোঁজ রাখবেন।’
দোয়াত কালির ঝর্না কলমে লেখার স্মৃতি আজও উঁকি দেয়। একটা সময় পি এম বাগচি, সুলেখা, কাজল কালির বাজার ছিল বেশ উচ্চপর্যায়ের। সেসময় বাজারে দেখা মিলত বাঘমার্কা কালিরও।
আবার অন্য একটি বিজ্ঞাপনী লেখাতে দেখা যায়— ‘এতদিন প্রত্যেকখানি ‘বাঘ মার্কা’ এনামেল বাসন যুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়েছে। এখন মুক্তি পেয়ে আপনাদেরই সেবায় ফিরে এল।’ এই বিজ্ঞাপনগুলি সবই তখন এনামেলের থালার মাঝে ডিম্বাকৃতিতে লেখা হত। আর এসব এনামেল বাসনের পিছনে বৃত্তাকারে একটি বাঘের মুখের ছবি দেওয়া থাকত।

দোয়াত কালির ঝর্না কলমে লেখার স্মৃতি আজও উঁকি দেয়। একটা সময় পি এম বাগচি, সুলেখা, কাজল কালির বাজার ছিল বেশ উচ্চপর্যায়ের। সেসময় বাজারে দেখা মিলত বাঘমার্কা কালিরও। বিশ শতকের কলকাতায় ইণ্টালি থেকে শ্রীবর্ণময়ী ইঙ্ক স্টোর লিমিটেডের বাঘমার্কা কালো ও নীল কালির প্রচলন ছিল। এই কালির টিনের বাক্সের উপর ছবিতে দেখা যায়, দুই দিকে দুটি গাছের মাঝে একটি বাঘ সামনে দুই পা ছড়িয়ে বসে আছে। এই প্রসঙ্গে বলতেই হয়, কয়েক বছর আগে ক্লাসমেট কোম্পানির খাতার প্রচ্ছদচিত্রে বিভিন্ন ধরনের বাঘের ছবি ব্যবহার করা হত ‘বাঘ সংরক্ষণ’-এর বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে। ‘সেভ টাইগার’ শিরোনামে একটি বৃত্তাকার চিহ্নের মধ্যে বাঘের পায়ের ছাপ দিয়ে বিশেষ স্মারক ছবিও এক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।
আবার দেশলাই বাক্সের লেবেলে বাঘের ছবি ব্যবহার হয়েছে সর্বাধিক। বিভিন্ন কোম্পানি তাদের দেশলাইয়ে কতরকমভাবে বাঘকে জড়িয়ে নিয়ে বাজারজাত করেছে, তা এক ঝলকে দেখলে অবাক হতেই হয়। উয়িমকো, ক্যাম্বে ম্যাচ ওয়ার্কস, এসওয়ার ওয়ার্কস, ধর্মরাজ ম্যাচ, কৃষ্ণা ম্যাচ ওয়ার্কস, ভিগ্নেস ম্যাচ প্রভৃতি কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে তাদের দেশলাই বাক্সের উপরের ছবিতে বাঘের ছবিকেই গুরুত্ব দিয়ে ছেপেছেন।

বাঘ সংক্রান্ত সকল দেশলাই বাক্সের উপরে বাঘের বিভিন্ন ধরনের ছবি দেখা গেলেও সেসবের শিরোনামগুলি বেশ মজাদার। ‘টাইগার, জঙ্গল রাজা, ডবল টাইগার, নিউ টাইগার, ন্যানো টাইগার, দোস্ত টাইগার, রাজা টাইগার, সার্কাস, কর্ণাটক হুলি, পাওয়ার, টাইগার হেড, এশিয়ান টাইগার, ভারত টাইগার, ইন্ডিয়ান টাইগার, বেঙ্গল টাইগার, বঙ্গাল টাইগার, বিহার কা টাইগার, চিতা টাইগার, বস, এ ওয়ান টাইগার, সুপার টাইগার’ এসব বিবিধ শিরোনামে বাঘের ছবি দেওয়া দেশলাই বাক্স আজও বাজারে প্রচলিত।
ওজন পরিমাপ করার জন্য যে বাটখারা ব্যবহার করা হত, তা-ও টাইগার ব্র্যান্ড নাম দিয়ে বাজারে প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন ওজনের এসব বাটখারার মাঝের অংশে বাঘের ছবি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়।
বিশ শতকের কলকাতার ধর্মতলায় ‘দি আরমারি’ নামের বন্দুক, রিভলভার, রাইফেলের যে দোকান ছিল, তারাও তাদের বিজ্ঞাপনে সর্বত্র বৃত্তাকারে একটি হিংস্র বাঘের ছবি রাখত। এতে তাদের বলশালী গুণের একটা রূপ তুলে ধরত বলেই জানা যায়। ওই সময়ের এই একই ব্যাবসায় আশুতোষ দাঁ অ্যান্ড কোং–এর নামডাক ছিল বেশ শীর্ষস্থানীয়। তাঁরা তাদের হ্যান্ডবিল, রশিদ, বিজ্ঞাপন, চিঠির লেটারহেড, ডাকখাম সব কিছুতেই বাঘের ছবি ব্যবহার করে ব্যতিক্রমী আভিজাত্যের প্রমাণ রেখেছেন। তাঁদের ব্যবহার করা বাঘের ছবি বেশ স্পষ্ট ও হিংস্র, সঙ্গে বাঘের শরীরের অনেকাংশই দৃশ্যমান।

ওজন পরিমাপ করার জন্য যে বাটখারা ব্যবহার করা হত, তা-ও টাইগার ব্র্যান্ড নাম দিয়ে বাজারে প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন ওজনের এসব বাটখারার মাঝের অংশে বাঘের ছবি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যায়। কলকাতার কে সি মিত্রের বাঘমার্কা সুবাসিত কাঁচা তিলের তেলের বিজ্ঞাপনে বৃত্তাকারে তাদের যে লোগো ছিল, সেখানে দাঁত বের করা বাঘের ছবি বেশ রঙচঙে। এখানে পণ্যের নাম ও অন্যান্য তথ্য লেখা হলেও বাঘের ছবিটিই একমাত্র গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হত।
সরকারি স্তরে ‘কলকাতা রাজ্য পরিবহন সংস্থা’ (ক্যালকাটা স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন)–এর নিজস্ব লোগোর মধ্যমণি বাঘ। বৃত্তাকার এই লোগোর ধার বরাবর পরিবহন সংস্থার নাম লেখা থাকলেও মাঝের অংশে একটি গোঁফওয়ালা বাঘের ছবি আঁকা থাকত। বাঘটিকে দেখে মনে হতে পারে, তা গর্জনের ভঙ্গিমায় আছে। তৎকালীন বাস পরিবহনের বিভিন্ন টিকিটগুলিতে এই লোগোর বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গেই গত শতকের পঞ্চাশ থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দীর্ঘ সময় প্রেক্ষাগৃহগুলো থেকে রাজ্য সরকার যে বিনোদন কর সংগ্রহ করত, তার ছোট্ট টিকিটটিও এক্ষেত্রে বিশেষ আলোচনার যোগ্য। মূলত ১৫ পয়সা, ২৫ পয়সা, ৩০ পয়সা, ৭৫ পয়সা, ১ টাকা, ১ টাকা ২৫ পয়সা মূল্যের এই ছোট্ট টিকিটগুলি রাজস্ব আদায়মূলক টিকিটের মতো দেখতে হত।
বাঘ সম্পর্কে মানুষের ধারণা নিয়ে বাণিজ্যিক প্রচারের এমন নজির দৃষ্টান্তমূলক। একটি প্রাণী সম্পর্কে সম্মান ও তা সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ সত্যই অনন্য
হাল্কা সবুজ, নীল, বাদামি, গোলাপি, মেরুন, তুঁতে এমন সব আলাদা আলাদা রঙে এই টিকিটগুলি প্রস্তুত হত, দামের ভিন্নতায় রঙের ভিন্নতাও পরিলক্ষিত হত। এই টিকিটের উপরের অংশে ‘এন্টারটেনমেন্ট’ ও নিচের অংশে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ লেখা থাকত। মাঝের ছবিতে দুটি মূল ভাগ করে উপরের অংশে থাকত, একটি বাঘের ছবি আর নিচের অংশে থাকত একটি পালতোলা বাণিজ্যতরীর ছবি। এখানে বাঘের ছবি এমনভাবেই ছাপা হত যে, সেটিই বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠত।
বাঘ সম্পর্কে মানুষের ধারণা নিয়ে বাণিজ্যিক প্রচারের এমন নজির দৃষ্টান্তমূলক। একটি প্রাণী সম্পর্কে সম্মান ও তা সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগ সত্যই অনন্য। বছরের নির্দিষ্ট দিনে আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস পালন হলেও, বাঘের ছবি দেওয়া পণ্য, টিকিট, লোগো, এসবের দৈনন্দিন ব্যবহারে মানুষ আজও বাঘকে প্রতিনিয়তই সম্মান করে চলেছে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত