(Kalikaprasad Memoir)
প্রিয় কালিকা,
বেশ কিছু বছর আগের কথা। টেলিভিশনের পর্দায় একবার এক সাক্ষাৎকারে তোমাকে বলতে শুনেছিলাম—রবীন্দ্রনাথ নাকি তোমার চিরকালের সমবয়সী বন্ধু। বয়সের কোনও অনড় খোপে তাঁকে তুমি কোনওদিনই বন্দি করোনি। শৈশবে কোনও রাখালের উদাসী বাঁশির মেঠো সুরে যাঁর দেখা পেয়েছিলে, ভরা যৌবনে কোনও এক শান্ত গোধূলিলগ্নে হয়তো তাঁকেই আবার খুঁজে নিয়েছিলে মুগ্ধ করা এক যুবতীর চোখের তারায়। জীবনের প্রতিটা বাঁকে কবি যেন তোমার সাথে সাথেই হেঁটেছেন, বয়সে না বেড়ে তোমার সঙ্গে সমান তালে পা মিলিয়েছেন।
মনে পড়ে একটা দিনের ঘটনা— খুব সম্ভবত ২০০৭-এর নভেম্বরের কোনও এক দিন। সেদিনও হয়তো একইভাবে, অ্যাকাডেমি ছাড়িয়ে এক মিছিলে রবীন্দ্র সদনের দিকে হেঁটে যাওয়ার পথে তোমার নিবিড় সঙ্গী হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভিড়ের মাঝে সবার অগোচরে, তিনি হয়তো শরীরী উপস্থিতিতেই হেঁটেছিলেন তোমার পাশে পাশে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। আর হয়তো তোমরা দু’জন অন্তরের সমস্ত তীব্রতা এক করে, গলা ছেড়ে গেয়েছিলে—
আরও পড়ুন: উত্তম কুমার: মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের স্বপ্নপুরুষ
‘পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা, যুগ যুগ ধাবিত যাত্রী
হে চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি
দারুণ বিপ্লব-মাঝে, তব শঙ্খধ্বনি বাজে সঙ্কটদুঃখত্রাতা
জনগণপথপরিচায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!’
তোমার কথায় বুঝেছিলাম, তোমার বুকের গহীনে ধিকিধিকি জ্বলছিল এক আপসহীন প্রতিবাদের বহ্নিশিখা। সেই বুকের ভিতরের দহন যখন মাত্রা ছাড়াল, তুমি আর ঘরে বসে থাকতে পারলে না; দ্বিধাহীনভাবে সংকল্প নিলে পথে নামার। শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রযন্ত্রের আত্মম্ভরিতার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা তো তোমার আজন্ম স্বভাব ছিল। যৌবনের ছাত্ররাজনীতি তোমাকে কোনওদিন আপস করতে শেখায়নি; শিখিয়েছিল চোখে চোখ রেখে ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে।

নিজের বিবেকের কাছে যখন আত্মপ্রবঞ্চনার কোনও উত্তর মেলেনি, তুমি নেমে এলে পিচঢালা রাজপথে। অনেকেই সেদিন হয়তো হকচকিয়ে গিয়েছিল। অস্বীকার করব না— আমারও সেদিন খানিক অভিমান হয়েছিল। তোমার আর আমার বিশ্বাস, আমাদের প্রত্যয় তো ভিন্ন ছিল না। তাহলে? বলতে দ্বিধা নেই— পরে বুঝেছি কোথায় তুমি সঠিক ছিলে আর কোথায় আমি ভুল বুঝেছিলাম।
সুরের মানুষের এমন অগ্নিগর্ভ প্রতিরোধ দেখে অবাক হলেও, তোমাকে কিন্তু কোনও দ্বিধা বা শঙ্কা টলাতে পারেনি একচুলও। হয়তো তোমার অটুট আত্মবিশ্বাস আর মাটির প্রতি নিখাদ দায়বদ্ধতাই বরাবর তোমার চলার পথ নির্মাণ করেছিল। তোমার জীবনদর্শনকে সেদিন মনে মনে কুর্ণিশ জানিয়েছিলাম।
একদিকে কাকা অনন্ত ভট্টাচার্য— যাঁর সান্নিধ্যে খুব ছেলেবেলাতেই তোমার পরিচয় ঘটেছিল লোকগানের অতলান্ত সমুদ্রের সাথে। ভাটিয়ালি, বাউল, সারি, ঝুমুরের যে বিপুল রত্নভাণ্ডার তিনি আজীবন আগলে রেখেছিলেন, তা কোনও কার্পণ্য না করে অকাতরে উজাড় করে দিলেন তাঁর প্রাণের ভাইপোর দু’হাতে।
তুমি তো কেবল একজন সুরসাধক ছিলে না, ছিলে এক দ্রোহী পরিব্রাজক। তুমি চেয়েছিলে বরাকের উত্তাল স্রোতধারা এনে অনায়াসে মিশিয়ে দিতে গঙ্গার মোহনায়। আসামের বরাক উপত্যকার বঙ্গ, বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মাটি আর কলকাতার কংক্রিটের রাজপথের মাঝে তৈরি করতে চেয়েছিলে এক অবিচ্ছেদ্য সুরের সাঁকো।
তুমি ছিলে সত্তরের দশকের সন্তান— চারপাশে তখন ভাঙাগড়ার এক তুমুল, ঝোড়ো দোলাচল। একদিকে মহাকাশে জয়ের দামামা বাজিয়ে মানুষ চাঁদের বুক থেকে ধুলো মুঠো করে ফিরছে পৃথিবীতে; অন্যদিকে আপন দেশের মাটি, রাজনৈতিক মতবিরোধে রক্তাক্ত ক্ষতে ভিজে লাল হয়ে উঠছে। সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী ভূখণ্ডেও তখন স্বাধিকারের লড়াই— একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে মুক্তির দাবিতে গর্জে উঠছে মানুষের হাতিয়ার। রাজনৈতিক অস্থিরতা, উদ্বাস্তু শিবিরের কান্না আর বুলেটের শব্দের ভেতর দিয়ে তৈরি হচ্ছিল এক জটিল সময়পট। এমন এক বারুদগন্ধী ও স্বপ্নাতুর দশকেই তো তোমার শৈশবের বিস্তার।
তবে সেদিনের অস্থির সেই বাইরের পৃথিবীর পাশাপাশি তোমার ঘরের চৌহদ্দিতে বইছিল এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ফল্গুধারা। সেখানে ছিল শিকড়ের নিবিড় সুবাস। একদিকে কাকা অনন্ত ভট্টাচার্য— যাঁর সান্নিধ্যে খুব ছেলেবেলাতেই তোমার পরিচয় ঘটেছিল লোকগানের অতলান্ত সমুদ্রের সাথে। ভাটিয়ালি, বাউল, সারি, ঝুমুরের যে বিপুল রত্নভাণ্ডার তিনি আজীবন আগলে রেখেছিলেন, তা কোনও কার্পণ্য না করে অকাতরে উজাড় করে দিলেন তাঁর প্রাণের ভাইপোর দু’হাতে।
অন্য প্রান্তে আইপিটিএ-র একনিষ্ঠ কর্মী কাকা মুকুন্দদাস ভট্টাচার্য— যাঁর সমাজচেতনা আর রাজনৈতিক দর্শন তোমার মননে বুনে দিচ্ছিল গণমানুষের অধিকারের বীজ। সেই সুর আর দর্শন একসঙ্গে মিলেমিশে গড়ে তুলছিল তোমার সত্তা। শিকড় আর লড়াইয়ের এই যুগলবন্দিতেই তুমি বুঝতে শিখেছিলে মেঠো মানুষের আসল পরিচয়, আর কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলে মাটির চিরন্তন সুর।
কলকাতার যান্ত্রিক গতি, কোলাহল আর প্রতিযোগিতার রুক্ষ বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে অনেকেই শিকড় বিস্মৃত হয়; নিজেদের হারিয়ে ফেলে নগরজীবনের মোহে। কিন্তু তুমি তা করোনি।
তারপর একসময় সুরের অন্বেষণে তুমি চলে এলে এই মহানগরে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়ার সময় চিন্তার পরিসর আরও প্রসারিত হল। সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতি এবং সঙ্গীতকে তুমি আলাদা আলাদা খোপে কখনই দেখনি। লোকগানের মধ্যে যে মানুষের ইতিহাস, শ্রম, প্রেম, দুঃখ, দর্শন এবং প্রতিবাদ লুকিয়ে আছে— তুমি সেটিই আবিষ্কার করতে চেয়েছিলে।
শিলচরের সেই মায়াময় অথচ সংগ্রামমুখর দিনগুলো তোমাকে শিখিয়েছিল নদী আর গানের ভেতরের অদৃশ্য মিলটুকু ধরতে। সুরমা আর বরাকের জল যেমন কোনও কৃত্রিম ভূগোল মানে না, তোমার ভাবনাও তেমনই সংকীর্ণ আঞ্চলিকতার গণ্ডি মানতে শেখেনি। তুমি বুঝেছিলে, মানুষের গান কখনও কোনও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রেক্ষাগৃহের নিছক অলংকার হতে পারে না। গান আসলে বেঁচে থাকার রসদ, লোকগান আসলে শ্রমজীবী মানুষের ঘামের দাগ মোছার একমাত্র রুমাল।

কলকাতার যান্ত্রিক গতি, কোলাহল আর প্রতিযোগিতার রুক্ষ বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে অনেকেই শিকড় বিস্মৃত হয়; নিজেদের হারিয়ে ফেলে নগরজীবনের মোহে। কিন্তু তুমি তা করোনি। এই পাথর আর পিচের শহরে দাঁড়িয়েও তোমার বুক জুড়ে খেলা করত ধানক্ষেতের হাওয়া, গঙ্গা-পদ্মার ঢেউ আর মাঝিমল্লার কণ্ঠের আকুল আর্তি।
মেকি লোকসংগীতের আড়ালে যখন ঐতিহ্যকে সস্তা বিনোদনের সামগ্রী বানিয়ে ফেলার বাণিজ্যিক চক্রান্ত চলছিল, তুমি তখন বুক চিতিয়ে দাঁড়ালে প্রতিরোধের এক নতুন সুর নিয়ে। মাটির গান কেবল সংরক্ষণ না করে তাকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তুলে নিলে কাঁধে।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বাংলা গানের জগতে ‘ব্যান্ড’ শব্দটির বিশেষ জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল। আধুনিক বাংলা ব্যান্ড পশ্চিমী বাদ্যযন্ত্র, রক, ফোক-রক এবং নতুন গীতিকাব্যের মাধ্যমে তরুণ শ্রোতাকে আকৃষ্ট করছিল। পাড়ায় পাড়ায় চলছিল এই নতুন ধারার চর্চা।
এই দায়িত্ব থেকেই ১৯৯৯ সালে জন্ম ‘দোহার’-এর। নামটির মধ্যেই যেন দলের দর্শনটি লুকিয়ে। এখানে কোনও একক তারকা নয়, সম্মিলিত কণ্ঠই মুখ্য। দলের নিজস্ব ভাষায়, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলার ও উত্তর-পূর্ব ভারতের মাটির গানের নিজস্ব রূপ ও স্বাদ বজায় রেখে শহর ও গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এখানেই তোমার সবচেয়ে বড় অবদান।
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে বাংলা গানের জগতে ‘ব্যান্ড’ শব্দটির বিশেষ জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল। আধুনিক বাংলা ব্যান্ড পশ্চিমী বাদ্যযন্ত্র, রক, ফোক-রক এবং নতুন গীতিকাব্যের মাধ্যমে তরুণ শ্রোতাকে আকৃষ্ট করছিল। পাড়ায় পাড়ায় চলছিল এই নতুন ধারার চর্চা।
মনে পড়ে কালিকা, সেই এফ.এম. চ্যানেলে কাজ করার সময়ের সেই ‘বন্ধুত্ব’-র দিনগুলো? শুধু বন্ধু কেন? তুমি তখন আমার সহকর্মী ও চ্যানেলের মিউজিক ম্যানেজার। দোহার-কে বাংলা ব্যান্ডের শ্রেণিতে রাখায় তুমি বিরক্ত হয়েছিলে। তোমার বক্তব্য ছিল— দোহার ব্যান্ড নয়, ‘লোকগানের দল’।
তোমরা নতুন গান লেখার বদলে পুরনো লোকগান সংগ্রহ, পরিবেশন ও পুনরুজ্জীবিত করতে; পশ্চিমী বাদ্যযন্ত্রের বদলে ব্যবহার করতে ঢোল, খোল, মাদল, ধামসা, সারিন্দা, ডুবকি, খঞ্জনি, একতারা, দোতারা প্রভৃতি দেশজ বাদ্যযন্ত্র। এই সিদ্ধান্তটি নিছক নস্টালজিয়া ছিল না। বরং এর মধ্যে ছিল সাংস্কৃতিক রাজনীতি।
লোকসংগীত নিয়ে তোমার অন্বেষণ কোনও পুঁথিগত বা তাত্ত্বিক গবেষণার ভেতর আটকে থাকেনি। তুমি ছিলে এক প্রকৃত মাঠের গবেষক। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছ দিনের পর দিন, রোদে পুড়েছ, বৃষ্টিতে ভিজেছ।
লোকসংগীত দীর্ঘদিন ধরে তথাকথিত ‘উচ্চ’ সংস্কৃতির বাইরে অবস্থান করেছে। শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজে লোকগানকে অনেক সময় গ্রামের, দরিদ্র মানুষের কিংবা অতীতের সংস্কৃতি বলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তুমি সেই বিভাজনটিকেই প্রশ্ন করেছিলে। তুমি দেখিয়েছিলে, লালন, হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, শাহ আবদুল করিম, দ্বিজদাস বা মনোমোহন দত্তের গান কোনও ‘পুরনো দিনের গান’ নয়; এগুলি মানুষের অস্তিত্ব, প্রেম, শরীর, সমাজ, ধর্ম ও দর্শন নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা সৃষ্টিকর্ম।
আর তাই তো তুমি প্রতিষ্ঠা করলে ‘দোহার’। দোহার কেবল একটা গানের দল ছিল না— তা ছিল এক সাংস্কৃতিক আন্দোলন, শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক মহাযজ্ঞ। ধুতি-পাঞ্জাবি আর কাঁধে ঝোলানো বাদ্যযন্ত্র নিয়ে যখন তোমরা মঞ্চে দাঁড়াতে, তখন মনে হত যেন বাংলার আদিম গ্রাম্য প্রান্তরটাই এক লহমায় উঠে এসেছে মঞ্চের বুকে।

কাঁসি, ধামসা, মাদল, দোতারা, খমক কিংবা ঢাকের সেই গমগমে আওয়াজে শহরবাসী নতুন করে শুনতে পেল তাদের নিজেদেরই পূর্বপুরুষদের ফেলে আসা ডাক। মেকি আধুনিকতার মেদ ঝরিয়ে লোকগানকে তার নিজস্ব কৌলিন্যে, তার আদিম সারল্যে আর অকৃত্রিম মহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলে তুমি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন চোখ বুজে সুর ধরতে, তখন তোমার কণ্ঠের ভেতর দিয়ে একাকার হয়ে যেত শত শত বছরের গ্রামীণ বেদনা, আনন্দ, বিরহ আর আধ্যাত্মিক আর্তি। আজও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে। তোমার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে চলেছেন তোমার সুরসাথীরা।
লোকসংগীত নিয়ে তোমার অন্বেষণ কোনও পুঁথিগত বা তাত্ত্বিক গবেষণার ভেতর আটকে থাকেনি। তুমি ছিলে এক প্রকৃত মাঠের গবেষক। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়িয়েছ দিনের পর দিন, রোদে পুড়েছ, বৃষ্টিতে ভিজেছ।
শুধু গানেই তো তোমার পরিসর সীমাবদ্ধ ছিল না। টেলিভিশনের মঞ্চেও তুমি তৈরি করলে এক অনন্য ইতিহাস। আধুনিক বিনোদনের জাঁকজমকপূর্ণ আলো আর চটকদার প্রতিযোগিতার চেনা ছককে ভেঙে দিয়ে লোকগানকে কেন্দ্র করে তৈরি করলে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন।
উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত ভাওয়াইয়ার আখড়া থেকে রাঢ়বঙ্গের লাল মাটির বাউলদের কুঁড়েঘর— যেখানেই খাঁটি সুরের সন্ধান পেয়েছ, সেখানেই গিয়ে বসেছ ধুলোমাটিতে। নিঃস্ব, অবহেলিত, বিস্মৃত লোকশিল্পীদের পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁদের গান শুনেছ, সেই গান রেকর্ড করেছ, তাঁদের বুকভরা দুঃখের ভাগীদার হয়েছ। অবলুপ্তির অতলে তলিয়ে যাওয়া বহু অচেনা পদ, বিলুপ্তপ্রায় প্রাচীন লোকসুরকে তুমি উদ্ধার করে এনেছ জনসমক্ষে।
লালন, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, বিজয় সরকার কিংবা জালাল খাঁ—তাঁদের দর্শনকে তুমি একুশ শতকের তরুণ প্রজন্মের কাছে সহজ অথচ গভীর এক উপলব্ধির ভাষায় পৌঁছে দিয়েছিলে। যে প্রজন্ম আধুনিক ড্রামস আর ইলেকট্রিক গিটারের ঝংকারে মগ্ন ছিল, তাদেরও তুমি বাধ্য করলে দোতারার টুংটাং আর মাটির সুরের প্রেমে পড়তে।
শুধু গানেই তো তোমার পরিসর সীমাবদ্ধ ছিল না। টেলিভিশনের মঞ্চেও তুমি তৈরি করলে এক অনন্য ইতিহাস। আধুনিক বিনোদনের জাঁকজমকপূর্ণ আলো আর চটকদার প্রতিযোগিতার চেনা ছককে ভেঙে দিয়ে লোকগানকে কেন্দ্র করে তৈরি করলে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। সেখানে গ্রাম আর শহরের সীমারেখা মুছে গিয়েছিল তোমার জাদুকরী উপস্থাপনায়।
মাটির মানুষদের, পল্লীগ্রামের অবহেলিত গায়কদের তুমি এনে দাঁড় করালে জাতীয় স্তরের স্পটলাইটের নিচে। তাঁদের সাথে কোনও কৃত্রিম ব্যবধান রাখনি; একই মঞ্চে তাঁদের জড়িয়ে ধরে দেখিয়ে দিয়েছিলে— এঁরাই আমাদের সংস্কৃতির আসল মেরুদণ্ড। উপস্থাপনার সেই উষ্ণতায় কোনও মিথ্যা অহংকার ছিল না, ছিল নিখাদ ভ্রাতৃত্ববোধ আর মাটির প্রতি অপরিসীম ভক্তি।
বরাকের উথালপাথাল জল এখনও বয়ে চলে, কলকাতার পিচঢালা পথ দিয়ে এখনও মানুষের মিছিল হেঁটে যায় অ্যাকাডেমির দিকে, জড়ো হয় তার প্রাঙ্গণে। আর সেই ভিড়ের মাঝে কান পাতলে আজও কোথাও যেন শোনা যায় সেই পঞ্চাশোর্ধ কবির সাথে হেঁটে চলা এক সুরপাগল যুবকের পায়ের শব্দ।
আজ যখন এক শান্ত নৈঃশব্দ্যে তোমার কথা ভাবি, স্পষ্ট বুঝতে পারি, তুমি আসলে ছিলে এক সুরের বাউল, এক নিরন্তর পথিক। মৃত্যুর কোনও ভয় কোনওদিন তোমার চোখে দেখিনি, কারণ যারা মাটিকে ভালবেসে বাঁচে, তারা তো কোনওদিনই মাটির বাইরে চলে যায় না। এক আকস্মিক, নির্মম দুর্ঘটনায় পথ চলা হয়তো থেমে গেল মাঝপথেই, কিন্তু তোমার সেই অপূর্ণ সুর তো থামেনি। তুমি তো শুধু গান শোনাতে আসোনি, তুমি এসেছিলে মানুষকে শেকড়ের সন্ধান দিতে, আত্মপরিচয়ের আয়না মুখের সামনে তুলে ধরতে।
বরাকের উথালপাথাল জল এখনও বয়ে চলে, কলকাতার পিচঢালা পথ দিয়ে এখনও মানুষের মিছিল হেঁটে যায় অ্যাকাডেমির দিকে, জড়ো হয় তার প্রাঙ্গণে। আর সেই ভিড়ের মাঝে কান পাতলে আজও কোথাও যেন শোনা যায় সেই পঞ্চাশোর্ধ কবির সাথে হেঁটে চলা এক সুরপাগল যুবকের পায়ের শব্দ। তোমার দোতারা, তোমার খমক, তোমার সেই ভরাট গলার গমগমে আওয়াজ আজও অনুরণিত হয় হাজারও মানুষের হৃদয়মাঝারে।
কালিকা, তোমাকে স্পর্শ করতে পারি না ঠিকই, কিন্তু বাংলার মাটি, জল আর ঘাসের পরতে পরতে তোমার গান ভেসে বেড়ায়— ছুঁয়ে যায় আমাদের শরীর আর মন। এভাবেই তুমি পাশে থাকবে অনন্তকাল। তুমি নদী হয়ে মিশে গিয়েছ আমাদের সত্তায়। যে মাটিকে ভালবেসে সারাজীবন লড়াই করলে, গান গাইলে, সেই মাটির বুকেই তুমি রয়ে গেলে এক চিরন্তন, অমলিন প্রতিবাদের সুর হয়ে।
মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্য়মে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত