(Nepal Disaster)
২৬শে আগস্টের বিপর্যস্ত দিনটার পর দশদিন পেরিয়ে গেল। নেপাল এখনও পক্ষাঘাতগ্রস্ত।
অতিসক্রিয় সমাজমাধ্যমের দৌলতে জলের স্রোতে জল আর জঞ্জালের অনুপাত, আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট সেগমেন্টে তার গতি ও ত্বরণের পরিমাপ, কোন নদীখাত বেয়ে কত ডিগ্রি কোণে বেঁকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে কতটা শক্তি সঞ্চয় বা ক্ষয় করে নেপালের একটা অংশের টোপোগ্রাফি সে পাল্টে দিল— এসব এখন সকলের জানা। অতএব অলমিতি বিস্তারেণ।
বেশ কিছুকাল আগে ‘ক্লাউড বার্স্ট’ নামটার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। এবার শিখলাম GLOF বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড। ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অফ হিমালয়ান জিয়োলজি-র বিজ্ঞানীদের থেকে এও জানলাম যে, হিমালয়ের বুকে এমন লেকের সংখ্যা সাড়ে ৩২ হাজারেরও বেশি, যার ৭৭ শতাংশই ৫০০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।
বিশ্বজুড়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর দৌলতে হিমবাহের মুখ গলছে আর তার পায়ের কাছে তৈরি হচ্ছে গলা জলের হ্রদ। হ্রদের তিনদিকে থাকছে পাহাড়ের পাঁচিল, কিন্তু চতুর্থ দিকটা অতি অস্থিতিশীল পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়া নুড়ি পাথর আর বরফের টুকরো দিয়ে তৈরি, যাকে বলা হচ্ছে ডেড আইস।
হ্রদে জলের পরিমাণ বাড়াচ্ছে বৃষ্টির জল। কয়েক বছর আগেও এই উচ্চতা বৃষ্টি কাকে বলে জানত না। আকাশ থেকে পড়ার জন্য একা ছিল বরফের কুচিরা। হালকা পায়ে তারা পাহাড়ের পাথরের গা তুষারের চাদরে মুড়ে দিত। অনিয়ন্ত্রিত তুষারঝড় আর আভালাঞ্চের কথা বাদ দিলে, পাহাড়ের সঙ্গে কোনও সংঘর্ষ ছিল না তাদের।

ছবিটা পাল্টে দিল বৃষ্টি। অঝোরধারায় ঝরার কালে পাহাড়ের গায়ে প্রতি মুহূর্তের আঘাতে উপরিতলের পাথরের বাঁধন দিল আলগা করে। তীব্র স্রোতে গা বেয়ে নামার সময় সঙ্গে নিল নুড়ি-পাথরের ঝাঁক। তাদের ধাক্কায় বড় পাথরও আলগা হল, গড়িয়ে গড়িয়ে সবাই মিলে নামল এসে হ্রদের জলে।
পাথরের স্তূপ হ্রদের আয়তন সংকুচিত করতে লাগল, বৃষ্টির জল বাড়াতে লাগল জলের পরিমাণ। পরিসংখ্যান বলছে, আজ থেকে তিন বছর আগে যে হ্রদের জল উপচে পড়তে ছয় মাস সময় নিত, আজ সেটা কখনও কখনও হয়ে যাচ্ছে মাত্র এক সপ্তাহে। এই দ্বিমুখী আক্রমণে জলের অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ল, তাতে উপরে উল্লিখিত চতুর্থ প্রাচীরটি জল ধরব না ছাড়ব-র দ্বন্দ্বে দ্বিতীয়টি করবে মনস্থ করল, বলা ভাল, করতে বাধ্য হল।
চিন অধিকৃত তিব্বতে এক হিমবাহের বিপুলাকৃতি মুখ ভেঙে পড়ে দুটি নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে দিল, তাৎক্ষণিকভাবে জন্ম হল এক হ্রদের, যার জলের পরিমাণ শুরুর ২ লক্ষ ঘনমিটার থেকে অল্প সময়েই বেড়ে দাঁড়াল ৫ লক্ষ ঘনমিটারে।
চাপ যখন সহনীয়, তখন সেই দেওয়ালের ডেড আইসের ভিতর দিয়ে তৈরি হত সুড়ঙ্গ। সেই পথে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যেত। পরিমাণ বেশি হলে সেই জলপথ যে নদীতে মিশেছে, তাতে জলস্ফীতি দেখা দিত। কিন্তু চাপ আরও বাড়তে ভেঙে পড়ল চতুর্থ প্রাচীর, পথ করে দিল বিপুল পরিমাণ জলকে, যা ছোট-বড় পাথর, বরফের চাঁই নিয়ে বিপুল শক্তিধর এক দানবের আকারে নেমে এল নিচে। সমতল দিয়ে যাওয়ার সময় সে কী কী করল, তার লাইভ টেলিকাস্ট গত কয়েকদিন ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
এই ধরনের ধসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক অতীতে বেড়ে যাওয়া ভূমিকম্পের প্রবণতা। ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস পুরো হিমালয়কে, বিশেষ করে মধ্য হিমালয়ের পাহাড়গুলোকে অতি বিপজ্জনক Seismic Zone 6-এর অন্তর্ভুক্ত করেছে সম্প্রতি। এর মেঝেয় থাকা ইন্ডিয়ান আর ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের ঘষাঘষি অতিরিক্ত ভূমিকম্পের প্রবণতার জন্য দায়ী। অবশ্য এক্ষেত্রে মানুষের দায়ও কম নয়। সে প্রসঙ্গে আসব যথাসময়ে। তবে দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে এই অঞ্চল আগামী দিনে ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৮-এর ঘর ছুঁয়ে ফেলবে বলে তাঁদের অনুমান।

এবারে এমনই কিছু দুর্যোগের সম্মিলিত ফল— চিন অধিকৃত তিব্বতে এক হিমবাহের বিপুলাকৃতি মুখ ভেঙে পড়ে দুটি নদীর গতিপথ রুদ্ধ করে দিল, তাৎক্ষণিকভাবে জন্ম হল এক হ্রদের, যার জলের পরিমাণ শুরুর ২ লক্ষ ঘনমিটার থেকে অল্প সময়েই বেড়ে দাঁড়াল ৫ লক্ষ ঘনমিটারে। অস্থায়ী পাঁচিল ভেঙে গেল। জল, বরফ আর পাথরের স্রোত নেমে এল নিচে।
রসুয়ার সাজানো চিনা অভিবাসন দফতর আর সেখানে থাকা মানুষ, গাড়ি সব ফুৎকারে উড়ে গেল। নিম্নমুখী স্রোত সীমান্তের কাঁটাতার ভেঙে উন্নয়নের আকাশে বাস করা চিনকে নিচের তলার বাসিন্দা তিব্বত আর নেপালের সঙ্গে নিয়ে এল বিপর্যয়ের নিরঙ্কুশ সমতলতায়।
এই অব্দি এবং এর পরের ধ্বংসলীলার দৈর্ঘ্য প্রস্থের মাপ আমাদের সকলের জানা হয়ে গেছে। সুতরাং আবারও অলমিতি বিস্তারেণ।
সময়ের সঙ্গে মানুষ বাড়ল। পুণ্যার্থীদের গল্পের টানে কিছু মানুষ হিমালয়ের সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে পা বাড়ালেন সেই পথে। সংখ্যা বাড়ল অভিযাত্রীদের। ভ্রামণিকদের প্রয়োজনে ভ্রমণের পরিকাঠামো বাড়তে লাগল। একই কথা প্রযোজ্য অভিযাত্রীদের ক্ষেত্রেও।
যে প্রসঙ্গ এবার একটু বিস্তারে বলতে চাই, তা হল, এর কতটা প্রকৃতির তাণ্ডব আর কতটা মানুষের অবদান। এর কার্যকারণে আজ ঠিক কতটা জড়িয়ে আছে হিমালয় ভ্রমণ আর অভিযানের কুশীলবেরা।
হিমালয় ভ্রমণের ইতিহাস আর ঐতিহ্য প্রাচীন। ভ্রমণের চালিকাশক্তি একসময় ছিল ধর্ম। তাকে ভর করেই চারধাম যাত্রা। আত্মপীড়নে পুণ্যের সঞ্চয় বাড়ে— এই বিশ্বাসে চলার পথের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দুর্গমতা, জলাভাব, খাদ্যাভাব, বিশ্রামের স্থানাভাব, এমনতরো হাজার অপ্রাপ্তি, যাকে পূণ্যপথের কারেন্সির মর্যাদা দেওয়া হত। আর ছিল পাহাড়ে চড়ার গল্প। তাতে ছিলেন হাতে গোনা কিছু অভিযাত্রীরা।

সময়ের সঙ্গে মানুষ বাড়ল। পুণ্যার্থীদের গল্পের টানে কিছু মানুষ হিমালয়ের সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে পা বাড়ালেন সেই পথে। সংখ্যা বাড়ল অভিযাত্রীদের। ভ্রামণিকদের প্রয়োজনে ভ্রমণের পরিকাঠামো বাড়তে লাগল। একই কথা প্রযোজ্য অভিযাত্রীদের ক্ষেত্রেও। নইলে কে কবে ভাবতে পেরেছিলেন যে এভারেস্ট সামিট পুশের জন্য পর্বতারোহীদের রাত থেকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে?
ভ্রমণ আর অভিযানের এই পরিবর্তন কীভাবে মানুষ আর প্রকৃতিকে যুগপৎ বিপন্ন করে তুলছে, তার তালিকা করলে আমরা দেখব:
সাদা বরফ তার দুধসাদা উপরিতল থেকে প্রায় ৯৫% সূর্যালোককে প্রতিফলিত করতে সক্ষম। কালচে রঙের কারণে সে এখন সূর্যের তাপের অনেকটাই ধরে রেখে আশেপাশের তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। Albedo Effect-এ গলে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বরফ।
এক, প্রচুর সংখ্যায় উপস্থিতির জেরে শারীরিক বর্জ্য নিঃসরণ পারিপার্শ্বিকের তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে ব্যাপক হারে। শুধু ভ্রামণিক ও অভিযাত্রীদের উষ্ণ প্রস্রাব বরফ গলানোর শক্তিশালী অস্ত্রের কাজ করছে, এই কথা স্বীকৃত হয়েছে একাধিক গবেষণাপত্রে।
ভ্রামণিকের প্রয়োজন সুস্থিতি— তার ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রয়োজনে আগুন জ্বালানো, তার ঘরের মধ্যে হিটারের ব্যবস্থা, সব কিছুই তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে বাতাসে। আর ইকো ট্যুরিজমের নামে কর্পোরেট ব্যবসার সুবাদে শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে সেন্ট্রালি হিটেড বাড়ি বা রিসর্ট এক নয়া বিপদের আমদানি করেছে। গত কয়েক বছরে নেপাল ও তিব্বতি হিমালয়ের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়ার যে কোনও নিরিখে এ এক অতি বিপজ্জনক মাত্রা।

দুই, পর্বতারোহীদের বয়ে নিয়ে যাওয়া সামগ্রীর বিরাট অংশ পড়ে থাকছে বিভিন্ন শৃঙ্গের বরফের উপর। শুধু এভারেস্টের আশাপাশে তাঁরা নানা রঙের বর্জ্য, ছেঁড়া পোশাক ও তাঁবু, ব্যবহৃত অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ব্যবহৃত সরঞ্জাম ফেলে আসছেন বছরে গড়ে ৫০ মেট্রিক টন।
এছাড়া, মানুষের শরীরজাত বর্জ্য থাকছে মোটামুটি ১২ মেট্রিক টন। বরফের সাদায় এদের উপস্থিতি বরফের রঙকে কালচে করে তুলছে। সাদা বরফ তার দুধসাদা উপরিতল থেকে প্রায় ৯৫% সূর্যালোককে প্রতিফলিত করতে সক্ষম। কালচে রঙের কারণে সে এখন সূর্যের তাপের অনেকটাই ধরে রেখে আশেপাশের তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। Albedo Effect-এ গলে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বরফ।
গাছ কেটে জমি তৈরি হচ্ছে, সামান্য খোঁড়া ভিতের উপর তৈরি হয়ে যাচ্ছে বহুতল। পাহাড়ের ঢাল বিপজ্জনক উল্লম্ব রেখায় কেটে সামান্য খুঁটির উপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে রিসর্টের কাঠামো।
তিন, বেড়ানোর অতি উৎসাহে নিভৃত পাহাড়ের কঠিন কোণেও ভ্রামণিক খুঁজছে মুখরোচক খাবার, থাকার জন্য খুঁজছে বিলাসী ঠেক। পুঁজি বলছে, আছি তো আমি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা সরকার বলছে এই রইলাম চোখ বুজে। নেতারা তাদের ভাগ বুঝে নিচ্ছে। ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাইয়ের প্রাগৈতিহাসিক সমীকরণ মেনে তৈরি হচ্ছে চূড়ান্ত বেআইনি অবকাঠামো।
গাছ কেটে জমি তৈরি হচ্ছে, সামান্য খোঁড়া ভিতের উপর তৈরি হয়ে যাচ্ছে বহুতল। পাহাড়ের ঢাল বিপজ্জনক উল্লম্ব রেখায় কেটে সামান্য খুঁটির উপর দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে রিসর্টের কাঠামো। তাতে পাহাড় আর বাড়ি দুইয়েরই বিপদ বাড়ছে। বয়ে যাওয়া নদীর খাতের অনেকটা অংশ দখল করে তোলা হচ্ছে আবাসন। নদীর মাঝখানে মাটি ফেলে কাচের দেয়ালের রেস্তোরাঁ তৈরি হচ্ছে। রিলস বানানো আর প্রিওয়েডিং ফটোশ্যুটের গা ঘিনঘিনে উল্লাসে ভরে উঠছে পরিবেশ। এসবের আক্রমণে সংকুচিত নদীখাত প্রয়োজনে সামান্য বেশি জলও ধারণ করার ক্ষমতা রাখছে না। অতিরিক্ত প্রবাহের সময় উপচে উঠে ভাসিয়ে নিচ্ছে দুপাশের বাড়িঘর।

চার, রাস্তা তৈরির সময় পাহাড়ের গায়ে কাটাকুটি ন্যূনতম বিজ্ঞান মানছে না। বিরাট বিরাট বিস্ফোরণ পাহাড়ের হাড় পাঁজরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। ভূমিকম্পের অভিঘাত ছড়িয়ে যাচ্ছে দূর দূরান্তরে। তার ভয়াবহ ভবিষ্যৎ জেনেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি— ট্যুরিস্টকে দেখাতে হবে নতুন নতুন দৃশ্য। ট্যুরিস্টের ইচ্ছে, তাই গণহারে তাদের পরিবহনের জন্য পরিবেশবিদদের সতর্কতা, সুপ্রিম কোর্টের উপদেশ, সব উপেক্ষা করে বিপুল সরকারি উদ্যোগে হিমালয়ের পরিবশকে কার্যত হত্যা করে এগিয়ে চলেছে চার ধাম যাত্রার হাইওয়ে তৈরির কাজ, এই ২০২৬-এ যা প্রায় ৭৫ শতাংশ শেষ। এর পিছনের লগ্নি-পুঁজির গল্পটা আমরা জেনেও চোখ বন্ধ করে থাকছি।
অতএব সবাই তৈরি থাকুন, অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় ও প্রাণঘাতী বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে। পাহাড়ের ঢালে, পাহাড়ি নদীর পাড়ে বাস করা মানুষ এমন একটা ছবি এঁকে রাখুন মনে মনে, যে এক রাত্রে ঘুমের মধ্যেই দেখবেন জান্তব গর্জন করতে করতে নেমে আসছে জল পাথর আর কাদার সম্মিলিত স্রোত। আপনার ঘর, আপনার সংসার তাতে ভেসে যাচ্ছে এক মৃত ভবিষ্যতের দিকে। আপনাদের কারওর শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে শনাক্তকরণের সম্ভাবনার বাইরে, কেউ হয়তো তুলনায় সৌভাগ্যবান লাশের মর্যাদায় জীবনযাত্রা শেষ করছেন শ্মশানের চিতায় অথবা কবরের আঁধারে।
ওই সঙ্গীতের স্বরলিপি শিক্ষাই তার কাছে যাওয়ার ছাড়পত্র। সে শিক্ষা হাজার বছরের পরম্পরার অর্জন। সাধনাহীন উল্লাসে সে অনুমতিপত্রকে উপক্ষার ফল নেপালের প্রকৃতি বুঝিয়ে দিয়েছে। বুঝেছি কি না, তার নিশান থাকবে ভবিষ্যতের পাতায়।
পরদিন বেঁচে থাকা সব হারানো মানুষের মিছিল চলছে খোলা আকাশের নিচে ডোলসর্বস্ব জীবনের পানে— এরা মানুষের চক্রান্তে গজিয়ে ওঠা এক নতুন দল, নাম পরিবেশ উদ্বাস্তু বা ক্লাইমেট রিফিউজি। হারিয়ে যাওয়া মা-বাবার চার বছরের শিশু তার আড়াই বছরের বোনকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছে, মৃত ভাইয়ের লাশ পিঠে বাঁধা নাগাসাকির অশনাক্ত বালকের ছবির নেপালি সংস্করণ দেখতে দেখতে বাকি পৃথিবী হয়তো আর একবার কেঁপে উঠছে। লোভ, লালসা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থের আস্ফালন ইত্যাদি প্রকাশের নিয়ন্ত্রণে আমরা সেদিনের থেকে এক পাও এগোতে পারিনি। বরং গর্বের সঙ্গে পিছিয়ে চলেছি প্রতিদিন।
সেই দুঃসহ পরাজয়ের ভারে যখন হাঁটু ভেঙে বসে পড়েছি ধস্ত জমির রক্তাক্ত কাদায়, তখন ইতিকর্তব্য স্মরণ করাতে কে যেন এক গল্প ফাঁদেন। নেপালের সীমানা পেরিয়ে সে গল্প পৌঁছে যায় ইকুয়েডরের রেনফরেস্টে। তার গভীরে এক ক্ষীণতনু ঝর্নার জলধারা বয়ে চলেছে পাথুরে সমতলের ঢাল বেয়ে। কখনও তার উপর পা রেখে, কখনও তার পাশের পাথুরে বিস্তারের উপর দিয়ে হেঁটে চলেছে স্থানীয় কোয়েচা উপজাতির এক পুরুষ। তার পিছনে চারজন শ্বেতকায় পর্যটক পায়ে জুতো, হাতে লাঠি নিয়ে তাকে অনুসরণ করে। উপজাতি পুরুষটি নগ্নপদ, কোমরে জড়ানো খাটো কাপড়ের টুকরো। অরণ্য তাকে আঘাত করে না।

ঝর্ণার দিকে আঙুল তুলে সে বলে, ওই ঝর্ণা, এই নির্জন বনভূমি আমাদের শিক্ষক, আমাদের শক্তির উৎস। কিন্তু সে উৎসের সন্ধান পেতে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। প্রার্থনা জানাতে হয় সেই অতীন্দ্রিয়ের কাছে— তুমি কি আমাকে গ্রহণ করলে? উত্তর শুনতে এক কান চেপে ধরতে হয় গড়িয়ে আসা পাথরের গায়ে। কোয়েচা পুরুষটি তাই করে। তারপর প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের ভঙ্গিতে স্বগতোক্তি করে, ওই শোন, মন দিয়ে শোন, ভেসে আসছে সঙ্গীতের সুর। আমাদের তিনি গ্রহণ করেছেন। মন্দিরের দুয়ার খুলছে। আর ভয় নেই।
ওই সঙ্গীতের স্বরলিপি শিক্ষাই তার কাছে যাওয়ার ছাড়পত্র। সে শিক্ষা হাজার বছরের পরম্পরার অর্জন। সাধনাহীন উল্লাসে সে অনুমতিপত্রকে উপেক্ষার ফল নেপালের প্রকৃতি বুঝিয়ে দিয়েছে। বুঝেছি কি না, তার নিশান থাকবে ভবিষ্যতের পাতায়।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত