উত্তম কুমার: মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের স্বপ্নপুরুষ

Uttam Kumar 100
Uttam Kumar 100

উত্তম কুমার: মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের স্বপ্নপুরুষ

(Uttam Kumar 100)

বাঙালিকে একবার শুধু জিজ্ঞাসা করতে হবে, ‘মহানায়ক’ কে? চট করে একটি শব্দেই সে উত্তর দিয়ে ফেলবে— উত্তম কুমার! 

‘মহানায়ক’ বললেই কি এই ‘উত্তম-পুরুষ’-এর দীর্ঘ অভিনয়জীবন, বিপুল জনপ্রিয়তা এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে তাঁর অবস্থান চিহ্নিত করে দেওয়া যায়? উত্তম কুমারের মহানায়ক হয়ে ওঠা বা তাঁর জনপ্রিয়তার প্রকৃত রহস্য কি শুধুই তাঁর সুদর্শন চেহারা, অনবদ্য হাসি, রোমান্টিক অভিনয় কিংবা সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর অবিস্মরণীয় রসায়ন? শুধুমাত্র এগুলোই কি তাঁকে মহানায়ক রূপে গড়ে তুলেছিল?


আরও পড়ুন: বোম্বে নয়, দেশের প্রথম বেতার সম্প্রচার কলকাতায়


এই সবই তো সমসাময়িক বহু অভিনেতার ক্ষেত্রে হতে পারত বা এখনও তো হতে পারে। বিশেষ একজন নায়িকার সঙ্গে অভিনয়ের রসায়নটুকু বাদ দিলে, বাকি সমস্ত গুণই একাধিক নায়কের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। তবে, ইতোমধ্যে একজন অভিনেতাকে অনেকটা সেই রিলে রেসের ব্যাটন হস্তান্তরের মতো, ‘মহানায়ক’ তকমা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। যদিও সেটা সম্পূর্ণ আলাদা ঘটনা— এখানে আলোচ্য বিষয় নয়।

‘মহানায়ক’ উপাধি আর তকমার মধ্যে যে পার্থক্য আছে, সেই পার্থক্য বুঝে নিতে বাঙালির অসুবিধা হয় না। উপাধি চিরস্থায়ী আর তকমার মালিকানার হাতবদল হয় সময়ে সময়ে। কিন্তু, প্রশ্নটা হল উত্তম কুমারই ‘মহানায়ক’ কেন?— এর সঠিক উত্তর সম্ভবত বাঙালির কাছে নেই।

Uttam Kumar 100
শুধুমাত্র এগুলোই কি তাঁকে মহানায়ক রূপে গড়ে তুলেছিল?

তবে বাংলা ছবির দর্শক কিন্তু এটা বোঝে— উত্তম কুমারের সাফল্যকে বুঝতে গেলে তাঁকে শুধু ‘নায়ক’ হিসেবে দেখলে চলে না। অসংখ্য নায়কদের ভিড়ের মাঝে তাঁকে আলাদা করে মেলে ধরতে হয় যে। 

আসলে উত্তম কুমার ছিলেন বাংলার মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক সমাজের এক সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি। আর তাই হয়তো এই বিষয়টিই তাঁর জনপ্রিয়তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলির একটি।

উত্তম কুমার মানে তো ম্যাটিনি আইডল! কিন্তু তিনি যে স্বপ্ন দেখাতেন, সেই স্বপ্ন ছিল বাঙালির নিজের সমাজের ভিতর থেকেই উঠে আসা। তিনি ছিলেন আধুনিক, রোমান্টিক, আকর্ষণীয়; একই সঙ্গে সকলের যেন ভীষণ পরিচিত একজন। তাঁর পোশাক, কথাবার্তা, রসবোধ, প্রেমের প্রকাশ, পারিবারিক সম্পর্ক— সবকিছুর মধ্যেই বাঙালি মধ্যবিত্ত দর্শক নিজের একটি সম্ভাব্য প্রতিচ্ছবি দেখতে পেত।

Uttam Kumar 100
সূর্য্য তোরণ ছবির পোস্টার

তিনি এমন এক স্বপ্নপুরুষ, যাঁকে দেখে বাঙালি দর্শকের মনে হত— এ মানুষটি ‘আমাদেরই একজন’, শুধু আমাদের চেয়ে একটু বেশি সুন্দর, একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী, একটু বেশি সফল। আর এই ‘আমাদের একজন’ হয়ে ওঠার ক্ষমতার জন্যই বাঙালি দর্শক, উত্তম কুমারকে অন্য অনেক তারকার চেয়ে আলাদা আসন দিয়েছিল। আজও তিনি সেই আসনেই অধিষ্ঠিত।

স্বাধীন ভারতে জমিদারি প্রথার অবসান ঘটল। পাশাপাশি বাংলায় বড় শিল্পপতি শ্রেণি সেভাবে গড়ে উঠল না। তার সঙ্গে দেশভাগের একটা মস্ত প্রভাব। ফলে পুরনো অভিজাত ভদ্রলোকের জায়গা ক্রমশ দখল করল মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক।

উত্তম কুমারের আবির্ভাবের সময়টি ছিল তাঁর পক্ষে এবং মহানায়ক হয়ে ওঠার জন্য প্রতিকূল- ততকালীন বাংলার সমাজের পরিবর্তনটিও অনুঘটকের কাজ করেছে।

ঔপনিবেশিক বাংলার ‘ভদ্রলোক’ সমাজ একসময়, মূলত জমিদার ও শিক্ষিত অভিজাত পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ঠাকুর পরিবার বা সমসাময়িক অন্যান্য ধনী জমিদার পরিবাররা ছিলেন তৎকালীন ‘ভদ্রলোক’ আর তাদের হাতেই ছিল সেই সমাজের সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব। একটা গোটা সমাজ মূলত দু’টি ভাগে বিভক্ত ছিল— উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত কিংবা ভদ্রলোক আর ছোটলোক। যেন দু’টি মাইলফলক, যার মাঝামাঝি যে মধ্যবিত্ত নামক পথটি থাকার কথা, তার অস্তিত্বই নেই— থাকলেও সেটা উল্লেখ করার মতো কিছু না।

কিন্তু স্বাধীনতার পর, বিশেষত ১৯৫০-এর দশকে, সমাজচিত্রের বিন্যাস একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সামাজিক চিত্রটি তার জৌলুস হারাচ্ছিল এবং তার পাশাপাশি নতুন এক ছবি দিয়ে সামাজিক পট সাজানো হচ্ছিল। দেশ জুড়ে চেহারাটা এক হলেও, বাংলার ক্ষেত্রে খানিকটা ভিন্নই ছিল।

Uttam Kumar 100
পৃথিবী আমারে চায় ছবির পোস্টার

স্বাধীন ভারতে জমিদারি প্রথার অবসান ঘটল। পাশাপাশি বাংলায় বড় শিল্পপতি শ্রেণি সেভাবে গড়ে উঠল না। তার সঙ্গে দেশভাগের একটা মস্ত প্রভাব। ফলে পুরনো অভিজাত ভদ্রলোকের জায়গা ক্রমশ দখল করল মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক।

এই ‘মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক’ কারা? এই গোষ্ঠীর কাছে সম্পদের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু শিক্ষা ছিল। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছিল না, কিন্তু সামাজিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা ছিল। উদ্বাস্তুর পরিচয় নিয়ে কলোনি জীবন ছিল, সংসারে টানাপোড়েন ছিল, চাকরির চিন্তা ছিল, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ছিল— তবু প্রেম করার, সুন্দরভাবে বাঁচার, একটু স্বচ্ছন্দ জীবনের স্বপ্ন দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রবল ছিল। আর এসবেরই ছায়া পড়েছিল সমসাময়িক সাহিত্যে, নাট্যে, চিত্রশিল্পে, এমনকি চলচ্চিত্রেও। এসব শিল্পের মূল চরিত্র বহুলাংশে সেই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি আর এইসব সৃজন শিল্পের পাঠক, শ্রোতা বা  দর্শকও ছিল সেই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক শ্রেণির।

অস্বীকার করার উপায় নেই— বাংলা ছবির সিলেবাসে উত্তম কুমার সংযোজন করেছিলেন প্রেমের নতুন এক ব্যাকরণের পাঠ্যক্রম। যার ফলে পঞ্চাশের দশক থেকে রুপোলি পর্দায়, অনেকটা বদল ঘটে প্রেমকাহিনির পরিবেশনে। এই ক্ষেত্রে, উত্তম কুমারের পাশাপাশি সুচিত্রা সেনের প্রসঙ্গ উত্থাপনও কিন্তু খানিকটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকই হয়ে উঠেছিল উত্তম কুমারের প্রধান ‘সাংস্কৃতিক’ দর্শক। এখানেই উত্তমের গুরুত্ব এবং প্রাসঙ্গিকতা। তিনি এই শ্রেণির মানুষের কাছে কেবল বিনোদনের নায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন তাদের মনের আকাঙ্ক্ষায় বসবাস করা, পর্দার প্রতিমূর্তি। তিনি ছিলেন ‘আমাদের লোক’। প্রশ্ন হল, কী করে উত্তম ‘আমাদের লোক’ হয়ে উঠলেন?

উত্তম-অভিনীত রোমান্টিক নায়কদের চরিত্রগুলিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, তারা কোনও পশ্চিমী সিনেমা থেকে ধার করা এক বিচ্ছিন্ন ‘হিরো’ না। তারা আধুনিক, কিন্তু পাশ্চাত্যনির্ভর না। তারা প্রেমিক, কিন্তু বেপরোয়া না। তারা সুদর্শন, কিন্তু উদ্ধত না। তারা আত্মবিশ্বাসী, কিন্তু দাম্ভিক না। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তারা রোমান্টিক, কিন্তু পরিবারবিচ্ছিন্ন না। মনে হয়, যেন এই বৈশিষ্ট্যগুলিই তৈরি করেছিল উত্তম কুমারের সেই বিশেষ ‘ভদ্রলোকীয়’ আকর্ষণ? 

Uttam Kumar 100
উত্তম-অভিনীত চরিত্রগুলি রোমান্টিক, কিন্তু পরিবারবিচ্ছিন্ন না

উত্তম-অভিনীত বহু ছবিতে আমরা দেখছি, নায়ক প্রেমে পড়তে জানেন, কিন্তু প্রেমের সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্কও বোঝেন। তিনি নারীর প্রতি আকৃষ্ট হন, কিন্তু নারীকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে দেখেন না। তিনি সংসারের সঙ্গে যুক্ত, পরিবারকে গুরুত্ব দেন, সামাজিক মর্যাদার মূল্য বোঝেন, আবার ব্যক্তিগত সুখের আকাঙ্ক্ষাকেও অস্বীকার করেন না। অর্থাৎ তিনি মধ্যবিত্ত বাঙালির সেই চিরন্তন দ্বন্দ্বটিকে চরিত্রের মধ্যে দিয়েই নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন— সংস্কার বনাম আধুনিকতা, কর্তব্য বনাম প্রেম, পরিবার বনাম ব্যক্তিস্বাধীনতা। এই দ্বন্দ্বই তাঁকে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।

অস্বীকার করার উপায় নেই— বাংলা ছবির সিলেবাসে উত্তম কুমার সংযোজন করেছিলেন প্রেমের নতুন এক ব্যাকরণের পাঠ্যক্রম। যার ফলে পঞ্চাশের দশক থেকে রুপোলি পর্দায়, অনেকটা বদল ঘটে প্রেমকাহিনির পরিবেশনে। এই ক্ষেত্রে, উত্তম কুমারের পাশাপাশি সুচিত্রা সেনের প্রসঙ্গ উত্থাপনও কিন্তু খানিকটা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আর সুচিত্রা সেনের চরিত্রগুলি এই সম্পর্ককে আরও আধুনিক করে তুলেছিল। তিনি কেবল নায়কের প্রেমিকা নন; শিক্ষিত, সচেতন, সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নারীও। ফলে উত্তম-সুচিত্রা জুটি আসলে মধ্যবিত্ত বাঙালিকে একটি নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। 

উত্তম–সুচিত্রা জুটি বাংলা সিনেমায় শুধুমাত্র একটি সফল রোমান্টিক জুটিই ছিল না, এই দু’জনের জুটি মিলে সৃষ্টি করেছিল মধ্যবিত্ত বাঙালির প্রেমের এক নতুন ভাষা। অর্থোডক্স বা রক্ষণশীল বাঙালি সমাজের চোখের সামনে মেলে ধরেছিল মধ্যবিত্ত বাঙালি প্রেমের ছাড়পত্র। 

ভুললে চলবে না, ১৯৫০-এর দশকের সিনেমাহলগামী দর্শকদের একটা বড় অংশ ছিল তরুণ প্রজন্মের এবং সেই দর্শকদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাও স্বাভাবিক কারণেই ছিল মহিলাদের তুলনায় বেশি। ফলে রোমান্টিক সিনেমার চাহিদা তৈরি হওয়াটাও স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এই প্রেম নিছক রূপকথার প্রেম ছিল না।

Uttam Kumar 100
সুচিত্রা-উত্তম জুটি

সাড়ে চুয়াত্তর-এ যেমন শহুরে কর্মজীবী মানুষের আবাসনের বাস্তবতা রয়েছে। সাগরিকা-তে শিক্ষিত সমাজের ছাত্রছাত্রীর প্রেমে দোলাচল। ওদিকে, সূর্যতোরণ-এ দরিদ্র মানুষের জন্য আবাসন তৈরির স্বপ্ন। সপ্তপদী-তে ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করা প্রেম। অর্থাৎ উত্তম–সুচিত্রার ছবির প্রেমে ছিল সমকালীনতার স্পর্শ। এই প্রেম ছিল সেই প্রেম, যা মধ্যবিত্ত বাঙালি নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারত। নিজেকে খুঁজে পেত ছবির গল্পে।

আর সুচিত্রা সেনের চরিত্রগুলি এই সম্পর্ককে আরও আধুনিক করে তুলেছিল। তিনি কেবল নায়কের প্রেমিকা নন; শিক্ষিত, সচেতন, সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নারীও। ফলে উত্তম-সুচিত্রা জুটি আসলে মধ্যবিত্ত বাঙালিকে একটি নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। 

ম্যাটিনি আইডলদের ক্ষেত্রে একটা বিপদ থাকে। পর্দায় ছবির নায়ক যদি দর্শকের ধারণায় অতিরিক্ত দূরের মানুষ হয়ে ওঠেন, তার সঙ্গে দর্শকের আবেগের যোগ কমে যেতে পারে। 

খুব সহজ কথায় বলতে গেলে উত্তম কুমার পুরুষের কাছে ছিলেন ‘আমি যেমন হতে চাই’, আর নারীর কাছে ‘যেমন পুরুষকে চাই’— এই দুই আকাঙ্ক্ষার এক বিরল মিলন সৃষ্টি করেছিল উত্তম কুমার নামক আসল রক্তমাংসের এক মানুষের আলোছায়ায় মোড়া সংস্করণ। আর সেখানেই জন্ম নিল এক মহানায়ক। 

উত্তম কুমার সেই দূরত্ব তৈরি হতে দেননি। ভিড়ের থেকে দূরে থেকেও তিনি ভিড়ে মিশে থাকার কৌশল ভাল রপ্ত করেছিলেন। তিনি স্বপ্নের পুরুষ, কিন্তু নাগালের বাইরের মানুষ নন। তাঁকে স্পর্শ না করা গেলেও, তিনি যেন সব সময় পাশেই ছিলেন। তাঁর এই তারকাসত্তার মধ্যে ছিল এক ধরনের পরিচিতির উষ্ণতা।

তাঁকে দেখে বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষ হয়তো নিজের কাঙ্ক্ষিত সংস্করণটিকে দেখতে পেত। আর মধ্যবিত্ত বাঙালি নারী দেখতে পেত সেই পুরুষটিকে, যাকে সে হয়তো জীবনে পেতে চায়— সুন্দর, শিক্ষিত, রুচিশীল, রোমান্টিক, কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়।

Uttam Kumar 100
শাপমোচন ছবির পোস্টার

এই দ্বিমুখী আকর্ষণই কি তাঁকে অসাধারণ জনপ্রিয় করে তুলেছিল?

খুব সহজ কথায় বলতে গেলে উত্তম কুমার পুরুষের কাছে ছিলেন ‘আমি যেমন হতে চাই’, আর নারীর কাছে ‘যেমন পুরুষকে চাই’— এই দুই আকাঙ্ক্ষার এক বিরল মিলন সৃষ্টি করেছিল উত্তম কুমার নামক আসল রক্তমাংসের এক মানুষের আলোছায়ায় মোড়া সংস্করণ। আর সেখানেই জন্ম নিল এক মহানায়ক। 

এখানেই শেষ নয়— উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার আরও বড় রহস্য লুকিয়ে ছিল তাঁর পরবর্তী রূপান্তরে। ১৯৬০-এর দশকের শেষ এবং ১৯৭০-এর দশকে বাংলা মধ্যবিত্ত সমাজ নিজেই এক গভীর সংকটের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের পরিবর্তন— সব মিলিয়ে পুরনো ভদ্রলোক সমাজের ভিত নড়ছিল।

প্রশ্ন থেকে যায়— উত্তম কুমারের ‘মাস অ্যাপিল’ ছিল কি? সিনেমার ভাষায় ‘মাস অ্যাপিল’ বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝে নেওয়া দরকার।

এই সময় উত্তম কুমারের পর্দার চরিত্রেও খানিক পরিবর্তন এল। রোমান্টিক নায়ক ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন ‘দাদা’ এবং এটি নিছক বয়সের সঙ্গে চরিত্র বদলের ঘটনা নয়। এর মধ্যে একটি গভীর সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে।

নায়ক প্রেমিকাকে জয় করতে পারেন; কিন্তু ‘দাদা’ সংসারকে ধরে রাখেন। নায়ক প্রেমের স্বপ্ন দেখান; দাদা বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করেন। নায়ক ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধি; দাদা পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের রক্ষক।

এই ‘দাদা’ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে উত্তম কুমার যেন মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের নতুন সংকটের পাশে দাঁড়ালেন। উদাহরণস্বরূপ, মৌচাক-এর মতো একটি মজার ছবিতেও তাঁর এই দাদা-সত্তা স্পষ্ট। তিনি শুধু বড় ভাই নন; পরিবারের সংঘাত মেটান, সম্পর্কগুলিকে ধরে রাখেন— যেন ভেঙে পড়তে থাকা ভদ্রলোক সংসারের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। স্পষ্টত, উত্তম কুমারের তারকাসত্তা কেবল ‘রোমান্টিক হিরো’-তে আটকে থাকেনি। তিনি প্রেমিক থেকে অভিভাবক হয়েছেন।

Uttam Kumar 100
আলো আমার আলো ছবির পোস্টার

এই রূপান্তরই তাঁর জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘস্থায়ী করেনি কি?

প্রশ্ন থেকে যায়— উত্তম কুমারের ‘মাস অ্যাপিল’ ছিল কি? সিনেমার ভাষায় ‘মাস অ্যাপিল’ বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝে নেওয়া দরকার।

তিনি প্রথমেই মহান হয়ে ওঠেননি। তিনি আগে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির পাশের বাড়ির সেই পরিচিত মানুষ। তারপর তিনি স্বপ্নের মানুষ। তারপর তারকা এবং তারপর মহানায়ক। আর এই যাত্রাপথে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়টি ছিল— তিনি একজন ‘মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক’।

উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল, কিন্তু সেটি পরবর্তী সময়ের অমিতাভ বচ্চনের মতো সর্বস্তরের ‘মাস’ জনপ্রিয়তার সঙ্গে এক করে বিচার করা যায় না। আমরা আগেই দেখেছি, ১৯৫০-এর দশকের কলকাতায় সিনেমা দর্শকদের একটি বড় অংশ ছিল তরুণ মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক সমাজের অন্তর্ভুক্ত; শহরের এবং গ্রামবাংলার বিপুল সংখ্যক মানুষ তখনও নিয়মিত সিনেমা দেখতেন না। এই তথ্যটি উত্তম কুমারের গুরুত্বকে কমায় না; বরং তাঁর জনপ্রিয়তার প্রকৃতি আরও স্পষ্ট করে।

তারকার জনপ্রিয়তা সাধারণত সময়ের সঙ্গে মুছে যায়। একইভাবে ফ্যাশন বদলায়। চেহারার আকর্ষণ বদলায়। অভিনয়ের ধরন বদলায়। নতুন নায়ক আসে।

Uttam Kumar 100
‘উত্তম কুমার’ নামটি আজও শুধু একজন অভিনেতার নাম নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক নস্টালজিয়ার নাম

কিন্তু উত্তম কুমারের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। কারণ তাঁর স্মৃতি কেবল সিনেমার স্মৃতি নয়। সেটি একটি বিশেষ সময়ের বাঙালি মধ্যবিত্তের নিজস্ব যৌবনের স্মৃতি। একটি নির্দিষ্ট সময়ের কলকাতা, প্রেম, পরিবার, চাকরি, বন্ধুত্ব, আড্ডা, পোশাক, গান, রোমান্টিকতা— সবকিছুর সঙ্গে উত্তমের মুখ জড়িয়ে গেছে। এ যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া এক সময়কে স্মরণ করা।

এই কারণেই ‘উত্তম কুমার’ নামটি আজও শুধু একজন অভিনেতার নাম নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক নস্টালজিয়ার নাম। সম্ভবত এখানেই উত্তম কুমারের সাফল্যের সবচেয়ে বড় রহস্য।

তিনি প্রথমেই মহান হয়ে ওঠেননি। তিনি আগে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির পাশের বাড়ির সেই পরিচিত মানুষ। তারপর তিনি স্বপ্নের মানুষ। তারপর তারকা এবং তারপর মহানায়ক। আর এই যাত্রাপথে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়টি ছিল— তিনি একজন ‘মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক’।

এই সমন্বয়টাই তাঁকে বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। করে তুলেছিল স্বপ্নের নায়ক। কারণ তাঁর প্রেমের ছবি সেই স্বপ্নকে পূর্ণতা দিয়েছিল; আর পরবর্তী সময়ে ‘দাদা’ হয়ে ওঠা তাঁকে নিয়ে এসেছিল আরও গভীরে— বাঙালি পরিবারের অভ্যন্তরে।

ভদ্রলোক, কিন্তু নিষ্প্রাণ নয়। আধুনিক, কিন্তু শিকড়হীন নয়। রোমান্টিক, কিন্তু দায়িত্বহীন নয়। সফল, কিন্তু আত্মম্ভরী নয়। সুন্দর, কিন্তু নাগালের বাইরে নয়।

এই সমন্বয়টাই তাঁকে বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল। করে তুলেছিল স্বপ্নের নায়ক। কারণ তাঁর প্রেমের ছবি সেই স্বপ্নকে পূর্ণতা দিয়েছিল; আর পরবর্তী সময়ে ‘দাদা’ হয়ে ওঠা তাঁকে নিয়ে এসেছিল আরও গভীরে— বাঙালি পরিবারের অভ্যন্তরে।

সেই জন্যই উত্তম কুমারকে শুধুমাত্র বাংলা সিনেমার ম্যাটিনি আইডল বললে পুরোটা বলা হয় না। তিনি ছিলেন এক সামাজিক সময়ের প্রতিনিধি। তিনি ছিলেন মধ্যবিত্ত বাঙালির আত্মপরিচয়ের, পর্দার প্রতিচ্ছবি। আর তাঁর ‘ভদ্রলোকীয়’ রূপই সম্ভবত সেই বিরল সেতু, যা একদিকে তাঁকে স্বপ্নের নায়ক করেছে, অন্যদিকে দর্শকের নিজের মানুষ করে রেখেছে। এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হয়েছিলেন এক উত্তম কুমার। আর সেই কারণেই, বয়েসের ফিতে দিয়ে তাঁকে না মেপে, শতবর্ষ পরেও বাঙালির কাছে তিনি শুধু মহানায়ক নন- তিনি এখনও আমাদের উত্তম।

মুদ্রিত ও ডিজিটাল মাধ্যমে সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

Please login to bookmark Close
Picture of সুতীর্থ দাশ

সুতীর্থ দাশ

সুতীর্থ দাশ জন্ম হরিয়ানার শিল্পনগরী ফরিদাবাদে। পিতার কর্মসূত্রে বাল্য-কৈশোর কেটেছে উত্তর-পশ্চিম ভারতের একাধিক শহরে। কলকাতায় এসে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে শিল্পশিক্ষার পাঠ নেওয়ার পর বিজ্ঞাপন সংস্থায় চাকরি। দীর্ঘ ১২ বছর বিজ্ঞাপনের পেশায় থাকার পর, পেশা বদল করে আসেন বেসরকারি রেডিও প্রোগ্রামিং’য়ের চাকরিতে। সেখানে আরও ১৮ বছর কাটিয়ে বর্তমানে ভারতের এক স্বনামধন্য মিউজিক কম্পানিতে কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের কাজে যুক্ত। পেশাগত কাজকর্মের পাশাপাশি ভালোবাসেন ছবি আঁকতে এবং লিখতেও। নিজের শিল্পীমন দিয়ে তিনি লেখেন গ্রাম-শহরের নানা কাহিনি। ছোট ছোট গল্পের জাল বুনে তিনি লিখে চলেন আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা কাহিনি। অজস্র প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাশাপাশি, ইতিমধ্যেই তিনি লিখে ফেলেছেন বেশ কয়েকটি বইও। সেগুলোর মধ্যে শহর কলকাতার বিভিন্ন আখ্যান নিয়ে লেখা ‘তিলোত্তমার গর্ভজাত’ পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়াও জাগিয়েছে। রেডিয়ো নিয়ে তাঁর প্রথম বই ‘তরঙ্গে অন্তরঙ্গে – কলকাতা বেতারের উপকথা’ ইতিমধ্যে খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

The Banglalive's Picks

Weekly Newsletter

Enjoy our flagship newsletter as a digest delivered once a week.

By signing up, you agree to our User Agreement and Privacy Policy & Cookie Statement.

Please login to bookmark Close
ছোটবেলায় বিছানায় শুয়ে মা-ঠাকুমাদের কাছে রূপকথার গল্প শুনতাম। তাঁরা বলতেন "এক ছিল রাজা, তার ছিল রানী। তাদের ছিল অগাধ ঐশ্বর্য। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, লোক-লস্কর, ঢাল-তরোয়াল, পাইক-বরকন্দাজ, পাত্র-মিত্র, মন্ত্রী-আমলা, সাতমহলা প্রাসাদ ইত্যাদি আরও কত কী।" কিন্তু এগুলো যে শুধুই রূপকথার গল্প নয়, বাস্তবেও যে ছিল এমন সব রাজা, তা জেনেছি অনেক পরে। লিখছেন সুধীন্দ্র কুমার চক্রবর্তী...
Please login to bookmark Close
ভাদ্রের বাতাবরণে লুকিয়ে থাকে কেমন একটা বিরহজনিত বিষাদ, যা কবিহৃদয়কে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে, সে তিনি যে যুগের কবিই হোন না কেন। ভাদ্র পূর্ণ অথচ একই সঙ্গে বিষণ্ণ। ভাদ্রের মধ্যে খেলা করে ভরা জোয়ার, কিন্তু মরা ভাটার টানকেও সে অস্বীকার করতে পারে না। ‘ভরা বাদরে’ অবগাহন করার পরও তার বদনাম ‘পচা ভাদ্র’ হিসাবে।  লিখছেন দিলীপ কুমার ঘোষ...
Please login to bookmark Close
ছোটবেলায় আমাদের সঙ্গে পড়ত সমৃদ্ধ চক্রবর্তী। সমৃদ্ধ ছিল অটিস্টিক। সমৃদ্ধর মা কৃষ্ণা কাকিমা ওঁকে নিয়ে স্কুলে আসতেন। পরীক্ষার সময় ওঁকে নিয়ে বসতেন। সমৃদ্ধকে আপন করে নিতে আমাদের ছোটদের কখনও কোনও অসুবিধা হয়নি। কিন্তু আমাদের অভিভাবকেরা তা করতেন না। কী অবলীলাক্রমে তখন গার্জিয়ানরা সমৃদ্ধকে বলে দিত 'অ্যাবনর্মাল বাচ্চা'! লিখছেন ভাস্কর মজুমদার...

Subscribe

Banglalive.com/TheSpace.ink Guidelines

Established: 1999

Website URL: https://banglalive.com and https://thespace.ink

Social media handles

Facebook: https://www.facebook.com/banglaliveofficial

Instagram: https://www.instagram.com/banglalivedotcom

Twitter: @banglalive

Needs: Banglalive.com/thespace.ink are looking for fiction and poetry. They are also seeking travelogues, videos, and audios for their various sections. The magazine also publishes and encourages artworks, photography. We however do not accept unsolicited nonfiction. For Non-fictions contact directly at editor@banglalive.com / editor@thespace.ink

Time: It may take 2-3 months for the decision and subsequent publication. You will be notified. so please do not forget to add your email address/WhatsApp number.

Tips: Banglalive editor/s and everyone in the fiction department writes an opinion and rates the fiction or poetry about a story being considered for publication. We may even send it out to external editors/readers for a blind read from time to time to seek opinion. A published story may not be liked by everyone. There is no one thing or any particular feature or trademark to get published in the magazine. A story must grow on its own terms.

How to Submit: Upload your fiction and poetry submissions directly on this portal or submit via email (see the guidelines below).

Guidelines:

  1. Please submit original, well-written articles on appropriate topics/interviews only. Properly typed and formatted word document (NO PDFs please) using Unicode fonts. For videos and photos, there is a limitation on size, so email directly for bigger files. Along with the article, please send author profile information (in 100-150 words maximum) and a photograph of the author. You can check in the portal for author profile references.
  2. No nudity/obscenity/profanity/personal attacks based on caste, creed or region will be accepted. Politically biased/charged articles, that can incite social unrest will NOT be accepted. Avoid biased or derogatory language. Avoid slang. All content must be created from a neutral point of view.
  3. Limit articles to about 1000-1200 words. Use single spacing after punctuation.
  4. Article title and author information: Include an appropriate and informative title for the article. Specify any particular spelling you use for your name (if any).
  5. Submitting an article gives Banglalive.com/TheSpace.ink the rights to publish and edit, if needed. The editor will review all articles and make required changes for readability and organization style, prior to publication. If significant edits are needed, the editor will send the revised article back to the author for approval. The editorial board will then review and must approve the article before publication. The date an article is published will be determined by the editor.

 

Submit Content

For art, pics, video, audio etc. Contact editor@banglalive.com